গতকাল রাত তিনটে নাগাদ ঘুমালেও আজ ভোরবেলা পাঁচটার মধ্যে উঠে পড়লাম আমি আর তুলি। আজকের গন্তব্য ‘রামোজী ফিল্ম সিটি’। টিকিট তো আগে থেকেই কাটা ছিল অনলাইনে। সেমু আর আদিত্য দা আজ যাবে না। তাই, ওদের অত সকালে উঠতে আমরা বারণ করে দিয়েছি। ঝটপট্ রেডি হয়ে আমরা অ্যাপার্টমেন্টের নীচে নেমে অটোতে চড়লাম। ওখান থেকে সেকেন্দ্রাবাদ একশো টাকা নিল, মিনিট পনেরোর দূরত্ব। ভোরবেলা রাস্তা ফাঁকাই ছিল। সেকেন্দ্রাবাদ স্ট্যান্ডেই সাতটা পনেরো মিনিটে রামোজীর বাস আমাদের পিক করবে। ওখানে পৌঁছে দেখলাম, আমাদের মতো আরও অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বাঙালি। স্ট্যান্ডের চায়ের দোকানে জিজ্ঞাসা করে আশ্বস্ত হলাম যে, ওখানেই রামোজীর বাস এসে দাঁড়াবে, ওটাই স্ট্যান্ড। তখনও প্রায় আধ ঘন্টা দেরি। গত দু দিন সোয়েটার, চাদর নিয়ে বেরিয়েও কোনো লাভ হয়নি, ঘেমে নেয়ে বাড়ি ঢুকেছিলাম। তাই, আজ সেসব কিচ্ছু আনিনি কিন্তু স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বুঝলাম যে, আজকের ওয়েদার বেশ ঠাণ্ডা, মেঘ করে রয়েছে, বৃষ্টিও হতে পারে, খুবই ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ভাবলাম, ভোরবেলা বলেই বুঝি এত ঠাণ্ডা লাগছে, বেলা বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। এরপর এ. সি. বাসে বসে আর সারাদিন ঠাণ্ডা হাওয়া খেয়ে আমি সারা রাস্তা রীতিমতো কাঁপছিলাম। যাই হোক্, স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকের ফুটপাতে বন্ধ প্যারাডাইসটার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বাসের ওয়েট করতে লাগলাম। নির্দিষ্ট সময়েরও মিনিট পনেরো পরে বাস এল। মেইলে বাসের নম্বর আগে থেকেই রামোজী কর্তৃপক্ষ পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাস এসে রাস্তার ওপাশে দাঁড়াতেই আমরা বাসে উঠে নিজেদের নির্দিষ্ট সিটে বসলাম। তারও প্রায় মিনিট কুড়ি বাদে বাস ছাড়ল, রাস্তায় বিভিন্ন স্টপেজ থেকে রামোজীর যাত্রীরা উঠতে লাগলেন, অবশ্যই সবার টিকিট আগে থেকেই কাটা ছিল। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পরে রামোজী ফিল্ম সিটির গেট দিয়ে ঢুকলাম। ওখানে নেমে আমাদের আরেকটি নির্দিষ্ট বাসে উঠতে বলা হলো। সেই বাস আমাদের টিকিট কাউন্টার পর্যন্ত পৌঁছে দিল। আমাদের তো টিকিট কাটাই ছিল, তাই, ওখানে নেমে আমাদের কী করণীয়, তা বুঝতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল। এত বড় জায়গা জুড়ে ফিল্ম সিটিটি বিস্তৃত ও এত লোকজন চারিদিকে যে, প্রথমে একটু খেই হারিয়ে ফেলতেই হয়। বিভিন্ন টিকিট লাইনে জিজ্ঞাসা করে আমরা আমাদের নির্দিষ্ট স্পেশ্যাল গেস্টের টিকিট লাইন খুঁজে পেলাম। ওখানে ফোনে অনলাইন টিকিট দেখাতেই আমাদের দুজনকেই একটা করে জলের বোতল আর একটা চকোলেট বক্স (ভিতরে ছটা ডার্ক চকোলেট ছিল) দিল ব্রেকফাস্ট হিসেবে। সাথে অনেকগুলো ক্যুপন ছিল। সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা কী, তা পরে বুঝলাম। আমাদের গাইড আমাদের বাঁ হাতে একটি নীল ট্যাগ লাগিয়ে দিলেন, যাতে উনি দূর থেকে দেখেও সহজে বুঝতে পারেন যে, আমরা ওনার অধীনে আছি। গাইডের নির্দেশমতো একটি নির্দিষ্ট বাসে আমরা উঠলাম।

