বিয়ের পর আবীর তার বউ তৃণাকে নিয়ে নতুন বাসায় ওঠেছে আড়াই মাস হলো। চার-পাঁচ দিন হয়ে গেলো বত্রিশ ইঞ্চি স্মার্ট এলইডি টিভি কিনে ওদের বেডরুমের দেয়ালে লাগানো হয়েছে কিন্তু এখনো ডিশ লাইনের কেবল কানেকশান দেওয়া হয়নি। তৃণা দিনের বেলা বাসায় একা থাকে। ডিশ কানেকশন দেওয়ার সময় আবীরকে বাসায় থাকতে হবে আর সেটা হতে হবে সকাল দশটার পর কারণ দশটার আগে ডিশ কানেকশনের লোকরা তাদের কাজ শুরু করে না। কিন্তু সে প্রতিদিনই দশটার আগে বের হয়ে যায় আর আসে রাতে তাই আর ডিশ কানেকশন নেওয়ার জন্য ফোন করা হয়নি।
আজ জুন মাসের তেরো তারিখ। আগামীকাল থেকে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৮ শুরু হচ্ছে। আসলে এই টাকা পয়সার টানাটানির সময়ে আবীরের এতো তাড়াতাড়ি টিভি কেনার কোনো পরিকল্পনা ছিলো না কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ এসে যাওয়ায় টিভি না কিনলে আর হয় না তাই তাকে টিভি কিনতে হলো। সেই দশ বছর বয়স থেকে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা দেখা সে কখনো বাদ দেয়নি। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা নিয়ে তার প্রচ- উত্তেজনা কাজ করে সব সময়ই। তাই নতুন বউকে নিয়ে সেইউত্তেজনা এবার আরও বেশি। তাই বউকে বাসায় রেখে অন্য কোথাও গিয়ে খেলা দেখা সম্ভব নয় বলে টিভি কিনেছে সে। টিভি না কিনলে অন্য কথা আর একটা জিনিস কিনলে দীর্ঘ দিনের জন্যইকেনা উচিত। তাই কমদামী জিনিস না কিনে বত্রিশ ইঞ্চি স্মার্ট এলইডি টিভিই কিনলো আবীর যাতে অন্তত পাঁচ বছর চলে যায়।
জুন মাসের ষোল তারিখ আবার রোজার ঈদ তাই কালকের মধ্যে ডিশ কানেকশন না নিলে ঈদের আগে আর কানেকশন পাওয়া যাবে না। পল্লবী কেবল কানেকশনের একটা মোবাইল নাম্বার ওর কাছে আছে। সকাল নয়টায় একটা জরুরী কাজে বেরিয়ে দুপুর দুইটায় বাসায় ফিরার পথে আবীর ডিশ কানেকশনের জন্য ফোন করে সাজু নামের একজনকে। লোকটা বললো, নরমালভাবে ডিশ কানেকশন দেওয়া যাবে না তাই কানেকশনের জন্য তাকে কেবল অপারেটরের অফিসে যেতে হবে। টাকা বেশি লাগবে।
আবীর বললো, চার বছর ধরে পল্লবীতে থাকি কিন্তু ডিশ কানেকশনের জন্য অফিসে যাইতে হয় এই কথা তো কখনো শুনিনাই। নরমাল হোক আর এবনরমাল হোক বাসায় লোক পাঠান টাকা যা বেশি লাগবে দিয়ে দিবো।
এবার লোকটা বুঝতে পারলো আবীর এই বিষয়ে অভিজ্ঞ তাই বললো, আচ্ছা আমি তো অন্য কাজে ব্যস্ত আপনি আমার রবি নাম্বারের শেষে ৪৫ এর জায়গায় ৩৩ দিয়ে কল দেন। তার সাথে কথা বলেন।
আবির ৩৩ দিয়ে কল দিলো, আমার বাসায় ডিশ লাইন দিতে হবে। কাউরে একটু পাঠায়া দেন।
আপনে আমার নাম্বার পাইলেন কোথায়?
