প্রেম

ভেবেছিলাম ভুলে গেছি
রাতকান্নার মায়া থেকে ঝরে গেছে হেমন্তের সোনারঙা শ্বাস
দুয়ে দুয়ে চার মেলানো সন্ধেগুলো বকুল ছড়ানো প্রেমে হামাগুড়ি দিয়ে
যেদিন উদ্বাস্তু হলো
সেদিনও ভেবেছি, মনে নেই আর কিছু।
নিষিক্ত নীলের বোঁটায় সারাদিন অপেক্ষারা ক্লান্তমগ্ন ছিল
ভালোবাসা ভেঙে ভেঙে জড়ো হলো ডুবোচরে
সেখানে গহন বর্ণিল রাতে পাক খায়
আমারই রক্ত ঋণে বেড়ে ওঠা বোধের বিষাদ।
ভেবেছিলাম অনন্ত হিরক চিত্র থেকে ধসে গেছে মগ্নতার কুচি
মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে যাবতীয় বেদনার ল্যাম্পপোষ্ট
লকলকে ইশারা আগুন ছেড়ে চলে গেছে অরণ্যপথ ধূলিমাখা চাঁদ
আর নবীন বাতাবি ঢেউ।
তুমি এসে দাঁড়াতেই বুঝলাম
পাঁচের ভেতর উল্টে থাকা এক
কতোটা ক্রন্দররত
কতোটা নিঃসঙ্গ ছিল এতোকাল।
…………………………………………..

কাঁদে বাশুলির বাংলাদেশ

অভয়নগরে পূর্ণ তিথি রাত
তারাগুলো মৃদুলয় মান্দার ধ্বনির পাশে
জোছনার অণুছিদ্রে কুয়াশা প্রাচীর
বেদনার ভাটিতে বাঁশির ডাক
চারিদিক চুপচাপ, ঘোরহীন উন্মুক্ত উদাস।

মধ্যরাতের অচেনা হিমে
মেয়েটি আবেশ ভরে স্বামীর আদরে
নয়কুড়ি মার্বেলের রূপকল্প আঁকে
পেঁচার দূষিত শীষ নিরুচ্চার শীৎকারের বেশে
ঘরের দাওয়া থেকে ঘুমের উদরে
শৈশবের মতো নিঃশব্দে গড়ায়।

রাতের শেষ প্রহর
অভয়নগরে গ্রহণের কাল
পূর্ণ তিথি চাঁদে জমে অহল্যার বিষ
খেজুর রসের টুপটাপ ঝড়ে
ভেসে ওঠে পৃথিবীর যাবতীয় দুঃস্বপ্নের করাঘাত
ঘরের বিছানা ছেড়ে মেয়েটির নাভিনিম্ন ভূমি
যেন একাত্তুরের একটুকরো বাংলাদেশ
ফসলী মাঠের পাড়ে পড়ে থাকে
বাড়ে চক্রনেমি…

সরষে ফুলের মিহিসুরে ভোর হয়
নরম আলোয় জেগে ওঠে জনপদ
কোলাহল বাড়ে
মেয়েটির কাঁচুলির হুক থেকে উবে যায় সংক্ষুব্ধ শিশির
খোলা ঝিনুকের মতো রক্তাক্ত যোনির পাশে পিঁপড়ের সারি
লাভার করাত হয়ে পম্পাই নগরী থেকে নেমে আসা
সংখ্যাগুরুর বীর্যের মউ
লেপ্টে থাকে খটখটে মাটির ঢেলায়।

সূর্যের উত্তাপে ধীরে ধীরে জনশূন্য সময়ের কণা
মাটির ঢেলায় সুরেলা রঙিন প্রজাপতি ফুল
বাষ্পগন্ধ নিয়ে ভরে দেয় চারিদিক
তবু নির্জনে রোদন বাড়ে
গৃহকোণ ভরে যায় বাদুর বিলাপে
একক অপেক্ষা ছেড়ে সমষ্টির ভীড়ে চোখ তোলে
আঁধারের খোপ, খোঁজে আলোর ইশারা ঢেউ;

বাশুলির বাংলাদেশ আঁচল ছড়িয়ে কাঁদে
ভাঙে আওড় বাওড় থেকে জেগে ওঠা
তর্কাতীত বিশ্বাসের ভিত।
…………………………………………..

