বাহিরে চাপা গুঞ্জরণ। উৎসুক জনতার ভীড়। চারদিক গম গম শব্দ। মৃদু চাপা হই চই। সবাই অপেক্ষার প্রহর গুনছে সেই সন্ধ্যাবেলা থেকে। দরবার বসেছে সুবাসপুর হাইস্কুলের বড় শ্রেণি কক্ষে। চেয়ারম্যান আফাজ উদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে পদ্মপাড়া গ্রামের পুটু মেম্বার, মিলনেরপাড়া গ্রামের মাহফুজ আলী আকন্দ, সুবাসপুর গ্রামের আজাদ ম-লসহ মোড়লদের নিয়ে আজকের এই দরবার।
ইউনিয়ন কমপ্লেক্স কোথায় নির্মাণ হবে এটা ঝুলন্ত অবস্থায় আর দেখতে চায় না গ্রামবাসি। এর আগে দুইবার অর্থ বরাদ্দ এসে ফিরে গেছে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ে। এবার যে অর্থ বরাদ্দ এসছে তা আর ফিরত যেতে দিবে না এলাকার লোকজন। বিশেষ করে আরিফ সোহেল রন্টু সোহাগ সাকিলদের মতো টগবগে তেজিদিপ্ত তরুণদের কথা কমপ্লেক্স যে গ্রামেই হোক এবার বরাদ্দ ফিরত যেতে দেব না। তিন গ্রামের মধ্যে দেড় যুগের সমস্যা আজ মিটমাট হবে এটাই সবার আশা। তাই সবাই উদ্বিগ্ন।
এর মধ্যে বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করছে কয়েক বার। এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। গ্রামের বিদ্যুত একবার গেলে ফিরে আসার আর মনে থাকে না। হেমন্তের রাত। হালকা শীত মিশানো বাতাস বইছে। অনেকের রাতের খাওয়া হয়নি। বিশুর ভাসমান দোকানে উপচে পড়া ভীড়। রুটি-কলা, চিনা বাদাম, বুট ভাজা খেয়ে ক্ষুধাকে থামিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ছোট-খাটো একটা লোকের মেলা বসেছে। বিশুর দোকানে যা ছিল কয়েক নিমিশেই বেচা-বিক্রি শেষ। ছেলেকে বাড়িতে পাঠাছে আরো মাল সামানা আনতে। এখানো এসে পৌঁছিনি। এই নিয়ে বিশু রাগে গড় গড় করছে।
বিশুর ভাসমান দোকানটা বংশগতভাবে। তার দাদা করেছে, বাপ করেছে। এখন সে নিজে দোকান করছে। সাথে তার ছেলে থাকে। ছেলের নাম পুষু। ক্লাস টুতে থাকা অবস্থায় পড়া লেখার পাঠ চুকে দিয়ে বাপের কাজে যোগাল দেয়। বয়স কম হলেও যুওয়ান মানুষের মতো কাজ করে। বিশু ছেলের উপর নির্ভর করে সংসার চালায়।
কেউ কেউ রাস্তায় হাঁটছে। কেউবা আবার খোস গল্পে মেতে উঠেছে। বিশুর দোকান থেকে পাঁচ টাকার বাদাম, পাঁচ টাকার ছোলা বুট ভাজা নিয়ে স্কুলের দক্ষিণ গেটের উল্ট পাশে মাঠের সবুজ ঘাসের উপর গিয়ে বসলাম।
যমুনার তীর ঘেসে সাজানো গোছানো সুবাসপুর গ্রাম। নদীর তীরে গ্রামটি গড়ে উঠেনি। বছর বছর নদী ভাঙ্গে গ্রামের কাছে এসেছে। পর পর দুটি বেরি বাঁধ দিয়ে নদী থেকে গ্রামটিকে আলাদা করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