আপনার নাম্বারের শেষে ৩৩ এর জায়গায় শেষে ৪৫ নাম্বারটা যার তার কাছ থেকে।
আপনে শেষে ৩২ নাম্বারে কল দেন।
শেষে ৩২ নাম্বারে কল দিছিলাম সেখান থেকেই বলছিলো ৪৫ নাম্বারে কল দিতে আর ৪৫ নাম্বার থেকে বললো আপনাকে কল দিতে।
আচ্ছা আপনে একটা বাংলালিংক নাম্বার লেখেন তার নাম ইউসুফ।
আবীর তো গাড়িতে নাম্বার লেখতে পারবে না তবু বললো, বলেন লিখে নিচ্ছি।
লোকটা নাম্বার বললে আবীর দুই বার রিপিট করে মুখস্ত করে কলটা কেটে দিয়ে বাংলালিংক নাম্বারটা ডায়াল করলো।
ইউসুফ নামের লোকটা ফোন ধরলো। আবীর বললো, আমার বাসায় ডিশ লাইন দিতে হবে।
রোড নাম্বার আর বাসা নাম্বার কতো?
রোড নাম্বার ছয় আর বাসা নাম্বার এগারো। আমার আগে যারা থাকতো তাদের টিভি ড্রয়িং রুমে ছিলো আমি বেডরুমে টিভি চালাবো তাই ড্রয়িংরুম থেকে লাইনটা বের করে বেডরুমের জানালা দিয়ে ঢুকাতে হবে।
তাইলে তো একস্ট্রা তার লাগবে?
হ্যা লাগতে পারে।
তাইলে আজকে আর হবে না। কালকে সকাল দশটা এগারোটার দিকে করে দিবো।
তাইলে আমি দশটায় ফোন দেই।
না। দশটায় না আপনে সকাল এগারোটায় ফোন দেন।
আচ্ছা আমি সকাল এগারোটায় ফোন দিবো।
আগামীকাল ১৪ জুন। শুরু হবে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। সকাল থেকে প্রচ- টেনশন হচ্ছিলো আবীরের। আজকে নিশ্চয়ই অনেক বাসায় লাইন দেবার কথা। যদি তাদের বাসায় লাইন দেবার সিরিয়ালটা পিছিয়ে যায়? এজন্য এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে সকাল দশটায় ইউসুফ নামের লোকটাকে ফোন করলো আবীর, আমার বাসায় ডিশ লাইনটা কখন দিবেন?
কতো নাম্বার বাসা যেন?
রোড নাম্বার ছয় বাসা নাম্বার এগারো।
আচ্ছা লাইন অবশ্যই দিবে দুপুরের আগে তবে সময়টা বলতে পারবো না।
আচ্ছা অবশ্যই দিয়েন কিন্তু মিস কইরেন না।
না। মিস হবে না দুপুরের আগেই দিবে।
আবীর দুপুর সোয়া দুইটা অবধি অপেক্ষা করে। ডিশ লাইন দিতে কেউ আসে না। তাই আবার ফোন করে, ইউসুফ ভাই। দুইটা বাজে লাইন দিতে ত কেউ আসল না এখনো।
কাজের চাপ বেশি তাই দেরি হইতেছে। ওয়েট করেন দিয়ে দিবে।
আবীর তৃণাকে জিজ্ঞেস করে, খেলা কয়টায় শুরু হবে?
তৃণা বললো, সন্ধ্যা ছয়টায়।
অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে তিনটার দিকে আবীর ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমটা জরুরী ছিলো তার। একে তো রমজান মাস তার উপর নতুন দাম্পত্যকে উপভোগ করতে রাতে অনেক সময় দিতে হয়। তারপর আবার সেহেরি খাবার জন্য শেষ রাতে এক ঘন্টার বেশি ঘুমের ব্যাঘাত হয় তাই দিনে ওকে ঘুমাতে হয়। গতকাল পর্যন্ত অফিসের কাজ ছিলো আজ সকালে ওঠে গেলো ঈদের বাজার করতে তাই ঘুমের ঘাটতি রয়ে গেছে। তারপর যখন চোখ জুড়ে ঘুম আসে তখন সাড়ে তিনটায় কলিং বেল বাজে। হুড়মুড় করে বিছানা থেকে ওঠে গিয়ে খালি গায়ে দরজা খোলে আবীর। অবশেষে ডিশ লাইন দিতে একটা লোক এসেছে। ড্রয়িংরুম থেকে তার খোলে নিয়ে লোকটা বললো, কোন রুমে টিভি?
