শহীদ কাদরীর জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৪২, কলকাতায়। দেশ ভাগের পর আসেন ঢাকায়। কবি দেশ ছাড়েন ১৯৭৮ সালে। প্রথমে জার্মানি তারপর লন্ডন হয়ে মার্কিন মুল্লুকে। কবিতা লেখা শুরু করেন পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ১৯৫৬ সালে প্রথম কবিতা ‘এই শীতে’ প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’য়। সেদিনই মারা যান তাঁর মা। ১৪ বছরের কিশোর বিষন্ন মনে ঘরের এক কোণে মন খারাপ করে শুধুই মা’র স্মৃতিতে বিচরণ করছিলেন। হঠাৎ পেছন থেকে শামসুর রাহমান তাঁর কাধে রাখলেন হাত। সদ্য প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকা তাঁর মুখের সামনে খুলে ধরলেন। বিষন্নতা আর শোকের মাঝে এ যেন শান্তির ছায়া। ১৯৬৭-তে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তরাধিকার’। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৮ সালে তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’। পঞ্চাশ-উত্তর বাংলা কবিতায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে ক’জন কবির নাম নেয়া যায় কবি শহীদ কাদরী তাঁদের অন্যতম। বিশ্ব-নাগরিকতা বোধ, আধুনিক নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল এসব তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে স্বতস্ফূর্তভাবে। একুশে পদক (২০১১) ও বাংলা একাডেমি পুরষ্কারপ্রাপ্ত খ্যাতিমান এ কবির সাথে আলাপচারিতায় বসেছিলেন কবি শামস আল মমীন।

শামস আল মমীন : প্রায় চব্বিশ বছর কবিতাহীন কেমন আছেন?
শহীদ কাদরী : চব্বিশ বছর ধরে কবিতা লিখছি না এটা সত্যি কথা কিন্তু কবিতাহীন আমি না। কীটস-এর একটি কথা আপনার মনে আছে নিশ্চয়, Poetry of the earth is never dead. অর্থাৎ পৃথিবীতে কখনই কবিতার দিন শেষ হবে না। জীবনকাব্য দ্বারা এখানো আমি পরিবৃত। কবিতা আমি এখনও পড়ি।

শামস আল মমীন : সপ্তাহের একটা দিন আপনি কীভাবে কাটান?
শহীদ কাদরী : আমি Site Counselor হিসাবে কাজ করি। দিনের একটা অংশ ঘুমাই আর বাকী সময় বই-টই পড়ি।

শামস আল মমীন : কখন বুঝতে পারলেন আপনি কবিতা লিখতে পারবেন?
শহীদ কাদরী : কবিতা লিখতে পারবো এরকম বিশ্বাস কখনই ছিল না। সব সময় দোদুল্যমান দোদুল্যমান ছিলাম। অল্প বয়সে আমার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দিনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের। শামসুর রাহমানকে প্রায়ই ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করতাম, আমার কি হবে? হ্যাঁ, তবে আপনার মধ্যে দুটো Opposing force কাজ করছে। আপনি খুব ভালো লিখতে পারেন অথবা আপনি নষ্টও হয়ে যেতে পারেন।

শামস আল মমীন : তাহলে বলা যায়, শুরুতেই আপনি শামসুর রাহমান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন?
শহীদ কাদরী : সত্যি কথা বলতে কি, লেখা আমি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। ১৯৫৬ সালে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। আমি তখন স্কুলে পড়ি। বুদ্ধদেব বসু আমার কবিতা ছেপেছেন, আমি মনে করলাম, আমার হয়ে গেছে আর লেখার দরকার নেই। তারপর দু’বছর আর আমি কবিতা লিখিনি। এর একটা কারণ হলো, তখন খালেদ চৌধুরী, সুকুমার মজুমদার ওঁদের সাথে আমার পরিচয় হয়, এঁরা ছিলেন দার্শনিক। এঁরা তখন হেগেল, প্লেটো, কান্ট পড়ছেন। আমাদের মধ্যে একটা কথা উঠলো, কবিরা কবিতায় অনুপ্রেরণা বা আবেগে অনেক কথা বলেন যার কোন অর্থ হয় না। এবং প্লেটো যে কারণে তার রিপাবলিক থেকে কবিতাকে নির্বাসন দিয়েছেন। জীবনের অর্থ সত্যের উদঘাটন এবং তা একমাত্র দর্শনেই সম্ভব। আমি তখন তুমুল বেগে দর্শন পড়া শুরু করলাম। কবিতাকে ছেলেমানুষির মতো মনে হওয়া শুরু করলো। একদিন আমরা বসে আছি ‘চুচিং চাওতে’, ঢাকার প্রথম চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, হঠাৎ সৈয়দ শামসুর হক এসে বলল- আমার প্রথম কবিতার বই বেরিয়েছে ‘একদা একরাত্রি’ আপনাকে বইটা দিতে চাই। আপনি কাল চিত্রালী অফিসে আসেন। পরের দিন চিত্রালী অফিসে গেলাম। হক আমাকে বইটি দিয়ে বলল, যদি পারেন একটা রিভিউ লিখে দেন। আমি বললাম, তাহলে বইটা আমি বাসায় নিয়ে যাই। হক বলল, না শহীদ ভাই আপনি একবার গেলে আপনাকে আর পাওয়া যাবে না। এখানে বসেই লিখে দেন।

