পথের দেখা

তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল পথ চলতে চলতে,
সেদিন ছিল রোদে জ্বলা দুপুর,
আকাশে মেঘ ছিল না একটুও।
রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম তোমায়
এরপর যখন আবার দেখা হলো
তুমি আমায় চিনতে পারলে না,
বলতে গিয়েও বলা হলো না যে
আমি তোমায় চিনি,
এরপর দেখা হয়েছে বহুবার
কারণ আমাদের যাতায়াতের রাস্তা ছিল একটাই।
এভাবেই একদিন আলাপ-
হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম
এ পথে তুমি আর যাও না,
ভাবলাম বোধহয় তোমার জ্বর
কিন্তু একদিন দেখলাম রিক্সায় তোমার সঙ্গে অন্য এক নারী,
কষ্ট হলো
ঝুমবৃষ্টি নেমে এলো
কিন্তু রোদে জ্বলা দুপুরের পোড়া দগদগে ঘা রয়ে গেল,
আজ অনেক দিন পর তোমায় আবার দেখি
সেই পথে,
কিন্তু এবার যে পথটা অচেনা।
তোমায় হারিয়ে সেই পথে আর হাঁটি না
হঠাৎ একদিন আমার সামনে এসে দাঁড়ালে,
অকপটে স্বীকার করলে তোমার সব দোষ
সেটা নাকি ছিল তোমার খনিকের মোহ,
কিন্তু আমি যে পথ হারিয়ে ফেলেছি।

আমার হাত দুটো ধরে বললে, কিচ্ছু হারায় নি,
আগের মতোই একই পথে হাঁটব তুমি আমি,
নাহয় এই পথেই হলো কিছু দেরী।
…………………………………………..

কেমন করে

কেমন করে যেন আজ আমার ইচ্ছের
ডানা চুরি হয়ে গেছে,
কেমন করে যেন ভাসতে ভাসতে
তোমার হাত খানা ধরেছি,
কেমন করে যেন সব হারিয়ে
আকাশের ঘুড়িটা ধরেছি,
কেমন করে যেন আমার সব কিছু
অন্যের হয়ে গেছে,
আমার ঘর আমার বিছানা আমার কেনা
বই গুলোও,
আমি কিছুই করতে পারিনি
শুধু চেয়ে থেকেছি,
একদিন দেখলাম আমি আমাতে নেই
সব কিছুই অন্যের অধিকারে চলে গেছে,
ইচ্ছের ডানা ঝাপটে আমি আহত পাখির মত
ছটফট করেছি,
তবুও …
একটা পরিযায়ী মন
তোমাকে খুঁজেছে।।
…………………………………………..

শ্যামলী মা

যতদূরে চোখ যায় শুধুই শ্যামলী মা
অপার সৌন্দর্য ধারণ করেছে বুকে,
ছয়টি ঋতুতে বিভিন্ন ভাবে সাজে এই রূপসী বাংলা।
কখনো শরৎ আসে কখনো হেমন্ত এরপর শীত বসন্ত,
গৃষ্মের খড়তাপে পোড়ে শহর বন্দর গ্রাম,
কিম্বা বর্ষায় ভেসে যায় কখনও অধিকাংশ অঞ্চল।
আমাদের জীবনে ছয়টি ঋতু ঘুরে ফিরে আসে,
পাখি হয়ে করে ডাকাডাকি।
রোদ বৃষ্টির খেলায় মাতে মন,
শ্যামলী মায়ের পরশ লাগে গায়।
কখনো মন চলে যায় স্রোতহীন কোন নদীর কুলে
কখনও ভেসে আসে সুর বাতাসের চলাচলে,
কান পেতে রই, পাখির কলতানে ভরে রয় মন।
সুখপরী দুঃখপরী এপিঠ ওপিঠ জড়িয়ে থাকে।
ঘুমঘোরে আসো কে তুমি মনোহর?
এসো শ্যামলী মায়ের বুকে গড়া ছোট্ট আমার গৃহে,
যার সম্মুখে যতদূর চোখ যায় শুধুই সবুজ,
যেখানে ভালবাসা বিছায় আঁচল।
…………………………………………..

হেমন্ত

হেমন্তে প্রকৃতিতে বাজে নতুন সুর
জনমনে জাগে শিহরণ,
বাতাসে বাতাসে খেলে নতুন ধানের গন্ধ,
ছড়িয়ে পড়ে সোনালী রোদ।
আজিকে হাওয়ায় বাজে গান
প্রাণ করে আনচান,
মল্লিকা, গন্ধরাজ, ফোটে যত হেমন্তি ফুল,
সুবাস মাখা কামিনী নিয়ে করবো কানের দুল।
পেঁজা পেঁজা কাশবন, সাদা শুভ্র আকাশ
মেঘের টানে উড়ে আসে হেমন্তি বাতাস।

ওরে ওরে ধান তোল গোলায়
আজি গেয়ে যাও গান,
তোমার প্রাণের কথামালা
শুনবো পেতে কান।
মেলা বসেছে দেখ
শখের চুড়ি, মোয়া মুড়কি
পাবে সেথায় চলো,
আমার সাথে জোছনা রাতে বঁধু
কোর না আর ছল।

গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে আনন্দ আজ ধরে না
সবার মুখেই হাসি
ওরে নবীন ওরে কৃষান
আজ তোমার দিন ফিরেছে
ঘরে উঠেছে শস্যদানা,
এমন সুখের দিন বছর ঘুরে
আবার যেন আসে ফিরে।
…………………………………………..