আবীর বললো, এই রুমে। বলে বেডরুমে টিভির কাছে নিয়ে গেলো লোকটাকে। টিভির কাছাকাছি জানালাটা দেখিয়ে বললো, এই দিক দিয়ে তার ঢুকাতে হবে।
লোকটা বললো, পনেরোশ টাকা দেন।
আবীর পনেরোশ টাকা দিলো। লোকটা টাকা নিয়ে চলে গেলো। আবীরের ধারণা ঘন্টা খানেকের মধ্যে লোকটা মাপ মতো তার নিয়ে এসে লাইন দিবে। তাই ততক্ষণ সে ঘুমাবে বলে পৌনে চারটার সময় আবার শুয়ে পড়লো।অনেক প্রত্যাশিত ঘুমে শরীরটা মুহূর্তে জড়প্রায় হয়ে যায়। প্রায় সোয়া দুই ঘন্টা পর ঘুম ভাঙলে সাথে সাথে ঘড়ি দেখে আবীর। ছয়টা দশ বাজে তখন। তার মানে খেলা শুরু হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ইউসুফ সাহেবকে ফোন করে, ইউসুফ ভাই সাড়ে তিনটার সময় একজন এসে টাকা নিয়ে গেলো কিন্তু তিন ঘন্টা হয়ে গেলো এখনো লাইন দিতে আসেনাই।
ইফতারের আগে তো আসবে না। টাকা যেহেতু নিছে ইফতারের পরে আসবে লাইন দিতে।
স্মার্ট টিভিতে ওয়াইফাই লাইন আছে তাই আবীর তাড়াতাড়ি করে অনলাইনে খেলা দেখতে সার্চ দিলো ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৮ লিখে। একটা ওয়েবসাইটে বাংলায় খেলার সিডিউল এলোকিন্তু লাইভ অপশন নেই কারণ রাশিয়া বনাম সৌদী আরবের খেলা রাত নয়টায়। আরেকটা ওয়েবসাইটে দেখলো মস্কো স্টেডিয়ামে খেলার উদ্বোধন হবে রাত সাড়ে আটটায়। বিটিভি সহ কয়েকটি চ্যানেলে সরাসরি খেলা দেখাবে। তার মানে সে শুধু শুধু অস্থির হচ্ছে। এক সাথে স্বস্তি ও বিরক্তি নিয়ে আবীর তৃণাকে ধমক দেয়, কে বলছে তোমাকে ছয়টায় খেলা?
তৃণা বলে, ও। কী জানি তুমিই তো গতকালকে বললা ছয়টায় খেলা হবে।
গতকালকের কথা গতকালকে। না জেনে উল্টা পাল্টা কথা বলবা না।
কেন?খেলা কখন?
খেলা নয়টায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সাড়ে আটটায়।
হুম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা অনেক সুন্দর হয়। সেটাও দেখতে হবে।
ঠিক আছে এখন খাবার আনো তাড়াতাড়ি।
খাবার এনে কী হবে? ইফতারের সময় তো হয়নাই।
আবীর ঘড়িতে দেখলো ছয়টা বাইশ বাজে। ইফতারের আরও তিরিশ মিনিটের মতো বাকি।
ইফতার শেষ করে আবীর ডিশ কানেকশানের লোকটার আসার অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু লোকটা আসছে না। আবীর হিসাব করতে থাকে। ছয়টা পঞ্চাশে ইফতার হলে ইফতার শেষ করে নামাজ পড়ে বা রেস্ট করে কাজে বের হতে লোকটার আধঘন্টা লাগতে পারে আর বের হওয়ার পর এখানে আসতে আসতে আরও আধঘন্টা লাগতে পারে। তার মানে একঘন্টা অপেক্ষা করতে হতে পারে।রাত আটটা বাজলো। ইফতারের পর এক ঘন্টার বেশি হয়ে গেলো। আবীর ইউসুফ নামের লোকটাকে আবার ফোন দিলো, ইউসুফ ভাই। ইফতারের পর এক ঘন্টার বেশি হয়ে গেলো। এখনো তো লাইন দিতে এলো না।
কী বলবো ভাই। ওর মোবাইল তো বন্ধ পাচ্ছি। আমি তো দেশের বাড়িতে আইছি। মোবাইল বন্ধ। তাই আমি নিজেই খুব বিপদে আছি। অপেক্ষা করেন। আমি মোবাইলে ট্রাই করতেছি। দেখি কখন খোলে।
কিছু করার নেই। আবার শুরু হলো অপেক্ষা। রাত সাড়ে আটটায় ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে জেনে আবীর নিশ্চিত হয়েছিলো যে, তার আগে অবশ্যই ডিশ লাইন দিয়ে দিবে কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সেটা আর হবে না।
