সকালবেলায় চোখ খুলেই দেখলাম, সেমু আর তুলি লুচির তরকারি করেছে। আমার পেট প্রায় ভর্তি ছিল, একেবারেই খেতে ইচ্ছে করছিল না। ওদের জোরাজুরিতে দুটো লুচি খেয়ে নেটে রামোজী ফিল্ম সিটির টিকিট কাটতে বসলাম। ১১০০ টাকা ও ৩২০০ টাকা দু’ধরণের টিকিট ছিল। সারাদিন এ. সি. বাসে করে ঘোরাবে ও স্ন্যাক্স, লাঞ্চ ইত্যাদি দেবে এই পুরো প্যাকেজ ৩২০০ টাকায়, এটাই আমরা কাটলাম কারণ বাড়ির সামনের স্ট্যান্ড থেকে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে আবার ঐ স্ট্যান্ডেই নামিয়ে দেওয়া অবধি সবই ওরা করবে, নিজেদের হেডেক নেওয়ার কোনো দরকারই নেই। ১১০০ টাকার টিকিটে খাওয়াদাওয়া বা যাতায়াতের দায়িত্ব ওরা নেবে না, সেমু আর দাদাও যাবে না। তাই, আমাদের দু’জন মেয়ের পক্ষে ৩২০০ টাকার প্যাকেজটাই ঠিকঠাক ছিল। দাদার ল্যাপটপ থেকে টিকিট বুক করে লাঞ্চে বসলাম। গতকালের বিরিয়ানি ও কাবাব এত পরিমাণে রয়েছে যে, দুপুরে সকলে ভালোমতো খেয়েও আরও বেশি থাকল। সেটুকু জোর করে ভাগাভাগি করে খেয়ে নিলাম। বলাবাহুল্য, সবার থেকে বেশি পরিমাণ বিরিয়ানি আমিই খেয়েছিলাম। সত্যি, প্যারাডাইজ়ের খাবারের পরিমাণটা অনেকখানি। গতকালের চেয়ে আজকেই বরং বেশি আর ভালো খেলাম। এই স্বাদ অনেক দিন মুখে লেগে থাকবে।

লাঞ্চ শেষ করে আমরা চারজনে গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম চৌমহল্লাহ্ প্যালেসের দিকে। প্রত্যেকের ৫০ টাকা টিকিট কেটে মহলের ভিতর ঢুকে পড়লাম। দক্ষিণী উর্দু, হিন্দি, ফারসি মতে, এই শব্দটির অর্থ হলো চার মহল। নিজ়ামেরা যখন শহরটিকে শাসন করতেন, তখন পঞ্চম নিজ়াম সালাবত জঙ্গের ৪৫ একর জুড়ে তৈরী এই প্রাসাদটিতে থাকতেন। এখন অবশ্য কেবল ১২ একর জায়গা পর্যটকদের জন্য খুলে রাখা হয়েছে। ১৭৫০ সালে প্রাসাদটি নির্মাণের কাজ শুরু হলেও শেষ হয় ১৮৮০ সালে আফজল আড-দাওলাহ, আসফ জাহ্ পঞ্চমের আমলে। প্রাসাদটির কারুকার্য, ভাস্কর্য, বাগান, দরবার হল, ফাউন্টেন সবই অষ্টাদশ শতকের নিদর্শন বহন করে। বর্তমানে বরকত আলি খান মুকররম জাহ্ ও তার স্ত্রী প্রিন্সেস এরা এই জায়গাটির মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণের অংশীদার রয়েছেন। ২০০৫-১০ সালে তাদের ওপর সরকার থেকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাজপরিবার ও গভর্নর জেনারেলের সমস্ত অনুষ্ঠান এখন এখানেই হয়। অপূর্ব সুন্দর এই প্রাসাদের ভিতর নিজ়ামদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, জামাকাপড়, বিভিন্ন মডেলের গাড়ি, বাসনপত্র, মুদ্রা, আসবাবপত্র ইত্যাদি যত্ন সহকারে রক্ষিত আছে। শিসমহল, তোয়খানা, তোপখানা ইত্যাদি সব ঘুরতে এক ঘণ্টা মতো লাগে।

