সাদামাটা সহজ, সরল, নম্র প্রকৃতির ছেলে তনু। তেরো পেরিয়ে চৌদ্দ ছুঁই ছুঁই করছে। ক্লাস সেভেনে পড়ে চলনে বলনে গর্ব অহংকার তার ভেতর নাই বললে চলে। ছোট্টকালে বাবাকে হারিয়েছে। মায়ের রোজগারে তার জীবনের চাকা চলছে। মা- বাপ দুটোই এখন তার মা। সহায় সম্বল তেমন কিছু নেই। কোনরকম মাথা গুজাবার ঠাঁই আছে। মায়ের দিব্যি ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলবে। পড়াশুনার খরচ কে জোগাড় করে দেবে অতো শতো ভাবে না। তার মাকে সফল বলা যায় কারণ মায়ের যে চিন্তা সেটা ছেলের অন্তরে ডুকাতে সক্ষম হয়েছে। তারও প্রবল ইচ্ছাশক্তি। সে চায়, পাশের পাড়ার করিম মাঝির ছেলে লাবিব জর্জ হয়েছে। তার মতো জীবনে উন্নতি করতে। সে তার সাক্ষাৎ পেয়ে জীবনের মুড কিভাবে ঘুরানো যায় সবক নিয়েছে। লাবিবের ক্যারিয়ার গড়তে জীবনে কম দখল সইতে হয় নাই। সে আজ সফল তার ভিতর প্রবল অদম্য ইচ্ছাশক্তি কাজ করেছিল বলে। তনুর মায়ের সংসার চলে বাড়িতে একটা গাভি আরেকটা বাছুর আছে। দুধ বিক্রি করে বাকি সময় মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে। গত বর্ষার সময় মা ভীষণ অসুস্হ হয়ে পড়েন।আগে কাজ করে কিছু টাকা ইনকাম হতো এখন সে পথটাই বন্ধ। এখন লবন আনতে পান্তা ফুরায়। একদিন খেলেও আরেকদিন না খেয়ে থাকতে হয়। তনুকে দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়। সে কি করবে সিদ্বান্তহীনতায় ভুগছে। তার দুঃসম্পর্কের মামার একটা বড় দোকান আছে। ভাবল ওখানে কাজ করে আড়াই হাজার টাকা বেতন পাবে তা দিয়ে সংসার চালাতে পারবে। মায়ের ঔষুধের খরচও যোগাড় করতে পারবে।পড়ালেখাটা আপাতত স্টপ থাকল। তনু কাজে যোগ দিল চিন্তার সাথে বাস্তবতার খুব একটা মিল নেই। মাস দুয়েক হয়ে গেলো প্রথম মাস বেতন পেলেও দ্বিতীয় মাস বেতনের হাফ দিল। দোকানদার বললো, দেখছো তো, আমার এখানে আগের মত বেচাকেনা নাই। পাঁচজন কর্মী রাখা সম্ভব না। দু’জন ছাটাই করতে হবে। তুমি অন্য কোথায় পথ দেখো। একথা শুনার সাথে সাথে তনুর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতন অবস্হা। একদিকে বেতনও অর্ধেক অন্যদিকে চাকরিটা গেল। কি করবে তনু, মায়ের খাবার এবং ঔষুধের খরচ কিভাবে যোগাবে? রাত হয়ে এল রাতটা কোন রকম কেটে যাক সকালে পথ দেখতে হবে। শপিং বেগে কাপড় যা ছিল গুছিয়ে নিল। কাক ডাকা ভোরে বেরিয়ে পড়ল অজানা পথে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তদেহ একটু আরাম খুঁজল পাশে একটা দিঘীর পাড়ে বৈঠকখানায় ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর একটা সাদা দাঁড়ি ওয়ালা একজন বৃদ্ধলোক পায়চারি করার জন্যে দীঘির পাড়ে আসল। বৃদ্ধটা দুয়েক চক্কর দিতে চোখে পড়ল সিঁড়ির উপর বৈঠকখানায় একজন অমায়িক চেহারার তরুণ ঘুমিয়ে আছে কিন্তু তার ভিতর দুশ্চিন্তার চাপ লক্ষ্য করছে বৃদ্ধটা। চোখ মুছতে মুছতে ঘুম থেকে উঠলে দেখতে পেল তার পাশে বসা একজন বৃদ্ধলোক।