শেষ বিকেলের তমা
-ভাই, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে, ঈদের পর ৭ই জুন ২০১৯, শুক্রবার বিয়ে, পরের দিন বৌভাত।
-ভেরি গুড, বৌ সাজলে তোকে কেমন সুন্দর লাগবে – তাই ভাবছি।
-জানি, তুমি মহাব্যস্ত ইঞ্জিনিয়ার, কোনদিকে তাকানোর সময়ও তোমার নেই। তার পরেও বলছি, তোমার কিন্তু থাকতে হবে।
কথায় ছিল কিছুটা অভিমান, কিছুটা অনুযোগ, তার চেয়েও বেশি কান্না আটকানোর চেষ্টা। চোখের দিকে তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিল তমা, বুঝলাম আজকের এই বিকেলটাতে বৃষ্টির ঘনঘটা।
‘চোখে কি যেন পড়েছে’ বলেই সে শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলো।
হঠাৎ স্মৃতি কাতরতা আমাকে পেয়ে বসল, ছোট কাল থেকে এখন পর্যন্ত তমার সাথে মান-অভিমান, খুনসুটি আর ভালো লাগার ঘটনাগুলি বার বার উঁকি দিতে লাগলো।
প্রতিবেশী তমাদের সাথে আমাদের পারবারিক সম্পর্কটা আত্মীয়র চেয়েও বেশি কিছু। তবে এই প্রথম সাহিত্যের ছাত্রী তমার জন্য হাহাকার অনুভব করলাম।
মনে পড়লো, জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’র কথা।
তমাদের বাসার কলিং বেল টিপতে গিয়ে কেমন যেন একটা আড়ষ্টতা অনুভব করলাম।

বড়লোকের জামাই
ট্রেন আসতে দেরি হবে জেনে ময়মনসিংহ স্টেশনের ওয়েটিং রুমে গিয়ে যার পাশে বসলাম, তিনি এলজিইডি’র একজন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার।
পাশে বসেই বুঝতে পারলাম, ভদ্রলোক শোনার চেয়ে বলতে পছন্দ করেন। কিছুক্ষনের মধ্যে কথায় কথায় জানা হয়ে গেল, তার থাকার জন্য ফ্ল্যাট গুলশান নিকেতনে, বনশ্রীতে ছয়তলা একটি বাড়ি আছে. তার নিজের ও ফ্যামিলির ব্যবহারের জন্য একটি করে গাড়িও আছে।
প্রাইভেট জব করা একজন সিনিয়র বুয়েটিয়ান হিসেবে নিজের বৈষয়িক অর্জন নিতান্তই কম বলে মনে হল।
-”তাহলে তো রইস সাহেবের আয়-রোজগার বেশ ভালো” কথাবার্তার একপর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
আমার কথা শেষ হতে না হতেই তিনি বললেন, “আমি নিজে কিছুই করতে পারিনি, ফ্ল্যাট-বাড়ি-গাড়ীর মালিক আমার স্ত্রী, শ্বশুর সাহেবের কাছ থেকে পেয়েছে।”
-আপনার শ্বশুর বাড়ি যেন কোথায়?
-চন্ডীপাশা প্রাইমারী স্কুলের পাশে, নান্দাইল।
-কি নাম আপনার শ্বশুর সাহেবের?
-আব্দুস সালাম, শম্ভুগঞ্জ জুট মিলে বড় পদে চাকরি করতেন।
এরই মধ্যে ঘোষণা আসলো ট্রেন চলে আসছে, দু’জনের কম্পার্টমেন্ট ভিন্ন হওয়ায় সালাম দিয়ে বিদায় নিলাম।
সিটে বসে মনে হতে লাগলো উনার শ্বশুর সালাম সাহেবের কথা, যাকে আমিও চিনি।
ভদ্রলোক শম্ভুগঞ্জ জুট মিলের কেরানি ছিলেন। সৎ মানুষ, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার খরচ চালাতেই হিমহিম খেতেন। জুটমিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এলাকায় একটা মুদি দোকান চালিয়ে কোন রকমে চলতেন।
সেখানকার স্থানীয় কলেজে বাবার অধ্যাপনার সুবাদে ঐ এলাকায় আমরা এক সময়ে ছিলাম। উনার শ্বশুর সাহেবের সাথেও এজন্য জানাশোনা ছিল।
পোড় খাওয়া এক জীবন -সংগ্রামী মজা করে বলেছিলেন, “উপার্জন যাদের সীমার অধিক, তারা বড়লোকের জামাই !”
দেরিতে হলেও এবার বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবণ করতে পারলাম।

একজন শাহজাদা
সেদিন হোটেলে চা দিতে গিয়ে ছোট্ট হোটেল বয়টির হাত থেকে অসাবধানতা বশতঃ কাপ-প্লেট পড়ে ভেঙে গেলে হোটেল মালিক তাকে ইচ্ছামতো পিটিয়ে বেঁধে রাখে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমি কাপ-প্লেটের দামের দ্বিগুন পরিশোধ করে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসি।
বাইরে এসে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, নাম কি তোমার ?
-শাহজাদা, তয় মাইনষে আমার নাম ভেঙ্গাইয়া সব সময় ডাকে হারামজাদা।
-বাবার নাম কি ?
-বাদশাহ।
-বাবা কি করেন ?
-মাদকের মামলায় জেলে আছে।
-মা কোথায়?
-মাইনষের বাসায় কাম করে।
-থাক কোথায় ?
-তেজগাঁও রেল লাইনের পাশের বস্তিতে।
-তোমার নাম কে রেখেছিল ?
-আমার দাদী, শখ করে বাদশাহর পোলার নাম রাখছিল শাহজাদা।
-কত পাও একদিনে?
-তিনবেলা খাওন ছাড়াও পঞ্চাশ টাকা।
-কতক্ষন কাজ কর ?
-ভোর সকাল থাইক্যা মাঝ রাইত পর্যন্ত। তবে আপনি আমারে ছাড়ায়ে নিয়ে আসায় আমার আইজক্যার টাকা আর দিবো না।
শাহজাদাকে এবার ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম। আমি এভাবে তাকানোয় সে একটু লজ্জাই পেলো। তার বয়স আটের বেশি হবে না। তবুও জীবন সংগ্রামের সাহসী, কিন্তু নিপীড়িত যোদ্ধা সে।
তাকে দুইশ টাকা দিতে চাইলে প্রথমে সে নিতে চায়নি। জোর করে তার হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে হাটা শুরু করলাম আমি। আর ভাবতে লাগলাম, শাহজাদার জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় দাদীর রাখা নামটি স্বপ্ন বিলাস নাকি উপহাস !