এরপরে আমাদের গন্তব্যস্থল গ্রানাইট, চুনাপাথর ও মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরী চারমিনার ও তার সামনের লাদবাজার। ১৫৯১ খ্রিস্টাব্দে কুতুব শাহি রাজবংশের পঞ্চম সুলতান মোহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ্ দ্বারা স্থাপিত অন্যতম প্রাচীন সৌধ এটি। মুসি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই ইন্দো-ইসলামিক সৌধটির উত্তরপূর্ব কোণে রয়েছে লাদ বাজার এবং পশ্চিম দিকে রয়েছে গ্রানাইটের তৈরী খুবই উচ্চ কারুকাজসম্পন্ন মক্কা মসজিদ। ‘চারমিনার’ শব্দটি দুইটি উর্দু শব্দ ‘চার’ এবং ‘মিনার’-এর সমন্বয়ে গঠিত, যার ইংরেজি অর্থ ‘Four Towers’। চারটি খিলান বা চারটি মিনারের মাধ্যমে সৌধটি দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে এরূপ নাম। এগুলি চারটি বড় রাস্তার নির্দেশক। ৪৮.৭ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট স্তম্ভগুলো সুন্দর কারুকাজ সম্পন্ন দ্বিস্তর ব্যালকনি বিশিষ্ট। কুতুব শাহর প্রধানমন্ত্রী মীর মোমিন আস্তারাবাদী চারমিনারের নকশা পরিকল্পনা করেন। গোলকোন্দা বাজারের সাথে বাণিজ্যিক শহর মাসুলিপত্তনমের সংযোগ সাধনের জন্য গোলকোন্দার ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক পথের মিলিত স্থানে চারমিনার তৈরী হয়। তাই, হায়দ্রাবাদ শহরের পরিকল্পনা করা হয়েছে চারমিনারকে কেন্দ্র করে এবং সেইজন্যই চারমিনারের চারপাশে ছড়িয়ে আছে এই শহর। এর উত্তর দিকে ‘চার কামান’ তৈরী করা হয়েছিল মৌলিক দিক নির্দেশনার জন্য। বর্গাকৃতির সৌধটির প্রত্যেক দিকের দৈর্ঘ্য ২০ মিটার। মিনারগুলির প্রত্যেকটির মাথায় মুকুটের মতোন সুন্দর কারুকাজ করে কাটা এবং প্রত্যেক মিনারের ভিত্তিতে রয়েছে ফুলের পাপড়ির মতোন নকশা। চারমিনারের চূড়ায় ওঠার জন্য ১৪৯ টি ধাপসম্পন্ন প্যাঁচানো সিড়ি রয়েছে, অবশ্য আমরা ভিতরে ঢুকতে পারিনি বা উপরেও উঠতে পারিনি, দরজা বন্ধই ছিল, বাইরে থেকেই চারিদিক ঘুরে দেখলাম। ওখানে দাঁড়িয়েই শুনলাম, করাচীর বাহাদুরবাদ রোডের পাশে পাকিস্তানে বসবাসরত হায়দ্রাবাদি মুসলমানরা চারমিনারের আদলে একটি ক্ষুদে প্রতিরূপ তৈরী করেছিলেন। চারমিনারের নিচে অবস্থিত ‘ভাগ্যলক্ষ্মী মন্দির’ নিয়ে প্রচুর বিরোধিতার কথাও শুনলাম। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা, সময়কাল নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।

চারমিনারের চারপাশে একটি বিশাল বাজার আছে, যা লাদ বাজার নামে পরিচিত। কলকাতায় থাকাকালীন সেমু ফোনে আমাদের এই বাজারের বর্ণনা দিয়ে লোভ দেখাত এবং বলত ব্যাঙ্ক ভর্তি ও ব্যাগ ভর্তি টাকা যেন নিয়ে আসি এখানে বাজার করার জন্য (যেন আমরা টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছি)। আমি অতটা শপ্যাহোলিক নই, পছন্দ হলে সামান্য দু-একটা জিনিস কিনব, এইরকম মনে মনে ঠিক করেই