শামস আল মমীন : আমরা যতটুকু জানি, আপনি কারো বইয়ের রিভিউ লেখেন না।
শহীদ কাদরী : ঐ বইটার রিভিউ লিখেছিলাম। (না লেখার কোন কারণ ছিলো না, আলসেমীর জন্যই লেখা হতো না। আমাকে জোর করলেই আমি লিখতাম। কেউ জোর করতো না তাই লেখাও হতো না।) হক জোর করলো তাই লিখলাম।
সৈয়দ হক পরে একদিন বলল, বইটার একটা প্রকাশনা উৎসবের মতো করেছিলাম এক রেস্টুরেন্টে। ওখানে শামসুর রাহমানের সাথে দেখা হলো, বইটা তাকে দিতেই তিনি বললেন, ‘আহ্ আজকে শহীদ কোথায়, ও ছেলেটা লিখতে পারতো। ও নিজেকে নষ্ট করল খামোখা-ই। এই কথা শুনে আমার খুব খারাপ লাগলো। বাড়িতে এসে ঐদিন সন্ধ্যায় আমি ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ কবিতাটা লিখে ফেললাম।

শামস আল মমীন : কবিতাটা কি একটানে লিখেছিলেন?
শহীদ কাদরী : একটানা। আধঘন্টার মধ্যে লিখে শেষ করেছি।

শামস আল মমীন : এটাতো প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা।
শহীদ কাদরী : আমি তখন বুঝতেও পারিনি এটা একটা ভালো কবিতা হয়েছে। পরে আল মাহমুদ কবিতাটা আমার কাছে থেকে নিয়ে সমকাল-এ ছাপে। অনেকেই কবিতাটার প্রশংসা করলো। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আমাকে বললো, ‘এত অল্প বয়সে ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’র মতো কবিতা লিখেছো, এটা একটা বিস্ময়কর ঘটনা’।

শামস আল মমীন : আমরা ৮০/৯০ দশকের কবিতা লেখার পরিবেশ সম্পর্কে মোটামুটি জানি। আপনাদের সময় কবিদের মধ্যে কি ধরনের সম্পর্ক ছিল? কিংবা কবিদের আড্ডাগুলোর পরিবেশ কেমন ছিল?
শহীদ কাদরী : তখন ঢাকা ছোট্ট শহর ছিল। এবং আড্ডাগুলো ছিল মুলত পত্রিকা কেন্দ্রীক। সমকাল অফিসে আড্ডা হতো। সওগাত অফিসে আড্ডা হতো। এসব জায়গায় প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের দেখা হতো। আল মাহমুদের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় সওগাত অফিসেই। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া থেকে আল মাহমুদ যেদিন প্রথম সওগাত অফিসে আসে সেদিনই সওগাতে আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়। আব্দুল গাফফার চৌধুরী সওগাত পত্রিকার কবিতার অংশ সম্পাদনা করতেন। ঐ সন্ধ্যাতেই আল মাহমুদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হলো। তাঁর হাতে ছিল মার্কসবাদ।

শামস আল মমীন : এটা কি ৫৬ সালের কথা?
শহীদ কাদরী : সঠিক মনে নাই তবে ৫৫/৫৬ সাল হবে।

শামস আল মমীন : আমরা জানি বৃদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার তখন দারুণ প্রতাপ। কবিতা ছাপার পর আপনাদের মনে কী জাগরণ সৃষ্টি হয় যে, হ্যাঁ আমাদের হবে।
শহীদ কাদরী : প্রচন্ডভাবে, প্রচন্ডভাবে। আসলে আমাদের মধ্যে যিনি জাগরণ সৃষ্টি করেন তিনি হলেন শামসুর রাহমান। আমার মনে আছে, এক দুপুরে পিয়ন এসে ‘কবিতা’ পত্রিকা (আমার বড় ভাই কবিতা পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন) দিয়ে গেল বাসায়। তখন আমি, এক বন্ধু, বাচ্চুসহ ভাত খাচ্ছিলাম। বাচ্চু ছিল ফিল্ম ডিরেক্টর, ও ছবি বানিয়েছিলো ‘আগুন নিয়ে খেলা’। দেখেছেন ছবিটা?