গাইড ইপ্সিতা শাহু ফুল হাতা শার্ট আর ব্লু ডেনিম জিন্সে বেশ স্টাইলিস্ট এবং খুব সুন্দরভাবে আমাদের নেক্সট গন্তব্যস্থল সম্বন্ধে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। উনি এতটাই লম্বা ছিলেন যে, বাসের পিছনেও প্রত্যকটি যাত্রী ওনাকে দেখতে পারছিলেন আর ওনারা প্রত্যেকেই যাত্রীদের কিছু বলার জন্য কানের সাথে আটকানো ছোট মাইক ব্যবহার করছিলেন। পরিষ্কার, লাউড ইংরাজি ও হিন্দিতে তিনি আমাদের সব বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। ফলে, কোনো অসুবিধাই হচ্ছিল না। উনি বারবারই আমাদের বলছিলেন যে, নামার সময় বাসে যেন আমরা কিছু রেখে না যাই। তবুও জলের বোতলটা টানতে পারছিলাম না বলে রেখে গেছিলাম। পরে এসে দেখলাম যে, বাস আবার চেঞ্জ হয়েছে। আমাদের সাথে বাড়ির জলের বোতল ছিল বলে আর অসুবিধে হয়নি।

বাসে উঠেই খিদেতে দুটো চকোলেট খেতে খেতে রামোজী সম্বন্ধে ইপ্সিতা ম্যামের বক্তব্যে মন দিলাম। হায়দ্রাবাদ শহরের থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ১৯৯৬ সালে রামোজী রাও ১৬৬৬ একর জায়গা জুড়ে এই ফিল্ম সিটিটি নির্মাণ করেন। ২০১২ সালের ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত আয়তনের দিক দিয়ে এটাই ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ফিল্ম সিটি। তবে স্টুডিও কমপ্লেক্স হিসেবে এটি এখনও বৃহত্তমই রয়েছে। হিন্দি, বাংলা, কন্নড়, তামিল, মালয়ালম, তেলেগু ইত্যাদি ভাষা ও বহু বিদেশী ভাষা মিলিয়ে প্রায় ১২০০ টি চলচ্চিত্র এখনো পর্যন্ত এখানে নির্মিত হয়েছে। তার মধ্যে বিখ্যাত বাহুবলী দুটো পর্বের সেট তো এখানে দর্শনীয় স্থান। এছাড়া, ‘গোলমাল’ (প্রতিটা পর্বই), ‘সিংহম্’ (প্রতিটা পর্বই), ‘সিম্বা’, ‘শোলে’, ‘ওয়ার’, ‘য়মলা পাগলা দিওয়ানা’, ‘স্পাইডার’, ‘শাহো’, ‘নায়ক’, ‘মগধীরা’, ‘দ্য ডার্টি পিকচার’, ‘কে. জি. এফ. টু’, ‘গব্বর সিং’, ‘হেব্বুলি’, ‘জনতা গ্যারেজ’, ‘বেঙ্গল টাইগার’, ‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট লাভ’ ইত্যাদি বিখ্যাত সিনেমাগুলোর শ্যুটিং এখানেই হয়েছে। বাসে করে ঘুরতে ঘুরতেই আমরা শ্যুটিং-স্পটগুলো দেখতে দেখতে গেলাম। কোথাও ফুলের বাগান, যেখানে নায়িকারা শুয়ে, বসে, গড়াতে গড়াতে গান করে এবং তাদের ড্রেসের কালার অনুযায়ী ফুলের কালারও চেঞ্জ করে দেওয়া হয়; কোথাও পুলিশ স্টেশন, যেখানে ডিরেক্টররা নিজেদের পছন্দমতো নাম বসিয়ে নেয়। মজার কথা হলো, থানার দরজা দিয়ে ঢুকে পিছনে আর কিছুই নেই, শুধুমাত্র