কাঁচা মাটির সিজদাহ্

আমি তোমায় বৃক্ষের
সহনশীলতা দিলাম,
রিপুকে ছেড়ে এসো
কাঁচা মাটির সিজদায়।
আহামরি সুখের আমন্ত্রণে
মফস্বলি স্বর্গের অবমাননা
তোমায় ঠিক মানায়না।
নিজেকে খুুনী
প্রমাণ করোনা
আলেয়া প্রবঞ্চনায়।
বটবৃক্ষ দেখেছো?
কিংবা অশত্থ?
আমি যখন
মানুষের সাথে পেরে উঠিনা,
তখনই বটের ছায়ায় বসে
আকাশে চোখ রেখে
নিজেকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতায়
আবিষ্কার করে,
আকাশের বিশালতা
আর
বৃক্ষের মমতায় আপ্লুত হই।
এই সজীব ছেলেমানুষী
সাদা ভাতের মতো
সরলতার মায়া শেখায়।
আর এই যে
হরহামেশা
তুমি আমি হোঁচট খাই!
এটা জীবনের চলার রীতি।
তুমি আমি কেউই
পূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে
জীবনের পথে হাঁটিনি।
সেই শুধু বুদ্ধিমান ;
যে পথিক হয়েও
পথের দিশা চিনে রাখে।
হোঁচট খেলেও আমি
তোমার হাত ছাড়বোনা
ইহকালে।
আমার ভারসাম্যে যদি
তোমায় বাঁচাতে না’ই পারি,
তবে তোমার সাথে
ভূপতিত হতে তো পারবো।
আমি
এই সাথে চলার প্রতিজ্ঞাকে
ভালোবাসা বলি;
কোনো অভিধান মানুক
আর নাই মানুক।
সহজ স্বীকারোক্তিতে যেমন
আবাদি আপন সুখ।
…………………………………………..

বিবস্ত্র লজ্জা

টি এস সি মোড়ের বিবস্ত্র লজ্জা
সভ্যতার গলা চিপে
বের করে আনে শকুনের গায়ে
মানুষের খোলস।

লজ্জিত মনুষত্ব থরথর করে কাঁপতে থাকে
কলমের রক্তক্ষরণে।
মানবতার আর্তনাদে দুন্দুভি বাজায়
কাপুরুষের কাতার।

চিল -শকুন, বাজ’এর আধিপত্যে
দামামার তাল মঞ্চস্থ।
আর কামান হাকিয়ে কাক মেরে যায়
ব্রান্ডের সংবাদ।

শহীদের সাদা কাফনে কালি লাগায়
অমানুষী কাল।
কালজয়ী আত্মারা বুক থাপড়ে
সোনার বাংলা আর্তনাদ করে।

কামুক পিশাচ ধর্ষিত মায়ের
বুক চিড়ে জয়ী তিলক পরে।
ষড়যন্ত্রের মানচিত্র ধ্বংস করে
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব।
…………………………………………..

উনিশ বিশ

এক দুই তিন চার,
সাবান ঘষে যত্ন করে
হাত ধোব বার বার।
পাঁচ ছয় সাত আট,
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে
আমল করবো আঁটসাঁট।
নয় দশ এগারো বারো,
ঘরের সবাই সুস্থ থাকতে
বাইরে যাওয়া ত্যাগ করো।
তেরো চৌদ্দ পনেরো,
লেবুর রস দিয়ে গরম পানি
বারবার খেতে পারো।
ষোলো সতেরো আঠারো,
আল্লাহ ছাড়া মালিক নাই
এই বিশ্বাস দৃঢ় করো।
উনিশ থেকে হলেই বিশ,
আঁকড়ে ধরবে কোভিড-১৯
ফুসফুসে ঢালবে বিষ।
…………………………………………..

