সাইকেলটাকে উপুড় করে,সিট আর হ্যান্ডেলের উপর রেখে,চাকা দুটো আকাশের দিকে রেখে,হাত দিয়ে চাকা দুটো ঘুরাতে বেশ মজা লাগে।মাঝে মাঝে খোলা উঠানে এভাবে সাইকেলকে চিৎ করে শুয়িয়ে টিউব দুটো টিপতেও ভালো লাগে।আবার গিয়ার ও চেইন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শীতের সকালে ড্রপারে করে নারকেল তেল দিলে সাইকেল বেশ পঁ-পঁ করে রাস্তায় চলে।
স্বাধীন বউয়ের কাছে, এক খাটে, এক বিছানায় শুয়ে একা-একায় মৃদু-মৃদু হাসে এবং উল্টো দিকে ঘুরে শুয়ে থাকা, বউটার ডান হাতের উপর হাত দিতেই রোজিনা,গরম কড়াইয়ে তেল দেওয়ার মত ছ্যাৎ করে জ্বলে ওঠে,আমার গা’য় হাত দিবা না বলছি।
স্বাধীন নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে, বলতে থাকে,বর্ষায় বেড়ে উঠা আমার শ্যামা ঘাস আজ বসন্তের রঙচটা বৃক্ষ…
এবার রোজিনা স্বাধীনের দিকে ঘুরে শুয়ে বলে,এই রঙচটা বৃক্ষের জন্যিই তো দুঃখের কবিতা ল্যাখি-ল্যাখি ভুলাইছিলি।আর ন্যাকামি করবা না,তুমার ওই কবিতা-টবিতায় আমি আর নেই।
স্বাধীন বলে,তাইলে যে আমারে বিয়া কইরলা।
-ওই ভুলই তো কইরিচি…
-তাইলে আর রাগ কইরো না।
-ওরে আমার খোকা-রে,মাছ উল্টিয়ি খাইত্ জানে না।
-শুধু শুধু রাগ করো
-হ-হ,কইরবু।রাগই কইরবু।
বলে,রোজিনা আবার উল্টো দিকে ঘুরে শুয়ে, নিজের শাড়ির আঁচলটা টেনে শরীরটা ডেকে রাখলো।
স্বাধীন মনে মনে কষ্ট নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আধো-ঘুম আধো চেতন অবস্থায় নাক ডাকতে শুরু করে।এরপর, মুখচাপায় ধরলে যেমন গুমরায়, ওই রকম গুমরাতে থাকে।রোজিনা একটু বিরক্ত হয়ে, বাম হাত দিয়ে স্বাধীনকে ঠেলা মারে।ঠেলা খেয়ে স্বাধীনের নাক ডাকা থেমে যায়।


স্বাধীন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে থাকে।সে ভোরে উঠে, গরু খেতে দেয়,তারপর তাড়াহুড়ো করে, নাস্তা সেরে দৌড়ায় দু’মাইল দূরে বাজারের উপরে, একটি ছোট পানবিড়ির দোকানে গিয়ে বসে।সেখানে সারাদিন থাকে এবং সন্ধ্যা ঘোর হলে বাড়িতে ফেরে।এটায় রোজিনা আর স্বাধীনের সংসারের আয়ের উৎস।
মা-বাবাহীন স্বাধীন, বড় ভাই-ভাবীর কাছে বড় হয়।দশ কিলোমিটার দূরে বাইসাইকেলে পড়তে যেতো।স্নাতক শ্রেণিতে পড়ার সময় একই শ্রেণিতে অধ্যয়ণরত রোজিনার সাথে পরিচয় হয়।রোজিনার বাবার বাড়ি জেলা শহরেই।কলেজের পাশে একতলা একটি বাড়ি।সে ছয়বোনের মধ্যে তৃতীয়। রোজিনার বাবা দবির মুন্সী কলেজ মসজিদের ঈমাম ছিল। অভাব অনটনের সংসারেই রোজিনাও বড় হয়েছে।তবে বোনগুলো বেশ সুন্দরী ও মেধাবী হওয়ায় ভালো অবস্থা সম্পূর্ণ পরিবারে তাদের বিয়ে হয়েছে।শুধু রোজিনায়, তার নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করে স্বাধীনকে।স্বাধীনও গা-গতরে খেটে সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে চেষ্টা করছে।
