সাইমন আর্মিটেজ বৃটেনের পোয়েট লরিয়েট বা জাতীয় কবি। তার লেখা প্রতিটি পঙক্তি জীবন ঘনিষ্ঠ। সমাজকে নিংড়ে যিনি সাহিত্যের রস খুঁজে বেড়ান। প্রতিটি কবিতার প্যাটার্ন ও এক্সপ্রেশনস অপূর্ব। প্রকৃতি প্রভাব বিস্তার করেছে তার কবিতার অঙ্গে-বিহঙ্গে। অনন্য উপমা ও চিত্রকল্প মিলে সৃষ্টি হয় ভালোলাগার এক অভূতপূর্ব আবেশ। অনবদ্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি গণমানুষের অত্যন্ত কাছে পৌঁছতে পেরেছেন। প্রগাঢ় মানবতাবোধ সম্পন্ন এই কবি নানা কারণে আমাদের অতি প্রিয় হয়ে উঠেছেন।
বৃটেনের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মানুষ টিকেট করে অংশ নেয়। বৃটিশ রাজপ্রাসাদ বাকিংহাম প্যালেসেও কবিদের জন্য রয়েছে বিশেষ জায়গা। এই সময়ে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত লেখকদের মধ্যে সাইমন আর্মিটেজ শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। তার অনুষ্ঠানে লেখক-সাহিত্যিকদের ভিড় জমে যায়। কবিতা এবং ছোটগল্পের লেখক হিসেবে তিনি বিখ্যাত। অনন্য কাব্যসুষমা ও নান্দনিক প্রকাশের জন্য সুপরিচিত। আর্মি়টেজ উপন্যাস লিখেছেন, অনুবাদও করেছেন। তিনি সর্বজনীন কাব্যকন্ঠে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। তার কবিতা বিলেতের স্কুল পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত।
আর্মিটেজের কোন কোন বই বিশ্বব্যাপী লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে। বৃটেনের রানীর ব্যক্তিগত পছন্দের কবি তিনি। তার কবিতা ও গানের শ্রোতা রানী নিজেও। সাহিত্যে কৃতিত্বের জন্য রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে স্বর্ণপদক উপহার দিয়েছেন।
সাইমন আর্মিটেজ বর্তমানে বৃটেনের ‘পোয়েট লরিয়েট’ বা জাতীয় কবি। এটি দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক ও গৌরবময় পুরস্কার। কবিকে বিশেষ সম্মানী প্রদান করা হয়। যার কাজে রয়েছে জাতীয় তাৎপর্য।
৮ জুলাই নরফোক আইলশাম টাউন হলে একটি অনুষ্ঠানে যাবার কথা ছিল। পোয়েট লরিয়েট সাইমন আর্মিটেজ ছিলেন মুখ্য আকর্ষণ। বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের জীবন ও কর্ম নিয়ে তার সাথে আলোচনার পরিকল্পনা ছিল। আগের বার আল মাহমুদের আত্মজীবনী ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস ‘কাবিলের বোন’নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তিনি ইংরেজিতে একটি নোট চেয়েছিলেন। কিন্তু কোভিডের কারণে ৮ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানটি স্তগিত হয়েছে। ৯ জুলাই নরউইচ অ্যাসেম্বলি হাউসে অপর অনুষ্ঠানও একই অবস্থা। তবে ২৭ অক্টোবর লন্ডনের (ও’মিয়েরা স্ট্রিট এসই১১) অনুষ্ঠান এখনো বহাল আছে। এর আগে গ্রেটার লন্ডনে আর কোন অনুষ্ঠান হবে বলে মনে হয়না।
২০১২ সালে সাইমন আর্মিটেজ বৃটেনে সাংস্কৃতিক অলিম্পিয়াডের অংশ হিসেবে অলিম্পিক জাতির কবি এবং কবিতার সমাহার ঘটাতে ব্যাপক কাজ করেছেন। তখনই তার সাথে পরিচয় ঘটে। আন্তর্জাতিক কবিদের একসাথে আসার এই যুগান্তকারী ঘটনাটি কবিতার ইতিহাসের অনেক বড় কাজ হিসেবে স্বীকৃত।
বৃটিশ কবিরা প্রাচীন কাল থেকেই তাদের সমাজ পুনর্গঠনের অংশ ছিলেন। ১৬৬৮ সালে তৎকালীন সম্রাট দ্বিতীয় চার্লস প্রথম জন ড্রাইডেনকে ‘পোয়েট লরিয়েট’ নির্বাচন করেছিলেন। তারপর থেকে রাজকীয় পদটি দশক, শতক পেরিয়ে এখনও সম্মানজনক ভাবে অব্যাহত আছে। সাড়ে তিনশ বছরের সুদীর্ঘ সময়কালে এ পদে অভিষিক্ত হয়েছেন অনেক খ্যাতিমান কবি। বিশ্বসাহিত্যে যাদের অবদান অনস্বীকার্য।
যারা নোবেল পুরস্কার পায় তাদেরকে ইংরেজিতে নোবেল লরিয়েট বলা হয়। আর জাতীয় কবিদের বলা হয় পোয়েট লরিয়েট। বৃটেনে এই সম্মান ও পদবি যারা পেয়েছেন, তারা ইংরেজি সাহিত্যের দিকপাল। ইতিহাসে বিশাল জায়গা দখল করে আছেন।
পোয়েট লরিয়েটদের মধ্যে প্রথম সৌভাগ্যবান হলেন জন ড্রাইডেন। তারপর টমাস শ্যাডওয়েল, নাহুম টাতে, নিকোলাস রো, লরেন্স ইউসডেন, কলি সিবার, উইলিয়াম হোয়াইটহেড, টমাস ওয়ার্টন, হেনরি জেমস পাই, রবার্ট সাদি, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, আলফ্রেড লর্ড টেনিসন, আলফ্রেড অস্টিন, রবার্ট বৃজেস, জন ম্যাসফিল্ড, সিসিল ডে-লুইস, জন বেতজেমন, টেড হিউজেস, অ্যান্ড্র মোশন, ক্যারল অ্যান ডাফি ও সাইমন আর্মিটেজ।
