রাতের জোসনা

গভীর রাতে ঘুম ভেংগে জেগে দেখি
আকাশের গায়ে ঝুলে আছে অনুজ্জ্বল পাংশুটে চাঁদ
বিবর্ণ পশমের মত জ্যোতিহীন নিশ্চল মেঘেরা
বিক্ষিপ্ত পড়ে আছে তার চারপাশে।
জীবনের শেষ দিনগুলোয় বিছানায় শুয়ে এমনি মলিন আবহে
বেদনার দূর্বিপাকে তলিয়ে যেত আমার দুঃখিনী জননী।

একদিন তড়িঘড়ি আমাকে ডেকে নিয়ে কাছে বসিয়ে
অত্যন্ত ক্ষীণস্বরে মা বলেছিল, ‘বাবা, বেশিদিন বাঁচবনা আর,
পৃথিবীতে কেউতো থাকেনা চিরকাল,
দুঃখ একটাই, এই নিষ্ঠুর জগতে তোমাকে একা রেখে যাব।
আমি মরে গেলে গগণের চাঁদকে অন্তর দিয়ে দেখ
ওর হাসি আমারই হাসি বলে মনে হবে।’

জানালার কাছে বসে গভীর রাতের নিষ্প্রভ জোসনায়
শোকের ছায়ায় দুঃখিনী মাকে মনে পড়ে
দ’ুচোখ উপচে রোদনের অশ্রু ঝরে অবিরাম
মাগো,আমাকে ছেড়ে এমন করে কীভাবে নিরব থাক,
আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে যদি
তোমার অসহায় সন্তানের বড় ভাল হত।
…………………………………………..

আমার ভেতর ঝড় হয়েছিল

সেদিন বোধহয় আমার ভেতর খুব ঝড় হয়েছিল
আমি বাতাসকে ছুটতে দেখেছি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে
সাগরকেও উত্তাল ঢেউয়ে ফুঁসে ওঠতে দেখেছি সর্বদা
মেঘের অবিরাম গর্জনে তোলপাড় হওয়া আকাশকে প্রশ্ন করে
একবিন্দু জবাবও আদায় করতে পারিনি আমি।

পৃথিবীকে প্রকৃতিস্থ করতে, বাধ্য হয়ে
সুউচ্চ পর্বতের চূড়া ধরে দিয়েছিলাম প্রবল ঝাঁকুনি
দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে সাগরকে নির্দেশ দিয়েছিলাম অধিকতর শান্ত হতে
লজ্জাশীলা রমণীর মত বিনম্র ছন্দে চলতে
বাতাসকে করেছিলাম বাধ্য,
বিনাবাক্যে সাগর আমার কথা শুনেছিল সেদিন
শুনেছিল বাতাস এবং শিলাপিচ্ছিল সমুন্নত পাহাড়।

কেন জানিনা অনেক বেশি কঠোর আর রাগাম্বিত ছিলাম সেদিন
আমার কাঠিন্য লক্ষভেদী তীরের মত পর্বতপ্রাচীর করেছে বিদীর্ণ
চোখের দুর্বোধ্য ভাষায় অতল মহাসাগর কেঁচোর মত হয়েছিল সংকুচিত।
অনুপম প্রেরণায় প্রভাত করেছে আলো সমগ্র জগৎ
আর সুনিবিড় রাত ধ্যানের মৌনতা বিছিয়েছে সকল প্রান্তরে।

প্রবল ঝড় ওঠেছিল সেদিন আমার চেতনায়
সে ঝড়কে অনুগত করে অতন্দ্র উদ্ভাসে দাঁড়িয়ে ছিলাম ধূসর ভূতলে
এক হাতে আকাশগুহার অন্ধকার ছুঁয়ে অন্য হাত ঢুকিয়েছি পৃথিবীর নাভিমূলে
জ্বলন্ত লাভায়,
সেদিন আমার প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল অসীম রহস্যের দিকে।
…………………………………………..

ভালোবাসা শব্দটি খুব কাছের

ভালবাসা শব্দটি হৃদয়ের খুব কাছের বলে মনে হয়
জ্যৈষ্ঠের গরমে দীঘির জলে সাঁতার কাটার হৈ-হুল্লোড়
শান্ত বিকেলে প্রিয় কারো সাথে ঘুরে বেড়ানোর অনুপম স্বস্তি
ক্লান্ত চোখে শীতের রাতে প্রগাঢ় ঘুমের আমেজ
ভাদ্রের জোসনায় নরম তালপিঠায় গাল ভরানোর উল্লাস।