এদিকে তাদের অপেক্ষাটা শুধু ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, ফুটবল খেলা দেখা বা ডিশ কানেকশন নয়। সারা দিন রোজা রাখার পর নব দম্পতি আরো কিছু ম্যাচ খেলার অপেক্ষা করে। ওরা ওদের শারীরিক তৃপ্তির ম্যাচ খেলতে আর দেরি করতে পারছে না। ইফতারের এক ঘন্টা পর তাদের এই ম্যাচ খেলার কথা। আবীর ভেবেছিলো এই এক ঘন্টার মধ্যেই ডিশ লাইন দেবার কাজ হয়ে যাবে। এখন আর বেশি সময় অপেক্ষা করলে ফুটবল খেলা শুরু হয়ে যাবে। খেলা শেষ হতে হতে রাত সাড়ে দশটা বেজে যাবে। আবীরকে আবার রাত দশটায় অফিসের একটা মিটিংয়ের জন্য বাসার বাইরে যেতে হবে। ডিনারও করবে সেখানেই। ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বেজে যাবে। তখন ক্লান্ত শরীরে শারীরিক খেলাটা ঠিক উপভোগ্য হবে না। তাই ডিশ লাইনের লোকটার জন্য অপেক্ষা না করে ওরা পরিণয়ের অতিপ্রাকৃত উপভোগের খেলাটা শুরু করে দেয়।
প্রচ- আবেগে ওরা একে অন্যের শরীরকে স্পর্শ করে। অনেক গভীর ও অনেক দীর্ঘ সে স্পর্শ। অনেক শিল্প ও অনেক ছন্দে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে সেইস্পর্শ। আহ্ কী হর্ষ আর কী সুখের সেইস্পর্শ। বিচিত্র রকমের বিচিত্র ঢংয়ের সেই স্পর্শ। নর আর নারীর মধ্যে যতো রকম স্পর্শ হতে পারে তার সব রকম স্পর্শই চলতে থাকে ওদের মধ্যে। পাঁচ মিনিট অন্তরঙ্গ ও ঘনিষ্টতম স্পর্শে ওরা দুজন চূড়ান্ত শারীরিক মিলনের জন্য চরমভাবে উত্তেজিত হয়। একে অন্যের শরীর থেকে সব পোশাক খোলে নেয়। আদিম নগ্নতার পোশাকে ওরা তৈরি হয় রমণের জন্য। কিন্তু রমণ শুরু করতে যেতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। আবীর বললো, লোকটা ভালো সময়ে এসেছে। দুই মিনিট পরে এলেই ঝামেলা হয়ে যেতো। না পারতাম থামতে আর না পারতাম এগুতে।
তৃণা বললো, হ্যা। আমাদের তো আবার পনেরো মিনিটের আগে করা শেষ হয় না।
আবীর কাপড় পরতে পরতে তৃণাকে বললো, তাড়াতাড়ি কাপড় পরে নাও।
তৃণা সম্পূর্ণ নগ্ন দেহে কাপড়গুলো হাতে নিয়ে বললো, আমি পাশের রুমে ঢুকছি। তুমি দরজা খোলে দাও। লোকটা ভুল বাসায় এসেছে মনে করে আবার চলে না যায়।
তৃণা পাশের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। আবীর বাসায় ঢুকার দরজা খোলে দিলো।
লোকটা দরজার ভেতরে ঢুকে ড্রয়িংরুম আর ডাইনিংরুম সব অন্ধকার দেখে থমকে দাঁড়ালো। আবীর পথ দেখিয়ে বললো, আসেন। বেডরুমে আসেন।
লোকটা বেডরুমে এলো। হাতে রিংয়ের মতো প্যাঁচানো অনেক লম্বা তার। লোকটা তারের এক মাথার নবটা টিভির পেছনে লাগিয়ে তারের প্যাঁচ খোলে জানালা দিয়ে সবটুকু তার নামিয়ে দিলো।
তৃণা কাপড় পরে বেডরুমে ঢুকলো। আর এর মধ্যে লোকটার মোবাইলে ফোনে কল ঢুকলে লোকটা প্রচ- বিরক্ত হয়ে ফোন ধরলো, হ্যালো ইউসুফ ভাই। হ্যা এই বাসায়ই আইছি এখন। ওনারে বলছি আধঘন্টা পরে আসবো। আর দুইটা লাইন আজকে দেওয়া যাবে। বাকিগুলো ঈদের আগে সম্ভব না।
কথা শেষ করে লোকটা আবার ফোন বন্ধ করে দিয়ে বললো, ফোন খোলা রাখলেও সমস্যা।
আবীর জিজ্ঞেস করলো, আপনাদের আজকে অনেক প্রেসার?