প্রথমদিকে শুধুমাত্র ইউনাই়়টেড কিংডমের মধ্যে ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদবি সীমিত থাকলেও আটের দশকের মাঝামাঝি সময় কমনওয়েলথ-ভুক্ত দেশের কবিদেরও এই পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতি দশ বছর অন্তর ‘পোয়েট লরিয়েট’ বা রাজ কবি হিসেবে একজনকে মনোনীত করা হয়।
বর্তমান জাতীয় কবি সাইমন আর্মিটেজ ২০১৯ থেকে এ পদে আসীন হয়েছেন। ২০২৯ সাল পর্যন্ত তিনি বহাল থাকবেন। এর আগে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর অফ পোয়েট্রির অধ্যাপক ছিলেন।
সাইমন আর্মিটেজ ১৯৬৩ সালে পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের মার্সডেন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। তরুণ অপরাধীদের উপর টেলিভিশন সহিংসতার প্রভাব নিয়ে তিনি এমএ থিসিস করেছেন। (HIS MA THESIS CONCERNED THE EFFECTS OF TELEVISION VIOLENCE ON YOUNG OFFENDERS)
কর্মজীবনে সাইমন আর্মিটেজ ১৯৯৪ সাল অবধি গ্রেটার ম্যানচেস্টারে প্রবেশন অফিসার হিসাবে কাজ করেছেন। পরে তিনি শেফিল্ড, লিডস ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক এবং ফালমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে হোমস ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।
আরমিটেজ তার কবিতার জন্য সানডে টাইমস ইয়াং লেখক অফ দ্য ইয়ার ছিলেন। স্পোকেন ওয়ার্ড অ্যাওয়ার্ড (গোল্ড), গান রচনার জন্য অ্যাওয়ার্ড, বিবিসি রেডিওর সেরা বক্তৃতা প্রোগ্রাম, টেলিভিশন সোসাইটি অ্যাওয়ার্ড সহ অসংখ্য পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
১৯৯৯ সালে আর্মিটেজ মিলেনিয়াম কবি খ্যাতি লাভ করেন। ২০০৪ সালে তিনি সাহিত্যের রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। কবিতায় অবদানের জন্য ২০১০ সালে অত্যন্ত সম্মানজনক সিবিই (কমান্ডার অব দ্যা অর্ডার অব দ্য বৃটিশ এম্পায়ার) উপাধি পেয়েছেন। ২০১৮ সালে ‘কুইন্স গোল্ড মেডাল ফর পোয়েট্রি’র মতো রাজকীয় খেতাব লাভ করেছেন। ২০১৯ থেকে হলেন ‘পোয়েট লরিয়েট’ বা বৃটেনের জাতীয় কবি।
সাইমন আর্মিটেজের উল্লেখ্যযোগ্য পুরস্কার সমূহ হলো :
1988 Eric Gregory Award
1989 Zoom! made a Poetry Book Society Choice
1992 A Forward Poetry Prize for Kid
1993 Sunday Times Young Writer of the Year
1994 Lannan Award
1998 Yorkshire Post Book of the Year for All Points North
2003 Ivor Novello Award for song-writing; BAFTA winner
2004 Fellow of Royal Society for Literature
2005 Spoken Word Award (Gold) for The Odyssey
2006 Royal Television Society Documentary Award Winner for Out of the Blue
2008 The Not Dead (Channel 4, Century Films) Mental Health in the Media Documentary Film Winner
2010 Seeing Stars made a Poetry Book Society Choice
2010 Keats-Shelley Prize for Poetry
2010 Awarded the CBE in the Queen’s Birthday Honours List, for services to poetry
2012 The Death of King Arthur made Poetry Book Society Choice
2012 Hay Medal for Poetry
2014 Cholmondeley Award
2017 The Unaccompanied made a Poetry Book Society Choice
2017 Pearl, winner of PEN America Award for Poetry in Translation
2018 The Queens Gold Medal for Poetry
2019 Poet Laureate
2020 Man of the Year, Yorkshire Awards

সাইমন আর্মিটেজের পূর্বসূরী ‘পোয়েট লরিয়েট’ ছিলেন ক্যারল অ্যান ডাফি। ২০০৯ সালে রাজকীয় কবির দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ২০১৭ সালের মে মাসে তিনি মেয়াদ শেষ করেন।