কিছুটা হতচকিত হলেও। বৃদ্ধটা জানতে চাইল তনুর পরিচয়। প্রথমে বলতে না চাইলেও বৃদ্ধ লোকটা তাকে অভয় দিল। বৃদ্ধ লোকটা তার ব্যাগ হতে বের করে মুড়ি এবং কলা এগিয়ে দিল। তারপর তার পরিচয় বাড়ি কোথায়, কি করে এখানে এল বলল। ছেলেটার ব্যবহার, কথাবার্তা শুনে তার হ্রদয়ে মমত্ববোধ সৃষ্টি হলো। বৃদ্ধলোকটা তাকে একটা প্রস্তাব দিল যে,দৈনন্দিন বাজারগুলো বাড়িতে পৌঁছাতে হবে। সে বাড়িতে থাকবে এবং খাবে মাস শেষে কিছু মাসোয়ারা দিবে। তনু তাতে রাজি হলো এবং বৃদ্ধটার সাথে বৃদ্ধের বাড়িতে চলে গেল। এভাবে চলল বেশ ক’দিন তনুরও ভালো লাগলো। বৃদ্ধটা ছেলেটার গতিবিধি লক্ষ্য করল। বৃদ্ধের ছোট একটা বাচ্চা আছে দশ বছরের। তার সাথে তনুর সখ্যতা গড়ে উঠল। বৃদ্ধের ছেলেটি যখন পড়তে বসে তনু পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে ক’দিন যাবার পর তনুকে ডেকে পাঠাল বৃদ্ধলোকটা
-তুমি পড়তে পারো?
-জ্বি
-তুমি পড়াশুনা করবে?
-জ্বি
-কি জন্যে পড়াশুনা করবে ?
তার অভিমত জানতে চাইলো
প্রবল ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করলো। বৃদ্ধলোকটা ভাবল পড়াশুনা করাবে কিনা। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সিদ্ধান্ত নিল পড়াশুনায় সুযোগ করে দিবে।
বছরের অর্ধেক হয়ে গেলো ক্লাস সেভেনে আবার ভর্তি করিয়ে দিল। বৃদ্ধলোকটা প্রধান শিক্ষককে বলল একটু নজর রাখার জন্যে। নিয়মিত স্কুলে যায় মাঝে মাঝে মায়ের খবরাখবরও রাখে। টাকা পয়সাও পাঠায়। প্রথম সাময়িক পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে নাই মাস দেড়েক পরে দ্বিতীয় সাময়িক পরিক্ষা আরম্ভ হবে। অল্প দিনের ভিতর তনু ক্লাসে শিক্ষক – শিক্ষার্থীর চমক কাটতে সক্ষম হলো। দিত্বীয় সাময়িক পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করলো মাস দেড়েকে যা পড়তে পারলো। পরিক্ষা শেষে কয়দিন পর রেজাল্ট দিলো। তনু আশি জন স্টুডেন্ট এর ভিতর পাঁচ নাম্বার হলো। রেজাল্ট কার্ডটা বৃদ্ধ অভিভাবকের হাতে তুলে দিল। রেজাল্ট দেখে তনুকে বলল, বেশ,ভালো করেছো। তবে সামনে বার্ষিক পরিক্ষায় আরো ভালো করতে হবে। তনু মাথা নেড়ে জবাব দিল।
-জ্বি
-ঠিক আছে, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আর,হ্যাঁ শুনো তোমার যা যা লাগবে আমাকে বলবে। গুপচি মেরে থাকবে না।
-জ্বি, জনাব
-তোমার মা কেমন আছে?
