বাজার থেকে ফিরতেছি হটাৎ ই থমকে দাড়ালাম। আবারও সেই একই ঘটনা। কেন এমন হয় আমার সাথে জানিনা। এই একটা ঘটনা বারবার ঘটছে কেন! কি এমন দোষ করেছি আমি।

এই এক জোড়া জুতা আর কত ছিঁড়বে। আরেকটু আগে ছিঁড়লে ভালো হতো না। এখন এটা ঠিক করব কি করে!

বাজারে যাওয়ার সময় ছিড়লে না হয় বাজার থেকে সেলাই দিয়ে আনতাম। এই নিয়ে ৩য় বার ছিঁড়ল এর আগেও ২ বার ছিড়ছে। এবার মুচির কাছে গেলে হয়ত মুচি আমাকে এক জোড়া গিফট করে বলবে, “ভাই এই স্যান্ডেল আর সেলানোর জায়গা নাই আপনি আমার গুলো নিয়ে যান।”

তারপর ও মান সম্মান এবং সাথে ছিঁড়া জুতা টা হাতে নিয়ে চলে গেলাম বাজারে।
মুচি কে বলতে লাগলাম, “ভাই জুতা টা একটু…”।
মনে মনে যা ভাবছিলাম তাই ঘটল।
বলতেও পারলাম তার আগেই মুচি মুখের কথাটা টেনে নিয়ে বলে দিল “ভাই এই জুতায় আর সেলাই করার জায়গা বাকি নাই, দরকার হলে আপনি আমার জোড়া নিয়ে যান,নতুন কিনতে পারলে ফেরত দিয়েন। আর নয়তো যদি এতোই ফকিন্নি হোন তবে আর ফেরত ও দিতে হবে না।”

মুচির কথায় আমার মাথা কাঁটা গেলো জায়গার মধ্যেই।
তবু লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে বলে ফেললাম, “ভাই এইটাই লাস্ট বার আর আসব না একটু কষ্ট করে সেলাই করে দিন।”

আল্লাহর কী দয়া এই গরীবের চিন্তার অবসান ঘটল। মুচি একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা দেন দেখি কোন রকম করে দিই”।
জুতা টা এগিয়ে দিতেই সে সেলাই করতে মন দিল।
বেশীক্ষণ লাগল না কারন সেলানোর জায়গা বেশী নেই। ৫ টা টাকা এগিয়ে দিতেই মুচি বলে উঠল ” ভাই এক জুতা সেলাই করে ৩ বার টাকা নিতে মন চাইছে না,থাক ভাই লাগবে না”। ভাবলাম শালা মুচিও আজ মজা নিচ্ছে।

আমি আর বেশী কথা বাড়ালাম না, কেননা এই কয় দিন পরপর জুতা সেলাই করতে করতে ভালোই চিনে ফেলেছি ওনাকে।
অতপর তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসলাম।
আজকে জুমার দিন এই এক তাগদা। আবার অন্য দিকে শ্রাবনীর সাথে দেখা করার কথা। আছি পুরাে ঝামেলায়। টিউশনিও নেই ৩ মাস ধরে,অন্য দিকে কেবল চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েই যাচ্ছি।

বস দের মিষ্টি খাওয়ানোর টাকা টা জোগাড় করতে পারিনি তাই চাকরি টা হচ্ছে না।
জুমার সময় হয়ে আসছে তাই গোসল সেরে নিলাম। জুতার সেলফ থেকে অন্য এক জোড়া জুতা নিলাম যেটা কিনা বেড়াতে যাবার একমাত্র সম্বল।
শ্রাবণীর সাথে দেখা করতে হবে তাই বাড়ির মসজিদে না গিয়ে একটু দুরের মসজিদে যাব। এতে করে আমার গাড়িতে উঠার প্রয়োজন হবে না।

ঘর থেকে বের হতেই সামনে পড়ল চাচাত ভাই। পাশ কাটিয়ে চলে যাব কিন্তু তা হলো না ডাক দিয়ে বলতে লাগল “চাচার ঘরর ভাই কই যাওবা এত তাড়াতাড়ি”?

“ চাচার ঘরর ভাই অত্ত পাশের এলাকার মসজিদে যাব তাই তাড়াহুড়া কররাম”, আমি জবাব দিলাম।

সে বলল, “আইচ্ছা! অউ কথা,তে ই জুতা পইরা কই যাও স্যান্ডেল পইরা যাও নাইলে নামায ওর লগে লগে জুতাও শেষ অইজিব”।
আমি বল্লাম ” হর বেটা কিতা কস মুসল্লীরা কিতা জুতা চুরি করবা নি,যদিও চোর আয় মুসল্লিদের বেশে”।
ও বলল “অউটাতো কইরাম তোমারে”।
আমি বল্লাম, ” যাই চিন্তা করে লাভ নাই আমাকে আবার একটু আরেক জায়গাও যেতে হবে, তাই সেন্ডেল পরে যাবার ব্যাবস্থা নেই (এমনিতেও আমার যে স্যান্ডেল)।

অতপর কথা না বাড়িয়ে রওনা দিলাম।নামায শেষে বের হয়েই দেখি যথাস্থানে জুতা জড়ো নেই। তন্মধ্যে জুতা খুঁজতে লাগলাম কিন্তু জুতা কোথাও খুঁজে পেলাম না। বাহ্ মামু শেষ পর্যন্ত এই গরীবের পেটেই লাথি মারলি!