কলেজ জীবনে কবিতা লিখতো।ভালো কবিতা আবৃতি করতো।কলেজে কোনো অনুষ্ঠান হলে,নিজ হাতে বাঁশ টেনে,খুঁটি পুঁতে মঞ্চ সাজাতো।স্যারদের হাতের লাঠি ছিল সে।তার বিনয়ী স্বভাব সকলকে মুগ্ধ করতো।রোজিনাও ভালো গাইতে পারতো।তাদের দু’জনের সম্পর্ক হয়, কলেজের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে।
এক সময় রোজিনাকে পছন্দ করে,বিয়ের প্রস্তাব দেয় হারেজ স্যার।হারেজ সাহেবও বাংলার শিক্ষক।তিনিও ভালো কবিতা আবৃতি করতেন এবং রবিন্দ্র সংগীত গাইতেন।এত ভালো বিয়ের প্রস্তাব হাত ছাড়া করতে চাইনি দবির মুন্সী।দবির মুন্সীকে রোজিনা অনেক বার বোঝাতে চেষ্টা করেছে,আব্বা ওই স্যারের মাথায় একটা চুলও নেই,সারাক্ষণ ক্যাপ পরে থাকে।
দবির মুন্সী বলেছে,তাতে কী?- ছেলেটি প্রফেসর,এত ভালো বর!
রোজিনার কথা উপেক্ষা করে,দবির মুন্সী বিয়ের আয়োজন করেছিল।দাওয়াত দেয়,কলেজ স্টাফসহ কলেজ সংলগ্ন প্রতিবেশীদের।শিক্ষকছাত্র ছাড়াও,প্রতিবেশীদের পরিবারের অনেকেই, কলেজ মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসে। দবির মুন্সীর ঈমামতীর বেতনের টাকাগুলো এই নামাজ আদায় করতে আসা, পরিবারগুলো থেকেই আসে এবং কিছু টাকা কলেজ কতৃপক্ষ দেয়।যাহোক বিয়ের দিন ঠিকঠাক হয়ে গেলে,আয়োজন চলতে থাকে।ঠিক এই সময়ই রোজিনা তার পছন্দের ছেলে স্বাধীনের হাত ধরে চলে এসেছিল।রোজিনা চলে আসলে,দবির মুন্সী তার ঈমামতীর চাকুরিটা হারায়।
কলেজ কর্তৃপক্ষ নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয়,ঈমাম সাহেব হিসেবে আপনি সম্মানিত ব্যক্তি হলেও, আপনার মেয়ে কারো সম্মান রক্ষা করেনি।আপনিও সকলকে দাওয়াত দিয়ে, না খাওয়ায়ে, অসম্মান করেছেন।তাই অত্র কলেজ সভা আপনাকে ঈমামতি থেকে অব্যহতি দিচ্ছে।
দবিরমুন্সী মাথার টুপি খুলে,বাম হাতে নিয়ে,নিজ পাণ্জাবীর সামনের ঝুলন্ত অংশটি ডান হাত দিয়ে উঁচু করে, চোখের পানি মুছতে মুছতে মসজিদ ছেড়েছিল।


সংসারের ঘানি টানতে-টানতে প্রায় দু’বছর পেরিয়ে গেছে।মান-অভিমানের মধ্যে ওদের জীবন চলে খাঁচায় বন্দী দুটি টিয়া পাখির মত।রাত শেষে কখন ভোর হয়েছে, টের পাইনি রোজিনা।স্বাধীন নির্ঘুম থেকে, আযানের শব্দে ওঠে, গরু দুটোর চাড়িতে ঘাস দিয়ে,হাত-মুখ ধুয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে।
ভালোবাসার টানে,বিয়ের দিনই স্বাধীনের হাত ধরে,রোজিনা চলে এসেছিল।সেদিন বেশ উৎকণ্ঠা ও ভয়ে-ভয়ে কেটেছিল তাদের।বড় ভাই আর ভাবী আদর করে ঘরে তুলে নিয়েছিল।অথচ কয়েক মাস যেতে না যেতেই,সেই ভাই-ভাবীর সাথে আর মিল থাকলো না,সংসারটা পৃথক হয়ে যায়।অভাবের সংসারে, অনেক কষ্ট করে, টাকা জোগাড় করে, একটি পানবিড়ির দোকান খাড়া করে, বাজারের রাস্তার ধারে খাস জমির উপর।একটি এনজিও থেকে অনেক টাকা ঋণও নিয়েছে।
রোজিনার ঘুমন্ত মায়াবী মুখটা দেখে স্বাধীনের আবেগ, কড়াইয়ের গুড়ের মত উথলিয়ে ওঠে।তার মনের চারধারে জ্বালানোর গুড়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে,আহা জীবনের স্বাধ!- একটু ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য সারারাত ঘুমহীন কেটে গেল?- মনে মনে বলে, এত ঝগড়াইটি জানলি তোমার হাত ধইরি নি আসতাম না।ফেলে আসতাম দবির হুজুরের বাড়ি।অসহায় স্বাধীন সংসারের প্রতি দারুণ অবিশ্বাস নিয়ে, কলেজ জীবনের সেই ভাঙা সাইকেলটা হাতে করে ঠেলতে ঠেলতে দোকানের দিকে চলে যায়।
সকাল আটটা বা নয়টা বেজে গেছে।ঘুম থেকে রোজিনা চোখ মুছতে মুছতে উঠে, উঠানে আসে।গোয়াল ঘরের দিকে যায়।গরু দুটো নান্দার ভিতর মুখ ডুবিয়ে দিয়ে খাচ্ছিল।রোজিনাকে দেখে ফ্যাল-ফ্যাল চোখে ঘাড় উঁচু করে দুবার তাকায়। তারপর আবার খেতে শুরু করে।বাড়ির চারদিকে, ধীরে-ধীরে পা ফেলে হেঁটে বেড়ায়।বড় একা ও নিঃসঙ্গ লাগে নিজেকে। আবার ঘরের পিড়ির উপর যায় রোজিনা।বড়ই একা ও নিঃসঙ্গ লাগে।
মনে মনে ভাবে ভাই-ভাবীর সাথে পৃথক হওয়া ঠিক হয়নি।ঝগড়া করে,পৃথক হয়ে, বাড়ির মাঝ দিয়ে প্রাচীর দিয়ে,এক ধরনের স্থায়ী শত্রুতা করা হয়েছে।স্বাধীনের জন্য বুকের ভিতরটা টন-টন করে,ব্যাচারী না খেয়ে দোকানে চলে গেছে,কিছুই বলে যাইনি।রোজিনার বুক ফেটে কান্না বেরুতে চায়, ইচ্ছে করে কাউকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে।
পিড়ির উপর বসে,প্রাচীরের ওপাশে ভাবীর মাথাটা দেখা যাচ্ছে।ভাবীও একাএকা উঠানে মুরগীগুলোকে আয়-আয় তিঁতিঁ উচ্চারণ করে, ডেকে খেতে দিচ্ছে এবং মাঝে মাঝে ঘাড় উঁচু করে, এ বাড়ির দিকে তাকাচ্ছে।রোজিনা টুক-টুক করে পা ফেলে,প্রাচীরের পাশে যায়।ভাবীর চোখ এড়াতে পারে না,ওপার থেকে বলে,কি রানলি বউ?
