আঁকা-বাঁকা নদীর পাড় জুরে গ্রাম, গ্রামের নামটির শেষে পুর আছে রতনপুর অথবা লক্ষিপুর। তবে নদীর নাম জানা হয়নি। ভাটির দেশে কোনটা নদী আর কোনটা হাওর বুঝা মুসকিল! এদিকে সন্ধাও ঘনিয়ে এলো। আমরা আট জনের একটি গেরিলা দল, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যেখানে এসে থামলাম, একটা বড় নদীর কূল। নদীর ঐ পাড়ে যেতে হলে নৌকা লাগবে। নইলে সাঁতার। কিন্তু আমরা কেউই তেমন ভাল সাঁতার জানা লোক নই। তার উপরে ক্লান্ত শরীর। অপেক্ষা করছি যদি কেউ নৌকা নিয়ে এই দিকে যায়। কমান্ডার সবাইকে নদীর জলে হাত মুখ ধৌয়ে নিতে বললেন, আমার খুব ইচ্ছে করছে ঝাপ দিয়ে নদীতে পরে ডুবে থাকি কিছুক্ষণ। ভাদ্র মাসের তাল পাকা গরমে তিরিশ থেকে চল্লিশ মাইল পথের মতো হবে হেঁটেছি! শরীর আর চলছে না।

আমাদের এভাবে জড়ো থাকতে দেখে একজন মুরুব্বি লোক এগিয়ে এলো, কমান্ডার তাকে ইশারা করে কাছে ডাকলেন। লোকটি এগিয়ে এসে সালাম দিল তারপর জানতে চাইলেন, ‘বাবাজী আপনাদের তো চিনলাম না?’
আমাদের দলের কমান্ডার আলতাফ সিরাজী লোকটার একদম কাছে গিয়ে নিচুগলায় বললেন, ‘চাচা আমরা মুক্তিবাহীনির লোক, নদী পার হতে হবে আপনাদের সহযোগীতা চাই। মুরুব্বি লোকটি জানালেন, ‘বাবা আমাদের গ্রামে বর্তমানে কোন নৌকা নাই!’
‘কি বলেন নৌকা ছাড়া এই ভাটি অঞ্চলে থাকা যায়?’
‘সে ঠিকি বলেছেন বাবা, কী আর করবো বলেন পাঞ্জাবী’রা এসে সব গুলো নাও নিয়ে নিছে। আর যেগুলো সামান্য ভাঙা, সেগুলান একবারে ভাইঙ্গা শেষ করে দিয়েছে।’
কথাটি শেষ করে তিনি পিছনে ঘুরে দূরে কিছু একটা দেখানোর চেষ্টা করলেন, সিরাজী সাব অবশ্য সেদিকে খেয়াল করলেন না। তার মনে একটা আসার সঞ্চার হলো, তিনি আশ্বস্ত মনে তার কাছে একটা উপায় বের করার জন্য জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন, ‘তাহলে চাচা একটা উপায়? আমরা এক্ষুনি ঐ পাড়ে যেতে চাচ্ছি না, তবে যেতে হবে এবং সম্ভব হলে আমাদের একটু বিশ্রামের ব্যবস্থা করতেন যদি।’

লোকটার নাম তাঁজউদ্দীন, গ্রামের পুরাতন গেরস্থ। তিনি খুশি মনে আমাদের নিয়ে গেলেন তার বাড়িতে। লাহাড়ী ঘরে আমাদের থাকার বন্দবস্ত হলো। মাগরিবের নামাজ শেষে মৌলবি সাবকে ডেকে এনে একটা খাসী জবাই করলেন। এতটা সুবিধা পাবে এমনটি আমরা কেউ আশা করিনি, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ্। তবে সময় খুব কম এখনই আমাদের মূল বিষয়টা নিয়ে পরামর্শ করা দরকার। এদিকে ক্ষিদায় পেট চু চু করছে আমি আমার ব্যাগ থেকে কয়েক মুটো চিড়া-গুর বের করে খেতে লাগলাম। তাঁজউদ্দীন সাহেব এসে জানালেন, ‘আপনাদের জন্য পাক বসানো হয়েছে তবে একটু দিরং হবে, যদি চান তাহলে মুড়ি এনে দেই।’
কমান্ডার ঘাড় কাত করে অনুমিত দিলেন।