শামস আল মমীন : হ্যাঁ, দেখেছি।
শহীদ কাদরী : পত্রিকা খুলে দেখি শেষ পৃষ্ঠায় ‘রুপালী স্নান’ শামসুর রাহমান। পড়ে খুব ভাল লাগলো। আমি তখন স্কুলে পড়ি। আমার বড় ভাই (ছাত্র, ইংরেজীতে অনার্স) তাকে বললাম, দেখতো কবিতাটা কেমন লাগে। পড়ে তিনি বললেন It’s a Piece of magical writing. এতো নামের ভিড়ে শামসুর রাহমানের নামটা খুব জ্বলজ্বল করে দাঁড়িয়ে আছে।
এর তিন মাস পর আবার কবিতা এলো। প্রথম কবিতাটিই শামসুর রাহমানের। ‘তার শয্যার পাশে’ তারপর ছিল সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী এঁদের কবিতা। ব্যাপারটা সাংঘাতিকভাবে আমাকে Strike করলো। তখন আমাদের মধ্যে একটা ধারণা হলো যে, হয়তো আমাদের পক্ষেও সম্ভব। আমি আগেও বলেছি এখনও বলছি, শামসুর রাহমানের প্রধান অবদান হলো তিনি আমাদের সাহসের সীমা সম্প্রসারিত করেছেন।

শামস আল মমীন : এখানে একটা কথা না বলে পারছি না, শামসুর রাহমানের কোন কবিতার বই বেরুবার আগেই তিনি কবি হিসাবে খ্যাতি পেয়েছিলেন।
শহীদ কাদরী : এটা সত্যি কথা।

শামস আল মমীন : এর কারণ কি?
শহীদ কাদরী : এর দু’টো কারণ আছে। প্রথমটা তাঁর কবিতার নিজস্ব গুণ যা সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, সময়টা ছিল ৫০-এর দশক যা বাংলা কবিতার জন্য খুব সুসময় ছিল না। কারণ ৩০-এর পাঁচজন কবির পর কলকাতায় সে কবিতার চর্চা হচ্ছিল তা ছিল রাজনীতি ভিত্তিক। এবং তখনকার বিখ্যাত কবি ছিলেন সুকান্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এঁদের কবিতা যদিও উজ্জ্বল কিন্তু একপেশে। এঁদের প্রভাবে কবিতা হয়ে উঠেছিল শ্লোগানমুখী। জীবনে যেমন রুটির প্রয়োজন আছে তেমনি গোলাপেরও প্রয়োজন আছে। তখন মার্কসবাদী আন্দোলনের এমন ঢেউ এসেছিল যে আমরা শুধু রুটির কথাই বলছিলাম গোলাপের কথা বলছিলাম না। কবিতার আবহাওয়া বদলে গিয়েছিলো। অনেকে এ ধরনের কথা বলেছিলো যে, কবিতায় অন্য কথাও বলা উচিত। শামসুর রাহমান তখন লিখলেন শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ… দেখি ছায়া নিয়ে শরীরে ছড়ায়’।

শামস আল মমীন : এখনো আপনার মুখস্থ আছে?
শহীদ কাদরী : এই কবিতাটা একটু নতুন সুর, নতুন এক ডিমেনশন্ দিয়েছে বাংলা কবিতাকে।

শামস আল মমীন : এই সময় এমন কোন কবি ছিলেন না যাঁকে কেউ অনুসরন করতে পারে? তখন কবি ছিলেন আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হোসেন, কিন্তু আমি ঠিক জানি না এঁরা কেউ প্রতিনিধিত্বশীল কবি ছিলেন কিনা।
শহীদ কাদরী : এঁরা ছিলেন যুগ সন্ধিক্ষনের কবি। আধুনিক এবং অনাধুনিক এর মধ্যবর্তী পর্যায়ের কবি। আধুনিক কবিতার যে বিভিন্ন মাত্রা, এটা তাঁরা পুরোপুরি আয়ত্ব করতে পারেননি, যেটা শামসুর রাহমান পেরেছিলেন।