কাঁচা রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি বিভিন্ন ধরনের গাছের মনোরম দৃশ্য। সাপের লেজের মতো এঁকে বেঁকে মেঠো পথ চলে গেছে সুবাসপুরের বুকচিরে জেলা শহরে। মোরগ ডাকা সকাল থেকে শুরু হয় সবার ব্যস্ততা। কৃষকেরা ক্ষেতে যায় । কেউ আবর লাঙ্গল কাঁধে গরুজোড়া নিয়ে যায় জমিতে হালচাষ করতে। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে যায় স্কুলে। দুই একজন অফিস করতে যায় সদর শহরে। সৃষ্টিকর্তার দক্ষ হাতে নিপুন মনে আঁকা ছবি সুবাসপুর ।
সুবাসপুর হাইস্কুলের দুবলা ঘাস বিছানো মাঠের দক্ষিণ পুর্ব পাশে বসে আছি। রাতের পাখিগুলো কিচিরমিচির করে উঠলো আরেকবার।
নানাজানের কাসার থালার মতো চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে নিরন্তর। জোছনার আলোয় গাছের নিরব পাতাগুলো চকচক করছে। নতুন বউর প্রথম রাতে এক এক করে যৌবনের কপাট খোলা খেলার মতো রাত তার প্রকৃত রূপের ডালা খুলে উসলায়ে পড়ছে সুবাসপুর গ্রামের বুকের উপর। গলে পড়া রূপের আলো আজলা দিয়ে ধরে ধরে গায়ে মাখছি সযতনে।
এক ঝাপটা দমকা বাতাস চুমু দিয়ে গেল পরম ভালোবাসায়। দেহের বাঁকে বাঁকে শীর শীর আবেশ ছড়িয়ে পড়লো। মনটা উদাস উদাস লাগছে। এই সময় কোকিলের কহু কহু ডাক শুনতে মন চায়। উড়ান্ত শাদা বকের ঝাক দেখতে ইচ্ছে করে। উড়ে যেতে মন চায় নীল আকাশে। বাতাসে ভর দিয়ে মেঘের সাথে গল্প করতে মন চায়। কিন্তু সেটা অবাস্তব। অবাস্তব কোন কিছু জীবনের সহ-সঙ্গ হতে পারে না।
রাতের একটা আলাদা ঘ্রাণ আছ। সে ঘ্রাণ কেমন তা বলা যায় না তবে অনুভব করা যায়। সেই গন্ধ হৃদয়ে মাঝে ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে দেয়। স্মৃতির জানালা খুলে দেয়।
মাথায় নানা ভাবনার জটলা উকি দেয়। ভাবনাগুলো স্বাধীন। শাদা বকের ডানার মতো। কখনো শংঙ্খ চিল হয়ে নীল আকাশ ভেদ করে উড়ে চলে মেঘের ওপারে। আবার হঠাৎ মানুষের মনের দোলনায় দোল খায় জেদি প্রেয়সীর মতো। ভাবনার হাত পা নাই তবুও মাথায় এসে চুলকায়। নাড়া দেয় মনের জানালায়।
আজ কেমন যেন মাকে বেশি দেখতে ইচ্ছে করছে । এখন যদি দেখতে পেতাম। খুব যে বেশি ভালো লাগতো তা না, তবে ভালো লাগতো। মায়ের চেহারা ভাসা ভাসা মনে পড়ে। ছোট বেলায় যখন গান গাইতাম তখন মা শব্দ করে হাসতো। কারন, গানের লিরিক ভুল বলতাম। বেসুরে গলায় নাকি চিল্লাতাম। সেই হাসির শব্দ আজ বেশি কানে বাজছে। সেই গলে পরা হাসি চোখে ভাসছে কিন্তু মায়ের চেহারা ছায়ার মতো মনে ভাসে।
মা যখন নানা বাড়ি আসতো আমি তখন বাবার সাথে বগুড়ায় থাকতাম। ভাবতাম, মা এবার এলে আমাকে দেখা দিবে। আমাকে সংবাদ দিবে। আমাকে দেখার জন্যে ব্যকুল হবে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে। আদর করবে। বলবে, ‘রিয়ন চলে আয়। কত দিন তোকে দেখিনা’। হয়তো মনু মামা এসে বলবে ,
-চল রিয়ন। বড় বুবু এসেছে।
আমি বলব- মা কখন এসেছে ।
মনু মামা বলবে- রাতে এসেছে। বুবু কি বলল জানিস?