ভাবীর কথা শুনে রোজিনার গলা জড়িয়ে আসে,কিছু বলতে পারে না।
ওপার থেকে আবার শব্দ হয়,ও রোজী ; কি কইরছু?
রোজিনা এবার বলে,কি কইরবু ভাবী?
ভাবী যেন বুঝতে পারে,সে বলে এখনো কিছু রানদো নাই তো?
-হ ভাবী।
-স্বাধীন দোকানে চলে গিছে?
-গিচে ভাবী।
-না খাইয়িই গেল?
রোজিনা আর কিছু বলতে পারে না।
কিছুক্ষণ পর প্রাচীরের ওপার থেকে, গামলায় ভাত-তরকারি দিয়ে, হাত উঁচু করে ভাবী বলে,নে-ধর,চারডি খাইয়ি নে।
রোজিনা বেশ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে গামলাটি নেয় এবং তার চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি চুয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।
সেদিন কী হতে কি হয়ে গিয়েছিল?-রোজিনা নিজেকেই দোষ দেয়।স্বাধীন কোনো কাজ করতো না বলে,ভাবী তাকে কোনো কিছু করতে বলেছিল-কাজ করে খেতে বলেছিল।স্বাধীনের বেকারত্ব নিয়ে ভাই-ভাবী দু’জনেই প্রায়ই বলতো।মাঝে মাঝে বড় ভাই বলতো,তোকে বইসি-বইসি খাওয়াত্ পাইরবু না,কাজ কইরি খা।একই কথা শুনতে-শুনতে একদিন রোজিনা,স্বাধীনের মুখোমুখি হয়ে বলেছিল,লজ্জা করে না,পুরুষ মানুষ অপরের ঘাড়ে বইসি-বইসি খাও।খাইত দিত্ পারবা-না,তে বিয়ি কইরছিলি কেন?
ভাবী রোজিনাকে বলেছিল,তুই আবার কথা বুলছিস ক্যান্?-ঘরের বউ,বউয়ের মত থাকবি।
ভাবীর কথায় রোজিনার মাথা বিগড়ে গিয়েছিল।বিষয়টি যেন, রোজিনাকে বেশ আঘাত করেছিল।সেও রেগে গিয়ে বলেছিল,আমি ঘরের বউ আর তুমি বুঝি পরের বউ।
এ কথা ভাবীর কানে যাওয়ার সাথে-সাথে আরো উচ্চবাচ্য ও গ্রাম্যভাষায় অশ্লীল গালি-গালাজ চলতে থাকে দিনব্যাপী।এমন কী, দুই ভাই-ই লাঠি নিয়ে একে অপরকে মারতে যায়।প্রতিবেশীরা এসে কোনো রকমে মারামারি ও ঝগড়া থামালেও,শেষমেষ সংসারে দুই ভাই, দুই দিকে ভাগ হয়ে যায়।এরপর উঠানের মাঝখান দিয়ে প্রাচীর দিয়ে দেয় বড় ভাই।
আজ ভাবীর হাতের ভাতের গামলাটা নিয়ে,নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে।ভাইভাবী তো সেদিন ঠিকই বলেছিল।তাদের রক্ত ঘামানো টাকায় তো স্বাধীন লেখাপড়া করতো,তারায় তো স্বাধীনকে বড় হবার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।অথচ সমান্য ভুলে, ভাইভাবী পর হয়ে গেল? রোজিনার মনে হচ্ছে,এখন যদি কেউ উঠানের মাঝের প্রাচীরটা ভেঙে দিতো,তবে ভাবীকে জড়িয়ে ধরে, সে শুধুই কাঁদতো,বলতো,ভাবী আমিই ভুল করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দেও।
ভাতের গামলাটা পিড়ির উপর রেখে যখন দক্ষিণে তাকালো,তখন আবার গরু দুটোর ডাগর চোখে, চোখ পড়লো। স্বাধীন কিছু না খেয়ে দোকানে চলে গেছে।ওর জন্য মনটা বড়ই খারাপ লাগছে।কি যেন মনে হলো রোজিনার।হঠাৎ ভাতের গামলাটা হাতে নিয়ে গরুর গোয়ালে গিয়ে, ভাতগুলো নান্দার ভিতর ঢেলে দেয়।গরু দুটোও ভাতগুলো না খেয়ে, রোজিনার দিকে তাকিয়ে,নাকে ফুস-ফুস শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে।রোজিনা ওখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে,দ্রুত ঘরের ভিতর গিয়ে,চৌকিতে শুয়ে পড়ে,মেয়েলি সুরে হুঁহুঁ করে কাঁদতে থাকে।তার নিজের মাথাটায় নিজেই হাত দিয়ে আঘাত করতে থাকে,মাথাডা ক্যান্ যে গরম হয়?