সেটটুকুই রয়েছে 🤣। কোথাও রয়েছে হাসপাতাল, কোথাও রয়েছে এয়ারপোর্ট, কোথাও রয়েছে হোটেল, কোথাও রয়েছে জেলখানা, কোথাও বড় বড় পাহাড়ি পাথর ফেলে পাহাড় বা টিলা, কোথাও রয়েছে মুদিখানা দোকান ইত্যাদির সেট। আবার বিদেশের রাস্তার মতো শ্যুটিং করার জন্য বিদেশের রাস্তা, ঘরবাড়ি, স্থাপত্যওয়ালা সেটও রয়েছে। জায়গাগুলো দেখে বিশেষ বিশেষ সিনেমার বিশেষ বিশেষ অংশ মনে পড়ে যাচ্ছিল। যেমন, জেলখানা দেখে ‘সিংহম’ আর ‘সিম্বা’র জেলের দৃশ্য, বিদেশের রাস্তাগুলো দেখে ‘সালাম নমস্তে’-র প্রীতি আর সঈফের বিদেশের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য বা ‘মুঝসে দোস্তি করোগি’-র হৃত্বিকের কেহ্ দো কে তুম মুঝসে দোস্তি করোগি গানের দৃশ্য, পাহাড় দেখে ‘শোলে’র গব্বর সিং-এর টিলার দৃশ্য, ফুলের বাগানগুলো দেখে ‘তোহ্ফা’র জিতেন্দ্রর পেয়ার কা তোহ্ফা তেরা গানের দৃশ্য, এয়ারপোর্ট দেখে ‘কভি খুশি কভি গম্’-এর শাহরুখের এয়ারপোর্ট জুড়ে দৌড়ানোর দৃশ্য ইত্যাদি। কলকাতার গলি, চেন্নাইয়ের মহল্লা, মুম্বইয়ের বস্তি, দিল্লির পুরনো বাজার সবই এখানে উঠে এসেছে। ই. টি. ভি.’র পূর্ণ সম্প্রচার কেন্দ্রটিও এখানে, প্রায় ১৯ টি ভাষায় এখান থেকে সম্প্রচার করা হয়। প্রায় সাত হাজার কর্মচারী এই সমগ্ৰ ফিল্ম সিটিটিতে কাজ করে চলেছেন।

গল্প শুনতে শুনতে ও সেটগুলো দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ‘ফিল্মি দুনিয়া’র সামনে। সেখানে আট সিটের ছোট ছোট টয় ট্রেনে করে আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য পুতুলের মাধ্যমে দেখানো হলো। যেমন, বিয়ের দৃশ্য, আলাদিনের দৃশ্য, বৃষ্টিতে নায়ক-নায়িকার ভেজার দৃশ্য, ভয়ের দৃশ্য ইত্যাদি।

সেখান থেকে বেরিয়ে স্যুইট মশালা কর্ন কিনে খেতে খেতে ঢুকলাম আরেকটি ফিল্মি দুনিয়ায়। সেখানে কীভাবে পুলিশ তাড়া করলে চোরেরা পালায় এবং ঘরের বিভিন্ন জিনিস দিয়ে ব্যাকগ্ৰাউন্ড সাউন্ড কীভাবে প্রথম তৈরী করা হয়েছিল, তা দেখানো হলো। দর্শকদের মধ্যে থেকেই কয়েকজনকে ডেকে নকল বাইকে বসিয়ে দেওয়া হলো এবং তাদের শুধু স্টিয়ারিং ধরে হাত নাড়াতে বলা হলো। বাইকগুলোর শুধু সামনেটুকু আছে, পিছনটা নেই। পরে টি. ভি.’তে দেখলাম, মনে হচ্ছে যেন, তারা বাইক চালিয়ে পুলিশের হাত থেকে পালাচ্ছে। আবার ব্যাকগ্ৰাউন্ড সাউন্ড হিসেবে স্ট্যান্ড ফ্যান দিয়ে হাওয়ার, হাতুড়ি দিয়ে গুলির আওয়াজ করা হলো। দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল সিনেমার এই আদিম টেকনিকগুলো।

