‘টোনলে স্যাপ’ একাধারে লেক, নদী আর সমুদ্র। এমন আর আছে কিনা জানিনা। জীবনে কিছু কিছু অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। যা জানার প্রয়োজন নেই তা আমরা জানি, আর যা জানা প্রয়োজন তা জানতে পারিনা। পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক কিছু আমি জানি, যা না জানলেও চলত। যতটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সেসব জায়গার/ জিনিসের প্রচার হয় সেসবের গুরুত্ব বাস্তবিক ততটা নয়। অথচ টোনলে স্যাপের মত একাধারে সুন্দর এবং দেশের জন্য প্রয়োজনীয় লেকের কথা আমি জানিনা। কম্বোডিয়ায় এসে একথাটাই ভেবে বিস্মিত হচ্ছিলাম, দুঃখ হচ্ছিল আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দেখে।
কম্বোডিয়ার পর্যটন শহর ‘সিয়াম রেপে’ এসেছি। সরকারি কাজ আর বেড়াবার প্রধান প্রধান জায়গাগুলো দেখা শেষ হল। অবশ্য দেখার স্থান নির্ধারিত হয়েছে আয়োজকদের পছন্দ অনুযায়ী। ওরা যেসব জায়গা দেখানো প্রয়োজন মনে করেছে দেখিয়েছে। আর একথাও তো ঠিক সময়ের স্বল্পতার কারণে ইচ্ছে থাকলেও অনেক কিছু দেখানো যায়না।
সেদিন আমাদের অবসর। পরদিন চলে যাব। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ। কি করব ভাবছিলাম। এর মধ্যে খবর এল আমাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে, কোন একটা লেক দেখাতে। হাতে সময় অল্প। দশ মিনিট পর গাড়ি ছাড়বে হোটেলের লবি থেকে। আমার ভিলাটা হোটেল লবি থেকে বেশ দূরে। আরেকটা ভিলায় খবির রয়েছে। ওর সাথে যোগাযোগ করে, তৈরি হয়ে আসামাত্র নাকের সামনে দিয়ে গাড়িটা বেরিয়ে গেল। ভীষণ মন খারাপ হল। কাউকে তো চিনিও না যে কোন একটা ব্যবস্থা করতে বলব। আমি রিসেপশনের লোকদের একটা ব্যবস্থা করতে বললাম। ওরা অপারগতা জানালো। আমরা রিসেপশনের বসে আছি। এই সময় টিম লিডার ই আর ডি সচিব আবুল কালাম আজাদ স্যার এলেন। উনি এখান থেকে সরাসরি ইন্দানেশিয়ার ‘বালি’ যাচ্ছেন বলে লেক দেখতে যাননি। সব শুনে হাসতে হাসতে বললেন, ‘সবাই চলে গেল, দুই বাঙাল পড়ে রইল’। এবার সত্যিই লজ্জা পেলাম। আমি আবারও রিসেপশনকে অনুরোধ করলে ওরা একই কথা বলল, অপারগ। কিন্তু আমি কিছুতেই শুনলাম না। বললাম অর্গানাইজারদের কারো সাথে যোগাযোগ করতে। আমাকে নাছোড় দেখে অবশেষে ওরা একজনকে ফোন করে রিসিভারটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। আমি করুণভাবে ভদ্রলোককে অনুরোধ করাতে উনি আমাদের লবিতে অপেক্ষা করতে বললেন। একটা গাড়ি এসে আমাদের তুলে নিয়ে যাবে। বসে আছি তো আছি, প্রতিটি মুহূর্ত মনে হচ্ছে একটা করে যুগ। অবশেষে একটা কার এল। যাক বাবা এ বরং ভাল হল, ওরা গেছে মাইক্রোতে আমরা যাচ্ছি কারে। কারের পেছনে দুজন মহিলা বসা। একজন কম্বোডিয়ান অন্যজন কানাডিয়ান। আমাদের দেখে কম্বোডিয়ান মেয়েটা উঠে সামনের সিটে গিয়ে বসল। কারে ওঠার পর পরিচয় হল। কানাডিয়ান সোনালি চুলের মেয়ের নাম ‘ক্যারোলাইন’ আর মোটাসোটা হাসিখুশি কম্বোডিয়ানের নাম ‘চক্র।’ ওরা দুজনই ব্যাচিলর। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহর ছাড়িয়ে গ্রামের রাস্তায় পড়লাম। মনে হল আমরা চলেছি চিরচেনা বাংলাদেশের গ্রামের রাস্তায়। গাছে গাছে আমের মুকুল ধরেছে। রং বেরংএর কাপড় শুকাচ্ছে দড়িতে, খড় গাদা করে রাখা হয়েছে। আমি গরুর গাড়ি দেখে উল্লসিত হয়ে উঠলাম। আমার দেশ থেকে গরুর গাড়ি বিলুপ্ত হতে চলেছে, এখানে সদর্পে চলেছে গরুর গাড়ি।
গল্প করে চলেছি আমিরা। জানতে চাইলাম, কম্বোডিয়ার রাজার নাম। চক্র বলল
:হিজ এক্সিলেন্সিজ নেম ইজ ‘সিহাকমনি’। হি ইজ স্টিল ব্যাচিলর।
হাসতে হাসতে বললাম
:আর ইউ ইন্টারেসডেট?