শামস আল মমীন : ধরা যাক, আপনাদের কারো কবিতা যদি কবিতা পত্রিকায় ছাপা না হতো, (ভৌগলিক রাজনৈতিক কারণে) তাহলে আপনাদের কবিতা লেখায় কোনো ভাঁটা পড়ত বলে মনে হয়?
শহীদ কাদরী : ভাঁটা পড়তে পারতো। কারণ তখন আমাদের সামনে এমন কোন দৃষ্টান্ত ছিলো না যার রুচি, কাব্যবোধ এবং বিচারের উপর আমরা আস্থা রাখতে পারি। তিরিশের কবিদের যে কাব্যকৃতি আর পাণ্ডিত্যের গভীরতা আমরা অনুভব করেছিলাম, তাতে আমরা এঁদের প্রতি আস্থা রাখতে পেরেছিলাম।

শামস আল মমীন : কবি ফরহাদ মজহার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’র পর শামসুর রাহমান আর গ্রো করতে পারেননি।
শহীদ কাদরী : না, কথাটা আমার কাছে ঠিক মনে হয়নি।

শামস আল মমীন : আমি মনে করি, তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটিতে’।
শহীদ কাদরী : আমি আপনার সাথে একমত। ‘রৌদ্র করোটিতে’ তাঁর নিজস্ব কণ্ঠস্বর আমরা শুনতে পাই এবং আমি মনে করি ‘রোদ্র করোটিতে’ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থ। এবং তাঁর সমস্ত কবিতার দিকে তাকালে একটা জিনিস বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি যে কয়েকবার তাঁর বিবর্তন ঘটেছে এবং এদিকে থেকে তিনি খুব সৃষ্টিশীল। তাঁর লেখা ডেভেলপ করেনি এটা ভুল কথা।

শামস আল মমীন : তিরিশের পাঁচ কবির মধ্যে কাকে আপনার মতে সবচে শক্তিশালী মনে হয়?
শহীদ কাদরী : শক্তিশালী কোন অর্থে?

শামস আল মমীন : সম্পূর্ণ কাব্যভাষা কার বেশী আয়ত্ত্বে ছিল?
শহীদ কাদরী : এটা ঠিক আমি বলতে পারব না। তবে আমাকে আকর্ষণ করে বেশি জীবনানন্দ এবং বিষ্ণু দে।

শামস আল মমীন : আমার জানা মতে শামসুর রাহমানের পছন্দ সুধীন্দ্রনাথ।
শহীদ কাদরী : সুধীন্দ্রনাথ আমারও পছন্দ। তাঁর প্রভাব কিছু আমার উপরে পড়েছে কিছু শামসুর রাহমানের উপরেও পড়েছে। কিন্তু তার মূল কাব্যকৃতি, কিছু শব্দ ব্যবহার কৃতর্য্য শব্দ ব্যবহারের উপর তার নির্ভরশীলতা অনেক সময় তাঁর কবিতাকে অনঢ়, অচল করে দেয়।

শামস আল মমীন : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটা ইন্টারেস্টিং কথা বলেছেন। সুধীন দত্ত যেহেতু বাড়ীতে বাংলা বলতেন না, সে কারণে প্রতিদিনের কথকতা তিনি ঠিকভাবে আয়ত্ত্ব করতে পারেননি। তাঁর কাব্যভাষা বই নির্ভর।
শহীদ কাদরী : এটা পুরোপুরি সত্য নয়। পশ্চিমবঙ্গের চলতি মুখের বুলি তিনি জানতেন না এটা ভুল। হাইনের কবিতার অনুবাদে চমৎকারভাবে তিনি চলতি মুখের ভাষা ব্যবহার করেছেন। আসলে সুধীন দত্ত বাংলা কবিতা এবং প্রবন্ধেও একটা জিনিস চেষ্টা করেছিলেন তা হলো জটিলতাকে নষ্ট না করে জটিল অবস্থাতেই তাকে ব্যক্ত করা। এবং এটা করতে গিয়ে তাঁকে অনেক নতুন শব্দ তৈরী করতে হয়েছে। তার জন্য মাঝে মাঝে তা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু তার অর্জনটা হচ্ছে বাংলায় যে সব কথা বলা সম্ভব ছিলো না সে ধরনের কথা তিনি বলতে পেরেছেন।