বলব- আমি কি করে জানব মামা?
মামা তখন বলবে- বুবু এসেই তোকে দেখার জন্যে ছটফট করছে। আমাকে বলল,‘কাল সকালে গিয়ে রিয়নকে নিয়ে আসবি। ওর জন্যে অনেক ধরনের চকলেট এনেছি।’ তাই আমি এসেছি। চল তারাতারি যাই। বুবু অপক্ষো করছে। তুই গেলে তারপর সকালের নাস্তা করবে।
আমি পাখি হয়ে উড়ে যাব। অভিমানে গাল ফুলে থাকব। বলব, তোমার সাথে আড়ি। তখন মা স্নেহমাখা হাসি দিয়ে বুকে টেনে নিবে। বুকে মাথা রেখে অনেকক্ষণ কাঁদব। বলব, তুমি পচা, আমাকে ভুলে গেছ। আমাকে আর আদর করো না। আমি যে তোমার জন্যে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদি। অসুস্থ্য হলে তোমার সেবা পাই না। মাথায় কেউ হাত বুলিয়ে দেয় না। তখন শুধু নিরবে কাঁদি। স্কুল থেকে এসে মা বলে ডাকতে পারি না। ক্ষুধা পেলে নানি খাবার দেয় কিন্তু তুমি খাওয়ানোর মতো না। বৃষ্টিতে ভিজলে কেউ নিষেধ কওে না। কারেন্ট চলে গেলে কেউ বাতাস করে না। রাতে শোবার সময় তোমাকে না পেয়ে মন হু হু করে কেঁদে উঠে মা।
ওখানে তুমি অনেক ভালো আছো, তাইনা মা? তোমার ওই মেয়েটা আমার থেকে ভালো। তাইতো আমাকে আর মনে পড়েনা তোমার। তোমার গা থেকে ভেসে আসা মা মা গন্ধ খুব ভালো লাগে মা। স্কুল ভালো লাগেনা, খেলা ভালো লাগে না। ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে না। বাবা অনেক আদর করে। ঘুমানোর আগে গল্প শোনায়। আমার সাথে খেলে। তবুও তোমার স্নেহের মতো নয়। এখানে আমার আর কিছু ভালো লাে গনা। তুমি আমাকে সাথে নিয়ে চলো মা।
কিন্তু এই ভাবনাগুলো স্বপ্নই রয়ে গেল। মা আমাকে আর দেখা দিল না। ইচ্ছে করলেই মা আমাকে দেখা দিতে পারতো। হয়তো সেই ইচ্ছা আমার জন্যে বরাদ্দ নাই। চোখের আড়াল হলে মনেরও আড়াল হয়।
বসন্তের প্রথম বৃহস্পতিবার বিকালে মা বাবার মধ্যে ডিভোর্স হয়। এটা ছিল আমার জন্মের আঠারোতম দিনে । আমাকে নিয়ে যখন সারা বাড়ি জুড়ে আনন্দের ঢেউ তখন ছড়িয়ে পড়ল সম্পর্কের বিচ্ছেদের সুর। এটা আরো আগে হওয়ার কথা ছিল কিন্তু নানার অনুরোধে থেমে ছিল। নানা ভেবেছিলেন, আমার জন্মের পর মা বাবার মধ্যে সম্পর্ক ঠিক হবে। হয়তো আমর মুখপানে চেয়ে দুজনের জেদ কমে যাবে। ভেঙ্গে যাবে ভুল। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে গলে তরল হয়ে যাবে দুজনের অভিমানের বরফের পাহাড়। তা আর হলো না।
