আজ সকালে উঠে ম্যাগি খেয়ে রেডি হয়ে গেলাম। আজই এখানে আমাদের শেষ দিন। আজ অনেকগুলো জায়গায় যাওয়ার প্ল্যান ছকে রেখেছি কিন্তু সকাল থেকেই রিমঝিম বৃষ্টি নেমেছে শহরের বুকে পাশাপাশি বছরের শেষ দিনে ঠাণ্ডার কামড়ও অনুভব করছি। তাই, আজ আর কালকের মতো ভুল না করে উলের কুর্তি চাপিয়ে নিলাম গায়ে। বেরনোর আগে কিছুক্ষণ সেমুর বারান্দায় ঝুলচেয়ারে বসে এই শহরের বৃষ্টি দেখছিলাম। এই কদিনে শহরটাকে ভালো লেগে গেছিল…

অটোয় করে প্রথমেই চলে গেলাম সালারজং মিউজ়িয়াম। বাড়ি থেকে অটোভাড়া দুশো টাকা। পৃথিবীর বৃহত্তম মিউজ়িয়ামগুলোর মধ্যে এটি একটি। পার হেড ১০ টাকা টিকিট ও ক্যামেরার জন্য ৫০ টাকার টিকিট কেটে ঢুকে গেলাম ভিতরে। তিনতলা মিউজ়িয়ামটির অনেকটা জায়গাই বন্ধ। একতলা থেকে দেখা শুরু করলাম। বিভিন্ন দেশ যেমন জাপান, চীন, বার্মা, নেপাল, পার্সি, ইজিপ্ট, ইউরোপ, আমেরিকা ইত্যাদি জায়গা থেকে সংগৃহীত আসবাব পত্র, রাজরাজড়ার মুদ্রা, ব্যবহৃত জিনিস, আঁকা, স্থাপত্য, বস্ত্র, বাসনপত্র, ঘড়ি, জামাকাপড় ইত্যাদি এই মিউজ়িয়ামটির প্রধান আকর্ষণীয় স্থান। ১৯৫১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সালারজং পরিবারের এক মহান ব্যক্তি নবাব মীর ইউসুফ আলি খান এই মিউজ়িয়ামটি তৈরী করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই মিউজ়িয়ামটির সূচনা করেছিলেন। ওখানে একটি ঘড়ির শো দেখলাম, ঠিক বেলা বারোটা বেজে বারো মিনিট বারো সেকেন্ডে সেই শো দেখানো হয়। প্রত্যেকটি ঘরই ঘুরে ঘুরে দেখলাম, স্থাপত্য ও অঙ্কনগুলো সত্যি দেখবার মতো। চীনের একটি মূর্তি দেখলাম, যার দুপাশে দুরকম। একদিকে পুরুষ মূর্তি আর পিছনের আয়নায় মূর্তির পিছন দিকটা দেখা যাচ্ছে, যেটা নারী মূর্তি। এইরকম অপূর্ব শিল্পকলা দেখে অবাক হয়ে গেলাম।

ওখান থেকে বেরিয়েই চলে গেলাম কুতুবশাহী সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে বিখ্যাত ভারতের প্রাচীন দুর্গ গোলকোন্ডা ফোর্ট। মিউজ়িয়াম থেকে গোলকোন্ডা অটোতে দেড়শো টাকা নিল। পার হেড ১৫ টাকা টিকিট কেটে আর ক্যামেরার জন্য ২৫ টাকা টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। গাইড ১২০০ টাকা চাইলেও শেষে ৯০০ টাকায় রাজি হলো। গাইড ছাড়া ঐতিহাসিক স্থানে ঘোরার কোনো তাৎপর্যই নেই। ভেবেছিলাম, সকালের বৃষ্টির জন্য দুর্গের সিঁড়ি পিছল হয়ে থাকবে কিন্তু এত রোদ উঠেছিল পরে যে, সব শুকিয়ে গেছিল। দুর্গে ঢোকার গেটেই একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে গাইড আমাদের হাততালি দিতে বলল। হাততালি দেওয়ার সাথে সাথে সারা দুর্গ জুড়ে সেই আওয়াজটা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ওখান থেকে এক পা সরে আবার হাততালি দিলাম কিন্তু এবার আর ঐরকম প্রতিধ্বনি হলো না অর্থাৎ ঐ জায়গাটির মেঝের পাথর বিশেষভাবে নির্মিত হয়েছিল, যা তখনকার দিনে কলিং বেলের কাজ করত। এরকম স্থপতি সত্যিই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। ২০১০ সালে এটি ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে স্থান পায়। গোলকোন্ডা হিরকখনির জন্য বিখ্যাত হওয়ার দরুণ খুব তাড়াতাড়ি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। বড় আকৃতির হিরকগুলি ‘গোলকোন্ডা ডায়মন্ড’ নামে পরিচিত। আরও অনেক হিরকখন্ডের সাথে বিখ্যাত নুরহাজান একসময় জমা রাখা ছিল এই গোলকোন্ডা দুর্গের ভল্টেই। কোন্ডাপাল্লি দুর্গের পশ্চিমভাগের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাকাটিয়া বংশের রাজত্বকালে রাজা কৃষ্ণদেব পাহাড়ের শীর্ষে এই দুর্গটি তৈরি করেছিলেন। পরে তাঁর উত্তরসূরী কন্যা রুদ্রমা দেবী এবং প্রপৌত্র প্রতাপরুদ্র এর পুনর্নির্মাণ করেন। দুর্গ এবং এর ভেতরের শহর একটি সুউচ্চ গ্রানাইট পাহাড়ের ওপর তৈরি হয়েছিল, যা উচ্চতায় ১২০ মিটার। ১৩৬৩ সালের এক চুক্তি অনুযায়ী, কাকাটিয়া রাজবংশ বাহমানি শাসকদের হাতে এই দুর্গের অধিকার ছেড়ে দেন। এরপর ১৪৯৫-১৪৯৬ সালের দিকে তারা জায়গীর কুলী কুতুব শাহের হাতে এর দায়িত্ব তুলে দেন। মূলত বাহমানি সালতানাত ৬২ বছরের মাটির দুর্গকে গ্রানাইট পাথর দিয়ে সংস্কার ও বিস্তৃত করে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। বাহমানিদের রাজ্যপাল সুলতান কুলী কুতুব-উল-মুলক ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে এটিকে শহরের কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যখন বাহমানি শাসন অস্তমিত হতে থাকে, তখন সুলতান কুলি তাঁর স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা চালু করেন এবং ১৫৩৮ সালে তিনি সেখানে কুতুব শাহী রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৫৯০ সাল অবধি এটি কুতুব শাহী রাজবংশের রাজধানী থাকার পরে তাঁদের রাজধানী হায়দ্রাবাদে স্থানান্তরিত হয়। ১৬৮৭ সালে দুর্গটি একেবারেই পরিত্যক্ত হয় এবং ঔরঙ্গজেবের হায়দ্রাবাদ দখলের পর দুর্গটি মুঘল অধীনে চলে আসে। চারটি দুর্গের সমষ্টি দিয়ে তৈরী এই দুর্গ কমপ্লেক্সটি চতুর্দিকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পেরিসিমার দেয়াল দিয়ে ঘেরা, যার প্রত্যেকটি ভাঁজ এবং কোণা খুব মজবুত। দুর্গের আটটি গেট এবং চারটি স্থানান্তরযোগ্য ব্রিজ আছে বলে গাইডের মুখে শুনলাম। তার মধ্যে পূর্ব দিকে অবস্থিত কেন্দ্রীভূত ধরণের খিলান ও মোড়ানো ধরণের নকশা বর্ডার দিয়ে তৈরী ‘বালা হিসার গেট’ হচ্ছে প্রধান প্রবেশপথ। এই দুর্গের ভিতরে আছে রাজকীয় আবাসন এবং দরবার হল, মন্দির, মসজিদ, অস্ত্রাগার। দুর্গের চূড়ায় একত্রে কালী মন্দির ও মসজিদ দেখে অবাকই লাগল। শুনলাম, নবাব তাঁর হিন্দু স্ত্রীর জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, যুদ্ধযাত্রার আগে তিনি পুজোও দিয়ে যেতেন। দুর্গটির একদম নিচে অবস্থিত সর্ববহিঃস্থ দেয়াল, যা দক্ষিণ-পূর্ব দিকের বড় লোহার স্পাইক দ্বারা অলংকৃত ‘ফাতেহ্’ (বিজয়ের দরজা) দরজা দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সৈন্যবাহিনী যুদ্ধে জিতে বিজয়ীর বেশে এই দরজা দিয়েই প্রবেশ করেছিল। গাইডের মুখেই শুনলাম যে, দরবার হল থেকে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি প্রাসাদ পর্যন্ত গোপন সুড়ঙ্গ রয়েছে, চারমিনারের দিকেও একটি সুড়ঙ্গ আছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।