শামস আল মমীন : হুমায়ুন আজাদ বলছেন,‘বাংলা কবিতাকে একজন মহৎ (প্রধান) কবির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী, তাই এক দশকে পাঁচজন মহৎ কবির আবির্ভাব যারপরনাই বিস্ময়কর’।
শহীদ কাদরী : আমি সম্পূর্ণ একমত এ প্রসঙ্গে।

শামস আল মমীন : ফরহাদ মজহার বলছেন, তিরিশের যুগটা কেরানীদের যুগ (আকার ইকার)।
শহীদ কাদরী : এটা একটা শ্লোগানের মতো উঠেছে বাংলাদেশে। কিন্তু আমার মনে হয় কথাটা সত্য নয়। যারা পশ্চিমা সাহিত্য পড়েছেন তারা জানেন ওরা তিরিশের মতো কবিতা লেখেননি। এবং তিরিশের কবিরা যে ধরনের কবিতা লেখেছেন পশ্চিমারা ঐ ধরনের কবিতা লেখেননি। যার জন্য অডেন-এলিয়েট পড়ে আমি যে স্বাদ পাই জীবনানন্দে, বুব্ধদেব বসু পড়ে আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদ পাই।

শামস আল মমীন : ‘পশ্চিমা সাহিত্য, সভ্যতা এবং দর্শনের কিছুই জানতেন না বুদ্ধদেব বসু। সুধীন দত্তের বই পড়লে মনে হয় ওটা অপাঠ্য, একটা মুর্খের লেখা বই। তার কোন লেখাই Complete না,’ বলছেন ফরহাদ মজহার (আকার ইকার)। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?
শহীদ কাদরী : আমি গভীরভাবে দর্শন র্চচা করেছি। সুধীন দত্ত কেনো দার্শনিক লেখক না। তিনি দর্শনের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেননি। তার প্রবন্ধে, ইংরেজীতে যাকে বলে এল্যুসিভ এবং এই এল্যুসিভনেস থেকে বোঝা যায় তিনি প্রচুর পড়াশুনা করেছেন এবং তার ছায়া আছে তাঁর বক্তব্যে। দর্শনের যে সিদ্ধ-পদ্ধতি সেই অর্থে তিনি দার্শনিক না কিন্তু তার লেখা পড়ে মনে হয় তিনি মূর্খ এই উক্তির উৎসে এক ধরনের মূর্খামী আছে।

শামস আল মমীন : তিনি আবারো বলছেন, ‘তিরিশের কবিরা একটা সংস্কৃত বাংলা তৈরী করার চেষ্টা করেছেন’ (আকার ইকার)।
শহীদ কাদরী : এ কথা একেবারেই গ্রাহ্য না।

শামস আল মমীন : ‘তিরিশের কবিরা বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি করেছেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টা হাস্যকরও বটে; বলেছেন ফরহাদ মহজার (আকার ইকার)।
শহীদ কাদরী : তাঁর কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে, এতে আমার বলার কিছু নেই। খুব সম্ভব বাংলার লোকসাহিত্য তাঁর খুব পছন্দ। আমারও মনে হয়, বাংলার লোকসাহিত্য খুব রিচ, কিন্তু অত্যন্ত সীমিত। তিরিশের এই কবিরা যদি না আসতেন তবে বাংলা ভাষা এবং বাংলা সাহিত্য ভয়াবহভাবে বাল্যকালে থেকে যেতো।

শামস আল মমীন : তখনো রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। এবং তাঁকে অনুসরণ করে নতুনরা যদি কবিতা লিখতেন তাহলে কি নিম্ন মানের কবিতা লেখা হতো?
শহীদ কাদরী : না, নিম্ন মানের হয়তো হতো না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথেরও একটা সীমা ছিলো। তিরিশের কবিদের মূল অবদানই ছিল সেই সীমা ভেঙে আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রকে, আমাদের অনুভবের রাজ্যকে সম্প্রসারিত করা। রবীন্দ্রনাথকে যদি আমরা অনুসরণ করে যেতাম তাহলে আমরা একই বৃত্তে আবর্তিত হতে থাকতাম।

