আজ এক গার্লস ট্যুরের কাহিনী শোনাই। ছোটবেলার বন্ধু সেমন্তীর বিয়ে হয়েছে হায়দ্রাবাদে। অনেকদিন ধরে ওর কাছে গিয়ে আমাদের বন্ধুদের থাকতে বলছে কিন্তু কিছুতেই আর যাওয়া হয়ে উঠছে না। গরমের ছুটিতে প্ল্যান করেও ভেস্তে গেল। সকলেই খুব ভয় দেখালো যে, হায়দ্রাবাদের গরমে এক্কেবারে শিক-কাবাব হয়ে যাব। তাই, প্ল্যান ক্যানসেল কিন্তু আমরাও ছোড়নেওয়ালি বান্দি নই। স্কুলে শীতের ছুটি পড়ার আগেই রাত জেগে প্ল্যান করে বাবা-মায়ের কাছে চেয়ে চিন্তে, পাঁচটা কথা শুনে, টাকা ধার করে কলকাতা টু হায়দ্রাবাদ দুটো প্লেনের টিকিট কেটে ফেললাম। গরিব মানুষ আমরা, তাই, যে সময়ে সবচেয়ে কম ভাড়া হয়, সেই প্লেনের টিকিটই বেছে বেছে কাটলাম। আর তাতে আমাদের বোর্ডিং টাইম হলো ভোর ৪টে। কুছ পরোয়া নেহি, সারারাত তো এমনিই উত্তেজনায় ঘুম হবে না, জানি। জীবনে প্রথমবার কোনো অভিভাবক ছাড়া বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাচ্ছি, তাও আবার প্লেনে চেপে, এ কি ভাবা যায়!

আমার বাড়ি থেকে এয়ারপোর্ট দশ মিনিটের দূরত্ব, এই যা রক্ষে! সাতাশে ডিসেম্বর সন্ধ্যেবেলাই লটরপটর আর সাথে একগাল হাসিমুখ আর উত্তেজনা নিয়ে তুলি চলে এলো আমার বাড়ি। শেষ মুহূর্তের প্যাকিং শেষ করে কোনোরকমে খেয়ে দুজনে লেপের তলায় শুয়ে গল্প করতে লাগলাম। ঘুম যে কোথায় উবে গেছে, জানি না। দুটোর অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম যদিও। গল্প করতে করতে একটু ঘুম আসছিল চোখে। ঘড়িতে দেখলাম, দেড়টা বাজে আর আধঘণ্টা পরেই উঠতে হবে। ওমা! হঠাৎ দেখি, অ্যালার্ম বাজছে। কখন চোখ লেগে গেছে, বুঝিনি। বাইরে তখন তাপমাত্রা ৭° সেন্টিগ্ৰেড। এত ঠাণ্ডায় লেপের ভিতর থেকে বেরিয়ে রেডি হয়ে হাতমুখ ধুয়ে বেরোতে যে কী কষ্ট হচ্ছিল, তা শুধু ভগাদাই ফীল্ করতে পারছিল। নিজেদেরকেই মনে মনে খান কুড়ি গালাগালি দিলাম এইরকম অদ্ভুত সময়ে টিকিট কাটার জন্য! অনেক কষ্টে লেপ থেকে বেরিয়ে রেডি হয়ে খানকতক সেল্ফি তুলে ওলা বুক করলাম। বাইরে বেরিয়ে বুঝলাম, উলের কুর্তি পরে থাকা সত্ত্বেও হি হি করে কাঁপছি। যদিও সেমন্তী সোয়েটার নিয়ে যেতে বারণ করে দিয়েছিল, হায়দ্রাবাদে খুব একটা ঠাণ্ডা নেই বলে কিন্তু আমি হেব্বি শীতকাতুরে। তাই, লাগেজে সোয়েটার ছিলই। লাগেজ খুলে তাড়াতাড়ি আরেকটা মোটা সোয়েটার গায়ে গলিয়ে নিলাম। ঐ ভয়ঙ্কর শীতের রাতে রাস্তায় একটা জনমনিষ্যি তো দূর কি বাত, একটা নেড়ি কুকুর পর্যন্ত নেই (অবশ্য আমাদের মতো গরিব আদমি আর কজনই বা আছে)!

ওলা যখন এয়ারপোর্টে নামাল, তখন মনেই হচ্ছে না যে, রাত পৌনে তিনটে বাজে। দুদিন আগেই ক্রিস্টমাস গেছে, আর কিছুদিন পরেই ইংরেজি নববর্ষ আসছে। সারা এয়ারপোর্ট আলোয় সুসজ্জিত, এত সুন্দর লাগছিল! এই আলোয় আরও কিছু সেল্ফি খচাক্ করে নিলাম। আমাদের আরও এক বন্ধু প্রীতিরও যাওয়ার কথা ছিল। ওর ছেলের কিছু অসুবিধের কারণে শেষ অবধি ও যেতে পারল না। আহা, বেচারি খুব দুঃখ পেয়ে আমাদের যখন তখন অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছিল, যাতে আমাদের যাওয়াটা পণ্ড হয়! কিন্তু শকুনের অভিশাপে গরু মরে না, তাই, শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে ‘হিপ্ হিপ্ হুররে’ বলে দুটো চিকেন স্যান্ডউইচ্ খেতে খেতে (কারণ ততক্ষণে আমাদের মনে পড়েছে যে, রাত্রে উত্তেজনায় সেরকম কিছু খাওয়া হয় নি, খিদেয় তখন পেট চোঁ চোঁ করছে😥) আমরা বোর্ডিং শেষ করে যখন প্লেনে চেপে বসলাম, তখন আমাদের সেই ব্যাপক উত্তেজনা, টুক করে ফেবুতে স্ট্যাটাস দিয়ে দিলাম। ঐদিকে সেমুও (সেমন্তী) সারারাত জেগে, ততক্ষণে ফেবুতে আমাদের ওয়েলকাম স্ট্যাটাসও দিয়ে দিয়েছে সে! ফ্লাইট মাটির বুক ছেড়ে যখন আকাশে ডানা মেলল, আমাদের বহুদিনের ছোটবেলার স্বপ্নগুলো পূরণ হওয়ার প্রথম পদক্ষেপে পৌঁছাল। ছোটবেলার বন্ধুরা একসাথে দূরে কোথাও ঘুরতে যাব, এইরকম স্বপ্ন সাধারণত মেয়েদের দেখা বারণ, তা সে যত বড়ই হয়ে যাক্ না কেন কিন্তু আমরা দেখেওছি আর স্বপ্নপূরণও করতে চলেছি তখন! জানলা দিয়ে তাকিয়ে নীচের ঝলমলে কলকাতাকে ক্রমশ ছোট হতে দেখতে দেখতে চোখটা জড়িয়ে এলো… বায় বায় কলকাতা… দ্য সিটি অফ জয়… আবার চোখ খুলব নিজ়ামের শহরে…