দুর্গের ভেতরে রয়েছে তিনটি মসজিদ, তারামতি, ইব্রাহিম এবং হীরাখানা। বহি:দেওয়ালের থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে কুতুবশাহী সুলতানের রগজাও আছে। দুর্গের বাইরের দিকে দুটো আলাদা প্যাভিলিয়ন, আশলাহ্ খানা, বন্দিশালা, হাবশি কামান, উটের আস্তাবল, নাগিনা বাগ, আম্বরখানা, কারখানা, জল সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। সমসাময়িক স্থপতিবিদ্যার প্রয়োগ ও বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে ঠাণ্ডা, বিশুদ্ধ বাতাস দুর্গের বিভিন্ন অংশে প্রবাহিত হতে পারে। দুর্গের ভিতর প্যাভিলিয়ন, দরজা, প্রবেশপথ এবং গম্বুজ এই চারটি ভাগে বিভক্ত। চারশো বছর আগে নাকি সেখানে সুগন্ধি ছড়ানো বাগান ছিল। দুর্গের গেটগুলিতে ‘ইয়ালিস’ নামে হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন চিত্র এবং গোলাকার অলংকরণ বসানো আছে। দরজার উপরের অংশে খিলানময় কুলুঙ্গির শেষভাগ জুড়ে পেখম ছড়ানো ময়ূরের নকশা করা ছিল, নিচে গ্রানাইট ব্লক লিন্টেলের গায়েও একই ধরনের গোলাকার কারুকাজ দেখতে পাওয়া যায়। ময়ূর এবং সিংহের কারুকাজ মানেই সেখানে হিন্দু স্থাপত্যের ছোঁয়া রয়েছে কিন্তু মসজিদের স্থাপত্য শৈলীতে ইসলামিক রীতির ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়। সমগ্ৰ দুর্গ অংশটি মনোহর বাগান এবং বড় পাথরে ঘেরা, পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে পুরো শহরটাকে দেখা যাচ্ছিল। গাইডের মুখেই আক্ষেপ শুনলাম যে, দুর্গের স্থাপত্যগুলোর সৌন্দর্য ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ওনার মুখেই গল্প শুনতে শুনতে হাঁপাতে হাঁপাতে কয়েকশো সিঁড়ি ভেঙে দুর্গের উপরে উঠলাম। মাথার ওপরে গনগনে সূর্য, বেশ গরম লাগছিল। তিনটে মেয়ে যে একা একা এভাবে এত কষ্ট করে ওপরে উঠতে পারে, তা সম্ভবত গাইড দাদা ভাবতে পারেননি। অত ওপর থেকে নীচের শহরটাকে দেখতে দেখতে নিজেদের ‘আজ়াদ পরিন্দে’ মনে হচ্ছিল। জল খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে এবার নামার পালা। খাড়া সিঁড়ি ভেঙে ধীরে ধীরে নীচে নেমে বাইরে আসলাম। বিকেলের দিকে এখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-এর মাধ্যমে এই পুরো ইতিহাসটা দেখানো হয়। আমাদের হাতে সময়ও কম ছিল এবং পুরো ইতিহাস গাইডের মুখেই শুনে নিলাম বলে ওখানে আর অপেক্ষা করলাম না।

