ছোট ভাই রাকিবের রুমের দরজায় উঁকি দিতেই কপালে ভাঁজ পরল আকিবের। শ্যেন দৃষ্টিতে পড়ার টেবিলটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল৷
নাহ, এই বেয়াড়া ছোট ভাইটিকে নিয়ে আর পারা গেল না।
রাত ১২ টা বেজে গেছে এখনো বাসায় ফেরার নামগন্ধ নেই !
বিছানায় বসে মোজা খুলতে খুলতে রাগে গজরাতে থাকে আকিব আহসান।
ছোট বোন সাবিহা হাতে গ্লুকোজ মেশানো পানির গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে শেষ করে পানিটুকু।
: ও কখন বের হয়েছে, রে ?
: সেই সকাল ৮ টায় কলেজে যাওয়ার পর এখনো ফেরেনি৷
এই গোঁয়ারটাকে নিয়ে তো আর পারা যায় না৷ দিনদিন আরো অপোগণ্ড হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। পাজির পাজরা একটা। সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ানো, আজ এই পার্টি কাল কনসার্ট, সেলিব্রেশন।
বিড়বিড় করে ছোট ভাইকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলে রাকিব।
আকিবের যত রাগ বেশিরভাগ অপ্রকাশ্যে অগোচরে।
সামনাসামনি কখনোই ছোটভাইকে বকাবকি করেনা আকিব।
যেদিন বখাটে বন্ধুদের সাথে বাইক রাইডে গিয়ে হাতে জখম নিয়ে ফিরেছিল সেদিনও তেমন বকেনি ।
বকাবকি, গায়ে হাত তোলা আকিবের স্বভাব বিরুদ্ধ৷
অফিস থেকে এত রাতে ফেরার পরও ছোট ভাইকে বাসায় না দেখে বিষাদ আর বিরক্তির একটা রিনরিনে ঢেউ খেলা করছে আকিবের শরীর জুড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করেই চাকরিতে ঢুকতে হয় আকিবকে। প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি। সপ্তাতে ছয়দিন অফিস। অফিসের নির্দিষ্ট কোন সময় নেই৷ ছুটির দিনেও ল্যাপটপে মুখ গুঁজে থাকতে হয়। বয়স ২৪ হলেও সে এখন পুরোদস্তুর একজন অবিভাবক৷ টানাপোড়েনের সংসারে হাল ধরার জন্য জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে তার স্বাদ -আহ্লাদগুলো৷ মফস্বল থেকে ছোটভাই আর বোনটাকে মানুষ করার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসে৷ অনেক খরচ জেনেও ছোটভাইটিকে ঢাকা সিটি কলেজে আর ছোর বোন রেসিডেন্সিয়ালে ভর্তি করিয়ে দেয়৷ শঙ্করে একটা তিন রুমের ফ্লাট ভাড়া নিয়ে থাকে৷ তিনজন সদস্য নিয়ে তাদের ছোট্ট এই সংসার। অনেক সাধাসাধি করেও বাবাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসতে পারেনি সে।
তার জীবনের ধ্যানজ্ঞান এই দুই অনুজকে ঘিরেই।
ছোট বোনটি বেশ ভদ্র। মনোযোগী ছাত্রী৷ তার ক্লাস পার্ফরমেন্স অনেক ভাল। ইতোমধ্যে ভাল ফলাফলের জন্য টিচারদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে সাবিহা।
রাকিব গ্রামের স্কুল জিপিএ ফাইভ পেয়ে পাস করে৷ কিন্তু ঢাকায় আসার পরেই সঙ্গেদোষে দিনদিন বখে যেতে থাকে।
আকিবের যত দুশ্চিন্তা এই বাউণ্ডুলে ভাইটিকে নিয়ে।
মোবাইলে কয়েকবার ফোন দিয়েও ওপাশ থেকে রিসিভ করল না।
বিবশ হয়ে বিছানায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দেয় । হাত দিয়ে চোখ ঢেকে শুয়ে থাকে। আকিবের অজান্তেই মুক্তার দানার মত অশ্রুজলের চিকন একটা ধারা আঙ্গুল গলিয়ে বালিশ ভিজিয়ে দেয়।
ক্ষুধার জ্বালায় পেট চো চো করতে থাকে তার। সবকিছু কেমন অসহ্য ঠেকে।
এভাবেই ভ্যাপসা গরমে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে। কলিংবেলের শব্দ শুনে সম্বিৎ ফিরে পায়।
ঘড়ির কাটা তখন একটা ছুঁইছুঁই৷
অফিসের কাপড় ছেড়ে, ওয়াশরুমে যায় আকিব।
রাকিবের রুমে এসে দেখে সে স্মার্টফোনে পাবজি খেলায় মগ্ন। ইয়ারফোন কানে পার্টনারদের সাথে কথা বলছে।
অ্যাটাক অ্যাটাক, মারিস না মারিস না, গাড়িতে ওঠ, এনিমি আছে…
যেন বাস্তব কোন যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিক সে!