মা বাবার সম্মতিতে ডিভোর্স হয়। ডিভোর্সের পরের দিন বাবা নানা বাড়ি থেকে চলে যায়। নানা বাবাকে বলেছিলেন, ‘তুমি আর কয়েকটা দিন থেকে যাও।’
কিন্তু বাবা এই প্রথম নানার কথা অমান্য করে চলে যায়। আর কোন দিন আসেনি এই বাড়িতে। নানির মৃত্যুর দিন এসেছিলেন। তবে সুবাসপুর হাইস্কুল মাঠে জানাজায় শরিক হয়েছিলেন। তারপর গোরস্থান থেকে সোজা বগুড়ায় চলে গেছেন।
সময়ের ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে গেল জীবনের আরো সময়। ভারি হতে লাগলো স্মৃতির গুদাম। বেড়েই চলল মনের একাকিত্ব। দুঃখের জানালা খুলে খুলে ঝরে পড়ছে হৃদয় বাগানের ফুলের কলি। শুকনো পাঁপড়িরা মর্মর সুরের মূর্ছনায় নিষ্পেতি হয় স্বার্থের পায়ের তলায়। এভাবে কাটে গেলো কয়েক বছর।
যে দিন মাকে বিয়ে করে নিয় গেল লোকটি তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কাঁদছিল। সেই কান্না ছিল হৃদয় ভাঙা করুন আর্তনাদ। মা বলেছিল, ‘ভালো থাকিস। মাঝে মাঝে তোকে দেখতে আসবো’।
আমি সেই লোকটার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম। মা আমার কপালে চুমু দিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়ি চলে গেল মাকে নিয়ে। গাড়ির শাঁ শাঁ শব্দ কানে বাজছে বজ্রপাতের মতো। গাড়ির হর্ণ বিচ্ছেদের সুর হয়ে ভাসে আমার মনের আকাশে। গাড়ির চাকা আমার কচি বুকের উপর দিয়ে চলে গেল নতুন দিগন্তে।
সে দিন অনেক কেঁদেছি। ঘুমাতে পারিনি কয়েক রাত। সেদিনই শেষ দেখা। মাকে আর দেখার সৌভাগ্য হয়নি। মনু মামার মাধ্যমে বাবা আমাকে তার কাছে নিয়ে গেলেন।
বাবার ছবিটাও মনে পড়ে। পৌরষ দিপ্ত চেহারা। দৃঢ় সিদ্ধান্তের লোক। বাবা সরকারি আযিযুল হক কলেজের সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
কলেজের সামনে জামিলনগর জানে সাবা হাউজিং সোসাইটিতে দুইতলা বাড়িতে থাকেন। অবশ্য নিচের তলা ভাড়া দেওয়া আছে।
তখন ওখানেই থাকতাম। মাঝে মাঝে বাবা আমাকে তার কলেজে নিয়ে যেতেন। বাবা যখন ক্লাস নিতেন তখন পাশের ডিপার্টমেন্টের বরান্দা দিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। সারি সারি সুন্দর ভবন। ভবনের সামনে ফুল বাগান। বিশাল খেলার মাঠ। অনেক শিক্ষার্থী। ছাত্র-ছাত্রীর ভিড়ে মেলার মতো গম গম করে কলেজের পরিবেশ।
একদিন বাবাকে বললাম- আমি কবে তোমার কলেজে পড়বো বাবা?