এরপর আবার বাস ও গাইড দুটোই চেঞ্জ হলো। এই নতুন গাইড ভদ্রলোকটি মাইক ব্যবহার করলেও ওনার কথা আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না ওনার অস্পষ্ট, আস্তে ও তামিল-ঘেঁষা উচ্চারণের জন্য। যদিও পাশে ইপ্সিতা ম্যাম্ ছিলেন, তাই, আমি ওনাকেই বারবার জিজ্ঞাসা করে নিচ্ছিলাম। এবার গেলাম ‘বাহুবলী’ সিনেমার সেটে। সাধারণত সিনেমা হয়ে গেলে সেই সেটগুলো ভেঙে দেওয়া হয় কিন্তু দর্শকদের এত কোটি টাকার সেট দেখানোর জন্য সেখানে এখনও অবিকৃতভাবে সেটটিকে রেখে দেওয়া হয়েছে। কামান-গোলা, মহারাজের বিচার সভা, রথ, বিশাল হাতি খেলার ময়দান ও গ্যালারি ইত্যাদি সবই আছে। বল্লাদেবের একটি বিশাল মূর্তি আছে, কিছু মেইনটেন্যান্স চলছিল বলে মুণ্ডু আর ধড় আলাদা করে রাখা হয়েছিল। ওখানে একটা বিরিয়ানি কম্পিটিশন চলছিল, আমি আর সেদিকে দৃষ্টিপাত করলাম না। ওখানে গিয়ে আমাদের প্রথম ক্যুপনটি কেটে নিয়ে একটি ফ্রুটির টেট্রাপ্যাক্ দেওয়া হলো।

এরপর ঐ একই বাসে উঠে দেখতে গেলাম রাজদরবার। বিশাল রাজসভা আমরা যেরকম সিনেমা আর সিরিয়ালে দেখে থাকি, ঠিক সেরকম। সেখানে তিন-চারজন কুশীলব থাকলেও বাকিরা সকলেই পুতুল, যারা চেয়ারে বসে বসে ঘাড় নাড়ছে, দূর থেকে দেখে সত্যি-মিথ্যে বোঝার উপায় নেই।

তারপর গেলাম রেলস্টেশন। ওখানে পরিচালক ইচ্ছেমতো স্টেশনের নাম বসিয়ে নেন। নকল রেল লাইনের ওপর তিন বগির একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’-র শাহরুখ-কাজলের দৃশ্যটা আর ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’-এর শাহরুখ-দীপিকার দৃশ্যগুলো মনে পড়ছিল।

সেখান থেকে বাসে উঠে চলে গেলাম বাটারফ্লাই পার্ক, বনসাই গার্ডেনে। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে পুরো গার্ডেনটা ঘুরে দেখতে হয়। বিভিন্ন রকম গাছ (বিশেষত বনসাই), পাখি (বিশেষত এমু) এই জায়গাটার সৌন্দর্য।