বর্ণহীন লাশ

আমার শব্দগুলো আতঙ্কিত,
কবিতা কি হয়
এমন লাশের বহরে!
আমি যখন দেখি
এক বছরের শিশুটি
আক্রান্ত মা’কে
খোলসের উপর জড়িয়ে ধরে আছে,
আমি শব্দহীন হয়ে যাই!
আমি দেখি
চার বছরের শিশু
করোনায় নিয়ে যাওয়া মা’কে
আকাশের তারায় খোঁজে,
আমি স্তব্ধ হয়ে যাই!
আমি যখন দেখি
সেবাব্রত ডাক্তার জীবন দিয়ে দেয়,
যখন দেখি সেবায় রত
সেবিকারা জীবন দিয়ে দেয়
আমি উম্মাদ হয়ে যাই।
লাশ লাশ লাশ আর লাশ
আর কোন কবিতা নেই।
আমি তুমি সে আমরা
কেউই চিরঞ্জীবী নই,
কিন্তু আমি মানুষ বলেই হয়তো
এ লাশের বহর আমায় কাঁদায়।
জানি সবাইকে যেতে হয়,
একদিন মায়ার ভুবন ছেড়ে।
তবু লাশ লাশ আর লাশ
আমি সহ্য করতে পারিনা।
তোমরা মায়ের লাশ দেখেছো?
মুসলিম,
হিন্দু,
বৌদ্ধ,
খ্রিস্টান
সকল মা’ই মা।
মায়ের লাশ,
মায়েরই লাশ।
তোমরা বাবার লাশ দেখেছো?
সকল বাবার লাশই
বাবার লাশ।
আমি আবেগি বলেই হয়তো কাঁদি।
আমি লাশের কাতারে নিজের ছবি দেখে ঘুমের ঘোরেই কাঁদতে থাকি।
নিজের জন্য কাঁদছি দেখে অবাক হই।
সময় হলে সকল মায়া ছেড়ে তো যাবোই।
আমি মুসলিম বলেই এটুকু বুঝি,
যেতে যখন হবে ;
হিসাব দেয়ার মতো কিছু নিয়ে যাই।
কিছু সওয়াবের কাজ,
পূর্ণ দায়িত্বের নামাজ!
দায়িত্ব আদায় করি মৃত্যু পর্যন্ত।
যদি স্রষ্টার ইচ্ছায়
মারণাস্ত্রের কাহিনী শেষেও ভুবন মাঝে থাকি;
সোনালি সকালের কবিতা শুনাবো প্রভাতি স্নিগ্ধতায়।
হয়তো!
…………………………………………..

আরো একবার

অভিজাত পাড়ার ওয়াইন উৎসবে
গণতন্ত্রের মৃত্যুচিৎকার।
তোমার নষ্ট শহরের ভাইরাসে
মফস্বলের গায়ে লেপ্টে গেছে কলঙ্কের ধুতি।
ফাগুনের বাউলা বাতাসে আজ পঁচা রক্তের গন্ধ!
প্রতারক প্রেমাবাসের ঝাড়বাতির ঝলসানিতে
অনিকেত বিদির্ণ সবুজ।

আমি তবু
চিরতরুন সকালের আত্মবিশ্বাসে দাঁড়িয়ে,
প্রতিদিন পতাকায় সালাম দেই।
আমি তবু
সদ্যস্নাত বৌঠানের প্রথম সিঁদুরের মতো
সত্য প্রতিশ্রুতি।

তুমি নিশাচর আততায়ীর
রক্তে লেখো মঞ্চ নাটক।
কালের উপন্যাস ভিজে যায়
রক্তের ছিটায়।
ভবঘুরে বিশ্বাসেরা তোমার
বার্ধক্যের লাঠি ধরে এড়িয়ে যায় কর্তব্যের চৌকাঠ।

তোমার কলমের পেট ভর্তি ভেজাল কালিতে
আজ মুক্তির বিকৃত গল্প শেষ।
আরেকবার অগ্নিঝরা মার্চে
বুকের রক্তে লিখবো আমার বাংলাদেশ।
…………………………………………..

লোনা চয়ন

চলে যাবে?
যাও!
তবে তুমি আমায় যা দিয়ে গেলে
সে আমার ভালোবাসার সার্থকতা,
সে আমার জীবনের পরিপূর্ণতা।

তুমি তো জানোনা;
মেমোরির ভিসায় তোমায় মাঝে মাঝে দেখতে যাবো।
তোমার নিবিড় মমতায় আপ্লুত স্নায়ুর স্নান দেবো।

কখনও সখনও স্মৃতির চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ডাকবো তোমায়;
দেখবো আমার ভালোবাসায় ঘেরা নিবিড় কুটির।
দেখবো আমার সারা জীবনের ব্যকুল স্বপ্নের সার্থক লোনা চয়ন।

অনেককেই বলতে শুনেছি তুমি ভীষণ কৃপণ,
হয়তো আমায় আঁচল ভরে দেবে বলেই,
সকলের তরে
তোমার এই কৃত্রিম কৃপণতা!

আমি আমার এই
অমূলক জীবনের অর্থ জেনেছি
তোমার আশিষে।
প্রেম পিয়াসী নদী
নারী হয়েছে তোমার শুভাশিষে।

আজ তুমি যখন বিদায় নিতে এলে,
আমি নির্বাক!
শুধু তোমার পথপানে চেয়ে!

