চাঁদের জোছনা ঢেলে পড়েছে চারদিকে। এই জোছনায় গা ভাসিয়ে পানির সেকি নাচানাচি, জোছনায় নাচানাচির সাথে পাল্লা দিয়ে পানির হাসাহাসি। হাসতে হাসতে কখনও শব্দ তুলে হো-হো, ঐ হাসি মনে ভয় ধরিয়ে দেয়।
কারণ ঐ ভয়ঙ্কর হাসির রোল তোলা মানেই কারো বাড়ির একাংশ সাঁই-সাঁই করে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। পানির এমন উত্তালের কাছে ইনসান বড়ই অসহায়।
চারদিকে ভরাবর্ষা। পানি ক্রমেই ঘরের টুই ছুঁই ছুঁই। চালের উপরে কায়দা করে মাচা পেতে কোন রকমে মাথা জাগিয়ে বেঁচে থাকা। এমন ভরা বর্ষায় দু-পয়সার কাজ নেই। অথচ; ক্ষুধার সন্ত্রাস প্রচন্ড ভাবে ছড়িয়ে পড়ে পেটের মধ্যে। এই সময়ে পানির নীচে চুলা রেখে পেটের আগুন নেভানো যে কত দূরহ্ গৃহিনী ছাড়া বোঝা ভার।
এমন বর্ষার মধ্যে কাজ কাম ছাড়া মোতালেব মাদবরের ঘন্টায় ঘন্টায় ক্ষুধা পায়। ক্ষুধার কথা বললেই স্ত্রী ক্ষেপে উঠে দু-কথা শুনিয়ে দেয়।
আপনের পেডের মধ্যে কি রাক্ষস। কতক্ষণ পরপরই খাওন চান?
চোখে মুখ বিরক্তি থাকলেও মনটা বন্যার পানির মত বড়ই নরম। লুকিয়ে রাখা গোপন কোন হাড়ি পাতিল থেকে কাঁঠালের ভাজা বিচীর সাথে চাউল ভাজা দিয়ে বিদায় করে-
যান গল্প সল্প কইরা আহেন।
বিদায় করার অন্য একটা ব্যাপারও আছে। ছয় সাত বছরের মেয়েটার সামনেই গায়ে হাত দেয়, সন্ধ্যা হবার সাথে সাথেই লোকটাকে আদিম নেসা পেয়ে বসে। লোকটার জ্ঞান বুদ্ধি কবে হবে, এ বিষয় নিয়ে মোতালেব মাদবরের স্ত্রী হনুফা বড় চিন্তিত, মানুষটা ভাল মন্দ সময়ও বুঝেনা। মোতালেব মাদবরের চোখে দুষ্টামি, তার যাবার নাম নেই দেখে স্ত্রী আবারো জ্যামটা দেয়।
কৈ আপনেরেনা কইলাম যান গল্প গুজব কইরা আহেনগা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মোতালেব মাদবর তার ডিংগা নিয়ে সামনে এগোয়। অদূরে আরো আট দশটা ডিংগার জটলা, এরা সবাই সবার পরিচিত, কাজ কাম না থাকায় প্রায় প্রতিদিনই মধ্য রাত অবধি গল্পের তুবরি ছুটে। গল্প শুনতে শুনতে অনেক শ্রোতা নায়ের মাচানেই ঘুম নেতিয়ে পড়ে। আসরের শুরুতে বিক্ষিপ্ত কথা বার্তা হলেও সব শেষে গুছানো গল্প দিয়েই আসর সমাপ্ত হয়।
গল্পের খনি নামে খ্যাত। মোতালেব মাদবরের নাম সবার মুখে মুখে… তার দাবি হলো সে যত গল্প করে সবই হাছা… তার গল্প বলার মাঝা-মাঝি সময়ে নিরবতার পাহাড় নেমে আসে, আবিষ্ট হয়ে সবাই গল্প শোনে, জ্বলন্ত বিড়ি ফুকতে খেয়াল থাকেনা কারো কারো, এতে বিড়ি নিভে যায়, নিভে যাওয়া বিড়ি পূনর্বার ধরানোর ইচ্ছে হয়না। তার গল্প শুনে কখনও কখনও চোখে জলোচ্ছাস শুরু হয়। ভিজে যায় মন, মনের গভীর গগন।
আজও বিক্ষিপ্ত গল্প হবার পর, মোতালেব মাদবর গলা খাকারি দেয়। এর মানে আজও একটা হাছা গল্প শোনাবে। গল্প বলার শুরুতে তার সেই পুরনো নিয়ম, কিছু ভুমিকা থাকবেই।
হুনো মিয়ারা, আইজ যেই গপ্পো তোমাগো হুনামু এই গপ্পো আসলে গপ্পো না, এককেবারে হাছা হিস্টোরি। এই হিস্টোরি কওনের আগে একটা কথা কই। এই হটাৎ বন্যার কারণ অইলো ভারতের দেওয়া ফারাক্কা বান, কথাটা এই জন্যই কইলাম, আইজ যেই হিস্টোরি কমু, এই হিস্টোরিডা বন্যার জন্যই জম্মাইছে..। এই ফারাক্কার কুফলের কারণে আইজ আমরা ঘরের চালে থাকি, গরু বাছুর মইরা সাফ !