হ্যা। প্রচ- প্রেসার। পাগল হওয়ার মতো অবস্থা।
বিশ্বকাপের জন্য প্রেসার?
হ্যা আজকে বিশ্বকাপ, কালকে ঈদ। প্রচুর লাইন দিতে হইতেছে।
হ্যা। এই কয়দিনে প্রচুর টিভি বিক্রি হইছে।
লোকটা জানালা দিয়ে তার নামানো শেষ করে বাসা থেকে বের হবার দরজার দিকে গেলো। আবীর ভাবলো বোধ হয় কিছু আনতে গেলো। তারপর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে দরজা লাগিয়ে দিলো।দশ মিনিট পর টিভিতে ডিশ লাইন এলো। কিন্তু খুব একটা ভালো না। ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলছে এখন। তার মানে লোকটা লাইন দিতে তিন তলা থেকে নিচে নেমে বিল্ডিংয়ের পেছনে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পর নয়টা বেজে গেলো। রাশিয়া বনাম সৌদী আরবের খেলা শুরু হলো। খেলা কোনো রকম বোঝা যাচ্ছে। লোকটার ফোন নাম্বার এবারো রাখা হলো না। এদিকে আধঘন্টা হয়ে গেছে। লোকটা নিশ্চয়ই চলে গেছে। লাইন দেওয়ার জন্য ইউসুফ লোকটাকে দুই দিন ধরে বহুবার ফোন করা হলো। এখন লাইন ক্লেয়ার করার জন্য আবার ফোন করতে ইচ্ছা করলো না। আর ফোন করেই বা লাভ কী? লোকটার মোবাইল তো বন্ধ। ওরা যখন নিশ্চিত হলো যে লোকটা কাজ করে চলে গেছে আর আসবে না তখন টিভি মিউট করে রেখে আবার রমণের খেলার জন্য প্রস্তুত হলো।
আবারো বিপুল আবেগের টানে ওরা পরস্পরকে স্পর্শ করে। অনেক বিচিত্র আর অনেক গভীর অনুভবের সে স্পর্শ। অনেক সুখের ও অনেক ছন্দময় সেই স্পর্শ আবারো চলতে থাকে। আবারো চলে বিচিত্র সুখের বিচিত্র হর্ষের সে স্পর্শ। নর আর নারীর মধ্যে যতো রককম স্পর্শ হতে পারে তারসবই চলতে থাকে। চরমভাবে উত্তেজিত হয়ে আবারো ওরা একে অন্যের সব পোশাক খোলে নেয়। আদিম অনুভূতির পোশাকে সজ্জিত হয় ওদের তৃষ্ণার্ত মন।
তারপর মিউট করা টিভিতে নিঃশব্দে চলতে থাকে রাশিয়া ও সৌদী আরবের বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ। আর বেডরুমের বিছানায় বিচিত্র সব শব্দে চলতে থাকে ওদের শারীরিক উপভোগের ম্যাচ। ওদের বিছানার ম্যাচ শেষ হবার পর ওরা একে অন্যের থেকে আলাদা হবার পর আবীর প্রথমে বাথরুমে ঢুকে। দুই মিনিট পর আবীর বাথরুম থেকে বের হলে তৃণা বাথরুমে ঢুকার সাথে সাথে আবার কলিং বেল বেজে উঠলো।
বাথরুমের দরজা আধখোলা ছিলো। আবীর বললো, ওই লোকটা মনে হয় আবার এসেছে। তৃণা বাথরুম থেকে বের হয়ে নগ্ন দেহে কাপড়গুলো হাতে নিয়ে আগের মতো আবার পাশের রুমে ঢুকে পড়ে আর দরজা লাগিয়ে দেয়।
আবীর আবার বাসায় ঢুকার দরজা খোলে দিয়ে বেডরুমে যায়। ডিশের লোকটা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে অন্ধকার দেখে বলে, ভেতরে আসবো?