মোবাইলটা রাখ রাকিব, শান্ত গলায় বলে আকিব। এতরাতে তুই বাইরে কি করছিলি ? ফোন ধরিস নাই কেন ? প্রশ্নগুলো করে থামে সে।
: এক বন্ধুর বার্থে ডে পার্টি ছিল তাই আসতে দেরি হয়ে গেছে।
: ওয়ল, তুই ফোন ধরস নাই কেন ? তুই নিজের ইচ্ছামত যা কিছু করতে চাস ? তোর টিচার আমারে নালিশ করে, সারাদিন অফিস করে তোর এইসব উটকো ঝামেলা আমি সহ্য করতে পারবো না, বলে দিচ্ছি।
পড়ালেখা করছিস কর, না হলে পটলাপুটলি বাঁধ।
কথাগুলো শুনার পর যেন কিছুই হয়নি, এমন ভাব করে আবার মোবাইলে মগ্ন হয়ে যায় রাকিব।
অথচ সেদিন ছোট ভাইকে বকে সারারাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকে আকিব।
ফেইসবুকের ওয়াল স্ক্রল করতে করতে আনিকার একটা ছবি সামনে এসে পড়ে।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অতীতে ফিরে যায় আকিব।
মা সুন্দর করে তার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। কপালে বড় করে কাজলের টিপ দিয়ে দিচ্ছে। কাঁধে স্কুল ব্যাগ দিয়ে আলতো চুমু খাচ্ছে।
যা বাবু মনযোগ দিয়ে ক্লাস করিস। বোর্ডে যা লিখে সব খাতায় লিখিস…
কি মধুর স্মৃতি। একদিন টিফিন টাইমে করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে আনিকাকে প্রথম দেখে আকিব।
জীবনে প্রথম কোন মেয়েকে দেখে তার বুক কাঁপে। তখন ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য জেঁকে পড়াশোনায় ব্যস্ত আকিব। উঠোনে নলখাগড়ার পাটি বিছিয়ে পড়তে বসেছে। বাংলা বইয়ের পাতা উলটাতে উলটাতে একটা চিরকুট পায় সে। ইংরেজিতে লেখা —
I love you vary much
Anika Tabassum
নিচে একটা লাভ সাইন। জীবনের প্রথম প্রেমপত্র পেয়ে আত্নহারা হয়ে যায় সে। আনিকা প্রতি যে আড়চোখে মাঝেমাঝে তাকাত আকিব তা দেখে ক্লাসের বন্ধুরা প্রায়ই ক্ষেপাত তাকে। তার মনের মানুষ আনিকা৷ সেদিন রাতে পড়ার টেবিলে দুধের গ্লাস নিয়ে এসে মা বলল-
শোন আকিব; এখন তো তুই বড় হয়েছিস, মেয়েদের দেকে দূরে দূরে থাকবি কেমন৷
নাহলে পড়ালেখা সব বরবাদ হয়ে যাবে।
খবরদার মেয়েদের সাথে কথাও বলবি না।
সেই আনিকার চিঠির উত্তর দেয়া হয়নি তার। মায়ের বাধ্যগত সন্তান হয়ে চুপটি করে শুধু পড়ালেখা করে গেছে।
আজও একটা বিষয়ে তার মনে ধোঁয়াশা- সেদিন কি মা ঐ চিঠিটা পড়েছিল।
এর উত্তর অবশ্য এখন জানা সম্ভব না। কেননা মা মারা যাওয়ার ছয়বছর হতে চলল!