:ইন্টারেসটেড, বাট নো হোপ।
খুব হাসাহাসি হল। এরপর আমি জানতে চাইলাম কম্বোডিয়ার বিয়ের নিয়ম কানুনের কথা। চক্র বলল, নভেম্বর থেকে মে কম্বোডিয়ার বিয়ের সিজন। দুই দিনে বিয়ে সম্পন্ন হয়। মং বাড়িতে এসে বিয়ে পড়ায়। প্রথমে ছেলের বাবা মা ছেলে ও মেয়ের চুূল কেটে দেয়। এরপর মেয়ের বাবা মা মেয়ে ও ছেলের মাথার চুল কেটে দেয়। এরপর ছেলে নারকেল কলা আম থেকে শুরু করে সব ধরনের ফল অনেক মানুষের হাতে দিয়ে মেয়ের বাড়িতে পাঠায়। এরপর মংক ছেলে মেয়ের হাত বেধে দেয়। তারপর তারা একত্রে মংকএর সামনে প্রার্থনা করে। এরপর ছেলে মেয়ের বাবা ও প্রতিবেশিরা মোমাবাতি জ্বালিয়ে পাত্র- পাত্রিকে প্রদক্ষিণ করে। তারপর ওরা হাত ধরে ঘরে যায়। বিয়ের পার্টি দুদিন ধরে চলে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নাইট পার্টি। নাইট পার্টির সব খরচ পাত্রকে বহন করতে হয়। মধ্য পর্যায়ের অবস্থাসম্পন্ন পুরুষ নাইট পার্টিতে কমপক্ষে একহাজার লোক দাওয়াত করে। তবে অতিথিরা সবাই ডলার বা রিয়েল গিফট দেয়। সে গিফট কমপক্ষে ১৫ ডলার বা সমমূল্যের বিয়েল হয়। কম্বোডিয়ান বিয়েতে ছেলে মেয়েকে যৌতুক দেয়। এপ্রিল মাসের ১৪, ১৫, ১৬ তারিখ নববর্ষ। এ সময় বিয়ে হয়না।
কম্বোডিয়ার কোথাও কোথাও এখনও যৌথ পরিবার প্রথা চালু রয়েছে। বাবা- মা বিয়ের পাঁচ ছয় বছর পর ছেলেকে সেপারেট করে দেয়। তবে বাবা-মার সাথে সম্পর্ক ভাল থাকে। অনেক ছেলে বাবা- মাকে নিয়মিত টাকা পাঠায়।
লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না। আামাদের সাথেতো একজন পুরুষ রয়েছে। এই সুযোগে তার সম্পর্কেও তো কিছু জেনে নেয়া যায়। ড্রাইভারের কাছে জানতে চাইলাম ওর পরিবারের কথা। ড্রাইভারের নাম সিয়াম। একটুও দ্বিধা না করে ও বলতে শুরু করল। ও হাসতে হাসতে বলল, এটা একটা চাইনিজ নাম। ওর চাচা নামটা রেখেছে। সিয়াম পরিবারের বড় ছেলে। ৫ ভাই ওরা, বোন নেই। ৮ গ্রেড পর্যন্ত পড়েছে। চাকরির খোঁজে থাইল্যান্ডে যায়। সেখানে ইলিকলে চাকরি করত। পরিবারের জন্য কিছু কিছু টাকাও পাঠাতো। কিন্তু সেখানে ওর থাকাটা বৈধ ছিলনা। তাই কম্বোডিয়ায় ফিরে আসে। বাবা মায়ের সাথে চাষবাসে মন দেয়। পরে চাচার আমন্ত্রণে মটর বাইক চালাতে আসে। এরপর সে ইংরেজি ও ড্রাইভিং শেখে। লাইসেন্স পাওয়ার পর দুটো কম্পানিতে কাজ করেছে। এটা তার তিন নম্বর চাকরি। বিয়ে করেছে সিয়াম। বিয়েতে স্ত্রীকে ২০০০ ডলার যৌতুক দিয়েছে। ওর সংসারে দুই সন্তান। আরও একজন আসি আসি করছে। যে গ্রামে ও বাস করে সেটার নাম ‘ওয়ানটেচা।’ আজকাল খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কোন কোন মাসে ৪০০-৪৫০ ডলার খরচ হয়ে যায়। স্ত্রী কিছু কিছু সঞ্চয় করে। নিজের বাড়ি নেই। মাদার ইন লএর সাথে থাকে। তবে মাদার ইন ল তাদের কিছু দেবার পরিকল্পনা করেছে। ৫ মিটার দৈর্র্ঘ আর ২ মিটার প্রশস্ত একটা জমি নেয়ার ইচ্ছে তার আছে মাদার ইন লএর সহায়তায়। সিয়ামের স্বপ্নের কথা শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, সারা পৃথিবীব্যাপী সাধারণ মানুষের স্বপ্নের রুপরেখা মোটামুটি এক। কত ছোট এই স্বপ্ন অথচ এটুকু মেটানোও কত কঠিন। ভাবনায় তলিয়ে গেছিলাম। কোন একটা ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি থেমেছিল। গাড়ির জানালায় এসে দাঁড়ালো একটা বাচ্চা ছেলে। বাঁশ দিয়ে বানানো দশটা চুড়ি আর একটা পাখা ওর হাতে। ও চুড়িটা দেখিয়ে বলল
:অনলি ওয়ান ডলার ফর টেন ব্রেসলেট ম্যাডাম।
আমি হাসলাম
:হোয়াটস ইওর নেম?
:রকসা।
বুঝলাম ওর নাম রক্ষা। ও জানালো ওর মা ইংরেজি জানে না। বাবা অল্প জানে। প্রয়োজন নেই তবুও ওর হাত থেকে চুড়িগুলো কিনলাম।
গাড়ি চলতে শুরু করল। গল্প চলছে। ওরা বাংলাদেশের কথা জানতে চাইল। বললাম আমাদের মানুষ, প্রকৃতি পরিবেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে। এর মাঝে গাড়ি থামল। ক্যারোলাইন বলল।
:নাউ উই উইল স্টার্ট ফর টোনলে স্যাপ।
একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় উঠলাম আমরা। নৌকা চলতে লাগল একটা নালার মধ্য দিয়ে। নালা জুড়ে থক থক করছে কাদা। কাদা ছিটে ছিটে এসে গায়ে লাগছে, মনে মনে বিরক্ত। একি দেখাতে নিয়ে এসেছে আমাদের! একটু একটু করে নালাটা প্রসারিত হচ্ছে। নালার দুধারে সবুজ বনানীর বিন্তার। নালার দুধারে জাল হাতে মাছ ধরছে জেলেরা। পাশে টুকরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ওদের সন্তানেরা। অতি চেনা চিত্র। জেলেদের দেখায় মগ্ন ছিলাম। হঠাৎ যেন নৌকাটা ডিগবাজি খেয়ে এক বিশাল পানির রাজ্যে প্রবেশ করল। চারদিকে পানি আর পানি। যতদূর চোখ যায় ডাঙার দেখা নেই। চক্র বলল
:ইটস টোনলে স্যাপ।
টোনলে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় বিশুদ্ধ পানির নদী। এটাকে বলা হয় গ্রেটলেক। টোনলে কম্বোডিয়ার পরিবেশ প্রতিবেশ আর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। এই লেককে ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৯৭ সালে ‘বায়োস্ফেয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। টোনলে অন্যান্য নদী থেকে আলাদা এর গতি পরিবর্তনের কারণে। এই লেক বছরে দুইবার গতি পরিবর্তন করে। আর মওসুমের পরিবর্তনের সাথে সাথে এ লেকের অংশ স্ফীত বা ক্ষীণ হয়। নভেম্বর থেকে মে কম্বোডিয়ার শুষ্ক মওসুম। এ সময় টোনলে স্যাপের পানি নমপেনে মেকং নদীতে চলে যায়। জুন মাসে প্রবল বৃষ্টিপাতের সাথে সাথে টোনলে আবার ফুলে ফেঁপে ওঠে। টোনলে স্যাপ লেক টোনলে স্যাপ নদী দিয়ে সমুদ্রের সাথে যুক্ত। টোনলে শব্দটা এসেছে গ্রীক শব্দ ‘থ্যালাসা’ থেকে যার অর্থ সমুদ্র। টোনলে সমুদ্রের সাথেই তুলনীয়। শুধু ব্যতিক্রম এটা বদ্ধ এবং বিশুদ্ধ পানি ধারন করে।