আবীর বলে, হ্যাঁ। আসেন।
লোকটা বেডরুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো, লাইন ঠিক আছে?
টিভি মিউট করা ছিলো। ওরা তো অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলো তাই লাইন ঠিক হয়েছে কি না এতোক্ষণ বুঝতে পারেনি। আবীর টিভি আনমিউট করে দেখলো লাইন একদম ক্লেয়ার আসছে। চ্যানেল পাল্টিয়ে আগে ও পরের কয়েকটা চ্যানেল দেখে নিয়ে বললো, হ্যাঁ। ঠিক আছে।
লোকটা চলে গেলো। তৃণা কাপড় পরে বেডরুমে ঢুকলে আবীর বললো, লোকটা এখনো ঠিক সময়ে এসেছে। একটু আগে আসলে কী যে ঝামেলা হতো। পৌনে দশটা বাজলে আবীর মিটিং ও ডিনারের জন্য বের হয়ে গেলো।
তারপর ১৫ জুন সারাদিন ও রাত এগারোটা পর্যন্ত ওরা টিভি দেখে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সকালে ঈদ। ঈদের নামাজ পড়ে এসে আবীর দেখলো ডিশ কানেকশন নেই। কোনো চ্যানেলই কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
আজ ১৬ জুন। ঈদের দিন। সন্ধ্যা সাতটায় আইসল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার খেলা। আবীরের পক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচ না দেখা সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনার খেলা দেখার জন্যই মূলত সে টিভি কিনেছে। এখন আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচই যদি দেখতে না পারে তবে কিভাবে হবে? তাই বাধ্য হয়ে ওকে ঈদের দিনে ডিশের কানেকশন ঠিক করে দেবার জন্য ফোন করতে হলো। সে এবার ফোন করলো শেষে ৩২ নাম্বার বিশিষ্ট নাম্বারটাতে।
লোকটা ফোন ধরে বললো, আজকে তো ঈদ লোকজন সব ছুটিতে গেছে। কালকে লাইন ঠিক করে দিবে।
কী আর বলার আছে আর কীই বা করার আছে?সন্ধ্যায় আবার আবীর ফোন করলো সেইশেষে ৩৩ নাম্বার বিশিষ্ট নাম্বারটাতে যেটাতে প্রথম দিন ফোন করেছিলো। রাজু নামের লোকটা ফোন ধরে বললো, আমরা তো সবাই বাড়িতে আসছি। দেখি কেউ আছে কি না।
আবীর বললো, আচ্ছা দেখেন। আজকে আর্জেন্টিনার খেলা তো। লাইন ঠিক করা খুব জরুরী।
আচ্ছা আমি একটু খোঁজ নিয়া দেখি।
তারপর লোকটা পাঁচ মিনিট পর ফোন করে বললো, একজন লোক পাওয়া গেছে। লাইন ঠিক করতে আসবে।
কিন্তু আসবে বললেও কখন আসবে বা কতোক্ষণ লাগবে আসতে সেটাই কথা। আবীর অপেক্ষা করতে থাকে। এদিকে আইসল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার ম্যাচ শুরু হয়ে গেছে তাই সে স্মার্ট টিভিতে অনলাইনে আর্জেন্টিনা আর আইসল্যান্ডের ম্যাচ দেখার চেষ্ঠা করে সে। কিন্তু কোনোভাবেই লাইভ অপশন থেকে ম্যাচ দেখা যাচ্ছে না। ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৮ লাইভ দিয়ে অনেকভাবে বিভিন্ন ওয়েভ সাইটে ঢুকে খেলাটি দেখার চেষ্ঠা করে কিন্তু কোনো ভাবেই কোথাও ফুটবল ম্যাচ লাইভে দেখার অপশন চালু করতে পারে না। এভাবে খেলা অর্ধেক হয়ে যায়। প্রচ- মন খারাপ হয় আবীরের। ফেইসবুক থেকে সে জানতে পারে ২৩ মিনিটে আর্জেন্টিনা প্রথম গোল করে কিন্তু ৪৫ মিনিটে আইসল্যান্ড দ্বিতীয় গোল করে ফেলে।
ইন্টারনেটে শুধু খেলার গোল সংখ্যা দেখা যাচ্ছে। সে ইন্টারনেটে ম্যাচটির হাইলাইট দেখার চেষ্টা করে কিন্তু তাও এখনো অনলাইনে আসেনি। ইকোপ্লাস স্মার্ট টিভি ইনস্টল ও সেটিং করতে যে লোকটা এসেছিলো আবীর সে লোকটাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলো, আপনাদের ইকোপ্লাস স্মার্ট টিভিতে অনলাইনে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা কিভাবে দেখা যাবে?