শামস আল মমীন : আমি জানি না রবীন্দ্রনাথকে কেউ অতিক্রম করতে পারবেন কিনা। কেউ পারলে খুশিই হবো। আরেক প্রতিভার সংযোগ হবে বাংলা সাহিত্য। তাকে ফলো করেও আমরা অন্য কোন প্রতিভা পেতে পারতাম।
শহীদ কাদরী : ফলো করার প্রশ্নটা আসছে না এই কারণেই যে, নিউটন যেটা আবিষ্কার করে গেছেন সেটাই যদি আমি আবার আবিষ্কার করি আমিতো তাহলে নিউটন হবো না। নিউটনের পর আইনেষ্টাইনের দরকার ছিলো। একজনকে আমরা তখনই বিজ্ঞানী বলি যখন সে বিজ্ঞানে নতুন কিছু যোগ করে। একজন লেখককেও নতুন কিছু যোগ করতে হবে তাহলেই সে লেখক। তা না হলে পূনরাবৃত্তি বা চর্বিত চর্বণ করে-তো কোন লাভ নেই। যারা রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে লিখবে তাদের লেখা পড়ব কেন? রবীন্দ্রনাথই পড়বো।

শামস আল মমীন : তিরিশের কবিদের মধ্যে থেকেও জীবনানন্দ অন্যদের থেকে আলাদা। তাঁর কবিতার শব্দচয়নে পূনরাবৃত্তি খুব বেশী। সমালোচকরা বলেন, কবিতায় পুনরাবৃত্তি ভালো নয় তার পরেও জীবনানন্দ ভালো কবি। তার কারণ কি?
শহীদ কাদরী : T.S.Eliot -এর একটা লাইন বলি, You say I am repeating I say what I have said before I will say it again রিপীটেশন হচ্ছে বসঢ়যধংরং করার একটা পদ্ধতিমাত্র। এই রিপীটেশন মিউজিকেও আছে। তবলায় আছে, ড্রাম ও আছে, রাগ রাগনিতে আছে। রিপীটেশন রিদম তৈরী করে। Repetition is not necessarily bad.

শামস আল মমীন : তিরিশের পর আমরা পাই সমর সেনকে। তাঁকে কি আমরা তিরিশের কবিদের সমান মর্যাদা দিতে পারি?
শহীদ কাদরী : একটা অসুবিধা আছে। সমর সেনের কবিতায় অনুভবের ক্ষেত্রটা সীমিত। একজন বড় কবি এবং একজন ছোট কবির মধ্যে Craftsmanship বা skill এ তফাৎ হয় না। তফাৎটা হচ্ছে, অভিজ্ঞতার বিভিন্ন শেকড় বা রেঞ্জ কে কতখানি স্পর্শ করেছে। সমর সেন অত্যন্ত শার্প, অত্যন্ত তীব্র অরিজিনাল একজন কবি কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রটা সীমিত। যেমন তাঁর কোন ভাল Passionate কবিতা নেই। মৃত্যুর উপরে তার কোন ভাল কবিতা নেই। নিঃসঙ্গতার উপরে তার কোন ভাল কবিতা নেই। তাঁর কবিতার পুঁজিবাদী সমাজের alienation আছে। জীবনের অনেক ডিমেনশন তার কবিতায় তিনি ধরতে পারেননি।

শামস আল মমীন : সমর সেন কবিতা লিখেছেন বছর দশেক। এবং ঘোষণা দিয়ে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। আপনি কি মনে করেন তাঁর আরও লেখা উচিত ছিল, নাকি যা করেছেন তাই আমাদের জন্য মঙ্গল?
শহীদ কাদরী : আমি মনে করি উনি যা করেছেন সেটাই আমাদের জন্য মঙ্গল। অনেক সময় হয় কি একজন লেখক নতুন একটা ফর্ম আবিষ্কার করেন। এবং he becomes prisoner of that form । তিনি যখন তার আবিষ্কৃত আঙ্গিকের বাইরে আর যেতে পারলেন না। তখন তিনি বুঝেছেন আর পূনরাবৃত্তির কোন মানে হয় না। তার যে বক্তব্য ছিল তাও তিনি Exhaustedly বলেছেন। এরপর তাঁর নতুন কোন বক্তব্য জন্মায়নি। নতুন কোন দৃষ্টিভঙ্গি জন্মায়নি, এমন কি ভাষাও বদলায়নি। তাই তিনি আর নিজেকে repeat করেননি।

শামস আল মমীন : অনেকের মতে শামসুর রাহমানের বর্তমান কবিতা শুধুই repetition. কবি আবুল হোসেন ব্রাত্য রাইসুকে দেয়া সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমানে শামসুর রাহমান কবিতা লিখছেন দিনলিপির মতো। এগুলো কবিতা হচ্ছে না।
শহীদ কাদরী : দিনলিপিও কবিতা হতে পারে। আমার মনে আছে, রবার্ট লয়েলের মৃত্যুর পর Note Books নামে একটা কবিতার বই বেরিয়েছিলো। তার প্রত্যেকটিই ছিল সনেট। এগুলো দিনলিপির মতো লেখা হয়েছিল। দিনলিপি লেখলেই কবিতা হবে না এমন কোন কথা নেই। আবুল হোসেন হয়তো বলতে চাচ্ছেন তাঁর কবিতা প্রাত্যহিক কর্মকান্ডের তালিকা হয়ে যাচ্ছে সাহিত্য হচ্ছে না, সেটা আমি বলতে পারব না। কোন কোন কবির প্রয়োজন হয় একটা ভালো কবিতা লেখার আগে দশটা মাঝারি ধরনের কবিতা লেখা।