মুড়ি খেতে খেতে আলোচনা চলছে মূল অপারেশনে যাওয়ার আগে আমাদের লোকাল পাওয়ার প্রয়োজন। আর সেই ক্ষেত্রে স্থানীয় ক’জন লোক হলে ভাল হয়। বিষয়টা তাঁজউদ্দীন সাহেব কে জানালে প্রথমে তিনি নিজেই রাজি হলেন এবং তার সাথে এ বাড়ির কামলা রইছ মিয়া। আমাদের আট জনের দলে আরো দুইজন যোগ হলো। তাঁজউদ্দীন সাহেবের বয়েস পঞ্চান্ন কি ছাপ্পান্ন হবে। রইছ মিয়া আমাদেরই বয়েসি জোয়ান মর্দ গায়ের রং কালো। শুধু যে কালো তা নয়, একদম মিছমিছে কালো! মনে হচ্ছে রৌদ্রে বৃষ্টিতে পুড়ে পুড়ে তার এই অবস্থা। আমার ইচ্ছে করছে তাকে রইছ মিয়া না ডেকে, ‘কালু মিয়া বলে ডাকি।’ যাই হোক, দেখেই বুঝা যায় এই কালুটা বেশ কাজের লোক। আমাদের এমন একটা লোকই দরকার, যে এক নিমিশেই পুরো এলাকার খবরা-খবর দিতে পারে। ফাইনালি রেকির গাইড। আশেপাশে দু চার গ্রামের অলি-গলি নালা-ঘাট এখানে বসেই বলে দিতে পারবে সে, এটা তার কথায় স্পষ্ট। আর তাঁজউদ্দীন চাচার উপরে আমাদের থাকা খাওয়ার দায়-দায়ীত্ব।

মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি দিকে পাঞ্জাবী’রা যখন একেবারে থানা পর্যায়ে চলে আসে, তখনি মেজর রশীদ আনোয়ারকে অল্প জনবল দিয়ে এ অঞ্চলে পাঠানো হয়। হাওর এলাকা থেকে তাজা রশদ সংগ্রহ করা ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
এদিকে নিজের কু-বুদ্ধি চরিতার্থ করতে পাঞ্জাবী সেনাদের সাথে গোপনে হাত মিলায় এলাকার এক ব্যক্তি নাম সুবাহান কাদের। শুরু থেকেই সে মেজর রশীদ আনোয়ার কে কুপরামর্শ দেয়া আরম্ভ করে। তার ইশারাতেই প্রথম দিকে নিরীহ নিরস্ত্র গ্রামবাসীর উপর নির্মম অত্যাচার চালানো হয়। যুবতী মেয়েছেলেকে তুলে নেয়া, লুটপাট, বাড়িতে আগুন দেয়া;
তার কথা হলো, ‘‘বাঙালীরে হাতেও মারা যাবে না, ভাতেও মারা যাবে না, মারতে হবে চিপ্পা।’’ আর এসব করে ভয় দেখাতে পারলে পরবর্তীতে সুবিধা অনুযায়ী সবাইকে বাই অর্ডারে কাজে লাগাতে কোন বেগ পেতে হবেনা। সেজন্য যেখানে সেখানে গিয়ে হুমকি দেয়া হতো লোকদের। অসহায় মানুষজন সব সময় আতঙ্কিত থাকতো, কখন পুরো গ্রাম একসাথে জ্বালায়া দেয়। এই ভয়ে সবাই তাদের কথা মতো চলতো। যখন যা চাই? দিয়ে দেয়া ছাড়া উপায় নাই!
এখান থেকে প্রতিদিন হাওরের বড় বড় মাছ, পাখি, হাঁস-মুরগি, গো-মাংস সহ নানান শস্য-সবজী গঞ্জের বড় ক্যাম্পে পাঠানো হয়। প্রতিদিন কিছু পাঞ্জাবী মিলিটারি পিকআপে করে এই তাজা রদশ নিতে আসে। পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন ইহতেশামের নেতৃত্বে এ পিকআপটি আসা-যাওয়া করে আর দশ বারোজনের মতো পাঞ্জাবী সৈন্য নিয়ে এসবে নেতৃত্ব দেয় মেজর রশীদ আনোয়ার। রাজাকার সুবাহান কাদেরের সাহচর্যে অস্থায়ী ক্যাম্পে তারা খুব অল্প সময়েই বেশ সুবিধাজনক অবস্থান করে নেয়। বাজারের সব দোকান পাট সহ আশে-পাশের তিন চারটে গ্রামে এখন তাদের কব্জায়।