কী জানি এইটা তো আমি জানি না। ওই যে গুগোল আছে না সেখানে ঢুকে তারপর কোনো একটা ওয়েভ সাইটে ঢুকেন।
কোন ওয়েব সাইট সেটা বলতে পারবেন?
না। সেটা তো ঠিক বলতে পারবে না।
আচ্ছা ঠিক আছে বলে আবীর ফোন কেটে দিলো। এই লোক তো দেখি এর কিছুই জানে না।
হাফ টাইম শেষ হয়ে আবার খেলা শুরু হয়। এদিকে তৃণা ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে লাইভে খেলা দেখার একটা পদ্ধতি খোঁজে বের করলো। সেটা হচ্ছে: লাইভনেটটিভি ডট টো নামে একটা ওয়েব সাইটে ঢুকে লাইভনেটটিভি নামের একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে আর সেটা এ্যানড্রয়েড ফোনে বা এ্যানড্রয়েড টিভিতে ইনস্টল করতে হবে। তারপর ইনস্টল করা অ্যাপ চালু করলে ৮০০ টি লাইভ টিভি চ্যানেলের অপশন আসবে আর সেখান থেকে স্পোর্টস টিভি চ্যানেল চালু করলেই খেলা দেখা যাবে।
তৃণা মুহূর্তের মধ্যে লাইভ টিভি চ্যানেলের লিস্ট থেকে স্পোর্টস চ্যানেলের লিস্টে ঢুকলো। স্পোর্টস চ্যানেলের লিস্টে প্রথমে পাকিস্তানের তিনটি চ্যানেলের পর ইন্ডিয়ার বিশটার উপর চ্যানেল রয়েছে। তার নিচে অন্য আরও অনেক দেশের স্পোর্টস চ্যানেল রয়েছে। আবীর ইন্ডিয়ার চ্যানেলগুলো থেকে ইএসপিএনে ক্লিক করলো। সেখানে লিংক ওয়ান, লিংক টু, লিংক ত্রি আর লিংক ফোর এরকম চারটি লিংক রয়েছে। ও লিংক ওয়ান ও লিংক টুতে ঢুকে ফিফার লাইভ না পেয়ে সেখান থেকে বের হয়ে সনি টু চ্যানেলে ঢুকলো। সেখানে লিংক ওয়ান ও লিংক টু এই দুটি লিংক রয়েছে। লিংক ওয়ানে না পেলেও লিংক টুতে আর্জেন্টিনা আর আইসল্যান্ডের ম্যাচ দেখাচ্ছে সরাসরি। কিন্তুততক্ষণে খেলার সময় প্রায় শেষ। আবীর সফলভাবে লাইভে ঢুকার সাথে সাথে রেফারী ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজালো। তারপর খেলা শেষ করা প্লেয়াররা মাঠ ছাড়তে লাগলো।
তার পরের দিন ব্রাজিলের খেলা। তৃণা ব্রাজিলের সমর্থক। আবীর সকাল বেলা দুইটা নাম্বারে ফোন দিলো। সেদিন আর কেউ কোনো আশ্বাস দিলো না। সরাসরি বলে দিলো, এখনো কোনো লোকজন ছুটি শেষ করে কাজে আসেনি। পরের দিন মানে ১৮ জুন লাইন ঠিক করে দিবে। কিছু করার নেই তাই আবীর অপেক্ষা করতে লাগলো।
ব্রাজিলের ম্যাচটি ওরা অনলাইনে লাইভ টিভিতে দেখলো। আবীর আর তৃণা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ব্রাজিল আর সুইজারল্যান্ডের ম্যাচ দেখছিলো। ব্রাজিল প্রথম গোল করার সাথে সাথে তৃণা আবীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আবীরকে জড়িয়ে ধরে চুমো দিলো।
আবীর আর্জেন্টিনার সমর্থক। তাই আর চুমো খাওয়ার অপেক্ষা না করে আবীর ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমানোর আগে আবীর তৃণাকে বললো, ব্রাজিল হারলে আমাকে ডাক দিও।
তৃণা কৃত্রিম রাগ করে বললো, কী? কী বললা বাবু? ব্রাজিল হারবে?