ঘুঙুর বাতাস

কতোদূর যাবে? তুমি, যাবে কতোদূর?

জীবনতো নয় যেন হাওয়ায় ওড়া ঘুড়ি
সুতো ছেঁড়ে, সুতো কাঁপে যখন তখন ওড়াউড়ি
কতোদূর যাবে? বলো? যাবে কতোদূর?
শীতের কুয়াশা পোড়ে, মনে হয় বরফ রোদ্দুর
অথচ জমাট সব, পথ ঘাট দূরের কর্কশ
সরাতে পারিনা কিছু, বেদনাও হাঁকে রথ
থেমে থেমে সরে যাই, ভরে নিই আষাঢ়ের ঝুড়ি।

সুতো ছেঁড়ে, সুতো কাঁপে, আহা!
যখন তখন ওড়াউড়ি।

জানো? জীবন ছড়াতে পারি, শুষে নিয়ে ঘুঙুর বাতাস
পর্দা টেনে টেনে জমাতেও পারি অচেনা অযুত ওই সমুদ্র পাহাড়
পৃথিবীর পায়ে পায়ে শিকারী ঘুরুক কিংবা
কাঁদুক অচেনা তমসার রাতে
তবুও জীবন ছুটবে না, আঁকবে না শূন্যতায় কোন বাড়ি
যতই বলো না তাকে শেখাবো নিঃশর্তে সোনা
কীভাবে উড়াতে হয় ঢাকের মুদ্রায় তোলা
অবিরল অগোপন দীর্ঘশ্বাস।

তবুও জীবন ছড়াবো না আর!

তুমি? শুষে নেবে? ঘুঙুর বাতাস?
…………………………………………..

শ্রাবণ সন্ধ্যায়

সভ্যতার ঝলমলে আবরণগুলো
ভিজিয়ে রেখেছি মন খারাপের জলে
আজ সারাদিন বৃষ্টি
আজ সারাদিন মেঘলা আকাশ
তোমার বানানো সত্যিগুলো থেকে
অনেক দূরের আমি
যেন বর্ষার নদীর বুকে সূর্য ছেঁড়া মায়া
শুধু হাতছানি দেয়, জড়ায় না বুকে।
মন খারাপের জলে দিগন্ত চিহ্নের বাঁক
মুছে দিতে চায় সভ্যতার আবরণ
সবুজের পাপে পুড়ে পুড়ে
শ্রাবণ সন্ধ্যায় নামে ঝড়
তুমি কৌতুহলী?
আমি দীর্ঘশ্বাসে বাড়াই দু’হাত।
…………………………………………..

টংকার

নেশাতুর জাফরিতে কুন্ডলী পাকানো এই ভোর
আমি আগেও দেখেছি
তুমি ভাবো, নতুন?
গুল্মভেজা শ্বাস গড়াতে গড়াতে উঁকি দিয়ে দেখে
তারপিনে সেঁটে থাকা শ্যাওলা জড়ানো দিন
কীভাবে ঋতুর প্রাচীর ভেঙে মিশে যায় পাহাড়ের গায়ে
পাখিরা বিষণ্ন তাপে পুড়ে পুড়ে সূর্যগামী হলে
চাঁদও জড়িয়ে যায় ভস্মের জীবন্ত কোলাহলে ।

তুমি ভাবো,
মেঘ ছুঁই ছুঁই ইচ্ছের আকাশে এই তো উড়েছে বেশ
মেঠো ঘোমটায় ঢাকা দিকচিহ্নহীন জটায়ু জীবন;
কেন যে দেখ না, মোহনার কাছে বসে
এখনও দিনরাত বিড়বিড় করে
চোখের মনিতে কাঁপা স্মৃতিশুন্য এক জলের টংকার।
…………………………………………..

