আষাঢ় গিয়ে শ্রাবণ আসে। মরা হানু গাঙে বান ডাকে। মহাজনী নৌকা গাঙের ঘাটে ভিড়তে শুরু করে আষাঢ়ের শেষ দিক থেকেই। হারু পাটনীরা সাত পুরুষ ধরে মাশালে বাজারের হানু গাঙের ঘাটে খেয়া দিয়ে আসছে। হারুর ঠাকুরদা হরিহর বলতো – ‘‘মানষির যেমনটা জোয়ানকী থাকে, নদীরও তেমনডাই থাকে। নদীর লগে মানষির জোয়ানকীর কিন্তুক ঢের ফারাক। মানষির জোয়ানকি চলি গ্যালি পারে তাগেরে পুরুষ্ঠু শরীরটা ন্যাতিয়ে যায়, গাঙেরও তেমনটাই লাগে জল শুকায়ে গ্যালি পারে! জোয়ানকী ভরা গাঙ চোত বোশেখ মাসে ন্যাতার নাহাল বালির চরে পড়ে থাকে, কিন্তুক গাঙে বর্ষার জল পড়তি না পড়তিই সে ফুলে ফ্যাঁপে ওঠে, আর জোয়ানকী আবার ফিরে আসে। মানষির জোয়ানকি একবার হারালি পারে তা আর ফিরে পায় না।’’

হারুর ঠাকুরদা হরিহর পুরনো কালের অনেক কিছুই দেখেছে। অন্যদিকে, বাপ দাদার মুখ থেকে অনেক গল্পও শুনেছে।

ঠাকুরদাদার আমলে চোত মাসেও হানু গাঙে পানিতে ভরা থাকতো। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে হানু গাঙের অবস্থাও খারাপ হয়ে পড়েছে।

হারু পাটনী বোশেখের পয়লা তারিখে পারানির নাও মেরামত শেষ করে ফেলে। জৈষ্ঠ্য মাসের শেষ দিক থেকে হারু পাটনি খেয়া পারাপার শুরু করে। মাশালে বাজারের হাটবারের দিন হারু খাটুনিটা বেশিই হয়। বড় ছেলে পেরু তাকে নাও বাইতে সাহায্য করে। মামাবাড়ি থেকে হারুর ছোট ছেলে নাড়ু বাড়ি আসায় হারু পাটনির কষ্ট একটু কমেছে।

সেদিন হারু তাদের গ্রামের প্রহ্লাদ ব্যাপারির কথা মনে মনে ভাবে আর লগি ঠেলে নাও কূলে ভেড়ায়। আর ওদিকে, হারুর ছোট ছেলে বৈঠাটা রেখে গলুইয়ের রশির দিকে এগিয়ে যায় নাওটা বাঁধার জন্যে। হাটুরেরা হুড়মুড় করে নাও থেকে নামে। অনেকেরই হাতে ও মাথায় কিছু না কিছু মালপত্র! কেরাতুল্লার দুধের হাঁড়িটাতে কার যেন ঠেলা লেগে খানিকটা দুধ ছলকে পানিতে পড়ে গেলে সে খেঁকিয়ে উঠে হারুর ওপর তেড়ে যায়। কেরাতুল্লাকে লোকে কেরা বলে ডাকে।

‘‘তুমার জন্যিই খানিকটা দুধ পানিতি গ্যাল, হালার পো, এত হাটুরে ক্যানে এক লগে নাওয়ে উঠাইছো ক্যানে?’’ কেরাতুল্লার গালমন্দ শুনে হারুর ছেলে নাড়ু এগিয়ে এসে তার কথার প্রতিবাদ করে।ছেলের মার মুখো ভাব দেখে হারুর বুকটা ছ্যাত করে ওঠে। সে ভাবে, কেরা নায়েব বাবুর পেয়ারের লোক, সে নিত্যদিন নায়েববাবুর বাড়িতে দুধ রোজান দেয়। তাকে বটতলার দুধের হাটে বসে থাকতে হয় না। সে দুধের হাটকে বাঁয়ে রেখে সোজা কাছারি বাড়ির পিছনের নায়েবের বাসা বাড়িতে ঢুকে পড়ে মাঠাকরুনের হাতে দুধের হাঁড়ি তুলে দেয়। হারু মনে মনে ভাবে, নাড়ু কেরাকে কিছু বল্লি পারে বাপবেটার নামে সে মাঠাকরুনের লগে কতা লাগাতি বাদ রাখবিনানে।