ভালবাসা শব্দটি বড় আপন, একান্ত নির্জন, অবিশ^াস্য সুকোমল
কাজলার হাটে টকঝাল পুদিনার বড়া
নির্ঘুম ফাগুনে জেগে থাকা উজ্জ্বল মায়াবী চাঁদ
ঘরছাড়া বাউলের অজানা যাত্রায় উদাস পথিকের বাঁশি।

ভালবাসা শব্দটি চার দেয়ালের মাঝে বিদেশ ভ্রমনের সুখ
বধুর কাল চোখের গভীর মমতায় বৈরী ধেনো মদের নেশা
রোদের আকাশে রূপালি মেঘের বড়সড় সামিয়ানা
ভরা আষাঢ়ে নদীর স্রোতে চকচকে ঢেউয়ের নোলক।

ভালবাসা শব্দটি দারুণ দুর্বোধ্য, অন্যরকম আজব
পথহারা বিজোড় পারাবত বৃক্ষের শাখায় খোঁজে আশ্রয়
বুকের ভেতর রাতদিন উচ্ছন্ন ভাবনার শঙ্কিত অধিবাস
প্রেম ও বিরহের যুপবন্দী শ^াসরুদ্ধ বিবাগী মানস
শুভ্র শিশির হয়ে রাতভর সব প্রাণে ভালবাসা ঝরে যায়।
…………………………………………..

আমি যাকে ভালোবাসি

আমি প্রাণ দিয়ে ভালবাসি এমন এক সুন্দর মানবীকে
যার দেহ হতে গলে পড়ে নবীন এলাচ দানার সুগন্ধ
শহরের প্রাণহীন কোলাহল থেকে অনেক দূরে
প্রকৃতির গভীর সবুজে তার বসবাস
আমার ব্যথিত হৃদয়ে প্রাণময় হাসির ছন্দে সে জাগায় স্বপ্নের রংধনু
চুলের মায়াবী আঁধারে তার বাসনার জোনাকিরা নেচে বেড়ায়।

পাহাড়ি এক স্রোতশীলা স্বচ্ছতোয়া ঝরণার ধারে
অনেক প্রতীক্ষার বিনিময়ে আমি তার নিগুঢ় সন্ধান পেয়েছি
যেখানে আকাশ অস্থির ঢেউয়ে আঁকে চলমান মুগ্ধ ছবি
মায়াভরা কালো দুটি চোখে ভীরু লজ্জায় কাঁপে সজল মিনতি
গাছের ছায়ায় কোমল বাহুতে জড়িয়ে ফুলের বৃষ্টিতে
হৃদয় করেছে সিক্ত।

যার স্নিগ্ধ রূপ আমাকে বদ্ধ পাগল করেছে তার প্রেম
জামরুল, সফেদা, নাশপাতির চেয়েও সুমিষ্ট
বৃষ্টিধোয়া আকাশের মত নির্মল নিষ্পাপ তার হৃদয়
তার বুকের নিভৃতে জাগে বসন্তের কুসুমিত রাত
পাতার আড়ালে নির্জন দুপুরে মিষ্টিসুরে যে পাখি গায়
সেই শুধু জানে তার মধুময় নাম।
…………………………………………..

স্বার্থপরতা

সমাজের সবখানে প্রকাশ্য স্বার্থপরতা দেখে দেখে
আমার মনে বাজে একটা ধারনা এতটা প্রবল হয়েছে যে
চোখকান বন্ধ করে অসংকোচে স্পর্ধাভরে বলতে পারি
স্বার্থ ছাড়া মমতাময়ী জননীও সন্তান গর্ভে ধরেনা।

অবলা নারী স্বার্থ অটুট রেখে ভালবেসে সুখী হতে চায়
সুযোগ্যের গলায় মালা দিয়ে চায় নিরাপদ নিরুপদ্রব জীবন
পৃথিবীর সর্বত্র প্রেম নামক পাগলামীর মহাচর্চা থাকলেও
বিত্তহীনের দরজায় কেউ সহসা কাঙাল সাজতে চায়না।

বাৎসল্যের ক্ষয়ে যাওয়া জীর্ণ অস্থি কঙ্কাল ঘেঁটে
অনুভব করছি অব্যক্ত দুঃখজনক এক গভীর শূন্যতা
পিতার প্রাণহীন লাশ দাফন করার পূর্বেই অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে
একমাত্র সন্তানও বুঝে নিতে চায় স্বার্থের সুস্পষ্ট দস্তাবেজ
মৃতের প্রয়াত আত্মার মুক্তিবিষয়ক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আড়ালে
সমাজপতিরা চরিতার্থ করে থাকে মজ্জাগত ভোজনবিলাস।

স্বার্থপর সমাজের অনাবশ্যক অসার আড়ম্বর দেখে
আমার অসুস্থ মগজের চিন্তার দৈন্যতা বহুগুণে বেড়ে যায়।
…………………………………………..