এরপর ছিল লাঞ্চ টাইম। দুপুর আড়াইটে নাগাদ আমরা ‘সিতারা’ রেসিডেন্সিয়াল হোটেলে প্রবেশ করলাম বুফে লাঞ্চের জন্য। এই লাঞ্চের টাকা টিকিটেই ইনক্লুডেড ছিল। এই সিটির ভিতরে অনেকগুলো বেশ ভালো ভালো হোটেল রয়েছে, যেমন, ‘সিতারা’, ‘তারা’ ইত্যাদি। এগুলোতে শ্যুটিং-এর টিমেরা থাকেন। সিতারা হোটেলে ঢুকে মনে হচ্ছিল, কয়েক যুগ পিছিয়ে গেছি, মনে হচ্ছিল, যেন কোনো মহারাজার দরবারে আমাদের জন্য শাহি খানা পেশ করা রয়েছে। এত সুন্দর, বড় এবং কারুকার্যময় হোটেল আমি এর আগে কখনও দেখিনি। আমাদের লাঞ্চ ক্যুপন দিয়ে আমরা বুফে হলের ভিতর প্রবেশ করলাম। রকমারি ভেজ ও নন ভেজ আইটেম দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। এই সময়ে সেমুকে খুব মিস্ করছিলাম। ও ব্যাটা সব একাই সাবড়ে দিত। অনেক রকম আইটেমের নাম সেই প্রথম শুনলাম। বিভিন্ন রকম স্যালাড, পোলাও, বিরিয়ানি, মাছ, চিকেন, ডিম, চাউমিন, ফ্রায়েড রাইস, তন্দুরি রুটি, স্যুপ, চাটনি, মিষ্টি, হালুয়া, পায়েস, কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রিম সবই ছিল খাদ্যতালিকায়। সবই একটু করে চেখে দেখলাম। শেষে পছন্দসই বিরিয়ানি আর চিকেন খেলাম পেট ভরে। শেষ পাতে মুগ ডালের হালুয়াটা ঠিক পছন্দ হয়নি, কেমন একটা গন্ধ লাগছিল, যদিও ওটাই ঐ খাবারটার গন্ধ, তবুও আমি অভ্যস্ত নই বলে খেতে পারছিলাম না। ফালুদায় একরকম কালো বীজওয়ালা ফল, যার নাম ‘চিয়া’ বীজ বা ‘সবজা’ বীজ বা ‘বাসিল’ সীড, দিতে দেখেছিলাম কাল, ওগুলো দিয়েই এখানে পায়েস করেছিল, ওটাও খেতে পারলাম না ঠিকমতো। এখানকার লোকেদের কথা অনুযায়ী, ঐ বীজগুলো শরীর ঠাণ্ডা করে, তাই, তারা সবকিছুতেই এগুলো বেশি করে দেয়। খাওয়ার পর বিভিন্ন মহলের মতো ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, প্রাচীন সময়ের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন, অজানা কোন্ ঐতিহাসিক জগতের মধ্যে আমরা সকলে বিচরণ করছি। আবছা আলোতে দিনের বেলাতেও অজানা কারণেই এই রোমাঞ্চে গা শিরশির্ করে উঠছিল। আমাকে মহলগুলোতে ঘুরতে দেখে ইপ্সিতা ম্যাম নিজে থেকেই শোনালেন এক অদ্ভুত কাহিনী। এই হোটেলের প্রত্যেকটি ঘরে, লিভিং-রুম, বারান্দায়, ড্রেসিং-রুমে রয়েছে অতৃপ্ত আত্মাদের উপস্থিতি। শোনা যায়, এই হোটেলের আলোগুলো নাকি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়, আবার অন্ধকারে নিজে থেকেই জ্বলে ওঠে। অনেকে নাকি সেখানে রহস্যজনক ছায়া দেখতে পান, মাঝ রাতে দরজায় ঠোক্কর শুনতে পান, কাপড়-জামা আপনা আপনি ছিঁড়ে যায়, লাইট নিজে থেকে ভেঙে পড়ে, মাঝে মাঝেই অন্ধকারে ওখানকার গার্ডরা আহত হন আবার অন্ধকারে অজানা কারোর দ্বারা সমস্ত খাবার তছনছ্ করার ঘটনাও ঘটেছে। এই ঘটনার কারণ হিসেবে উনি আরেকটি ইতিহাস বললেন। এই ফিল্ম সিটি বর্তমানে যে জায়গায় রয়েছে, সেখানে এককালে ছিল মহাবীর নিজ়ামের যুদ্ধক্ষেত্র অনাজপুর। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সেখানে যে সমস্ত সৈন্যরা প্রাণ দিত, তাদেরই অতৃপ্ত আত্মা এখনও ঐ জায়গাটি ঘিরে রয়েছে বলে এখানকার সকলেই বিশ্বাস করেন। যদিও কোনো ট্যুরিস্টের ক্ষতি হয়েছে, এমনটা কখনো শোনা যায়নি, তবুও রাত বাড়লে এদের উপদ্রব বাড়ে বলে রাতে এই ফিল্ম সিটির মধ্যে যাতায়াত খুব একটা সুবিধাজনক নয়। মহিলাদের ওপর নাকি এরা ভৌতিক অত্যাচার বেশি করে থাকেন। এই কথাটি শুনে যদিও বেশ হাসি পেয়েছিল কিন্তু এটা একদমই সত্যি যে, সিতারায় প্রবেশ করার পর চারপাশে এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও একটা অন্যরকম ফিলিংস হচ্ছিল, যা হয়তো বোঝানো সম্ভব নয়। সিতারার এই ভৌতিক ইতিহাস সম্বন্ধে আমি একেবারেই অজানা ছিলাম যখন, তখনই খালি আমার মনে হচ্ছিল যে, পুরনো কোনো নবাবের দরবারে চলে এসেছি। চারপাশে সেই যুগেরই মানুষ রয়েছে। জানি না, কেন এমন মনে হচ্ছিল কারণ এরকম অনুভূতির কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। বেরনোর সময় শাহি দরবারের রকমারি কুকিজ় খেতে খেতে বেগমের ভঙ্গিতে কিছু ফটো তুললাম।