কথায় কথায় ফারাক্কা বলার কারণে কেউ কেউ মোতালেব মাদবরকে ভারত বিদ্বেষী বলে। মোতালেব মাদবর ও সাফ সাফ উত্তর দেয়।
-ভারত আমার শত্র“, আমার দেশের শত্র“, তারে কেউ বন্ধু ভাবলে পাগলের ডাক্তর দেহানো জরুরি মনে করি। পেছনের ডিংগা হতে দাবি ওঠে।
-মাদদোর প্যাচাল বাদদেন, গল্পো কন হুনি, চোখে ঘুম পাইছে।
মোতালেব মাদবর শ্রোতাদের আগ্রহে সিরিয়াস হয়… সে গল্প শুরু করে।
হুনো মিয়ারা হেই বছর এমুনই চার দিহে পানি থৈ থৈ। এমন কোন মানুষ এই অঞ্চলে আছিলনা যার বাড়ির চাল পানিতে পায় নাই। মানুষ মারা গেলে তারে গোড় দেওনের জায়গা নাই, চাইর দিকে গরু-বাছুর মারা যাওয়া শুরু অইলো, একই ঘরের চালের উপর সাপ, ব্যাঙ, বেজি, একই গাছের ডালে কুকুর, শিয়াল, একে বারে কিয়ামতের আলামত। সাপ, ব্যাঙ ধরেনা ! আর বেজি সাপের দিহে ফিরাও তাকায়না, কুকুর আর শিয়াল কেউ যেন কাউরে জীবনেও দেহে নাই, কোনদিন তাগো মাঝে আছিলনা কোন শত্র“তা! মানুষ হইয়া গেল বাক শূন্য … আদম সন্তান মারা গেলে কলা গাছের ভেলায় করে ভাসায়ে দিত… এমন ভরা বর্ষায়, এমন চান্দের জোছনায় “হেই দিন” ঘটলো এক কলিজা ফাটা ঘটনা।
মজিবর নামে এক লোক তার ঘরের মাচায় শুয়ে আছে। পাশে তার স্ত্রী এবং চার বছর বয়সের ছেলে নাবিদ ঘুমিয়ে আছে, মজিবরের উল্টো পাশে তার অতিপ্রিয় পাঁচ নালী কোচ… এই কোচের সামনে যত বড় মাছই আসুক তার রক্ষা নাই… মজিবর ঘুমের ঘোরে হঠাৎ টুপ টাপ শব্দ হুনে। তার ঘুম অনেকটা চূড়ে যায়, স্ত্রীও যাই¹া উডে। মজিবরকে ধাক্কা দেয়।
এই ঘরের মধ্যে মনে হয় বড় মাছ ঢুকছে। স্ত্রীর কথায় মজিবরের ঘুম পুরো পুরি ভেঙে যায়, বিদ্যুৎ গতিতে মজিবর ওর কোচ পানিতে ছুড়ে মারে মজিবরের নিশানা কোন দিন ভুল হবারনা, আজও হয়নি, কিন্তু একি? মাছটা পালানোর চেষ্টা করছেনা কেন? মজিবরের অবাক হবার অন্ত নাই… বেজি যেমন সাপের সাথে খেলতে খেলতে সাপকে ক্লান্ত করার পর তার মরণ কামড় বসায়, খেলা ছাড়া মজা নাই, তেমনি কোচ দিয়ে মাছ শিকারি ও মাছের সাথে হুরোহুরি- মাছে কোচ হেছকা টান না দিলে, কমছে ম পড়নের লুঙ্গি না ভিজলে কিশের আবার মাছ শিকার? বোকা আর দূর্বল মাছ শিকারে কোন উস্তাদি নাই।
ঠিক ঐ সময় পশ্চিমের হেলে পড়া চান্দের জোছনা পানির সারা শরীর রূপালী করে তুলেছে.. সেই রুপালী জোছনার গতর কেমন যেন কাফন কাফন মনে হয়। সব কিছু দেখা যায় অথচ মনে হয় কেমন যেন অচেনা রহস্যময় ভয়…
মজিবরের হাতের শক্ত পেশী মিইয়ে যায়, পেশীতে তিরতিরে স্রোত… কথা বলার শক্তি নেই কণ্ঠে। হঠাৎ মজিবরের স্ত্রী চিৎকার করে ওঠে। -ইয়া আল্লাহ আমার বুকের মানিক কইগো ও আমার আল্লাহগো…
রাতের মোরাকাবা হঠাৎই খাঁন খাঁন হয়ে যায়। মজিবরের বুজতে বাকি থাকেনা, তার কোচের মাথায় কি? প্রচন্ড রকম হাত কাপে… শরীর মুহুর্তে ভিজে ওঠে… হারিকেনের আলোতে এবার স্পষ্ট দেখতে পায়, কি সুন্দর দুটি হাত, হাত দুটি আরো দুইবার উপরের দিকে মুঠিবদ্ধ হয়ে উঠা-নামা করে তারপর তলিয়ে যায়।
এরপর আর কোন শব্দ হয়না, সারা পৃথিবী নিথর হয়ে যায়, ক্রমেই পানি লাল থেকে গাঢ় লালে রূপান্তর ঘটে, এই সন্তান প্রসব করতে গিয়ে ওর-মা এক দিন সারা ঘর এমনই রক্তে লাল করে তুলেছিল, আজ যেন তার পূনরাবৃত্তি। মজিবর কোচ উপরে তুলতে পারেনা, তার সাহসে কুলয়না, তার চোখ কি করে দেখবে ঐ দৃশ্য ?