বাবা বললেন, ‘তোর এখানে পড়া হবে না।’
বাবার কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। মুখ গোমরা করে বললাম, কেন হবে না? আমি এখানে পড়বো। আমি এই বড় কলেজেই পড়বো।
বাবা তখন বললেন- মন খারাপ করলি রিয়ন? আরে তুই তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বি। তোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হবে। পিএইচডি করবি। অনেক বড় হতে হবে তোকে। আমার ইচ্ছে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার।
বাবা আরো কিছু বলতে চাইছিলেন। কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বললাম,
বাবা পিএইচডি কি?
পিএইচ ডি হলো কোন বিষয়ে গবেষণা করা। জ্ঞানী হওয়া।
বাহ্! আমি গবেষক হবো। কি মজা।
সেদিন বাবার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখতে পেয়েছিলাম। আর কিছু না বুঝলেও ‘গবেষক’ যে বড় কিছু সেটা বুঝতাম।
কলেজ ক্যাম্পাসে অনেক লোকের ভীড়। দুই একজন ছাড়া সবাই হলুদ কাপড় পড়েছে। চারদিকে রঙ বেরঙের ঝলক। লেকের দক্ষিণ পাশে রক্তচুড়া গাছের নিচে মঞ্চ সাজানো হয়েছে। বসন্ত বরণ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান পরিচালনা করবে কলেজ সাংস্কৃতিক সংসদ।
বাবা আমাকে দর্শক সারিতে রেখে মঞ্চে গেলেন বিশেষ অথিতির আসনে। আমি বাবার স্টুন্ডেদের সাথে বসে আছি। কেউ চকলেট এনে দিল। কেউ দিল আইসক্রিম। কেউ গাল টিপে দিচ্ছে। এক আপু আমাকে কোলে তুলে নিলো। কয়েকজন বান্ধবিসহ বসে আছে। আমার সাথে দুষ্টমিতে মেতে উঠে সবাই। আপু বলল,
-তুমি কিসে পড়?
-ক্লাস ফোরে পড়ি।
-কোন স্কুলে পড়?
-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে।
-রিয়ন, তুমি কিউট বয়। হ্যান্ডসাম। আমি তোমার প্রেমে পড়েছি। আমাকে বিয়ে করবে।
তখন আমি বললাম, তুমি পিইচডি গবেষক হও তখন বিয়ে করবো। এই কথা বলার সাথেই সবাই উচ্চ স্বরে হাসতে লাগলো।
বাবার সাথে বিকালে খোকন পার্কে ঘুরে বেড়াতাম। সাইকেল চালানো বাবাই শিখিয়েছিল। নতুন নতুন শার্ট প্যান্ট কিনে দিতেন। আর বলতেন, ‘রিয়ন তোকে স্মার্ট বয় হতে হবে।’
মনু মামা আমাকে নিয়ে আসা করতেন। সুবাসপুর গ্রামে ফাগুন মাসের প্রথম বুধবার বড় মেলা বসে। ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য মেলা। সুবাসপুর ঐতিহাসিক গ্রাম। এই মেলার নিপথ্যে মজার ইতিহাস আছে।
মেলায় হরেক রকম খেলনার দোকান। হাতের চুড়ি, নাক ফুল, কানের দুল, লেস ফিতার দোকান। সস্তা কসমেটিকের দোকান। জিলাপি মুড়ি মুরকি আর মিষ্টির দোকান। লাঠি খেলা। পাতা খেলা। মটর সাইকেল খেলা। জাদু খেলা। সার্কাস খেলা। আমি মৃত্যুকুপ মটর সাইকেল খেলা বেশি দেখতাম।
মেলার পশ্চিম পাশে ডেকরেটরের কাপড় দিয়ে প্যান্ডেল করা হয়। সেখানে ভিসিআর দেখায় সুবাসপুর খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে। সিনেমা দেখায়, নাটক দেখায় আর গান। টিকিট পাঁচ টাকা। মনু মামা সেই মেলা উপলক্ষ্যে আমাকে নিয়ে এলেন। তারপর কেটে গেল জীবনের দুই দশক। মন ও পরিবেশতান্ত্রিক জটিলতায় বাবার কাছে আর ফেরা যাওয়া হয়নি।
