গাছের আগায় একদল আগুন তখনও খেলা করছিল। এ গাছ থেকে ও গাছে লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিল। একটা আগুন লাফিয়ে পড়ছিল আর একটা আগুনের উপর। ‘হা ডু ডু’ খেলার মতো কখনো বা একটি আগুন একসাথে অনেককে ছুঁয়ে দিতে ব্যস্ত; ভালো করে খেয়াল করলে ‘ছি বুড়ি ছাই’ খেলার মতো মনে হতো। ভূতুড়ে সন্ধ্যায় বাড়ির দেউড়িতে বসে এ দৃশ্য দেখে মজাই পাচ্ছিল নাবিল। সে কিন্তু জানেনা এগুলো কিসের আগুন। এই প্রথম এ রকম দৃশ্য দেখলো সে। তাই মজাটাকে শেয়ার করার জন্যে নাশিতকে ডাকে-
-ভাইয়া, ও ভাইয়া দেখে যাও কি মজার আগুন। কোন জবাব দেয়না নাশিত; পড়তে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।
আর তর সইলো না নাবিলের। ভাইয়াকে দেখানোর জন্যে এক দৌড়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে। ভাইয়াকে সাথে নিয়ে আসে সারপ্রাইজ দেবার জন্যে। কিন্তু কই! কোন আগুনের পাত্তাই নেই। গাছগুলো শুধু একা একা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকটা সময় বসে থেকেও কোন আগুন দেখতে পেল না সে। ভাইয়ার কাছে সে অনেকটা বোকাই বনে গেল। গল্পটা বলেও নিজেকে তৃপ্ত করতে পারল না সে।

শ্যামপুর গ্রামেই নাবিলদের দাদুবাড়ি। বেশ ছায়াঢাকা গ্রামটি। প্রায় দুই কিলোমিটার লম্বা এ গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে কালপানি নদী বয়ে গেছে। এখন নদীটি মরা খালের মতো মনে হলেও এক সময় বেশ স্রোত বইতো। কথিত আছে যে, এ নদীর একপাশে ঘোলা পানির সাদা স্রোত এবং অন্য পাশে স্বচ্ছ কালো পানির স্রোত বইতো বলে এটাকে কালাপানি নদী নামে ডাকা হতো। নদীর দুধারে নানা প্রজাতির গাছ। বিকেল বেলায় পাখির কিচির মিচির শব্দে ভীষণ মজা হলেও সন্ধ্যা নামলেই পরিবেশটা একেবারে ভৌতিক হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ব্রিজের পাশের মরা ঘাটিতে খুব ভয়। ওখানে হিন্দুদের মরা পোড়ানো হয়। মরাঘাটি নিয়েও অনেক ভূত পেতিœর ভয়ংকার গল্প প্রচলিত আছে। তাই সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফেরে সবাই।

বাড়ির সামনে পুকুর, চারদিকে গাছ আর গাছ। আম জাম লিচু কাঁঠাল জলপাই পেয়ারা আরও কত গাছ, হিসেব করাই কঠিন। ওরা রাজশাহীতে থাকলেও গ্রীস্মের ছুটিতে দাদুবাড়ি যায় নিয়মিত। দাদা দাদী চাচ্চু সবাই খুব আদর করে ওদের। নাশিতটা একটু পড়া পাগল। গ্রামের বাড়ি এলেও পড়তে বসবে। বিদ্যুত না থাকলেও লেখা পড়া নিয়ে ধানাই পানাই শুরু করবে। নাবিলের এটা মোটেও ভালো লাগে না। আজও বিদ্যুৎ নেই। তবু ভাইয়া পড়তে বসার জন্যে এ সর্বনাশটা হলো। নিজ চোখে দেখা আগুনের খেলাটা সে ভাইয়াকে দেখাতেই পারল না। তাই খুব মন খারাপ ওর। দাদুকে সে কড়া নালিশ দেবে বলে ঠিক করে রেখেছে।
গভীর রাত। দাদু বাড়ি ফিরলেন বাংলাবাজার থেকে । বাড়িতে পৌঁছতেই নাবিলের নালিশ । দাদু মুচকি হাসেন। রেগে যায় নাবিল। দাদু তখন বললেন, আমরা ওটাকে ভূতের আগুন বলি। তবে তোমাদের বিজ্ঞান বলে ‘আলেয়া’।
-তুমি কি ভূত দেখেছ দাদু?
-হ্যাঁ, কতো ভূত দেখেছি আমরা; মরাঘাটিতে তো ভূতেরা সারা রাত খেলা করে। বুড়ো মানুষের মতো কাশি দেয়. শিশুদের মতো টোয়া টোয়া কান্না করে, কখনোবা মেয়ে মানুষের মতো খিলখিল করে হাসে; নদীতে রাতের বেলা মাছ ধরতে গেলে ভূতেরা নানা ঢঙে ভয় দেখায়।
গা ছমছম করে নাবিলের। নাশিত তো এমনিতেই ভৌতিক গল্প শুনতে পারে না। ওরও বুকে দুরুদুরু শুরু হয়েছে। হিস্যু দেবার নাম করে অন্য ঘরে পালিয়ে যায় সে। নাবিল কিন্তু গল্পের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দেয় পুরোপুরি; ঠিক যেন স্বপ্নরাজ্য।
-হি হি হি, তোমার তো খুব সাহস রে নাবিল, ভূতের গল্প শুনছো; আমার সাথে যাবে?
-কোথায়?
-কোথায় মানে? আমাদের বাড়ি। খুব মজার জায়গা ওটা।
-না আমি ভুতের বাড়ি যাই না।
-কেন ভয় পাও নাকি?
-ভয় পাবো কেন? তুমি কি সন্ত্রাসী মাস্তান নাকি যে ভয় পাবো? নিজেকে সামনে নেয় নাবিল।
-না না সন্ত্রাসী মাস্তান হবো কেন? আমি তো ভূত না জ্বীন। জ্বীনদের নাম শুননি?
-শুনিনি মানে কুরআনে সুরা জ্বীন আছে না? জ্বীনের কতো গল্প শুনেছি।
-জ্বীনদের কোন খারাপ গল্প শুনেছ? জ্বীনেরা কিন্তু খুব ভালো।
-উ.! ভূতের মুখে রাম নাম! ভালো মানসী দেখানো হচ্ছে।