আমি টোনলেকে দেখে বিমোহিত। কাছে এই লেক সম্পর্কে আরও জানতে চাইলাম। আর যা জানলাম তাতে বুঝলাম কম্বোডিয়ার অর্থনীতি মূলত এই টোনলের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। টোনলে স্যাপ এর মাছ এ এলাকার মানুষের উপার্জনের প্রধান হাতিয়ার। এই মাছ শুধু আভ্যন্তরীণ চাহিদাই মেটায় না রফতানিও হয়। আর টোনলের তীরবর্তী চাষের জমি এ লেকের পানি পেয়ে ফসলে উপচে পড়ে। সে ফসল খাওয়ার পরও উদ্বৃত্ত হয়। আর সেটা জমা হয় অর্থনীতির খাতায়। তাই টোনলেকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয় নানা উৎসব। মৎস্যজীবীরা তাদের জীবন আর জীবিকাকে নিবিড়ভাবে বেধে ফেলেছে টোনলের সাথে। এইসব উৎসবের অন্যতম প্রধান হচ্ছে ‘ফেস্টিভ্যাল অব সেভেন হেডেড স্কেক।’ (‘সাত মাথা সাপের উৎসব)।’ এই উৎসবকে ‘ওয়াটার ও মুন ফেস্টিভ্যালও বলা হয়।’ এই ফেস্টিভ্যাল উদযাপনের মধ্য দিয়ে টোনলে স্যাপে মাছ ধরার মওসুম শুরু হয়। পূর্ণচন্দ্রের শেষ দিন এই উৎসব শুরু হয়ে তিনদিন চলে। যেহেতু মওসুমের পরিবর্তনের সাথে টোনলের গতি পরিবর্তন সম্পর্কিত সে কারণে পূর্ণচন্দ্রের সাথে মিল রেখে সব সময় উৎসব উদযাপন করা সম্ভব হয়না। এই উৎসবে ‘ক্যানু’ (এক ধরনের কাঠের নৌকা) রেসের আয়োজন করা হয় যাতে ৩৭৫টা দল অংশ নেয়। টোনলে তীরবর্তী গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করে ক্যানু রেসে জয় সমগ্র গ্রামের জন্য সৌভাগ্য বহন করে আনে। যে গ্রাম বিজয়ী হবে তারা বেশি মাছ ধরবে এটা গ্রামবাসীদের বদ্ধমূল বিশ্বাস। এই উৎসব একজন বুদ্ধেও (নাগার) নামে উৎসর্গ করা হয়। নাগার কন্যা একজন ইন্ডিয়ার যুবরাজকে বিয়ে করেছিল যার উদ্দেশ্য ছিল কম্বোডিয়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা। পুরাণ অনুযায়ী তাকে দাহ করে তার দেহভস্ম নদীতে ফেলার সময় একটা দাঁত নদীতে পড়ে সাত মাথাওয়ালা সাপের রাজ্যে চলে যায়। উৎসব উপলক্ষে গ্রামবাসীরা নদী তীরবর্তী প্যাডোগার পাশে বসে শতবছরের পুরোনো ক্যাানুগুলোকে মেরামত করে আর যে ক্যানু মেরামতের অযোগ্য সেগুলোর জায়গায় নতুন ক্যানু তৈরি করে। ক্যানু ‘কোটিগাছের’ একটি একক খন্ড দিয়ে বানানো হয়। কোটি গাছ ক্যানু তৈরির জন্য খুবই উপযোগী কারণ এ গাছ সহজে পচে না বা নষ্ট হয়না। প্রতিটি ক্যানুতে নানান ধরনের ছবি ও নকশা আঁকা ছাড়াও দুটো চোখ আঁকা থাকে।