সেদিন তাঁজউদ্দীন সাবের বাড়ীতে এসেই মেজর রশীদ আদেশ দিলেন, বড় ষাড় গরুটা জবাই করে দিতে। নিরুপায় তাঁজউদ্দীন মূর্তির মত দাড়িয়ে রইলেন! এই গরুটা বীণার বিয়েতে জবাই দিয়ে সারা গ্রামের লোকজনরে দাওয়াত খাওয়াবেন বলে এতদিন হাউশ করে পালছেন। তার কামলা রইছ মিয়া আর নিরব থাকতে পারলো না। দৌড়ে গিয়ে মেজর রশীদের পায়ে উপুড় হয়ে পরে আকুতি করলেন, ‘ছার গোয়ালে আর সাত আটটা বড় গরু আছে তার থেকে একটা জবাই করে দেই।’
মেজর রশীদের এক পা মূহুর্তেই রইছ মিয়ার মাথার উপরে উঠে গেলো, ‘ছালে হারামীকো বাচ্চে, তুম কিউ বাত বলরাহাহে হামারা পছন্দ কো?’ ভারী বুটের ডলাডলিতে রইছ মিয়ার কানের লতি ছিঁড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে রক্ত পরতে লাগলো। তারপর চোখমুখ নাচিয়ে বললো, ‘জলদি মৌলবিকো বুলা শালে?
রইছ মিয়া ছাড়া পেয়ে অসহায় চোখে তাঁজউদ্দীনের দিকে তাকালো, তার গলা বরাবর বন্দুকের নল ঠেকানো! একমুহূর্ত আর দেরি করলো না সে, কোমরের গামছাটা খুলে কানে চেপে রক্ত মোছতে মোছতো মক্তব ঘরের দিকে হাটা দিল।
তাঁজউদ্দীনের একমাত্র মেয়ে বীণার বিয়ে হয়েছে মাস ছয় আগে, এখনো তাকে স্বামীর বাড়ীতে উঠায়ে দেয়া হয়নি। তারা ভেবেছিল এই যুদ্ধ থেমে যাবে। শেখ মুজিব এক সময়ে সবকিছু মেনে নেবেন। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে যুদ্ধাবস্থা আরো ভয়াবহ হচ্ছে। মেজর রশীদের শকুন চোখ হঠাৎ করে বীণার দিকে পড়লো! সঙ্গে সঙ্গে ইশারা দিলেন, ‘ও লাড়কিকো ইদার নিকালো।’ দুই জন সেনা বাবা-মার সামনে মেয়েটি টেনে হিঁছড়ে নিয়ে এলো উঠানে।
‘ওয়াও! বহত ছোরত লাড়কি হু। কিয়া নাম তেরা?’
বীণা কোন উত্তর দিলো না, সে নিজেকে ছাড়াবার প্রবল চেষ্টা করলো। কিন্তু তার কোমল নরম হাতটা, হায়েনার মুষ্টি থেকে চিতা বাঘের পুরুষ্ট থাবায় আবদ্ধ হলো! বীনার মা দৌড়ে এসে মেজর রশীদের পায়ে পড়লো। তারপর কান্না জড়ানো কন্ঠে বললো, ‘ওর নাম বীনা। ছয়মাস হলো ওরে বিয়া দিছি। এখনো স্বামীর বাড়ীতে তুলে দেইনি বাজান আপনের আল্লারহ দোহাই লাগে ওর সর্বনাশ করবেন না।’ মেজর রশীদ, বীণার মায়ের আজহারীতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করলেন না। লালসার চোখে বললেন, ‘ক্যায়ছা বীণা? হুম। অগ্নিবীণা?’ বলতে বলতে বীণাকে টেনে লাহাড়ী ঘরের ভেতরে নিয়ে গেলো। ঘরে তাঁজউদ্দীনের বয়স্ক মা শুয়ে ছিল। বয়সের ভারে তিনি অচল, একা একা চলা-ফেরা করতে পারেন না। মেজর রশীদ হাত ইশারা করে তাকে বেড়িয়ে যেতে বললেন। বৃদ্ধার নিজে নিজে উঠার সাধ্য না থাকলেও প্রাণপনে হামাগুরি দিয়ে নাতনির হাতটা ধরতে চেষ্টা করলেন। নরপিশাচ তার শক্ত বুটের লাথি বৃদ্ধার কোমর বরাবর চালিয়ে দিল! প্রচণ্ড আঘাতে তিনি কুকিয়ে উঠলেন। মেজর রশীদ চিৎকার করে ডাকলেন, ‘লতিফ?’
একটা পাঞ্জাবী সেনা দৌড়ে ঘরে প্রবেশ করলো, ‘জ্বী স্যার।’
‘বাহার নিকালো এ বুড়িকো।’
‘ইয়েস স্যার।’
বৃদ্ধার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে এক দলা থু থু ছুড়ে মারলেন মেজর রশীদের মুখ বরাবর, থু থু তার বুকে গিয়ে পড়লো। এবার আর সে তর্জন-গর্জন করলো না, হাত ইশারায় শ্যূট করতে বললো। বাহিরে নিয়ে আর কোন কথা নেই সোজা বন্দুকের নলটা মায়ের বুকে ঠেকিয়ে ট্রিগার চেপে দিলো। বৃদ্ধা একটু নড়ারও সুযোগ পেলেন না। এমনকি ফিনকি দিয়ে রক্তও বেরুল না। মূহুর্তেই বয়সের ভারে নূব্জ্য দেহটা নিস্তেজ হয়ে গেল। একই সাথে তাঁজউদ্দীনও জ্ঞান হারালেন।