আমি রাসাল। গতকালই এসেছি তোমাদের পৃথিবীতে। ছুটি পেলে মাঝে মধ্যেই আসি, দুএক সপ্তাহ থেকে আবার চলে যাই। মানুষের পৃথিবীটা আমার খুব ভালো লাগে। অবশ্য আমাদের জগৎটাও কিন্তু খুব মজার। তবে তোমাদের মতোই ভালো মন্দ দুটোই আছে। তোমার কিন্তু খুব ভালো লাগবে। গল্পে গল্পে জ্বীনটা নাবিলকে তাদের বাড়ি যেতে রাজি করিয়ে ফেলে।

যে কথা সেই কাজ; নাবিলকে সাথে নিয়ে ভোঁ দৌড়। জ্বীনের পাখায় চড়ে উড়ে চলে সে। নদী পাহাড় সব কিছু আবছা আবছা মনে হয়। তারপর ঘন অন্ধাকারে ডুবে যায় সে। কিছুই দেখতে পায়না। বুকের মধ্যে ভীষণ দুরু দুরু। না জানি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। ভয় পেলেও বেশ একটু মজা আর কৌতুহলও অনুভব করছে। ডালিম কুমারের মতো জীনের পীঠে সওয়ার হওয়ার মজাই আলাদা। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চমকে ওঠে নাবিল। ওরে বাবা; সে কি আলো। চারিদিকে থৈ থৈ সোনালী আভা। সোনালী রঙের গাছ; পাখিরাও অদ্ভূত রকমের সুন্দর। নদীর মিটি মিটি স্রোতে মাছের লাফালাফি। ও মা, মাছগুলোও যে সোনার মতো। প্রথমে মনে করেছিল ইকুরিয়ামে সাজিয়ে রাখা গোল্ডেন ফিস। কিন্তু সব মাছই যে সোনার মতো ঝকঝকে। কত রকমের মাছ, ছোট বড় মাঝারী নান সাইজের। পানি আর কচুরী পানাগুলোও অদ্ভুত রকমের সুন্দর। মনে মনে বলে, ইস যদি নদীটাতে নেমে মাছগুলো ধরতে পারতাম!

হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায় তারা জীনটা। কাণ্ড দেখে সে অবাক। হাজার হাজার ছেলে মেয়ে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাকে স্বাগত জানানোর জন্যে। সবার মুখে মায়াবী হাসি। মাটিতে পা রাখতেই তারা বলে উঠলো-
-উলু উলু গুলু গুলু, সাম্পান সাম্পা। কিন্তু কিছুই বুঝেনা সে। বন্ধু জীন রাসাল ব্যাপারটা বুঝে ফেলে। তাই তাকে বলে, ওরা বলছে, শুভেচ্ছা শুভেচ্ছা; স্বাগতম স্বাগতম। তোমার আগমনে আমরা আনন্দিত। তুমি বলো- উ উলু, উ উলু; সাম্পা সাম্পা।
-উ উলু, উ উলু সাম্পা সাম্পা; হাসি মাখা মুখে উত্তর দেয় নাবিল। অমনি ফুল ছিটিয়ে মজার আবহ তৈরি করে ফেলে। কিন্তু একি; সেখানে ফুলের গন্ধের সাথে সাথে নানা রকম খাবারের ঘ্রাণও পাচ্ছে সে। ইলিশ ভাজার গন্ধটা খুব মজার মনে হচ্ছে তার কাছে। ভুনা খিচুরী ইলিশ ভাজা; ভীষণ মজার খাবার ওর। জীভে পানি এসে গেল। কিন্তু চাইতে পারছেনা, লজ্জা বলে তো একটা কথা আছে তাই না? এটা তো আর দাদুবাড়ি না যে দাদীমাকে বললেই ওকে খাইয়ে দেবে।
কল্পনায় ভাসতেই পিছনে থেকে ডাক আসে। সুমধুর কণ্ঠ। নাবিল শব্দটা ছড়া আর কিছুই বুঝতে পারল না সে। ফিরে তাকাতেই দেখে সোনালী সবুজের কারূকাজ করা জামা আর ওড়নায় ঢাকা একজন নারী। বয়সটা ওর মার মতোই হবে, তবে দেখতে খুবই সুন্দর। হাসিটা ঠিক ওর মায়ের মতোই। হাতের ইশারায় ডাকছে ওকে। যেতে ইচ্ছে করলেও খানিকটা ইতস্তত বোধ করছে সে। অমনি রাসাল বলে ওঠে- যাও, উনি যাসা, তোমার বান্ধবী মা, মানে আমার বউ। খুব ভালো মেয়ে, তোমাকে অনেক আদর দেবে।

মৃদু পায়ে মা বান্ধবীর দিয়ে এগিয়ে যায় নাবিল। তিনিও এগিয়ে এসে বুকের ভেতর জড়িয়ে নেন; ঠিক যেন মায়ের আদরটাই অনুভব করে সে। মায়ের কথা মনে হলেও ওখানকার পরিবেশটা বেশ ভালোই লাগছে ওর।

যাসার সাথে ঘরে ঢুকেও বিস্ময়ে অবাক হয় নাবিল। এতো সুন্দর সাজানো গোছানো ঘর সে কোন দিনও দেখেনি। কতো রকমের জিনিস। শুধু বেনিআসহকলা নামের সাতটা রঙই নয়। আল্লাহ হয়তো আরও সুন্দর কোন রঙের কারূকাজ শিখিয়েছেন ওদের। প্রত্যেকটা ফার্নিচারই অসাধারণ সুন্দর।

ডাইনিং টেবিলে তাকিয়ে দেখে হাজার রকমের খাবার। আপেল কমলা আর আঙ্গুর শুধু নয়, বরই পেয়ারাসহ সব ধরনের দেশী বিদেশী ফল সাজিয়ে রেখেছে টেবিলে। পাশে অবশ্য রান্না করা নানা রকমের খাবারও আছে। এমনকি ভূনা খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজাও; সব খাবার যেন ওর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। খুব লোভনীয় ব্যাপার। দাদুর কাছে সে বেহেস্তের গল্প শুনেছে। সেটা নাকি খুব মজার জায়গা। সবকিছুই খুব সুন্দর, যখন যা মন চাইবে তাই পাওয়া যাবে। তাহলে কি আমি বেহেস্তে চলে এলাম নাকি! না না বেহেস্ত হবে কেন, ওখানে যেতে হলে অনেক ভাল কাজ করতে হয়। অবশ্য আমি তো কোন খারাপ কাজ করি না; আব্বু আম্মুর কথা শুনি, নিয়মিত স্কুলে যাই, দাদু আর দাদীমার সাথে কতো মজা করি; চাচ্চুরাও তো আমাকে খুব ভালোবাসে তাই হয়তো আমাকে বেহেস্ত….
-গুনগুন করে কি বলছ নাবিল!
-না তেমন কিছু না।
-বেহেস্তের কথা ভাবছো? সেটা আরো অনেক সুন্দর; আমরাও সেখানে যাবার জন্যে ভাল কাজ করি। সেটা যে কতো মজার জায়গা বুঝানোই যাবে না।
-তোমরাও বেহেস্তে যেতে চাও?
-ওমা, তাহলে কি আমরা দোজখে যাবো? ওটা খুব কষ্টের জায়টা। কত রকমের যে আযাব!
-হয়েছে, এখন বেহেস্ত দোজখের গল্প রেখে খেয়ে নাও;

[জ্বীনের বাড়ি যাবে, মজা করবে, ভূত আসবে দুষ্টোমির হাড়ি নিয়ে, হাড়ি ফাটার বিকট শব্দে জেগে দেখবে মাকে জড়িয়ে বিছানায় শুয়ে]