বাইরে এসে ঠাণ্ডা লেবুজল খেয়ে অটোয় করে চললাম কুতুব শাহি টম্বের দিকে। অটোওয়ালাকে একেবারে আড়াইশো টাকা দিয়ে বুক করলাম এখান থেকে টম্ব আর টম্ব থেকে লাড বাজারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। গোলকোন্ডা ফোর্টের থেকে ৮৫০ মিটার দূরে ফোর্টের বানজারা গেটের কাছে ইব্রাহিম বাগে রয়েছে এই টম্বটি। এখানে রয়েছে কুতুব শাহি সাম্রাজ্যের সাতটি কবর ও মসজিদ। ১৯ শতকে তৃতীয় সালার জং এই স্থানটির পুনর্নির্মাণ করেন। সুলতান কুলি, তাঁর ছেলে জামশেদ, ইব্রাহিম কুলি কুতুব শাহ্, আবুল হাসান কুতুব শাহ্, যমজ ভাই নিজ়ামুদ্দিন আহমেদ গিলানি ও আব্দুল জব্বার গিলানি, হুসেইন শাহ্ আলি প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের কবর এখানে শায়িত রয়েছে। এখনও সেখানে নির্মাণকার্য অব্যাহত রয়েছে দেখলাম।

বেরিয়ে এবার চললাম লাড বাজারের দিকে। সেদিন যেই চুড়িদার আর লেহেঙ্গা অল্টার করতে দিয়েছিলাম, সেগুলো আনতে হবে তো! আশ্চর্য হয়ে ভাবলাম, সারা দিন এত ঘুরলাম, সেরকম কারও খিদে এখনও পায়নি! লাড বাজারে নেমে প্রথমে গেলাম মক্কা মসজিদের দিকে। ওখানে মাথা না ঢেকে মেয়েরা ঢুকতে পারবে না। আমরা জিন্স পরেছিলাম। তাই, আর ভিতরে ঢুকতে পারিনি। মসজিদের বাইরের দোকানে রকমারি সুগন্ধি আতর কিনতে কিনতে ভারতের বৃহৎ ও প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম এই মসজিদের ইতিহাস শুনছিলাম। কুতুব শাহী সাম্রাজ্যের পঞ্চম শাসক মহম্মদ কুলি কুতুব শাহ্ ১৬৯৪ সালে সমগ্ৰ শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে এই মসজিদটি স্থাপনা করেন। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্রতম স্থান সৌদি আরবের মক্কা থেকে আনা মাটি থেকে তৈরী ইট দিয়ে এই মসজিদটির মূল ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তাই, এই মসজিদের নাম ‘মক্কা মসজিদ’। পাঁচ বছর ধরে ৫০০০ শ্রমিক গ্রানাইটের টুকরো দিয়ে মসজিদটির সম্মুখের খিলানগুলোর নক্সাগুলো তৈরী করেন। মহম্মদ কুলি কুতুব শাহ্ এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে হায়দ্রাবাদ জয়ের পর ঔরঙ্গজেব এই মসজিদের নির্মাণকার্য সমাপ্ত করেন। ১৮০ ফুট দীর্ঘ, ২২০ ফুট চওড়া এবং ৭৫ ফুট উঁচু প্রধান হলটিতে একসাথে ১০,০০০ জন নামাজ পড়তে পারেন। তিন সারিতে পাঁচটি করে সাজানো পনেরোটি খিলান এই হলের ছাদটিকে সাপোর্ট দেয়। মসজিদের প্রধান স্থাপনা একটিমাত্র গ্রানাইটের টুকরো দিয়ে তৈরী দুটি বিশাল অষ্টাভুজাকৃতির কলাম দ্বারা গঠিত। এই মসজিদটির স্থাপত্যকলার সাথে চারমিনার ও গোলকোন্ডা দুর্গের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মসজিদের মূল ভবনের ছাদের চার দেওয়াল গ্রানাইট ব্লক দিয়ে আবৃত। মসজিদের প্রবেশ দরজায় একটি কোণাকুণি আকৃতির দালান আছে, যেখানে শাসক আসাফ জহিরের একটি মার্বেল পাথরের আবরণ দেওয়া কবর আছে। উনি নিজেই তাঁর শাসনকালে এই স্থাপনাটি তৈরী করেছিলেন। এই একই জায়গায় নিজ়াম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কবরও রয়েছে। আতরের দোকানদার আক্ষেপের সুরে বললেন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এবং দূষণের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার অনেক অংশই নষ্ট হয়ে গেছে এবং ভেঙে গেছে। ১৯৯৫ সালে ঐ জায়গায় রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটার ফলে ভবিষ্যতে এই স্থাপনাটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ২০১১ সালের আগস্ট মাস থেকে তৎসংলগ্ন এলাকাটিকে যানবাহন মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেন। এছাড়াও ২০০৭ সালের ১৮ ই মে জুমার নামাজের সময় এই মসজিদে সন্ত্রাসবাদীরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, যার ফলে প্রায় ১৩ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়।

ওখান থেকে বেরিয়ে আরেকবার ফালুদা খেলাম তিনজনে। চিয়া বীজ, মালাই, খোয়া ক্ষীর, চেরি, পেস্তা, কাজু, আলমন্ড, ক্রিম, দুধ, বিভিন্ন ফল, জেলি, ফলের রস দিয়ে বানিয়ে যখন সুস্বাদু ফালুদা দিল, তখন মনে হচ্ছে কতক্ষণে পুরো খেয়ে শেষ করব! আজ আর এতে আইস নিইনি। খাওয়া শেষ হলে যখন চুড়িবাজারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, তখন আবার লোভ সংবরণ করতে না পেরে আমরা আরও কয়েক গাছা চুড়ি কিনে নিলাম। তুলি কয়েকটি সুন্দর বটুয়া, শাড়ির ব্রোজ-ও কিনল। এবার আমরা লেহেঙ্গার দোকানে গিয়ে ওটা নিলাম কিন্তু আমার আর তুলির চুড়িদার অল্টার তখনও বাকি ছিল। তাই, সেই দোকানে বসেই পাক্কা দু ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। আর সেই অপেক্ষার মাঝেই তুলি আরেকটা চুড়িদার ও আরেকটা শাড়ি এবং সেমু একটা কালচে খয়েরি লেহেঙ্গা কিনব না কিনব না করেও কিনে ফেলল। বলা বাহুল্য দোকানদারের আনন্দ আর তখন দেখে কে! তবুও দোকানদারের অত্যন্ত খাতিরদারিতেও আমি অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করে রেখেছিলাম (গরীব অওরতের এত শখ থাকা ভালো নয়, তাই)।

বাড়ি ফিরতে সওয়া নটা বাজল। বছরের শেষ রাতটা কীভাবে কাটাব, এই প্ল্যান করে আমরা খাবার অর্ডার দিলাম। আজ খাবারে সব চাইনিজ় ছিল। খাওয়া শেষ করতে করতে রাত বারোটা বাজল, সবাই একে অপরকে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ উইশ করলাম। কলকাতার জন্য তখন মন কেমন করছিল। কাল কাকভোরে বেরিয়ে পড়ব। ভোর পাঁচটায় ওলা প্রি-বুক করে রাখল দাদা। আমরাও ব্যাগ সব গুছিয়ে রাখলাম।

বেশিক্ষণ ঘুমাইনি, বড় জোর ঘণ্টা দেড়েক। উঠে পড়ে রেডি হয়ে নিলাম। সোয়েটার গায়ে দিয়ে নিলাম কারণ জানি, কলকাতায় মারাত্মক ঠাণ্ডা চলছে। ওলা যথাসময়ে আসল। সেমুকে বিদায় জানিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। আমাদের দুজনের লাগেজ টানতে আমাদের কালঘাম ছুটে যাচ্ছিল। লেহেঙ্গা, চুড়িদার আর শাড়ির ওয়েটে ব্যাগ আর নাড়াতে পারছিলাম না, হাত ছিঁড়ে যাচ্ছিল। কোনরকমে টেনে হিঁচড়ে ওগুলোকে লাগেজ বক্সে পাচার করে দিয়ে এলাম। ঘুম কম হওয়ার জন্য এবং খাবার ঠিকমতো তখনও হজম না হওয়ার জন্য শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। ফ্লাইটে আমি আর তুলি গল্প করতে করতে কখন ঘুমিয়েও পড়েছিলাম একটু ক্ষণের জন্য। চোখ খুলতেই আবার আমার সিটি অফ জয়, আমার শহর কলকাতা। হ্যাপি নিউ ইয়ার, কলকাতা।