মোবাইলে এলার্ম দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে। না ঘুম আসে না তার। বিছানা থেকে ওঠে। রাকিবের রুমে যায় সে। উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। কি নিষ্পাপ মুখটা তার। গোঁফগুলো বেশ বড় হয়ে গেছে। মুখে এখনো দাড়ি গজায়নি। মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে নিজের ঘরে আসে আকিব। সুবহে সাদিক হয়ে আসে। ফজরের আজানে কেঁপে কেঁপে ওঠে ভোরের শান্ত পরিবেশ। ওযু করে নামাজের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরে। ধানমন্ডি লেকে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আটটায় বাসায় ফিরে। এরমধ্যে ছুটাবুয়া এসে সকালের নাস্তা তৈরি করে দিয়ে যায়। ছোটবোন সাবিহা স্কুলের সময় হয়ে আসে। গোসল করে নাস্তা খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রাওনা হয় আকিব। রাকিব তখনো ঘুমোয়। শুরু হয় নতুন দিনের নতুন যুদ্ধ।
এভাবেই গুমোট কষ্ট আর যাপিত জীবনের তাড়নায় ব্যস্ত থাকে পরিবারের অগ্রজ সন্তান আকিব। গ্রামে থাকা বাবার জন্যে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে ভুল হয় না তার। এইটুকু বয়সে যথেষ্ট পুরুষালি দেখাতে হয় তাকে। মাঝেমাঝে আনন্দ এসে তার বিষাদ নদীর পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায় অচিন সমুদ্রে । যেদিন ছোটবোন সাবিহা গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে জেএসসি পাস করল, সেদিন তার মত খুশি কেউ হয়নি। এক কলিগের কাছে টাকা ধার নিয়ে পুরো অফিস মিষ্টিমুখ করায় আকিব। দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানায়। ছুটির দিনগুলো তারা উপভোগ্য করে নিতে চায়। কোথাও ঘুরতে বা খেতে যায়।
ভাইবোন মিলে আনন্দে কাটায়। যদিও আকিব বেশির ভাগ সময় তাদের সাথে ঘুরতে যায় না।
কিন্তু সুখের মুহুর্তগুলো যেন কোন দৈত্য দানো এসে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যায়৷
একদিন এমনি ছুটির বিকেলে আকিব ঘরে বসে অফিসের মেইলগুলো চেক করছিল । কে যেন বেয়াড়াভাবে কলিংবেলে বাজাচ্ছে। এ সময় সচরাচর কেউ আসে না । কে এসেছে ছোটবোনকে দেখতে বলে আকিব।
সাবিহা তার রুমে এসে ভয়ার্ত মুখ কাঁপাকাঁপা গলায় বলে ভাইয়া পুলিশ ! বিষম খেল আকিব।
চেয়ার থেকে সটান দাঁড়িয়ে দরজার দিকে যায় আকিব।
দু’জন পুলিশ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে।
হ্যালো ! আমি এস আই সুমন হাওলাদার, ধানমন্ডি মডেল থানা।
আমি যদি ভুল করে না থাকি; তাহলে এটাই তো আকিব আহসানের বাসা ?
জি, আমি ওর বড় ভাই। কি হয়েছে, বলুন তো। ওর নামে থানায় ডায়েরি করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওকে আমাদের সাথে যেতে হবে। রাকিব মারাত্নক কিশোর গ্যাং DARKS DEVIL এর সদস্য। গতকাল রাতে ধানমন্ডি লেকে আরিয়ান নামে একটা ছেলেকে মেরে অজ্ঞান করে ফেলে যায়। আরিয়ানের বাবা একজন শিল্পপতি। মনেহয় মেয়ে ঘটিত সমস্যা। আপনি যেহেতু ওর বড় ভাই, তাহলে তো আপনার মোটামুটি জানা থাকার কথা। এর আগেও ওরা মারামারি করে থানায় এসেছিল। পরে স্থানীয় সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের এক নেতা তাদের ছুটিয়ে নিয়ে যায়।
এস আই সুমনের কথাগুলো শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না আকিব।
গলা খাকানিতে সম্বিৎ ফিরে পায় সে।
বিস্ফোরিত চোখে পুলিশের উর্দি পরা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
যাইহোক, মিস্টার আকিব আপনার ছোট ভাই নিশ্চয় বাসায় ?
জি, বাসায় আছে। রাকিব তখনো ঘুমাচ্ছিল। আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল না। পুলিশ যখন হাত ধরে রাকিবকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন ভাবলেশহীনভাবে কেবল তাকিয়ে ছিল।
পিকআপে তোলার সময় সাবিহা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে । সাবিহাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করে আকিব।
কিন্তু তার নিজের মন যে বড় অশান্ত। জীবনে কখনো থানার চৌকাঠ মাড়ায়নি নিজে। এখন সে থানায় যাবে লোকাল গার্ডিয়ান হিসেবে !
কি জবাব দিবে সে বৃদ্ধ বাবার কাছে, পুলিশের কাছে, গ্রামের আত্নীয় স্বজনদের ?