সুখময় আশ্রয়ের সন্ধানে

সবাই তো সুখময় আশ্রয়ের সন্ধানে
নন্দনপুচ্ছ স্বর্ণালি মাছের মত প্রগাঢ় শৈবালের ভাঁজে ভাঁজে
জলসিঁড়ির উষ্ণশীতল ধোঁয়াশায়
যতিহীন সাঁতারে মগ্ন থাকে।

এই ছলনাময় পৃথিবীতে এক রূপসীর কাজল চোখের গভীর মমতায়
গড়তে চেয়েছি প্রশান্তির নীড়
সমুদ্রের অতলে ঘাতক সরীসৃপের তা-ব দলনে
হৃদয় হয়েছে বিক্ষত
প্রকৃতির বিরুক্ষ প্রতাপে নিদারুণ অভিমানে
আত্মহননের প্রতিজ্ঞা করেছি সাঙ্গ।

একটি নিগুঢ় রহস্যের ভেদমর্ম জানার উদ্দেশ্যে নিশ্চল শবের পশ্চাতে
গোধূলির ক্লান্ত আলোয় হেঁটে হেঁটে কখন পৌঁছে গেছি
অস্তাচলের নিঝুম নিস্তব্ধতায়
পিচ্ছিল সময়শৃঙ্গের বন্ধুর বিস্তারে চিরতরে হারিয়ে গেছে
আমার অস্তিত্ব
নিঃশব্দ রোদ আর দুর্বার ঝড়ো বাতাস আমাকে পাবেনা খুঁজে।
…………………………………………..

সন্তরণ

পৌষের মায়াবী রাতে তোমার স্মৃতির ধবল পূর্ণিমায়
আমার হৈ-হুল্লোড় পিকনিক, দারুণ দৌড়ঝাপ
দুরের কোন মনোরম বন্দরে পরিচ্ছন্ন দিনে
সবান্ধব সমুদ্রযাত্রা।

প্রতিটি সন্ধ্যায় আধখোলা মনের জানালায় সুবাস মদির
তোমার প্রাণবন্ত দুষ্টুমি, উচ্ছল লুকোচুরি
তোমার স্মরণে আমার মনোলোকে প্রতিরাতে জমজমাট ঘরোয়া পার্টি
সমাবেশ, সেমিনার
তোমার ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে হৃদয় ক্যাম্পাসে সর্বদা টানটান উত্তেজনা
অবিরাম মিছিল হরতাল।

চেতনার আর্কাইভে সজ্জিত নিবিড় সম্পর্কের গোপন দলিল
মনের দেরাজে গচ্ছিত অবাস্তব সব চুক্তির নমুনা
তোমার জলজ অঙ্গে পেয়েছি খুঁজে নারকেল জিজ্ঞিরা সেন্টমার্টিন
তুমি আমার অকুল সমুদ্রে স্বপ্নদ্বীপ মেরগুই, কোকো, আন্দামান।

আমার বাণিজ্য-বেসাত, ষ্টক-একচেঞ্জ তোমাকে ঘিরেই আবর্তিত
তুমি আমার হৃদয় মোচড়ানো ফুলেল ফাগুন
অশ্রুময় বিষণœ আষাঢ়
শ্যামল শরতে মেঘের জকি, জোসনা জোয়ার
ভাঙ্গা মেঘের সুদীর্ঘ পথে নির্জন চাঁদের সন্তরণ।

অতিক্রম

তোমার সবকিছুই দারুণ ঈর্ষণীয়
উচ্চবিত্ত স্বজন প্রতিবেশী বন্ধুমহল সম্পদ সম্মাননা
এসবের মাঝে আমার অস্বস্তিকর উপস্থিতি
বড়ই ঝঞ্ঝাটে বেখাপ্পা এবং বেমানান।

তোমার নিদাগ উজ্জ্বল দেহলতায় আমার অশুচ স্পর্শ
যেন দুষ্টব্রণের অস্থির অসহ্য প্রদাহ
সর্বাঙ্গের গ্রন্থিকলায় দূষণের অশুভ উপদ্রব ছড়িয়ে
ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে থাকি লসিকানালীর সংকীর্ণ দেয়ালে
দুর্ভাবনার রাজ্য থেকে আমাকে ঝেটিয়ে তাড়ানো বড়ই কষ্টকর।