কি আর করার খালি পায়ে রওনা হলাম।
দুপরের প্রচন্ড রোদে পাথরের রাস্তা গরম হয়ে আছে,তবুও হাটতে হচ্ছে।
প্রায় ২০ মিনিট হাটার পরে কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌছালাম।
শ্রাবনী আমার আগেই এসে দাড়িয়ে আছে।

নীল শাড়ি আর হালকা সাজে খুব সুন্দর লাগছে ওকে। কিন্তু আমি? হাসান মার্কেটের সস্তা গেঞ্জি আর প্যান্ট আর জুতার কথা আর কিই বা বলবো। সে কথা আর মনে করতে চাই না। শালা, থুক্কু ছ্যাচড়া চোর যা কামটাই না করল।

ওর সামনে স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছি না। রাস্তা গরম তাই বার বার পা উঠাই আর নামাই। ওর নজর পায়ের দিকে পড়তেই চেহারা লাল করে ফেলল আর ধমক দিয়ে বলতে লাগল “ছ্যাছড়ামির তো একটা সীমা আছে নাকি,জুতা ছাড়া আসলে কেন”?

আমি আহাম্মকের মতো বল্লাম, “আসলে জুতা পরেই বেরিয়ে ছিলাম নামাজ শেষে আর খুঁজে পাইনি তাই আরকি”।
ও বলল, “আবার বাড়িতে গিয়ে আরেক জোড়া আনা যেতোনা বুঝি,আর রাস্তায় কি আর কোন জুতার দোকান নেই”?
আমি বল্লাম ” দেখো তুমি জানোই যে আমার এখন কোন টিউশনি নেই”।
ও রেগে গিয়ে বলল, “কেন টিউশনি এই ৩ মাসে জোগাড় হলো না”?

আমি বল্লাম ম্যাডাম, “আপনি জানেন যে আমি কোন মেয়েকে পড়াই না,আর সব টিউশনি হলো খালি মেয়েদের জন্য,তাই বাধ্য হয়ে এখনো টিউশনি ছাড়া”।

ও আবার বল্ল “কেন মেয়েদের পড়ালে সমস্যা কি”?
আমি উওর দিলাম ” হ্যাঁ কি সমস্যা, লোকের মুখে বাজে কথা শুনব নাকি,আর তার উপর তুমিও তো পরে ঝগড়া হলেই ঐ টিউশনির কথা উঠাবে,এই সব ঝামেলায় আমি নাই।”
ও বল্লো “হয়েছে আর লেকচার দিতে হবেনা,পকেটে তো মনে হয় টাকাও নেই। এসো আগে জুতার দোকানে যাই”।

আমার না করার উপায় নাই,একেতো পকেটে নাই টাকা, তার উপরে রাস্তা যে গরম। তাই বাধ্য হয়েই জুতার দোকানে গেলাম। ও আগে ঢুকল আমি পরে ঢুকব।
দেখি দরজায় বসে থাকা ছোট ছেলেটা একবার আমার পায়ের দিকে তাকায়, আবার দোকানের ন্যাম প্ল্যাট এর দিকে তাকায়।
আমি ভাবলাম কি এমন রহস্য, উপরে তাকাতেই দেখি বড় করে লেখা “ ভিক্ষুক প্রবেশ নিষেধ”।

আমার বুঝতে বাকি রইল না যে বেচারা আমাকে ভিক্ষুক ভেবেই এই কাজ করছে।
ওই দিকে শ্রাবনী জুতা পছন্দ করে ডাকতেছে আমায়।
আমি একটু ভাব নিয়ে পোলা টাকে বুঝালাম যে আমি ওই ম্যাডামের সাথে আসছি কোন ফকির নই, তাই আমায় ঢুকতে দেওয়া উচিত।

ছেলেটা নিরব সম্মতি দিল। আমি পা ঝেড়ে ভিতরে ঢুকলাম।
অতপর জুতা কিনে বেরিয়ে আসলাম।

পাশের একটা পার্কের ব্যাঞ্চিতে বসে আছি।

আমি হাত বাড়িয়ে ওর হাত টা ধরতে গিয়েও আবার গুটিয়ে নিলাম। আসলে আমাদের ভালোবাসা টা এমনই,যদিও খুব ফ্রীলি চলাফেরা করি তারপর ও আজ পর্যন্ত ওর হাত ও ধরি নি একবারের জন্য।
ও হয়ত ব্যপার টা খেয়াল করেছে।নিজ থেকেই হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা ধরল।

আর বলল, “এই কবে তোমার চাকরীটা হবে বলো,আমি এভাবে কত দিন থাকব বলো,আমাদের বিয়েটা কি হবেনা”?
আমি কেবল সান্ত্বনা দিয়ে বল্লাম, ” কি করব বলো চারিদিকে কেবল টাকা আর টাকা, টাকা ছাড়া কেউ ই চাকরি দিতে নারাজ।”
ও কেবল আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বল্লো, “আমার মন বলছে খুব তাড়াতাড়িই তোমার চাকরী হয়ে যাবে আর আমরা এক হবো”।
আমি কোন উত্তর না দিয়ে নিরব রইলাম। অতঃপর শত জমানো কথা শেষে ঐ দিনের মতো বাড়ি ফিরে আসলাম।

উঠানে এসে পরছি প্রায় এই সময়েই কিসের সাথে যেন স্যান্ডেলটা উষ্ঠা লাগল।
আর কি! যা হবার তাই হলো “আবার ও যেতে হবে মুচির কাছে।তবে এবার আর বেটা আমাকে ফকিন্নি বলে অপমান করতে পারবে না। নতুন জুতা বলে তো একটা মান ইজ্জত আছে তাই না!

যাই বেটাকে নতুন জুতো জোড়া দেখিয়ে একটু চমকে দিয়ে আসি। আর যাই হোক নতুন জুতার আলাদা একটা ভাব আছে ! হোক সেটা অন্য কেউ কিনে দিছে। তাতে কী! মুচি তো আর সেটা জানে না।