স্বাধীন সারাদিনই চা’র দোকানে থাকে।দোকানের পাশের বাড়ি থেকে সীমা নামের মেয়েটা, তার বাবার জন্য, প্রতিদিন এক ফ্লাক্স গরম কপি নিয়ে যায়।সীমা এসে বলে,স্বাধীন ভাই আপনার তৈরি কপি ছাড়া আব্বা খেতে চায় না।স্বাধীন সীমার কথা শুনে, মনে মনে তৃপ্তি পায়,তার তৈরি কপির সুনাম বাজারের অনেকেই করে।তবে সীমার মুখের প্রশংসা তার কাছে অন্যরকম রোমাণ্টিক লাগে।সে চায় সীমা প্রতিদিনই প্রশংসা করুক,সেভাবেই মনোযোগ দিয়ে কপি তৈরি করে স্বাধীন।সীমাও চেয়ে থাকে স্বাধীনের দিকে।বার বার ছুতো-নাতা নিয়ে দৌড়ে আসে স্বাধীনের কাছে।
স্বাধীন মৃদু হেসে বলে,তাই।
সীমা বলে, ‘হ’ভাই।
স্বাধীন আগ্রহ নিয়ে বলে, চাচার শরীর ভালো আছে তো?
-ঘাড় নেড়ে হা সূচক সম্মতি জানিয়ে সীমা বলে,আব্বা যে তুমাকে দেইখবি বলছিল?
স্বাধীন চা’র কাপে, কেটলি থেকে গরম পানি কাপে ঢালতে ঢালতে সীমার দিকে তাকিয়ে বলে,যাবোনি,কি খাতি দিবানি?
সীমা বলে,দিবুনি-দিবুনি আলু ভর্তা আর ডাল রাইন্দিছি।
স্বাধীন বলে,তাইলে তো যাতিই হবেনি।
সীমা বলে,সত্যি চলো।আজ তো দোকানে চা’খাওয়া লোক নিকো।
স্বাধীন বলে,আচ্ছা যাবুনি।
সীমা চা’র ফ্লাক্সটা হাতে নিয়ে বলে,আসবা কিন্তু।আমি আব্বারে চা দিয়ি অপেক্ষা করবুনি।
সীমার বাবা আবেদ শেখ,পোস্ট অফিসে পিওনের চাকুরি করতো।বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করতো।তার প্রথম স্ত্রীর তিন ছেলে।তারা সবাই বিভিন্ন অফিসে চতুর্থ শ্রেণির চাকুরি করে।থাকে তাদের নিজের বাড়ি আশাননগরে।পাশাপাশি তিন ভাইয়ের বাড়ি রয়েছে।এ বাড়ির জমি, আবেদ শেখের পৈত্রিক জমি।ছেলেরা সে জমিতেই বাড়ি করে, বসবাস করে।আবেদ শেখ চিঠি বিলি করতে করতে বিধবা রহিমার সাথে পরিচয় হয়েছিল।সেই সুত্র ধরে আবেদ শেখ এক সময় রহিমাকে বিয়ে করে।রহিমার পূর্ব স্বামীসুত্রে পাওয়া জমিতে বাড়ি তৈরি করে, সে বাড়িতেই তারা থাকে।রহিমার সাথে বিয়ে হওয়ার এক বছরের মধ্যে আবেদ শেখের আগের স্ত্রী মারা যায়।ছেলেরা যার-যার মত সংসার শুরু করলে,আবেদ শেখ বাজারের উপর, পোস্ট অফিসের পাশে, রহিমার কাছেই থাকা শুরু করে।শেষ বয়সে এসে রহিমার গর্ভে জন্ম হয় সীমার ।এই সীমার বয়স এখন, ষোল-সতের বছর হবে।