এটা গডের প্রতীক এবং গ্রামবাসীরা যাকে মনে করে একজন গ্রামীণ বালিকার আত্মা। বুদ্ধিজমের আগে সত্যিকারের চোখ ক্যানুতে পেরেক দিয়ে আটকে দেয়া হত। এটা সেই পুরোনো কুসংষ্কারের অনুসরণ। সমস্ত আয়োজন শেষ করে ক্রুরা তিনটি পবিত্র চীৎকার দিয়ে ক্যানুগুলো নদীর পানিতে নামিয়ে দিয়ে পূুর্ণচন্দ্রের সময় তারা রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কোন কোন ক্রু বেশ কয়েকঘন্টা ক্যানু চালায় আবার কোনকোন ক্রু বেশ অনেকদিন ধরে চালায়। ক্যানুর ক্রু হিসেবে নির্বাচিত হওয়া একজনের জন্য সর্বোচ্চ সম্মান বলে গণ্য করা হয়। সমন্বয় করে ক্যানু চালানোর জন্য ক্রুদের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। শুধুমাত্র সেরা ক্রুরাই রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। দুদিন রেসের পর সব ক্যানু একত্রিত হয়ে নাগাকে উৎসাহিত করে তার মুখ দিয়ে টোনলের পানিকে সমুদ্রের দিকে ছুঁড়ে ফেলতে। এ সময় অসংখ্য আতশবাজি আকাশ সমুদ্র আর রাজার বাড়ি আলোকিত করে। এই সময় ক্রুরা প্রার্থনা করে বলে, ‘ঐতিহাসিক প্রভু সাপ তুমি জলের গভীরে চলে যাও আর তোমার শক্তি সূর্য দেবতার হাতে ছেড়ে দাও।’ এই উৎসবের শেষ বৃষ্টির মওসুমের শেষ হওয়ারও ইঙ্গিত দেয়।
টোনলে যখন প্লাবিত হয় তখন চারধারের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে মাছ উৎপাদনের একটা উৎকৃষ্ট ক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রজননের প্রয়োজনে এই সময় মাছ ধরা নিষেধ তাই এসময় জেলেরা মাছ ধরেনা। বৃষ্টির মওসুমের শেষে যখন পানি নেমে যায় তখন জেলেরা মাছ ধরার অনুমতি পায়, শুরু হয় মাছ ধরা। জেলেরা নদীগর্ভ থেকে তাদের ভেসে যাওয়া বাড়িঘর উদ্ধার করে। শুরু করে মাছধরা।
জেলেসহ বেশিরভাগ মৎস্যজীবি ভিয়েতনামিদের বংশোদ্ভুত। মাছ ধরার পর প্রথমত তারা স্থানীয় বাজারে মাছ সাপ্লাই দেয়। আমি মাছধরা প্রসঙ্গে শুনতে শুনতে চক্রর কাছে একজন স্থানীয় জেলের সাথে কথা বলার ইচ্ছে ব্যক্ত করলাম। আমরা টোনলেতে ভাসমান একটা রেস্টুরেন্টে নামলাম। কফি আর স্ক্যাকস খাওয়ার সময় ক্যারোলিন ‘জের সকারে’ নামে একজন জেলেকে ডেকে পাঠালো। পরিচিত হবার পর জের সাকারে বলল, ‘আমার পূর্বপুরুষ জেলে ছিল। আমরা কম্বোডিয়ায় বাস করতাম। মাছধরা আমার পূর্বপুরুষের পেশা। ১৯৭৫-৭৬ সালে খেমার রাজত্ব শুরু হলে আমরা ভিয়েতমান চলে যাই। পরে ফিরে এসে টোনলেতে মাছধরা ছুরু করি।’ মাছধরার পদ্ধতি সহজ তবে পরের কাজটিতে যথেষ্ট সময় দিতে হয় আর বেশ শ্রমসাধ্য। পানি নেমে যাওয়ায় টোনলেতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। তখন জেলেরা তাদের ভাসমান বাড়ি থেকে নদীতে ‘কোণ সেপের’ জাল ছুঁড়ে মারে। এর পরপরই আর একটা জাল ছুঁড়ে আগেরটা টেনে নেয়। এই পদ্ধতিতে দুই থেকে তিন টন মাছ একসময় ধরা পড়ে এবং প্রতি সপ্তাহে ১০ টনের বেশি মাছ পাওয়া যায়। জেলেরা বিশেষ করে মহিলা জেলেরা মাছের মাথা কেটে মাছগুলি পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে, তারপর চর্বি ছাড়িয়ে নেয়। এরপর মাসের পর মাস লবণ পানিতে ভিজিয়ে রেখে মাছগুলিকে নরম করে ‘প্রাহক’ নামের এক ধরনের পেস্ট বানানো হয় যা প্রায় সব খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। জেলেরা মাছের প্রায় সব অংশই নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। তাছাড়া বিক্রি করেও মুনাফা অর্জন করে। মাছের মাথাগুলি তারা সূর্যের আলোয় শুকিয়ে এক ধরনের উৎকৃষ্ট সার তৈরি করে। এই সার তারা বিক্রি করে। বিক্রির টাকাটা তারা এমার্জেন্সির জন্য সংরক্ষণ করে। পরিবারের কারো অসুস্থতা বা কোন জরুরি প্রয়োজনে এই টাকা তারা ব্যয় করে। মাছের ঝুড়িতে লেগে থাকা চর্বি জা¦ল দিয়ে তারা নিজেদের জন্য সাবান বানায়। টোনলে এলাকায় এখনও বাটা পদ্ধতি প্রচলিত। ওরা মাছের বদলে চাল কেনে। নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাল বিক্রি করে তারা মুনাফা করে। মৎস্যজীবী সকারে বলল ‘কোন কোন মৎস্যজীবী কর্মচারিদের বেতন মেটানো এবং মাছ ধরার লাইসেন্স কেনার পরও তাদের হাতে যে টাকা থাকে তা নিজেদের সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট। আমারও তাই। কাজেই আমাদের ধানক্ষেতের কোনই প্রয়োজন নেই।’ কম্বোডিয়ার অর্থনীতিতে মাছের গুরুত্ব অনুধাবন করে কম্বোডিয়ানরা ওদের মুদ্রার নাম রেখেছে এক ধরনের ছোট সিলভার কার্প মাছের নামে ‘রিয়েল।’ এই মাছ সব ধরনের খাদ্যের সাথেই নানাসই। কম্বোডিয়ার ফিশিং ইন্ডাস্ট্রিগুলো বুদ্ধিজম দ্বারা প্রভাবিত। বৌদ্ধ ধর্মমতে, সংসার চালানোর জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু মাছ ধরাই উচিৎ। তাছাড়া এই ধর্মমতে মাছকে হত্যা করা উচিৎ নয়, মাছের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা উচিৎ। তাই মাছের মওসুম শেষ হলে কম্বোডিয়ানরা সংশোধনের জন্য প্যাগোডায় যায়।
চাল মিল্প
শুষ্ক মওসুমের শুরুতেই ধান মওসুমের শুরু হয়। এই ধান কৃষকদের সম্পদের একমাত্র উৎস। একজন ভাল চাষি তার নিজের সারা বছরের সংসার চালাবার জন্য প্রচুর ধান উৎপাদন করে। কিন্তু বন্যা বেশি বা কম হলে ধান উৎপাদন কমে। সুতরাং প্রকৃতি যাতে সদয় হয় সেজন্য গডের সম্মানে নানা ধরনের উৎসব করা হয়। এই উৎসবগুলি করলে প্রকৃতি সদয় হয়ে ভাল ফসল দেবে বলে কম্বোডিয়ানরা বিশ্বাস করে। ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, এঙ্করিয়ান সিভিলাইজেশনের সময় ভেজা মওসুমে বড় বড় রিজার্ভার তৈরি করে পানি সংরক্ষণ করা হত যা শুষ্ক মওসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা হত। এর ফলে কোন কোন সময় দ্বিগুণ তিনগুণ ধান উৎপাদিত হত যা দেশের উন্নয়নের কাজে লাগত। কিন্তু এখন আর ও পদ্ধতি চালু নেই তাই চাষিরা বছরে একবারই ধান উৎপাদন করে। কিন্তু এর ফলে ধান চাষের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন আসেনি এবং ধানের গুরুত্বও কমেনি। এটাই এখন কৃষকদের আয়ের প্রধান উৎস। ওই এলাকায় ধানের বিনিময়ে এখনও কেনাকাটা হয়। যেমন চাষের জন্য ধানের জমি কেনাও এই ধান দিয়ে হয়। অতিরিক্ত ধান নিজেদের খাবার জন্য রাখা হয়। গ্রামে চাষবাস এবং চাল প্রক্রিয়াকরণও এই পদ্ধতিতে হয়। কোন যন্ত্রপাতি এজন্য ব্যবহার করা হয়না। সূর্য উদিত হলে চাষিরা পরিপক্ত ধান কেটে সেখানে নতুন ধানের চারা লাগায়। কাটা ধান পরিষ্কার করে গোছা বাধে। মহিলারা ধানগুলি গাছ থেকে আলাদা করার জন্য পায়ের নিচে মাটিতে ধানের গোছা রেখে পাড়ায়। এতে ধান থেকে পানিও আলাদা হয়ে যায়। চালের একাংশ উৎসব উদযাপনের জন্য গুড়ো করে আলাদা করে রাখা হয়। এই গুড়ো দুপুরে খাবার জন্য মাঝে মাঝে ব্যবহার করা হয়। চাল ও মুরগি টোনলের পানি দিয়ে রান্না করা হয় তারপর মাছ থেকে তৈরি ‘প্রাহক’ গুড়া সুগন্ধের জন্য মুরগির সাথে মেশানো হয়।
ধান মওসুমের শেষে গ্রামবাসীরা শোভাযাত্রা করে প্যাগোডায় যায়। কঠিন পরিশ্রমের ধান মওসুমের শেষে এটা গ্রামবাসীদের বিনোদন এবং সমাজের লোকজনের সাথে মেলামেশা হাসি তামাসা করার একটা সুযোগ। এদিন গ্রামবাসীরা তাদের সবচেয়ে সুন্দর কাপড় পরে, নাচ গান করে। যুবকেরা যুবতীদের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করে। গ্রামবাসীরা তিনবার মন্দিরের চারপাশে ঘোরে তারপর কাপড় খাবার, আসবাবপত্রসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি মন্দিরে উপহার দেয়। এই উপহার প্রদানকে ‘ক্যাথেন বাই বুদ্ধা’ বলা হয়। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করে এই উপহারের বদলে বুদ্ধ আশীর্বাদ দেন। গ্রামবাসীরা এও বিশ্বাস করে যে এই উপহার প্রদান তাদের সমস্ত সৎকাজের সমম্বয় এবং এর মাধ্যমে নির্বাণ লাভ করা সম্ভব। গ্রামবাসী এও বিশ্বাস করে, এই উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে নতুন ফলনের মওসুমের শুরু হবে।
টোনলে স্যাপ ঘুরে আর এখানকার জেলে আর কৃষকদের সাথে কথা বলে কম্বোডিয়ার অর্থনীতির দুই প্রধান খাত এবং খাত দুটিকে কেন্দ্র করে উৎসবাদি সম্পর্কে জানলাম। জানলাম জেলে আর কৃষকদের জীবনকেও। সবার উপরে দেখলাম টোনলের অপূর্ব সৌন্দর্য। ভরা মনে রওনা দিলাম সিয়াম রেপের পথে।