হারু ছেলেকে তাড়া দিলে সে শান্ত হয়। কিন্তু কেরা থামে না, সে হারুকে গালমন্দ করেই যায়। নাড়ুও কম যায় না। হারু তার ছেলের ওপরই বিরক্ত হয় এটা ভেবে, আজ হাটবার, কোন উচ্চিবাচ্চি হবিনানে। কিন্তুক কাল সহালে হতি না হতি লায়েবের প্যায়দা নাড়ু আর তারে ধরে নিয়ে যাবেনে কাচারিতি। তারপর যা ঘটবেনে তা হারুর জানা আছে। লায়েব বাবুর প্যায়দা করমদি বেজায় বদমায়েশ, দেখতি ছোটখাটো হলিপারে কী হবি! লাপ দিয়ে উঠে চড় ম্যারে যারে তারে। লায়েব বাবু কাউরে ড্যাকি আনতি বললি পারেতো ব্যাঁধে নিয়ে আসে।

হারু নিজের ছেলের দিকে তেড়ে এসে বলে ‘‘শালার ছাওয়াল, বাপ থাকতি তোর কী কতারে! খাঁ’র পো, তুমি যাও বাপ, আমাগেরেই ঘাট হইছে। বাবুর কানে য্যানো কতা না যায়, মাঠাকরণের কাছে এ কতাটা কইও না বাপ। সুধো পাটনির লগে পাল্লা করে মাঠাকরুনের পা ধরে এবারে ঘাটডা নিছি।’’ কেরাতুল্লা হারুর কথায় শান্ত হয়ে নাও থেকে দুধের হাঁড়িটা নিয়ে নেমে যায়। এদিকে, নাড়ু, হারু পাটনির জোয়ান ছেলে, বাপের হাবভাব আর কথাবার্তা শুনে মনে মনে বাপের ওপর রাগে ফুঁসতে থাকে।

হারু নিজের ছেলের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেও লগি ঠেলে নাও ওপারের দিকে ঘোরাতে ঘোরাতে ভাবে, ছাওয়ালটা তো আমাগের দ্যাশ গাঁয়ের কতা জানে না, মামাবাড়ি জোড়াদায় ছোট থিকে ম্যানুষহইছিষ, এহানকার কতা কী বুঝবি তুই ব্যাটা, লতুন জমিদার, লতুন নায়েব, নতুন জল, নতুন বাজার! গাঙ শুকোলো, বাজার ভাঙি যায় যায়! মাশালের বাজার ভ্যাঙে গ্যালি পারে এতদিনি কী হত কী বুঝবি ব্যাটা!

হারু আবারো ভাবতে ভাবতে লগি ঠেলে, লতুন নায়েব, লতুন করে বাজার লাগাইতেছে, লতুন করে গ্যাঙে জল আইছে। কলকাত্তা থিকে লতুন জমিদার দু’চার দিনির মধ্যি অ্যাসে পরবেনে। বাজার আবার জমি উঠবেনে মনে কয়। গোহাটটা আবার লাগবিনি, গোলক কম্মকাররা সুনার দোহান খুলবিনি, বেপাড়াতি নাকি লতুন লতুন সুন্দোর সুন্দোর ছুড়ি আসবেনে!