ষাঁড় গরুটা জবাই করতে বেশ বেগ পেতে হলো রইছ মিয়াকে, পাকিস্তানি মিলিটারির ভয়ে ততক্ষণিক গ্রাম পুরুষ শূন্য! মানুষ পাওয়া গেল না। ইমাম সাবকে এক প্রকার জোর করে ধরে আনা হলো। তার হাতে ছুরি, তিনি ভয়ে কাঁপছেন। আশেপাশে দুই-তিন ঘরের মহিলাদের ডেকে আনা হলো গরু জবাইয়ে সহযোগীতা করতে। শেষমেষ অতি কষ্টে ষাড়টা জবাই করা গেল। মাংসও কেটেকুটে দিতে হলো সবার আর চলে যাবার সময় মেজর রশীদ আনোয়ার বীণাকে ও সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন।

রাজাকার সুবাহান কাদেরের সহচারীতায় আর মেজর রশীদের নেতৃত্বে এভাবেই পাশবিক নির্যাতন হতো। একেক দিন, একেক গ্রামে, একেক বাড়িতে;

অর্ধেক রাত অবদি আমরা তার কাছ থেকে এই নির্মমতার বর্ণনা শুনলাম। কথাগুলো বলতে পেরে তাঁজউদ্দীন সাহেবের মনটা যেন একটু হালকা হয়েছে, তিনি কিছুটা শান্ত হলেন। তবে ভেতরে ভেতরে শোকে মূহ্যমান এক গোলা, যেন সামান্য টুকা পড়লেই বিস্ফারণ ঘটাবে। অনেক কিছু হারিয়ে, সামান্য কিছু পাওয়ার আসায় তার চোখমুখ উজ্জল হয়ে উঠলো। কমান্ডার আলতাফ সিরাজী উঠে তার কাছে গেলেন। তারপর বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘‘ইনশাআল্লাহ আমরা বীণাকে মুক্ত করবো চাচা, এই দেশটাকে মুক্ত করবো। এটা আমাদের মা-বোনের ইজ্জতের কসম।’’