শীতের বেলা দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। আগামীকাল এই ইংরাজি বছরের শেষ দিন। বর্ষশেষের পার্টির জন্য এই সিটির ভিতরেও অনেক স্টেজ তৈরী হচ্ছিল। আজও কিছু নাচ-গানের অনুষ্ঠান রয়েছে, ফেরার পথে আমরা ওগুলো দেখব। এরপর গেলাম ড্যান্স রিয়্যালিটি শো-এর শ্যুটিং কেমন হয়, তা দেখতে। সেখানকার কুশীলবদের নাচগুলোও প্রশংসনীয়।

সেখান থেকে বেরিয়ে বিদেশের রাস্তা ধরে সোজা চলে এলাম অ্যাকশন থিয়েটারে। সিনেমায় অ্যাকশন দৃশ্য কীভাবে শ্যুট্ হয়, তা দেখলাম। দারুণ দারুণ কিছু স্টান্ট-ও তারা আমাদের দেখালেন।

সেখান থেকে বেরিয়ে আমাদের একটি ক্যুপন নিয়ে চা আর কফি দেওয়া হলো। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। কিছু রাইডসও ছিল সেখানে কিন্তু আমরা অত্যন্ত দায়িত্ববান নাগরিক। তাই, কোনো রাইডসই আমাদের স্লিম ফিগারের ওজন ধরে রাখতে পারবে না ও সঙ্গে সঙ্গে ‘তালপাতার খেলনার ন্যায় মড়মড়্ করিয়া ভাঙিয়া পড়িবে’ ইত্যাদি চিন্তা করে আমরা শুধু দূর থেকেই অন্যদের রাইডস্ চড়া দেখতে লাগলাম।

পাঁচটা থেকে নাচ-গানের অনুষ্ঠানটা দেখার জন্য কিছুক্ষণ পর সেখানে গিয়ে জায়গা দখল করে বসলাম। সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত সিনেমার গানের নাচের মাধ্যমে সিনেমা জগতের যে বৃহৎ বিবর্তনটা দেখানো হলো, তা সত্যিই খুব ভালো হয়েছে। এক একজন পারফর্মারের নাচ ও তাদের সৌন্দর্য অনায়াসে বলিউডের প্রথম সারির যেকোনো নায়ক-নায়িকাকে টেক্কা দিতে পারে। ওখানেই একজনের মুখে শুনলাম, অনেক পরিচালক এদের পারফরম্যান্স দেখে নিজের সিনেমার জন্য তাদের পছন্দ করেন। সকলের ভাগ্যে সেই শিকে অবশ্য ছেঁড়ে না, ক্বচিৎ দৈবাতে সে ঘটনা ঘটে থাকে। সকলেই এখানে অসীম প্রতিভা নিয়ে স্ট্রাগলিং পিরিয়ডের মধ্যে দিয়ে যায়। এত খাটনির পর, আমাদের এত এন্টারটেইন করার পর তারা সামান্য কিছু টাকা নিয়ে নিজেদের গরীব ঘরে ফিরে যায়। দূর-দূরান্তের গ্ৰাম থেকে আসা অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েগুলো এখানকার সাজগোজ, গ্ল্যামারের আড়ালে নিজেদের দৈন্য লুকিয়ে রাখে, এন্টারটেইনমেন্টের এলিমেন্ট হিসেবে না দেখে একটু মানুষ হিসেবে দেখলেই এদের সেই লুকিয়ে রাখা দিকগুলো দেখতে পাওয়া যায়। যাই হোক্, খুব এনজয় করছিলাম ওদের শো-টা, হাততালি দিয়ে যতখানি সম্মান জানানো যায় ওদের শিল্পকে, সেই সবটুকুই দিলাম। প্রীতিকে খুব মিস্ করছিলাম এখানে। ও এরকম নাচ-গানের প্রোগ্ৰাম খুব এনজয় করে ও অ্যাপ্রিশিয়েটও করে।