তোমার আধুনিক কিচেন টাইলস সজ্জিত বাথরুমের
মসৃণ দেয়ালে
আমি বাস করি এক ক্ষিপ্র বিচ্ছু, ভীতিকর রক্তিম আরসোলা
প্রশ্বাসের বিষাক্ত কার্বন হয়ে গুপ্ত সংবহনে ফিরে আসি বারবার
পিচ্ছিল পিঙ্গল অত্যাবশ্যক রজঃরঞ্জক হয়ে।
জনহীন বাড়ির কালসন্ধ্যার নির্জন প্রাচীরে ছড়িয়ে যাই
হিমপুরীর মৃত্যময় সকরুণ আর্তনাদ।

শান্ত সুবোধ মনোলোকে অস্বস্তির খচখচে সুঁচকাঁটা হয়ে
ঝুমবৃষ্টির নিদ্রালু রাতে বজ্রের দুঃস্বপ্নে অকস্মাৎ ফেটে পড়ি
মেটে ঘুঘুর পশ্চাতে ক্ষুধার্ত দাঁড়কাকের দানবীয় ্উন্মত্ততায়
স্বাচ্ছন্দ্যের উৎসমূলে নিক্ষেপ করি শনির অশুভ ছায়া।
তোমার উৎকর্ণ কর্ণকুহরে আমি করে যাই সুনামহন্তক
বিস্বাদ বমন।

আমাকে অতিক্রম করলেই খুঁজে পাবে প্রশান্তির অনুপম জগত।
…………………………………………..

অনুভব

যখন ওজু করে জায়নামাজ পেতে নামাজে দাঁড়াই
খুব বিনয়ী আর মনোযোগী হতে চেষ্টা করি
পক্ষীছানা যেমন মায়ের বুকে নির্ভরতার আশ্রয় খোঁজে
তেমন ব্যাকুল অনুনয়ে স্মরণ করি মহীয়ান প্রভূকে
তাঁর অপার মহিমা বোঝার সাধ্য কারো নেই
গাফিল জিন্দেগীর সব অপরাধ তার দয়ায় হয়তো ক্ষমা হয়ে যাবে।

সালাত শেষে জায়নামাজের শুদ্ধ পরিসীমায় চোখ বুজে বসে থাকি
হৃদয় মন ঢেলে বিশুদ্ধ উচ্চারণে পাঠ করি প্রাত্যহিক অজিফা
যে জিকির সমস্ত বিশ্বকে একটি ক্ষুদ্র বিন্দুতে সীমিত করে
তেমন গভীরতম জিকির আমার কোন দিনই হয়না
পত্রহীন বৃক্ষের মত বালুময় ধূসর জগতে পড়ে থাকি যুগ-যুগান্তর।

আমার প্রেমময় মাসুকের রহমতের জোসনায় স্নান করে
আমি কী পরিশুদ্ধ হবনা!
জিকির শেষে আবার নামাজ পড়ি, বিশুদ্ধ নিয়তে গভীর মোরাকাবায়
নিরাশ্রয় মিসকিনের মত পড়ে থাকি মসজিদের শূন্য বারান্দায়
যে নামাজি নির্জন রজনীতে প্রিয় খোদাকে ব্যথিত হৃদয়ের কাব্য শোনায়
তাকে তালাশ করি আমি রাতের পর রাত
এই বিশাল পৃথিবীর অশেষ যাত্রায় অগণিত মানুষের মাঝে
কোন একদিন হয়তো তাকে খুঁজে পাব আমি।
…………………………………………..

ব্যথার তমসা

তোমার জন্য আমার এ ভালবাসা অনেক দিনের ব্যথাময়
চোখের জলে ভেজা
বিবর্ণ বৃক্ষের ডালে বিজোড় পাখির মত
গভীর বেদনায় পোঁড়া আমার এ হৃদয়ের বাসনা
বোশেখের ঝড়ো হাওয়ায় মিশিয়ে তোমার চেতনায়
ছড়িয়ে দিতে এসেছি।

এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে আমি তো কারও কাছে কিছু চাইনা
জ্বলে যাওয়া অন্তরের দগ্ধিত ভস্মের দামে
চাইনা মনরাখা বাহ্যিক সান্তনার মিথ্যা আড়ম্বর
নিস্তব্ধ পথাশ্রয়ের জীর্ণ কুটিরে একটি দিনের নিশ্চিন্ত বিশ্রাম
সেতো বুঝি আমার জন্য বরাদ্দ নয়।

বিধাতা যদি অনড় কলমে লিখে থাকে ললাটে আমার
খনখনে মৃত্তিকার নীলাভ আগুনে উত্তাপ
কোমল সম্ভাষণে আমাকে গৃহসুখে জড়িয়ে নেয়া কার কি পড়েছে দায়
জনহীন অরণ্যে শঙ্কিত পথিকের মত দিবান্ধকারে আমি মাখি
ঘর্মাক্ত দেহে অসহনীয় ব্যথার তমসা।