হারুর ঠাকুরদা হরিহর মাশালের বটতলা জমিদারী এস্টেটের জমিদারদের সম্বন্ধে কত যে গল্প বলতো… এ এস্টিটির জমিদারির হাত বদলে হ্যবার কম শুনিনি। প্রত্থমে ইংরাজদের থিকে এ জমিদারী নাকি ক্যানে কলক্যাতার রায় বাহাদুর চিন্তামণি দে। তার ছাওয়াল হরকুমার দে ’র বিয়েতে তার জমিদারী এস্টিটির প্রিজ্জাদেরকে নেমতন্ন করিছিলেন তিনি। কলক্যাতায় যাওয়া তো মুখির কতা ছেলো না! তাহলিও কায়েতপাড়ার মতি ডাক্তার ও তার ভাই সুধাময়, আর বরদা পোদ্দারের লায়েব লগে আমিও জমিদারের ছাওয়ালের বিয়্যাতে কলক্যাতার গ্যাছিলাম। আর গিছিলো কালীনগরের মনাউল্ল্যা সরদার ও চণ্ডীখালির তমিজ ব্যাপারীর বাপ মফিজ ব্যাপারী। আমাগের গাঁওয়ে মতি দাস তো কলক্যাতায় ডাক্তরির পড়া পড়ছিলো, সে ওহানেই ছিলো। জমিদার বাবু’র ছাওয়ালে বিয়েতে গিছিলো য্যারা, ত্যাগের পত্যেককে একডা কাঁসার থাল, একডা কাঁসার গ্লাস আর একডা ধুতি দিছিলো জমিদারবাবু। আমাগের বাড়িতি এহন সেই থাল ও গ্লাস খুজলিই পাওয়া য্যাবিনি। জমিদারবাবু লগে ইংরাজগেরে দহরম ছ্যাল, রায়বাহাদুর বোলে কতা! জমিদারের ছাওয়ালে বিয়্যেতে সে কী রোশনাই! ইংরাজি বাদ্দির ব্যান্ডো পাটির বাদ্দি শুনে আমি তো থ! ঝাড়বাতি আর হরেক রকম বাজিতি রাত দিনির মত সলোক! বাজিবাদ্দির লগে লগে ইংরাজ সাহেবমেমরা কী যে নাচগান আর মজা করিছিলো, তা দেখলি পারে তোরা তাজ্জব হতি।

বটতলা জমিদার এস্টেটের ইতিহাসটা এলাকার লোকের মুখে মুখে ফেরে। এই এস্টেটের প্রথম জমিদার রায়বাহাদুর চিন্তামণি দে। চিন্তামণি সৌভাগ্যবান মানুষ, লটারীই তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেয়। ব্রিটিশ আমলের কথা, বাপমা হারা চিন্তামণি অল্প বয়স থেকে কলকাতার পোস্তগোলা ভুষিমালের বাজারের এক মাড়ওয়ারীর আড়তে কাজ করতেন। তিনি ভাগ্যের জোরেই গরীব থেকেই এক সময় অনেক টাকার মানুষ হন।

আড়তের মালিক মাড়ওয়ারীবাবু তাঁর নামে একটা লটারীর টিকেট কেনেন। লটারীতে চিন্তামণি একটা পুরনো জাহাজ পান। ওই জাহাজের পুরানো লোহা বিক্রি করে প্রচুর টাকার মালিক হন তিনি।মারোয়ারীবাবু তা থেকে একটা টাকাও নেন না। সেই টাকা দিয়ে তিনি তাঁর গোমস্তা চিন্তামণির নিজের কারবার খোলার ব্যবস্থা করে দেন। কয়েক বছরের মধ্যে চিন্তামণি ব্যবসা বাণিজ্য করে প্রচুর টাকার মালিক হয়ে জনহিতকর কাজে মনোনিবেশ করেন। তখন কলকাতায় ইংরেজ সাহেবদের রাজত্ব। চিন্তামণি ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে দহরম মহরম রাখতে ভোলেন না। ফলে জনহিতকর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রায়বাহাদুর খেতাব দেয়। ব্রিটিশ রাজত্বকালে রায়বাহাদুর খানবাহাদুর এমনকী সেকালের লাখপতিরাও স্বপ্ন দেখতো জমিদারী এস্টেট কেনার। জমিদারী কিনে জমিদার হওয়াটা ছিলো সরকারবাহাদুর ও প্রজাদের কাছে মানসম্মানের ব্যাপার। সে সুবাদেই চিন্তামণি রায় বাহাদুর মাশালে সাকিনের বটতলা এস্টেটের জমিদারী ক্রয় করেন।