সেই রাতে সিদ্ধান্ত হলো, ভোরই আমরা ঐ পাড়ে যাবো এবং তাঁজউদ্দীন সাহেবের এক আত্বীয় বাড়ীতে হবে আমাদের প্রাথমিক অবস্থান। সেখান থেকে মূল অপারেশন। কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে এসে কমান্ডার সিরাজী মত পরিবর্তন করলেন। আমাদের পারাপারের জন্য রাতে একটা কলাগাছের ভেলা তৈরী করা হলো। এতে তিন জনের বেশী যাওয়া সম্ভব না, আর আমাদের সাথে যে সব গোলাবারুদ আছে এগুলা এভাবে নিতে রিক্সি, বিশেষ করে গ্রেনেডের ক্ষেত্রে। গ্রেনেডই আমাদের মূল হাতিয়ার আর অস্ত্র বলতে ছিল দুইটা সাব মেশিন গান, একটা পয়েন্ট টু টু বন্দুক একটা পিস্তল সাথে বিশ বাইশটা আর জে হ্যান্ড গ্রেনেড টি-৩৬।

সকালবেলা রইছ মিয়াকে তার গ্রাম পাঠিয়ে দেয়া হলো, তার বাড়ী ভাটীর বংশীকুন্ডায় যথাসম্ভব একটা বড় নৌকা নিয়ে রাতের অন্ধকারে ফিরে আসবে। সেই দিনটাও আমরা ঘরবন্ধি হয়ে কাটিয়ে দিলাম। মুল অপারেশনের পূর্বে একটু হালকা হতে পারলে ভালই হয় আমরা এমনি একটা সুযোগ পেলাম।

রইছ মিয়া ঠিক সময়ে এলো আমরা সব কিছু ঘুছিয়ে খুব ভোরে পৌঁছে গেলাম। তবে এখান থেকে গুলাগুলির আওয়াজ হলে ক্যাম্প থেকে সেটা স্পষ্টত শুনা যাবে, এই ভেবে কমান্ডার আমাদের নিয়ে আরো তিন চার মাইল এগিয়ে গেলেন। একটা রাস্থার মোরে আমরা এ্যাম্বুশ করলাম। পূর্বদিক থেকে রাস্তাটা এসে বামে হালকা বাক নিয়েছে তারপর আবার ডানে। এখানটাই আশেপাশে কোন ঘরবাড়ি নেই, ডান দিকে খানিক দূরে কিছু বাড়ী আছে, তবে বাম দিকে বিস্তর ফাকা জমি তারপর যতদূর চোখ পরে শনির হাওর। আমাদের জন্য এ জায়গাটা বেশ সুবিধে হয়, ডান দিক থেকে দুইটা সব মেশিন গান ফিট করা হলো। প্রথমে হবে গ্রেনেড চার্জ। তারপর ফায়ার। ফারারের দায়ীত্বে আমি ও শফিক ভাই দুজনের সাথে আর সহকারী দুইজন। কমান্ডার আলতাফ সিরাজী প্রথম বাঁকে, গাড়ীটি আমাদের রেঞ্জে পৌঁছলে তিনি বাঁশিতে ফু দিবেন। সাথে সাথে রইছ মিয়া গাড়ী লক্ষ করে গ্রেনেড থ্রো করবে, তারপর লাফিয়ে পড়বে পানিতে তার একটা বিষেশ গুন আছে তা হলো সে অনেক্ষন পানিতে ডুব দিয়ে থাকতে পারে! তার কাজ হলো, যাথাসম্ভব ডুব দিয়ে দূরে সরে যাওয়া। সঠিক ভাবে গ্রেনেড চার্জ করে ডুব দিয়ে কতদূর পর্যন্ত যেতে পারবে এটা বেশ কয়েক বার প্রেকটিস করানো হলো রইছ মিয়াকে, প্রতিবারই সে পাশ করলো। কমান্ডার সুনিশ্চিত হয়ে ফাইনাল ব্রিফ দিলেন। রইছ মিয়ার গ্রেনেড চার্জের পর আমাদের ফায়ার। তার সামনে আমাদের আরো দুই জন গ্রেনেড নিয়ে পজিশনে থাকবে।