শামস আল মমীন : আপনার কি এরকম কখনো মনে হয়েছে যে, আহা! আমি দি ওমুকের মতো লেখতে পারতাম।
শহীদ কাদরী : আমার সমসময় মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের মতো লিরিক লেখতে পারলেই ভালো হতো।

শামস আল মমীন : তাই নাকি!
(এ সময় শহীদ কাদরী তার স্বভাবসুলভ অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন)।

শামস আল মমীন : আমাদের কবিতায় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ এবং শহীদ কাদরী এই তিনটি নাম ত্রিরতেœর মতো প্রায় একসঙ্গে উচ্চারিত হতো। এবং কবি হিসাবে আপনি যখন প্রতিষ্ঠিত ঠিক সেই সময় দেশ ছাড়লেন কেন?
শহীদ কাদরী : আমি জার্মানীতে গিয়েছিলাম মাস তিনেকের জন্য। তাও পারিবারিক এবং অন্যদের প্রেসারে। ওখানে গিয়ে এমন কিছু ঘটনা ঘটল যে মনটা আমার খুব খারাপ হয়ে গেলো। আমি জার্মানীতে আটকা পড়ে গেলাম। ফিরতে চাচ্ছি কিন্তু পারছি না। তখন লন্ডনে কলকাতার আমার এক বাল্যবন্ধু একটা ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ওকে সব খুলে বলতেই ও আমাকে একটা চাকরীর এপোয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়ে দিলো। আমি লন্ডনে এসে হুসেন নামে এক বন্ধুর বাসায় উঠলাম। সৈয়দ শামসুল হক তখন বিবিসিতে কাজ করতেন। সাতদিন ঘুমটুম দিয়ে বিবিসিতে গেলাম। শামসুল হক বিবিসিতে একটা কাজ জুটিয়ে দিলো। তখন আমি কিছুটা উদাস ছিলাম।

শামস আল মমীন : তখন কি কবিতা লেখার কথা ভুলে গিয়েছিলেন?
শহীদ কাদরী : হ্যাঁ, তখন আমি অনুভব করি মাথাটা আমার অদ্ভুতভাবে শূন্য।

শামস আল মমীন : এমনিতেই মাথাটা শুন্য হয়ে গেলো না কি কোন ঘটনা ঘটেছিলো।
শহীদ কাদরী : সব কিছু মিলিয়ে মনে হয়।

শামস আল মমীন : একটা কথা মনে পড়ে গেলো, হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, ‘একদিন আমার মা ফোন করে জানালো, তুই বাংলা একাডেমী পুরষ্কার পেয়েছিস। আমি তখন Ph.D. করছি যুক্তরাষ্ট্রে। পড়াশুনা আর পারিপার্শ্বিক চাপে আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম আমি কখনো লিখতাম (তাঁর তিনটি উপন্যাস তখন প্রকাশিত হয়েছিল)’। আপনার কি এরকম ব্যস্ততা ছিল না কি অন্য কিছুর জন্য কবিতা লেখেননি?
শহীদ কাদরী : বিবিসিতে আমার কাজ ছিল খুবই হালকা। ব্যস্ততা ছিল না মোটেই। আসলে মনটা নিঃসাড় হয়ে গিয়েছিলো।

শামস আল মমীন : দেশ ছেড়ে এসেছিলেন বলে?
শহীদ কাদরী : খানিকটা। সারাদিন কামরায় বসে থাকতাম আর সিগারেট খেতাম। ঢাকা থেকে আমার ভাই ফোন করে বললো ‘আমি খবর পাচ্ছি তোমার নাকি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’

শামস আল মমীন : আচ্ছা। এটা তো খুব ভালো সময় ছিলো কবিতা লেখার।
শহীদ কাদরী : ইন্টেলেকচুয়ালি-ইমোশনালি Mentally I was Paralyzed for multiple reasons