ক্যারোল অ্যান ডাফি বৃটেনের প্রথম নারী পোয়েট লরিয়েট। ইংল্যান্ডের ৩৪১ বছরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মনোনীত কোনো নারী এই পদবি লাভ করেন। যিনি ১০ বছরের জন্য অ্যান্ড্র মোশানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। ডাফি এশীয় লেখকদের বেশ ভাল জানেন। ২০০৪ সাল থেকে কয়েকবার তার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে। এরই মধ্যে তিনি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, আলফ্রেড লর্ড টেনিসন, জন বেজামেন ও টেড হিউজের মতো বিশাল নামগুলোর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন।
ক্যারল অ্যান ডাফির পরবর্তী ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের জন্য আলোচনার শীর্ষে ছিলেন বৃটিশ-পাকিস্তানি কবি ইমতিয়াজ ধরকর। যথারীতি তার সম্মতির জন্য বিষয়টি তাকে জানানো হয়। কিন্তু তিনি রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ গ্রহণের ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করেন।
ইতিহাসের প্রথম কোন এশীয় এমন সম্মানজনক পদবি পেয়েছিলেন। তিনি আগে থেকেই ‘রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচার’ ফেলো। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ‘পোয়েট ইন রেসিডেন্স’। কিন্ত এবার তিনি আর কোন জাতীয় দায়-দায়িত্ব নিতে চাইলেন না। জীবনে বাকি সময়টা কেবল নিরবে লিখে যেতে চান। প্রচন্ড আত্মপ্রত্যয়ী এই কবির এমন সিদ্ধান্ত মিডিয়া অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে।
ইমতিয়াজ ধরকরের অসম্মতির পর সাইমন আর্মিটেজকে খুঁজে বের করা হয়েছে। তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ফোনে আর্মিটেজের সঙ্গে আলাপ করে পুরো প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করেন।
মূলধারার প্রকাশনার আগে, আর্মিটেজ ছোট এবং স্থানীয় কবিতার প্রকাশনায় কয়েকটি সীমিত সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন। এরমধ্যে হিউম্যান জিওগ্রাফি, দ্য ডিস্টেন্স বিটিউন স্টারস, দ্য ওয়াকিং হর্সস, রাইডিন রবিনসন এবং স্যুটকেস অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসবই এখন জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বের সমাদৃত।
সাইমন আর্মিটেজের উল্লেখযোগ্য বইয়েল মধ্যে রয়েছে: Xanadu (1992), Kid (1992), Book of Matches (1993), The Dead Sea Poems (1995), Moon Country (with Glyn Maxwell, 1996), CloudCuckooLand (1997), Killing Time (1999), Selected Poems (2001), Travelling Songs (2002), The Universal Home Doctor (2002), Tyrannosaurus Rex Versus the Corduroy Kid (2006 & 2008), Seeing Stars (2010 & 2011), Paper Aeroplane: Selected Poems 1989-2014 (2014), The Unaccompanied (2017), Sandettie Light Vessel Automatic (2019), Magnetic Field: The Marsden Poems (2020), A Vertical Art: Oxford Lectures (2020).
সাইমন আর্মিটেজ সাম্প্রতিক কালে ‘লকডাউন’ শীরোনামে একটি কবিতায় ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেন। সপ্তদশ শতকে বৃটেনের মানুষ মারাত্মক ভাবে প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ডার্বিশায়ার এলাকার গ্রামীন জনপদে সংক্রমিত হয়েছিল ভয়াবহ প্লেগ। তখনকার পেক্ষাপটের সাথে বর্তমান লকডাউনের সামাজিক বাস্তবতা ফুটে ওঠেছে তার কবিতায়। সেখানে প্লেগ উপদ্রুত ইয়ামের ঘটনা স্মৃতিপটে অনুরণিত হয়েছে।
করোনা ভাইরাসে পুরো পৃথিবী লকডাউন হয়ে গেছে। মানুষ যেন আজ গৃহবন্দি। সর্বত্র ঘটেছে জীবন ও স্বপ্নের ছন্দপতন। মানবজাতি এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী। তবু কবি স্বপ্নের ডালিমাখা প্রেরণা যুগিয়েছেন। তার বিশ্বাস একদিন থেমে যাবে এই মহামারি, ইয়ামের মতো অভিশম্পাত। সুদীঘ বৃষ্টির পরে হেসে উঠবে উজ্জ্বল পদ্ম।
ক‘বছর আগে সাইমন আর্মিটেজ বায়ুদূষণ রোধে কবিতা লিখেও সাড়া জাগিয়েছেন। ‘ইন প্রেইজ অব এয়ার’ কবিতায় তিনি বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। একদল গবেষক কর্তৃক তার কবিতা ধাতুর পাতের ওপর আণুবীক্ষণিক যৌগ টাইটেনিয়াম ডাই-অক্সাইডের অক্ষরে মুদ্রিত হয়েছে৷