-এখন আগের চেয়ে সুস্হ আছে।
-কোন সমস্যা হলে বলিও।
চলছে দুর্দম গতিতে তনুর পড়ালেখা। এখন তনুকে সবাই চেনে। ক্লাসের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, শৃংঙ্খলার ক্ষেত্রে তনু সবসময় কর্মঠ। কেউ করুক বা না করুক তনু কিন্তু চেষ্টা করে যায়। একদিন বৃদ্ধের ছেলের সাথে তনুর ঝগড়া হলে বৃদ্ধের স্ত্রী তনুকে খুব বকাঝকা করে। সে থেকে দু’দিন খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়। বৃদ্ধলোকটা তনুকে খেতে না দেখে, কোথায়,কি কারণ জিঙ্গাস করল তার স্ত্রী থেকে। তনুকে খুঁজল ছাদের উপর আকাশ পানে থাকিয়ে আছে তনু। হাতধরে খেতে নিয়ে আসল এবং তাকে শান্ত্বনা দিল। দু’জনকে ডেকে কোলাকুলি করিয়ে দেয়। দু’ জনকে পরস্পর ভাই হিসেবে আচরণ করতে বলে। পরের দিন ক্লাস যেয়ে দেখে বার্ষিক পরিক্ষার রুটিন টানানো হয়েছে। এবার পরিক্ষার প্রস্তুতির যথেষ্ট সময় পেল তনু। পরিক্ষা আরম্ভ হয়ে গেল। প্রত্যকদিন ফুল আনছার করে আসে। ভ্রমণের তিনদিন পর রেজাল্ট দিবে সিদ্ধান্ত হলো এবং সকল গার্ডিয়ানকে আমত্রণ করা হলো। এদিকে তনুর মন কাচুমাচু করছে সে কতটুকু ভালো রেজাল্ট করবে, তার গার্ডিয়ানকে মুখ দেখাতে পারবে কিনা। অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো কাঙ্খিত দিনটি হাজির। একে একে নাম ধরে ডাকছে অভিভাবকসহ রেজাল্ট কার্ড তুলে দিচ্ছে প্রধান শিক্ষক।এখন ক্লাস সেভেনের রেজাল্ট ঘোষণার পালা। প্রথম স্হান অধিকারের নাম ঘোষণা করল সে আর কেউ নয় সবার প্রিয় তনু। শুধু প্রথম স্হান অধিকার করে নি স্কুল ফার্স্টও হয়েছে। তনু আনন্দে এক লাফ দিল। তার গার্ডিয়ান বৃদ্ধ লোকটা খুব খুশি হয়েছে। ক্লাসে এইটে ভর্তি হলো জানুয়ারীতে সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হলো সংঙ্গিত বিভাগেও সেই সাথে আরো দুটো পুরুস্কার পাচ্ছে তনু। একটা স্কুল ফার্স্ট, আরেকটা হলো সবচেয়ে ভালো চরিত্রের পুরুস্কার। এভাবে দিনের পর মাস বছর যেতে থাকল। জীবনের গতি ঘুরে যাচ্ছে সব পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট বিশেষ কৃতি অর্জন করছে। পড়ালেখা যখন শেষ পর্যায়ে স্বপ্ন পূরণে আর কিছু বাকি। এমন সময় দুঃসংবাদ এলো তনুর জীবনে তার পৃথিবীর ছায়া যার স্বপ্ন ভালো মানুষ হিসেবে দেখতে চাওয়া, দুঃখ কষ্টে যার শরৎ বর্ষা অতিক্রম করেছে প্রিয় জননী আর নেই। অনেক মুছড়ে পড়লেন তনু। শোককে শক্তিতে রুপান্তরিত করে। বাকি পথটুকু পাড়ি দিল। কিছুদিন পর খবর এসেছে সে কলেজের শিক্ষক হয়েছে। আজ তনুর সব আছে কিন্তু মমতাময়ী জননীর ছায়া নেই। এভাবে তনুর জীবনে তার স্বপ্ন অর্জনে সকল প্রতিবন্ধকতা পরাজিত করে এগিয়ে গেছে।