বাবা বিয়ে করলেন। একই কলেজের ফিনান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক।
মনু মামার থেকে শুনেছি, বাবার নতুন বউ আমার মায়ের ভার্সিটির বান্ধবী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একই হলে থাকত। মার সাথে নানার বাড়িতে এসেছে কয়েকবার। মার বিয়েতে এসেছিল। ঘনিষ্ট বান্ধবী হলে যা হয়। মা অবশ্য সমাজ বিজ্ঞানে পড়ছেন। মা এখন একটি এনজিওর নারী ও শিশু পুনর্বাসন সোসাইটির ডিপুটি ডাইরেক্টর হিসাবে কাজ করছেন।
বাবাকে ইচ্ছে করলেই দেখতে পারি কিন্তু সেই ইচ্ছাটা হয়না। ইচ্ছা করার অনেক চেষ্ট করেছি। কিন্তু ইচ্ছেকে সফল করতে সারা দেয়নি মন। বাবার আশা পুরন করতে পারিনি। তবে অন্য ছেলে মেয়ে সেই আশা পুরণ করেছে। ছেলেটি পিইচডি গবষেক। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক। আর মেয়ে শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ডাক্তার।
নানি মারা যাওয়ার পর গাইবান্ধায় গেলাম বড় মামার কাছে। গফুর মামা একটি ঔষধ কোম্পানির মেডিক্যাল ইনফরমেশন অফিসার। সহজ কথায় ঔষধ সেল করে। দিনের সত্তর ভাগ বাহিরে থাকলেও আমার প্রতি তার দায়িত্ব যথাযতভাবে পালন করেছেন। মামি কখনো তার সন্তানদের থেকে আমকে আলাদা করে দেখেননি। মাঝে মাঝে ইংরেজি বুঝে দিতেন। কিন্তু গণিত নিয়মিত করাতেন।
এসএসসি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাশ করলেও ইন্টারমেডিয়েটে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় পড়লাম। আশা ছিল গণিতে অর্নাস মাস্টার্স করবো। তারপরে ভাবলাম কার্ডিওলজিস্ট হবো। হার্ট নিয়ে গবেষণা করবো। মেডিক্যাল কলেজে পড়াবো। এইচ এসসি ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে সুযোগ হলো সরকারি নাজির আখতার কলেজে। ভর্তি হলাম। কষ্ট করলাম তিন মাস। সব প্রাভেট পড়া বাদ দিয়ে বাণিজ্য শাখায় বিভাগ পরিবর্তন করলাম।
বাণিজ্য বিভাগের মোস্তাফিজুর রহমান স্যারে প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়লাম। তাঁকে দেখলেই মুগ্ধ হই। ভালো লাগে। কয়েকদিন ক্লাস করলাম। তাঁর পড়ানো এবং ব্যবহারে প্রভাবিত হলাম। তারপর পদার্থ বিজ্ঞানের সরণ দূরুত্ব কম্পাঙ্ক , রসায়নের রস ছেড়ে দিয়ে ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা আর হিসাব বিজ্ঞান পড়া শুরু করলাম। হিসাব বিজ্ঞানের লেনদেন জাবেদা রেওয়ামিল খতিয়ান ও চুড়ান্ত হিসাব সহজে মিলাতে পারছি। মা বাবার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র, আলাদা আত্মমর্যাদা এবং আত্মদাম্ভিকতার কারনে আমার জীবনের হিসাব মিলাতে পারিনি। জোছনার আলোছায়ার মতো জীবন নিয়ে আমার অনিশ্চিত পথচলা। সাজরে দেওয়ালে ছুঁড়ে ফেলা গ্লাসের মতো চুরমার হয়ে গেছে এই জীবন। বিচূর্ণ আয়নায় দেখি জীবনের প্রতিচ্ছায়া।