বর্তমানে আবেদ শেখের স্ট্রোকের পর থেকে, ডান পা অচল হয়ে যায়। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনো রকমে কষ্ট করে, অল্পই হাঁটতে পারে। পেনশনের যে টাকা পায়, তাই দিয়ে সংসার চালায়।সীমা বেশ চঞ্চলা মেয়ে।সকাল হলেই সে তার বাবার জন্য, হয় নিজে খাবার তৈরি করে অথবা বাজার থেকে হালকা খেচুড়িভাত কিনে নিয়ে যায়।তার সাথে নিয়ে যায়, স্বাধীনের তৈরি কপি।প্রতিদিনের এই রুটিনের কারণে সীমার সাথে স্বাধীনের মিষ্টি-কড়া সম্পর্কও হয়ে যায়।মাঝে মাঝে দু’জন আবেগঘন ঝগড়াও করে।
আজ স্বাধীন সীমাদের বাড়ি যেতে রাজি হওয়াতে সীমা খুব খুশি। রহিমা খাতুনেরও অনেকটায় বয়স হয়ে গেছে।তার বয়স আবেদ শেখের চেয়ে দু’এক বছরের বড়ই হবে।কারণ,তার আগের স্বামী সমীর মিয়া যখন মুক্তিযুদ্ধে যায় তখনই রহিমা বিবাহিত মেয়ে।যুদ্ধ শেষ না হতেই খবর আসে সমীর মিয়া যুদ্ধে মারা গেছে।সেই থেকে রহিমা বিধবা হয়ে জীবন-যাপন করছিল।এরপর আবেদ শেখের সাথে বিয়ে হয়।
তার মানে, রহিমার বয়স যুদ্ধের সময় চৌদ্দ-পনের হবে।যখন আবেদ শেখ চতুর্থ শ্রেণি পাশ করে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেছিল, তখন যুদ্ধ বেধে গিয়েছিল।দেশ স্বাধীন হলে,দূর্ভিক্ষ আর অভাবের কারণে আবেদ শেখ স্কুলে ভর্তি না হয়ে,এই পোস্ট অফিসে, বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা চিঠি, বাড়ি-বাড়ি দিয়ে বেড়াতো,বিনিময়ে পোস্ট মাস্টার কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিতো।এভাবেই আবেদ শেখ পোস্ট অফিসের পিওনের চাকুরিটা পেয়ে গিয়েছিল।
তাই হিসেব করলে আবেদ শেখ আর রহিমার বয়সের ফারাক খুব বেশি হবে না।আবেদ শেখ অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলেও, সেবা-যত্ন শারীরিক কারণে,রহিমা খুব একটা করতে পারে না।যেটুকু সেবা করা দরকার, সেটুকু মেয়ে সীমায় করে।