বৃষ্টি

হায় বৃষ্টি
মাঠ ঘাট টুই টুই
পুকুর নদী থৈ থৈ।

সারাদিন বৃষ্টি
কন্যা যেন নেচেই করে সৃষ্টি
বৃষ্টিরানী ফেরায় না তার দৃষ্টি।

ঝুম ঝুম বৃষ্টি
ঘরে আছে খৈ মোয়া
খেতে দেব
পাটি পেতে বসতে দেব
ঘরে এলে ইষ্টি।

বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি
চড়াই দুটো বৃষ্টি ভেজা
বারান্দাতে বসলো এসে
ডানা ঝাপটে অপেক্ষাতে থাকে
কখন থামে বৃষ্টি,
ও যে পাখি উড়েই গেল
থামেনিতো বৃষ্টি
আবার কোথা বসবি গিয়ে
উড়ে গেলি আজকে আমায়
হারিয়ে দিয়ে।

আকাশ জুড়ে বৃষ্টি
এরই মাঝে হারালি কোথা
সৃষ্টি ছাড়া সৃষ্টি
ঝুম ঝুম বৃষ্টি
খুব নেমেছে বৃষ্টি।
…………………………………………..

অভিশপ্ত

অভিশপ্ত আমি,
বিকিয়েছি এই মন,
যার নিজের বলে কিছু নেই
হারিয়েছি সকল আপনজন।
আমায় তবে কিসের প্রয়োজন?
যার ছিল না কোন কুল
নেই আজও,
অভিশাপ কুঁড়ে কুঁড়ে খায় যারে
ভেসে বেড়ায় অকূল পাথারে,
সবাই ফেরায় মুখ
অভিশপ্ত একজন।
আমায় যতই বলে লোকে
আমার সঙ্গে অসুচির বসবাস,
শিয়রে তব নাই কোন প্রদীপ
বৃথাই করি সুচী হবার প্রয়াস।
আমায় নিয়ে ভাঙ্গো আটপৌরে কাব্য
কত বিদ্যের বই
আমার উপর ছড়িয়ে দাও
তোমার সুখের বাড়ই,
রোজ সকালে মনের মাঝে
আকাশ জুড়ে বৃষ্টি
শান্ত নিথর দেহের ভাঁজে
রাত্রি জুড়ে মরণখেলার সৃষ্টি।
…………………………………………..

শরৎকাহন

শরৎ এসে গেছে
আবার কাশবন ভরে যাবে সাদা শুভ্র ফুলে,
জানো- বহু বছর আগে শহরের যেখানে বাস করতাম তার ধারে কাছে কেন?
বহুদূর পর্যন্ত কাশবন দেখা যেত না।
মনে খুব আফসোস হতো,
কাশবনে ঘুরে বেড়াবো এমন ভাবনা মনেই রয়ে গেছে।
আজ আমাদের বাড়ির ধারেই কাশফুল ফোটে,
বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিক্সায় খুব কাছেই।
সেখানে অনেক যুবক-যুবতী কপোত-কপোতী ঘুরতে যায়,
আমার আর যাওয়া হয় না।
এই ক’বছর আগে তো তুমি ছিলে না-
আজ তুমি আছো,
এইতো সে বছর তোমার হাত ধরে কাশফুল ছুঁয়েছি।

একসময় কাশফুল দেখতে পাই নি যদিও,
শরতের শিউলির কিন্তু অভাব ছিল না,
আবার শরৎ এসে গেছে-
শিউলির ঘ্রাণে ভরবে সকালটা,
আর কিছুদিন পর হয়ত আস্তে আস্তে শীতের আমেজও শুরু হয়ে যাবে;
শিশির ভেজা ঘাসে শিউলি পরে থাকবে।
তোমার হাত ধরে হাঁটতে চেয়েছি কত সকাল,
হাহ্ হাহ্ হাহ্-
এখন পরিণত বয়সে এসে-
ধুর ছাই।

আঁচলে শিউলি নিয়ে মালা গেঁথেছি কত,
আজো যখন শিউলি তলে যাই, দু’হাত ভরে কুড়াই।
গায়ে মাখি তার সুবাস, হাতে মুখে-
যেন ঐশ্বরিক এক অনুভূতি।

আজ তোমাকে পেয়েছি অন্য রূপে,
শরতের কাশফুলে নয়, শিউলিতে নয়
জীবনের অতি বাস্তবতায়।
সময় ঘড়িটা বয়েই চলেছে
তবু ভাবি,
শরৎ এসে গেছে
আবার শরৎ এসে গেছে।
কল্পনায় ছুঁয়ে থাক কৈশোর,
ছুঁয়ে থাক তারুণ্য;
ছুঁয়ে থাক অন্য বেলা।।
…………………………………………..