সকাল হওয়ার আগেই আমরা যার যার পজিশন নিলাম। রইছ মিয়াকে শিখিয়ে দেয়া হলো কিভাবে গ্রেনেডের রিং খুলতে হয়। বেলা আটটার দিকে ক্যাপ্টেন ইহতেশামের গাড়ী লো গতিতে এগিয়ে আসছে, তবে আজ দুটি গাড়ী! একটা জীপ, ও একটা পিকআপ। জীপটি সামনে তার পিছনে পিকআপ। কি মনে করে আলতাফ সিরাজী তার বাঁশি বাজালেন না! তিনি হয়তো ভাবলেন আমাদের এই জনবল নিয়ে আক্রমণে যাওয়া ঠিক হবে না। এদিকে রইছ মিয়া আর এটা বুঝলো না, তাকে ঝোপের লতা পাতা দিয়ে ছদ্মবেশে ডেকে রাখা হয়েছিল। সে ঠিক সময়ে গ্রেনেড নিক্ষেপ করলো! তার নিশানাও টু দ্য পয়েন্টে হয়েছে। তারপর ঝাপিয়ে পরলো পানিতে, মূহুর্তেই পিকআপটি ছিন্নভিন্ন হয়ে আছরে পরলো রাস্তায় পাশের ডুবায়। জীপটি প্রায় বেড়িয়ে গেছিলো কিন্তু তারা গঠনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হঠাৎ ব্রেক কশলো। ততক্ষণাৎ আমার মেশিন গানের ট্রিগার চাপা হয়ে গেছে! এক মিনিট ও লাগলো না, তারপর আরেক ম্যাগাজিন, তারপর আরেক ম্যাগাজিন; খুব অল্প সময়ে দশ বার জনের একটা প্লাটুন কমান্ডার সহ ফিনিস হয়ে গেলো।

এদিকে ক্যাম্পে বিশেষ অতিথির আগমন উপলক্ষে, তাকে চমকে দেয়ার জন্য মেজর রশীদ আনোয়ার বন্দুক হাতে পাখি শিকারে বেরুলেন। রাজাকার সুবাহান কাদের আজ তাকে টাঙ্গুয়ার হাওরে নিয়ে এলেন। শেষ বর্ষায় এই হাওরে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে নানান জাতের অতিথি পাখি আসে, এছাড়া ল্যাঞ্জা, বালি, পাণকৌরি তো আছেই। পাখি শিকার হোক বা না হোক হাওরের অপরূপ দৃশ্য দেখে মেজর রশীদ আনোয়ার খুব তৃপ্তি পাচ্ছেন। তিনি মনে মনে ভাবছেন, ‘‘শালা বাঙাল জাত কত সুন্দর একটা দেশে বাস করে! ইয়াহিয়া খানের রুচির তারিফ করতে হয় বটে।’’

গুলাগুলির আওয়াজটা ক্যাম্প পর্যন্ত না পৌছালেও পাঞ্জাবী সেনারা গ্রেনেডের আওয়াজটা ঠিকিই বুঝতে পারলো। ভুলবশত মেজর রশীদ আনোয়ার সেদিন ওয়ারলেস সেট নিয়ে যায়নি। তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবী সুবেদার তার সৈন্যদের ষ্টেন্ডবাই করে নিলেন। এই মুহূর্তে আমাদের ক্যাম্প অ্যাটাক করা ঠিক হবে না। বীণা সহ এলাকায় আরো বেশ কয়েকজন যুবতী মেয়ে আটক আছে ক্যাম্পে, তাদের কথাও ভাবতে হচ্ছে। তবে সময় খুব কম, যা করার খুব দ্রুতই করতে হবে। গ্রামবাসীর এক লোক মারফত খবর নেয়া হলো, ক্যাম্প কমান্ডার রশীদ হাওরে পাখি শিকারে গেছেন। বিষয়টা আমাদের জন্য খবই পজেটিব ঠেকলো, সাথে সাথেই আমরা হাওরে রওয়ানা দিলাম। মূল টার্গেট কে ট্রুপসহীন পাওয়ার চেয়ে সহজ যুদ্ধ আর কী হতে পারে? আর রইছ মিয়া থাকায় হাওর যত বড়ই হোক না কেন তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না।