দিন যায় রাত আসে।অপেক্ষায় থাকে রোজিনা।বাড়ি ফেরে না স্বাধীন।একাএকা ঘরে ঘুমাতে পারে না।অন্ধকার, আরো অন্ধকার হয়।সময় গেলে সকালও হয়।কিন্তু স্বাধীন আসে না,আসে এনজিও কর্মী ও তাদের ম্যানেজার।ঋণ নিয়ে দোকানে বিভিন্ন ধরনের মাল কিনেছে।সাপ্তাহিক কিস্তি দিতে হয়।রোজিনা এ ঋণের কিছুই জানে না।শুধু জানে,স্বাধীনের চা’র দোকান ভালো চলছে।বিভিন্ন ধরনের খুচরা বিড়ি-সিগারেটও দোকানে বিক্রি হচ্ছে।ম্যানেজার এসে বলে,তাদের ঋণের পঞ্চাশ হাজার টাকার মধ্যে মাত্র তিন বার কিস্তি দেওয়া হয়েছে।বাকী পড়েছে চার সপ্তাহ।ঋণের কিস্তি না দিলে,পুলিশ এনে, গরু খুলে নিয়ে যাবে।গরু দুটোই ছিল, তাদের ভবিষ্যৎ। বছর শেষে বিক্রি করলে অনেক টাকা হবে, স্বচ্ছলতা ফিরে আসবে।অথচ আজ সে গরুই এনজিও কর্মীরা এসে, গলার দড়ি ধরে খুলে নিয়ে যাচ্ছে।গরু দুটো যেতে চাচ্ছে না।তবু দড়ি ধরে একজন টানছে,আর পিছনে লাঠি দিয়ে দু’জন ঠেলছে, আবার পিঠে আঘাতও করছে।রোজিনা যেন বোবা হয়ে গেছে,কিছুই বলতে পারছে না।তার বুকের ভিতর ভাতের হাড়ির টগ-বগানি ফোটা পানির মত ফুড়-ফুড় শব্দ করে ফুপড়িয়ে উঠছে। দুপুর গড়িয়ে যায়।একদিকে স্বাধীনের চিন্তা,অপরদিকে গরুর মায়া।সে কিছুই ভাবতে পারছে না। চিন্তা হচ্ছে,খাওয়া নেই দাওয়া নেই ব্যাচারী কোথায় গেল,কি করছে?নিজের প্রতি বড়ই রাগ হয়,ভাই,-ভাবী পর হয়েছে,স্বামীটাকে ভালোবাসা দিয়ে ধরে রাখতে পারছে না,বাবা-মাকে পর করে দিয়েছে।-এ জীবন, জীবন নয়।হতভাগা জীবনের কোনো মূল্য নেই,ব্যর্থ জীবনের কোনো গুরুত্ব নেই।পদে-পদে সে ভুল করে চলেছে।ভাবতে-ভাবতে হাঁটতে থাকে, বাজারের দিকে,সে দোকানে গিয়ে পৌছায়।দোকানের পাল্লা বন্ধ।তাহলে স্বাধীন দোকানও খোলেনি।বেশ খানিক দাঁড়িয়ে থাকে,দোকানের দিকে তাকিয়ে।কত স্বপ্ন দেখেছিল, এই দোকানকে ঘিরে।সে দোকানই আজ বন্ধ।চোখের পানি ঠেকাতে পারে না।আঁচল দিয়ে বার বার মুছতে থাকে।মরুভুমি হয়ে যায় তার জীবন।কাছে এসে দাঁড়ায়, চা’র দোকানের পাশের দোকানদার।সে বলে, স্বাধীন ভাই পালিয়েছে,পুলিশ এসেছিল।হাত দিয়ে দেখিয়ে বলে,ওই বাড়ির সীমাকে নিয়ে পালিয়েছে।রোজিনা যেন কিছুই শুনতে পারছে না।সে পলকহীন তাকিয়ে থাকে দোকানদার ছেলেটির দিকে।চোখে পানি জমে আছে,যেদিকেই তাকাচ্ছে,চারদিকেই ঝাপসা, ভাসমান মেঘের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।