শামস আল মমীন : তারপর কি দেশে চলে গেলেন? এটা কি ৮২-র দিকে?
শহীদ কাদরী : হ্যাঁ।

শামস আল মমীন : বিবিসির চাকরী তো বেশ লোভনীয়। আপনার কি একদম পছন্দ হলো না।
শহীদ কাদরী : চাকরীতে মন নেই (আবার সেই অট্টহাসি)। আমি আমার যৌবনের অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ক্যারিয়ার দরকার, টাকা পয়সা জমানো দরকার। ভবিষ্যৎ আছে এগুলো কখনো ভাবিনি। আমি অনেক রকম স্কোপ পেয়েছি কিন্তু কোনটাই কাজে লাগাইনি।

শামস আল মমীন : দেশে যখন ফিরে গেলেন তখন পুরানো বন্ধু বান্ধব এবং পারিবার্শ্বিক অবস্থার কি পরিবর্তন দেখলেন?
শহীদ কাদরী : দেশে যখন ফিরে গেলাম তখন শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলার এডিটর। তাঁর অফিসে গেলাম। দেখি তিনি বহু লোক দ্বারা পরিবৃত। তিনি বললেন বঙ্গভবনে মিটিং এ যেতে হবে, বসুন চা খান। আমার গাড়ী আছে আপনাকে পৌঁছে দেবে। (হাসতে হাসতে বললেন) তাঁর গাড়ী আমাকে বাসায় পৌঁছে দিলো। ফজল শাহাবুদ্দীনের অনেক পরিকল্পনা। রাজনৈতিকভাবে তিনি একটা দলের সাথে জড়িত সেখানে আমার যোগ দেওয়া সম্ভব হলো না। আল মাহমুদ তাঁর রাজনৈতিক লোকজন নিয়ে ব্যস্ত। আমি দেখলাম, ওখানে বাস করতে হলে একটা দলের সাথে ভিড়তে হবে। এদের ব্যস্ততা আর নির্লিপ্ততা দেখে মনে হলো আমার আর জায়গা নেই দেশে।

শামস আল মমীন : তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন আমেরিকা চলে আসার?
শহীদ কাদরী : আমেরিকা আসার সিদ্ধান্ত নেইনি that was purely accidental । ভাইকে বললাম, আমার আরও এক মাসের ভিসা আছে লন্ডনের। ভাই বলল, মন খারাপ করে বসে থাকিস সারাক্ষণ, ভালই তো ছিলি ওখানে, তুই বরং চলে যা। এভাবেই আবার চলে আসলাম।

শামস আল মমীন : আমেরিকা আসার কি কোন প্লান ছিল?
শহীদ কাদরী : না কোন প্লান ছিলো না। আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে দেখা হলো লন্ডনে। তিনি ছিলেন আমেরিকান। তখন খুব একলা, নিঃসঙ্গ ছিলাম। বিয়ে করে ফেললাম তাকে। প্রথম বিয়ে যেমন না ভেবে করেছি, দ্বিতীয় বিয়েও তেমনি না ভেবে করেছি। তাঁকে আমি বলেছিলাম- ‘I will have one home in two continents. অর্থাৎ আসা যাওয়ার মধ্যে থাকব’। আমেরিকায় তখন আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে যাবো। তখন সে তার অসুস্থ মাকে দেখতে চাইলো। এভাবেই আমেরিকা চলে আসলাম।

শামস আল মমীন : তারপর সিদ্ধান্ত নিলেন যে আমেরিকা থেকে যাবেন।
শহীদ কাদরী : হ্যাঁ। সিদ্ধান্ত নিলাম এখানেই থেকে যাবো। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করবো, বাংলা বই পড়ব না, বাঙ্গালীদের সাথে কোন সম্পর্ক রাখব না। নতুন একটা জগতের জন্ম দেবো।

শামস আল মমীন : হঠাৎ এটা প্রতিজ্ঞা করলেন কেন বাংলা বই পড়বেন না, বাঙ্গালীদের সাথে সম্পর্ক রাখবেন না? বুঝলাম, আপনার কয়েকজন পুরোনো বন্ধু আপনাকে কষ্ট দিয়েছে।
শহীদ কাদরী : মনের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরী হলো, দূর! আমার দ্বারা আর কিছু হবে না। আমার মনে আছে লাইব্রেরীতে বসে একদিন বই পড়ছিলাম। কলম্বিয়া ইউনির্ভাসিটি থেকে প্রকাশিত Encyclopedia of world Literature দেখে মনের মধ্যে ইচ্ছা জাগলো দেখিতো বাংলা।