মেজর রশীদ আনোয়ার পাখি শিকারের নেশায় এতই মগ্ন যে, আমাদের নৌকা তার একদম কাছে চলে আসাতেও সে টের পেলো না! সাব মেশিন গানটা আগে থেকেই লোড করে ম্যাকসেভ করে রেখেছি। আলতাফ সিরাজী নিজে সেফটি ক্যাচ অন করলেন, তারপর এইম করলেন এক পাঞ্জাবী সেনার মাথা বরাবর। সিরাজী সাবের অভিজ্ঞ হাত নিশানা মিছ করলো না। মুহূর্তেই লোকটা ছিচকে গিয়ে পানিতে আছরে পরলো, তারপর আরো একজন। সাথে সাথে সুবাহান কাদের পানিতে লাফিয়ে পড়লো! মেজর রশীদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ঠাঁয় দাড়িয়ে রইলো, এই মুহূর্তে সে লাফ দিবে, নাকি পাল্টা গুলি ছুড়বে বুঝে উঠতে পারছে না। আমাদের সবগুলো অস্ত্রের নলী তার দিকে তাক করা। কমান্ডার তাকে অস্ত্র ডাউন করতে ইশারা করলেন, অনায়াসে তার অস্ত্রটা হাত থেকে খসে পরলো পানিতে। রাজাকার সুবাহান কাদেরকে টেনে হিঁছড়ে নাওয়ে উঠানো হলো। রইছ মিয়ার নেতৃত্বে তাদেরকে পিছমোরা করে বাধা হলো।

ক্যাম্পের ঘাটে নৌকা ভিড়তেই পাক সুবেদার এগিয়ে এলো, আমরা সবাই নাওয়ের ভিতরে বসে আছি। রইছ মিয়া বেরিয়ে এসে তাকে ভিতরে ডাকলেন, সুবেদার উঁকি মেরে দেখতে পেলো তার মনিব হাত-পা বাধা অবস্থায় পাটাতনে পরে আছে! শুধু চোখ দুটি খুলা, সাথে রাজাকার সুহানেরও একই অবস্থা। আলতাফ সিরাজী তাকে চুপচাপ নাওয়ের ভিতরে আসতে ইশারা করলেন। সুবেদার নিরুপায় হয়ে ভিতরে ডুকলেন, তাকে বলা হলো, ‘ক্যাম্পে আটক যত নারী আছে তাদের এক্ষুনি ছেড়ে দাও আর তোমাদের জোয়ানদের সব অস্ত্র এখানে নিয়ে আসো। বিনিময়ে তোমাদের জীবন বাচানো হবে।’
নিরুপায় সুবেদার জীবন বাচাঁতে আমাদের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন। রইছ মিয়া তার সাথে গিয়ে বীণাকে নিয়ে এলো নৌকায়। এরপর আর আমাদের এ্যাকশনে যেতে হলনা, সুযোগ পেয়ে গ্রামবাসীরাই হামলা করলো পাঞ্জাবীদের উপর। মেজর রশীদ আর সুবাহান কে নিয়ে আমরা আবার হাওরে দিকে রওয়ানা দিলাম, এই দুই হারামীর ক্ষমা নাই।

দীর্ঘদিন শারীরিক নির্যাতনের ফলে বীণা অর্ধমৃত প্রায়! মেয়ের অবস্থা দেখে তাঁজউদ্দীন সাহেবের মাথায় রক্ত চরে গেলো। সে পাগলের মত মেজর রশীদকে এলোপাথাড়ি কুল-ঘুসি, চড়-থাপ্পড় মারতে থাকলো। গেরীলা কমান্ডার আলতাফ সিরাজী তাকে বাধা দিলেনা। এগিয়ে এসে কাধে হাত রেখে বললেন, ‘চাচা ওরে আপনার হাতে মারবো বলে এখানে নিয়ে এসেছি, আপনি নিজ হাতে ওকে শেষে করুন। চাইলে গুলিও করতে পারেন।’
তাঁজউদ্দীন সাহেব ওরে গুলি করলেন না। মারতে মারতে রক্তাক্ত করা দেহটাকে আরো শক্ত করে বেধে পানিতে ফেলে দিলেন, সাথে সাথে বুদ বুদ করে মেজর রশীদ আনোয়ার নামের এক জীবন্ত নর-পিশাচ হাওরের পানিতে ডুবে গেল!
রইছ মিয়ার শেষ আবদার, ‘ছারগো জীবনে কোনোদিন বন্দুক চোউক্ষে দেহিনাই যুদি অনুমতি দিতেন, তাহলে এই রাজাকার কুত্তার বাচ্চারে আমি নিজ হাতে একটা গুল্লি করতাম। আলতাফ সিরাজী আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘ওরে গুলি করা শিখায়ে দাও।’

একটা না দুইটা না রইছ মিয়া টানা তিরিশটা গুলি করলো সুবাহান কাদেরের বুকে