এক নারী, কুলটা-

এই পৃথিবীতে আমার বাঁচতে ইচ্ছে করে না,
কি নিয়ে বাঁচব?
একটা স্বপ্ন?
স্বপ্ন যে আমার শেষ হয়ে গেছে শিশু কালেই,
যখন পাড়ার ছেলেরা ইভটিজিং করতো আর অভিভাবকেরা তাকাতো কড়া চোখে।
দোষটা কি আমারই ছিল?
এই পৃথিবীতে আমি কি নিয়ে বাঁচব?
একটা স্বপ্ন?
লেখাপড়া শিখবো, বড় হব, নিজের পায়ে দাঁড়াব,
তাও যে শেষ হয়ে গেল,
প্রাইভেটে, কলেজে সর্বত্রই নিপীড়ন
তারা যে শিক্ষক, পুরুষ
না! কোনদিন বলা হয় নি।

আমি কি নিয়ে বাঁচব?
একটা স্বপ্ন?
চাকরিটা তো হলো না লেখাপড়া জানি না বলে,
তবে বিয়ে তো করতে পারি।
কিন্তু!
আমি যে ভালো মেয়ে নই, পাড়ায় বদনাম
যারা এসিড মারতে চায়, পিছন পিছন ছুড়ি নিয়ে দৌড়ায়,
আমার নাকি তাদের সঙ্গেই প্রেম।
আজকাল বিয়ের বাজারেও যোগ্যতার দরকার হয়,
মেয়ে কি করে?

বিয়ে!
আমি যে মোটা, বিয়ে তো এত সস্তা নয়।
আমি কি নিয়ে বাঁচব?
আমার একটা নিজস্বতা চাই,
আমি তো গান শিখতে পারতাম
কিন্তু তাতে যে ধর্ম বাঁধ সাধে,
আমি যে জাহান্নামী হব।
কেন জানি না, আমার নাচের প্রতি একটা দুর্বলতা ছিল,
ঐ! বাবার নিষেধ।
যা হোক! তবুও তো আজ মানুষ হয়েছি,
নিজের জন্মটাকে স্বার্থক করেছি,
হুম, স্বার্থকই তো!
অপমান লাঞ্ছনা গঞ্জনায় ভরা আমার কৈশোর, তারুণ্য আর যৌবন,
কারণ কিছুই শিখি নি।
আমি আমার নারীত্বে আটকে গেছি,
নারীর মায়া, ভালবাসা উপভোগ্য হয়ে উঠেছে অন্যদের চোখে,
ন্যাচারাল ট্যালেন্ট।
আমি পারিনি, পারিনি হতে তোমাদের ছাঁচে গড়া,
তোমরা আমায় ক্ষমা করো।

বিনীতে,
এক নারী, কুলটা।
…………………………………………..

সুখের নোঙর

সন্ধ্যা আকাশের তারার মত নিঝুম স্বপ্ন বুনি
রূপালি চাঁদ হাসে যেন,
তারই গান শুনি।
বেপরোয়া বাতাস বয় কালবোশেখি ঝড়ে,
তারই টানে হাওয়ায় হাওয়ায়
কল্পতরু ওড়ে।
মন মোর ভেসে যায় কল্পনার ডানায় চড়ে
মেঘের ওপারে,
দূর দিগন্তে হারিয়ে যাই
সুখের নোঙর ছেড়ে।
দুয়ারে সেই তুমি
ভেজা বাতাস ভেজা আঙিনা
মন ভেজালে,
কাছে এসে,
শিয়রে প্রদীপ নিভালে।
…………………………………………..

শেষ

নিকষ কালো অন্ধকারে গুঁজে থাকা জীবন
নয়তো সে স্বাধীনতা হয়ত বা লুকিয়ে থাকা,
স্বাধীন হবার আকাঙ্ক্ষা ছিল কিনা জানা নেই
তবুও কি যেন হাতড়ে বেড়ায় অবস করা শরীরে,
ভয় তার বিপদে নাকি খুঁজে বেড়ায় বিপদ
ভালবাসা ছিল জীবনে তবু জয় করার আকাঙ্ক্ষা।
হঠাৎ ভুলে যাওয়া কে নিজে
ভাবনার অবকাশ কিই বা আছে,
তুচ্ছ জগৎ তুচ্ছ জীবন
সব ভুলে গেলেও কি যেন এক দুর্নিবার আকর্ষণ
টেনে নিয়ে যায় কোথায়,
বড় হয় অন্তর আর বড় হয় প্রেম।