আচ্ছা তাহলে হারবে না। ব্রাজিল আবার গোল করলে ঘুমের মধ্যে চুমো দিও।
আচ্ছা বাবু সোনা। তুমি ঘুমাও।
তারপর তৃণা আবীরকে ঘুমের মধ্যে আর চুমো দেয়নি কারণ ব্রাজিল আর গোল দেয়নি। আর ব্রাজিল হারেওনি তাই আবীরকে তৃণা ডাকও দেয়নি। ব্রাজিল আর সুইজারল্যান্ডের ম্যাচটি ড্র হয়েছিলো। ভোর রাতে যখন ওদের ঘুম ভাঙে তখন রাতে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থন মনে থাকে না। আদিম নগ্নতার পোশাকে ওরা তৈরি হয় রমণের ম্যাচ খেলার জন্য। প্রায় পনেরো মিনিটে ওদের এই খেলা শেষ হয়। এটা এমন একটা খেলা যে খেলা কখনো ড্র হয় না। এই খেলাতে সব সময় দুই দলই জিতে। তাই ভোরের এই রমণের খেলায় ওরাও দুজনই জিতে। তবে কদাচিৎ এই খেলায় দুই দলই হারে বা দুজনই অতৃপ্ত থেকে যায়। তখন সেটা হয় তাদের জীবনের পরাজয়।
তারপর ১৮ জুন সকালবেলা আবীর আবার ইউসুফ নামক লোকটাকে ফোন করলো। লোকটা বললো বিকেলের মধ্যে লাইনটা ঠিক করে দিবে। বিকেলে ওরা ঘুমিয়ে ছিলো তাই সন্ধ্যার পর সাড়ে সাতটায় আবার ফোন দেয়। কিন্তু দশবার ফোন দেওয়ার পরও লোকটা ফোন রিসিভ করেনি।
রাত সাড়ে আটটায় আবার ফোন দেয় সে পনেরোবার। এবারও নো আনসার। রাত নয়টায় আবার বাইশবার ফোন করলো। এবারো রিসিভ করেনি লোকটা। প্রচ- রাগ হতে পারতো আবীরের কিন্তু এখন আর সে সামান্য কারণে রাগ করে না। অবশ্য বিষয়টা সামান্য নয়। পঞ্চাশবারের বেশি ফোন করলেও যদি কেউ রিসিভ না করে তবে সেটা আর সামান্য বিষয় থাকে না। কিন্তুব্যাপারটা তো ডিশ কানেকশান নিয়ে। এটা তো জীবনের মৌলিক কোনো বিষয় নয় যা নিয়ে প্রচ- রেগে যাওয়া যায়। তাই আবীর রাগ করে না।
সকাল দশটায় লোকটাকে আবীর আবার ফোন করে। লোকটা ফোন রিসিভ করে জানায় সে গতকাল হাসপাতালে ছিলো তাই ফোন রিসিভ করতে পারেনি। আর আধঘন্টার মধ্যে ডিশ কানেকশান ঠিক করে দিবে। অবশ্য এই আধঘন্টা আধঘন্টাই ছিলো। আধঘন্টার মধ্যেই ওদের ডিশ কানেকশানটা ঠিক করে দিয়েছিলো।