হাত ধরে তুমি
যে আগামীর কাছে সঁপে গেলে
তোমার মতন সে
হবে কী অকৃপণ?

না’ হোক, ভয় নেই।
পূর্ণ প্রাপ্তিতে এখন আমি
আত্মবিশ্বাসী সুখী ;
তাই নির্বিঘ্নে সকলের
সুখ প্রার্থনা রাখি স্রষ্টায়।
…………………………………………..

ভাবনার প্রেম

ছন্দ আমার
মধ্যবিত্ত সম্মানের মতো
অযাচিত মেনে নেয়ার
নিয়ম বন্দী নীতি,
শব্দ আমার
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
অক্ষমতার সামর্থ্য
নিরীক্ষণ করা কষ্ট।
তাই
আমি অন্তঃমিল, ছন্দ মিলে
প্রেমী হতে পারিনা,
আমি শুধু
ভাবনার প্রেমে স্বাক্ষরিত।
হাতে হাত রেখে
কাপুরুষের মতো
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেই
প্রেম অমর ইতিহাস হয়ে যায়,
আর প্রতি পালসে
পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করে
বেঁচে থাকলে আমার অসাধারণতা
ভীষণ রকম সাধারণ হয়ে যায়।
তাই
আমি শ্রেষ্ঠ উপলব্ধির
প্রেমিকা হতে পারিনা
আমি শুধু
প্রকৃতির সবুজ প্রেম বিলিয়ে যাই।
অস্থির সাময়িকীকে
রঙরস দিয়ে জনমনে
একবুক অস্থিরতা
পুঁতে দিতে পারলেই পারগ।
আর অস্থিরতাকে ভুলাতে
শ্যামল প্রেম শেখালে
তারে বলো মজ্জাহীন।
তাই
আমি তোমাদের পারগতা শিখিনি,
আমি শুধু
নদীর মতো সকল ব্যাথা
বুকে আড়াল করে শুদ্ধির জলে
তোমার চরণ ভেজাই।।
…………………………………………..

মুগ্ধ উপমা

আমি জানি ;
আমার স্পর্শে তোমার শব্দেরা প্রাণ পায়,
জানা অপেক্ষায়
আমি দুলতে থাকি আশাবাদী নিরাশায়।

তোমার সজীবতাকে হিংসা করলে
আমি কি আর থাকি ভালোবাসায়!
আমার স্বার্থের পরম্পরায়
শব্দভাণ্ডারও নুয়ে কাঁদে লজ্জায়।

তুমি নির্বিঘ্নে
জটিল মর্মার্থ লেখো
সরল শব্দের একাগ্রতায়।
আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের
একনিষ্ঠ নীতির মতো
তোমায় যাচাই সুখ পাই।

হারাও কেনো নষ্ট ভাবনায়?
আমি তো জীবন বিশ্লেষণে
মুগ্ধ অহঙ্কারী উপমা চাই!
…………………………………………..

থামাও তোমার ধ্বংসযজ্ঞ

ওরে সর্বনাশী-অলক্ষ্মী
এবার ফিরে যাও!
ওরে অপয়া,
শকুন-বুকে মায়ার সলিল ছড়াও।

ভরা শ্রাবণে
তোমাকে পূর্ণ যৌবনা দেখে
আমি শতখানেক প্রেমকাব্য লিখেছি।
আজ কবিতার বুকে রক্ত
দেখে আঁতকে উঠি।

তুমি কতটা আর গ্রাস করবে!
কতোটা গ্রাস করলে
তোমার তৃপ্তির চরে
জীবন সুধার ঋণ দিবে?

কতো অপরূপ নামে
তোমারে দিয়েছি শ্রবণ আনন্দ,
আর তুমি হাজারো বসত গিলে
চুকাও নেশার রাজতন্ত্র।

আমি তোমায় নারীর মতোই
শ্রদ্ধা করি,
তোমার আঁচলের মুঠো জলে
শুদ্ধির ওজু সারি।
যে দেহ তোমার
জীবনের আখ্যানে আবৃত,
তারে কেন অনাচারী নাম দাও!

ওগো স্রোতস্বিনী পদ্মা
এবার থামাও।
থামাও তোমার ধ্বংসযজ্ঞ!

ওগো তটিনী উল্লোসিনী
এবার থামাও।
থামাও তোমার,
মাইল-শত বুকের ভেতর
দুমড়ে ফেলার প্রবণতা!