অনুষ্ঠান পৌনে সাতটায় শেষ হতেই আমরা তড়িঘড়ি বাসের দিকে হাঁটতে লাগলাম কারণ ইপ্সিতা ম্যাম আমাদের বারবার বলে দিয়েছিলেন যে, লাস্ট বাস ঠিক সাতটায় ছাড়বে মঞ্চের পিছন দিক থেকে। তারপরে যেতে চাইলে নিজেদের হেঁটে ফিরতে হবে। অনুষ্ঠানের জায়গাটি ছাড়া বাদবাকি চারদিকেই তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। শেষে ঐ গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হবে সারারাত আর তার ওপর মহিলা দেখে যদি সৈনিক ভুতেরা আক্রমণ করে (যদিও আমাদের দেখে সেই রিস্ক তারা নেবে বলে মনে হয় না🤣), তাহলে তো আর কলকাতায় ফিরতে পারব না। তাই, বাসে তাড়াতাড়ি পৌঁছে সিট দখল করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আজ সারাদিন যারপরনাই ঠাণ্ডা লেগেছে আমার। বাস থেকে দেখলাম, একটা ইয়ার-এন্ডের মিছিল বের করেছে। এরপর বাস ফিল্ম সিটির মধ্যেই অন্ধকার রাস্তা ধরে ছুটতে শুরু করল। এরকম অন্ধকার, জঙ্গলে ভর্তি আর নির্জন রাস্তায় ভুত থাকাটা বিচিত্র কিছু নয়। আধ ঘণ্টা পরে সেই বাস আমাদের সেই সকালের টিকিট কাউন্টারের সামনে নামাল। ওখানে অপেক্ষা করতে হবে। আটটার সময়ে একটি বাস (যে বাসটি সকালে সেকেন্দ্রাবাদ থেকে আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে) গিয়ে আবার আমাদের ওখানে ছেড়ে আসবে। এই বাড়তি সময়টুকুতে আমরা টিকিট কাউন্টারের সামনের দোকানগুলোতে ঘুরলাম, আকাশছোঁয়া দাম দেখে আর কিছু কিনছিলাম না, হঠাৎ মনে পড়ল, দুজনেরই ৯০ টাকার ক্যুপন আছে, সেগুলো দিয়েই কিছু কেনা যাক্। দুজনে দুটো কচ্ছপ পেপারওয়েট কিনলাম। যথাসময়ে বাসে উঠলাম কিন্তু তারও মিনিট কুড়ি পরে বাস ছাড়ল। জ্যাম পেরিয়ে সেকেন্দ্রাবাদ পৌঁছতে প্রায় দেড় ঘণ্টা মতো লাগল। এত টায়ার্ড ছিলাম যে, সারা বাস ঘুমিয়ে কাটালাম। ওদিকে দেরি দেখে সেমু আর আদিত্য দা-ও চিন্তা করছিল। সেকেন্দ্রাবাদ থেকে অটো ধরে বাড়ি যখন পৌঁছালাম, তখন দশটা বেজে গেছে। বাড়ি ফিরে গল্প করতে করতে সয়াবিনের তরকারি খেলাম। আবার আজ অনেক রাত অবধি আড্ডা আর পরের দিনের প্ল্যানিং চলল…