দাগ

দাগে ভরে যাচ্ছে আমাদের কোমল নিঃশ্বাসের রেখা;
বিশ্বাসের ভিতু কাহিনি মানুষের মুখ থেকে মুখে
চকমকি তীরে একাকী হাঁটার কালে মেঘ বলেছিল,
ঝরব না আর, ভেসে যাব হাওয়ায়-হাওয়ায়
সেই থেকে আমিও ভেবেছি, শুধুই ভাসব হাওয়ায়
দখিন দুয়ারী কান্নার মোড়ক খুলে ভেঙে দেব
প্রজাপতি ঘুম, শুষে নেবো উপবাসী সুর।
উড়তে পারিনি আমি।
দ্বিতল বিন্যাসে গড়া স্থবির প্রপাতে আটকে আছি
যেন শ্যাওলা জড়ানো স্মৃতিগন্ধা হিম।
…………………………………………..

বৃষ্টির ঘর

বসে আছি একখন্ড মেঘের ভেতর
গতি নেই নিশ্চল নিথর
কাছাকাছি কেউ নেই…..
ছিলো কাছে জোছনার পুর ভরা অনিদ্র আকাশ
চলে গেছে সেও কবে
ভেঙে গেছে বিহ্বল বৃষ্টির ঘর।
…………………………………………..

কালো বিষ

ছুরির ফলায় গেঁথে আছে চোখ
হাড়ের ভেতর অগ্নিধারা
অদৃশ্য কপাল জুড়ে অপেক্ষার শিরস্ত্রাণ।

মণি দু’টো শব্দহীন কান্নার ভেতর ডুবে যাওয়ার আগে
আমি অপেক্ষার শিরস্ত্রাণ খুলে ঘুরে আসি
জীবন খোয়ানো সেই মুহূর্তের পাড়ে
একদিন যেখানে তোমার কাঁধ ছুঁয়ে উড়িয়েছি
অজস্র বাতাস, মিলিয়েছি ঠোঁট, জিহ্বার করতল।

আজ প্রতি তিরস্কারে বাজালে যে সুর।
তাতে বৈকল্যের খরা, কালো বিষ।

চোখ দু’টো ছুরির ফলায়।
নাকের দু’পাশে আকাঙ্ক্ষার রক্তদাগ।
…………………………………………..

অপূর্ণতা

উপলক্ষ নেই।
তবু আসো, কাছে বসো
দক্ষিণ দিগন্ত বাঁকে যে কথারা হারিয়েছে সেই কবে
সেসব বিষণ্নতার ঘ্রাণ ছুঁয়ে
থাকো পাশে।

ঘোর নেই
নেই ছিন্নতার রেশ
শুধু মুখোমুখি নিঃশ্বাসের ঢাক
যার বাহুমূলে চাপা পড়ে আছে
বহুদিন ধরে জমে থাকা
আমাদের আজন্ম তিয়াস।
…………………………………………..

নপুংসক

সাহস থাকে সামনে দাঁড়া
বাসলে ভালো আপন কর
বোধের বিদ্যেয় ঠোঁট ডুবিয়ে
উড়বে কবে ধুলোর স্বর?
নে তুলে নে মারণাস্ত্র
দেখবো আমি সাহস কার
মন বরাবর মারবি জোরে
জুটুক যতই তিরস্কার!
কী হলো রে? নেই কথা তোর?
তলিয়ে গেলি? ভাঙলো ঘোর?
পারবি না তুই, জানি আমি
তুই কতোটা ভূগোলগামী।
তাইতো বলি তুই হলি গে
সলতে মোড়া নপুংসক
তোর চোখেতে চোখ মিলিয়ে
ভাঙবো আমি আমার বুক?
…………………………………………..

সাঁতারের গল্প

বন্ধ ছিল, এখন খোলা

ফিরে যাও তুমি
পৌঁছাতে পারো না
কাকরাইল থেকে বিজয়নগর।

জীবন মানে মৃত্যু
মৃত্যু মানে?
চিবুক ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেদিন সাঁতারের গল্প বলেছিলাম
সেদিন থেকে ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টি
সেদিন থেকে বিড়ালের কান্না প্রতিটি ভোরে

দরোজাগুলো বন্ধ
বাইরে সাঁতারের গল্প, অন্ধকার।