গেছি কিন্তু কে জানে, শেষ অবধি নিজের টাকা শেষ করে অন্যের থেকে ধার করেও ওখান থেকে শপিং করে আসতে হবে!!!! এই বাজারের পরিচিতি অলংকারের জন্য, বিশেষভাবে রেশমী চুড়ি ও মুক্তোর জন্য এটি বিখ্যাত। বর্তমানে চারমিনার বাজারে প্রায় ১৪,০০০ দোকান আছে। চারমিনারের সামনে খানকতক ফটো তুলে এবার ঢুকলাম লাদবাজারের বিখ্যাত লেহেঙ্গা, শাড়ি ও চুড়িদারের দোকানে। ইচ্ছে ছিল, ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে একটা ঝিঙ্কু লেহেঙ্গা কিনব, ভাই ওর বিয়েতে আমাকে দেবে বলেছিল কিন্তু বাজারে ঢুকে চোখ ধাঁধিয়ে গেল আমাদের। কোনটা ছেড়ে কোনটা কিনব, ভেবে পাচ্ছিলাম না আমরা। একটা রানী লেহেঙ্গা খুব পছন্দ হলো, আট হাজার থেকে দরাদরি করতে করতে সাড়ে তিন হাজারে নেমে শেষ পর্যন্ত কিনলাম। মা একটা শাড়ি কেনার জন্য টাকা দিয়েছিল, এবার এলো শাড়ি পছন্দের পালা। একটা হালকা সবুজ রঙের শাড়ি পছন্দ হলো। সেটাও সাত হাজার থেকে তিন হাজারে নামলো। তুলিও একটা চুড়িদার কিনল অন্য দোকান থেকে। সেই দোকানে গিয়ে একটা কালচে বেগুনি রঙের চুড়িদার এত পছন্দ হলো যে, তুলি আর দাদার থেকে চেয়েচিন্তে ধার নিয়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে কিনেই ফেললাম সেটা। প্রত্যেকটা জামাকাপড়ের শাহি জারদৌসি কাজ চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। রবিবার বলে অল্টার করে দিল না, নয়তো ওখানে ঘণ্টা দুয়েক বসলে অল্টার হয়ে যায়। ওগুলো অল্টার করতে দিয়ে এবার গেলাম চুড়িবাজারে। প্রচুর কানের দুল, চুড়ি, ব্রোজ কেনার পর যখন আমরা বাড়ি ফিরছি, তখন ব্যাগ প্রায় শূন্য। ডিজ়াইনার চুড়ি, বটুয়া, গলার হার, কানের দুল, জুতো, ঘড়ি ইত্যাদি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, সবই কিনে ফেলি কিন্তু আমি তখন প্রতিজ্ঞা করেছি, আর কোনোদিকে আমি তাকাব না, তাকালে আমাকে এখান থেকে ভিক্ষে করতে করতে কলকাতায় ফিরতে হবে । ওখানকার দোকানদারদের মুখেই শুনলাম, তাদের বেশিরভাগ কর্মচারীই হাওড়ার বাসিন্দা। হাওড়াবাসী ওখানে গিয়ে যে জিনিসে কারুকার্য করে, সেগুলোই কলকাতায় আসার পর বেশি দামে বিক্রি হয়। চুড়িবাজারের ভিতরেই একটি পুরনো, বিখ্যাত দোকান থেকে ওখানকার স্পেশ্যাল মালাই ফালুদা খেলাম, অপূর্ব সেই স্বাদ!

বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে টি. ভি. দেখতে দেখতে নিজেদের কেনা জিনিসগুলো দেখছিলাম আর টাকার হিসেব করছিলাম। ভালোই গরম এখানে তবে রাতের দিকটায় একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগে। রাতে ফ্যান চালিয়ে কম্বল গায়ে দিই। ঘুরতে বেরিয়ে দু’দিনই সোয়েটার নিয়ে যাওয়া ব্যর্থ, ঘেমে নেয়ে একেবারে একাকার। অনেক রাত অবধি সেদিন গল্প গুজব, হৈ-হল্লা আর উনো খেলা চলল…