শোনা যায়, তখনকার সরকার বাহাদুর নসরতশাহী পরগণায় কয়েকটি মৌজা নিয়ে মাশালেতে বটতলা এস্টেটের জমিদারীর পত্তনি দেয় চিন্তামণি রায় বাহাদুরের কাছে তা বিক্রি করার উদ্দেশে।

যশোরের উত্তর দিয়ে বয়ে যাওয়া গড়াই নদীর দক্ষিণ পাড়ের সুন্দরপুর গ্রামের পাশ থেকে একটা শাখা বেরিয়ে ইছাপুর, চাকদহ, মাশালে, কালীনগর, রাধানগর, সাচিলাপুর, দারিয়াপুর হয়ে মহিষাখোলা গ্রামের ভেতর দিয়ে হানুগাঙ নাম ধারণ করে গড়াই নদীর সঙ্গে মিলিত হয় কোন সে আদ্দিকালে। চিন্তামণি রায়বাহাদুর জমিদারী কেনার পর কলকাতা থেকে ঢাকার বিক্রমপুরের হারান মুখুজ্জে নামের এক কুলীন ব্রাহ্মণকে নতুন নায়েব করে পাঠান। নতুন নায়েব বাবু হানুগাঙের পাড়ে মাশালে কাছারি বাড়ির পাশে বাজার বসানোর প্রস্তাব পাঠান জমিদারবাবুকে, সিদ্ধান্ত নেন। জলজঙ্গল ঘেরা এলাকায় একমাত্র বাজার মাশালে বাজার জমজমাট হয়ে ওঠে চিন্তামণি রায়বাহাদুরের কৃপায়। সারাবছর বহতা হানুগাঙের ঘাটে বড় নৌকা ভেড়ে।

নাওটা এর মাঝে ওপারে ভিড়েছে, হারু এত ভাবনা চিন্তার মধ্যে খেয়ালই করতে পারেনি। আগেভাগে হাটে পৌঁছানোর জন্যে সবাই ব্যস্ত। ইছেপুরের রসো তেলিকে গাঙের ঘাটে দেখতে পেয়ে হারু জোরে জোরে লগি ঠেলে ঘাটে নাও লাগালো। রসো তেলির নিজের নাও আছে, কিন্তু নাও মেরামত করতে দেওয়ার জন্য মালপত্র লোকের মাথায় দিয়ে হাটে নিতে হচ্ছে। লোকটার নাম রসিক দাস,শাড়ি-ধুতি কাপড়ের বড় ব্যবসা করে রসো তেলি মালদার পার্টি হয়ে উঠেছে। রসিক দাসের ঠাকুরদা ভগবান দাস ইছেপুরের বাড়িতে বলদ গরুতে টানা তেলের ঘানি বসিয়ে তিল, তিষি, সরষে ভাঙিয়ে তেল তৈরি ব্যবসা শুরুর পর থেকে কৈবর্ত দাস ভগবান হয়ে গেল ভগবান তেলি। সেই থেকে লোকে তাদের বাড়িকে তেলি বাড়ি বলে জানে। হারু রসো তেলিকে বেজায় ভয় করে। লোকটার কথাবার্তা বেজায় খারাপ হলেও লোকটা কিন্তু আসলে ভালো। সে পাড়ানির কড়ি ঠিক মত দিতে কার্পণ্য করে না। ঘাটে নাও লাগতে দেরি হওয়ায় রসো তেলি চেঁচিয়ে উঠে- ‘‘এই শালা পাটনি, জোরে লগি ঠেল! এতক্ষণ লগি হাতে কী ভাবছিলি? বাজারের মাগিগুলোর কথা ভাবছিলি নাকি?’’

হারু কোনও কথা না বলে তাড়াতাড়ি লগি ঠেলে নাও ঘাটে লাগায়। বাপকে এভাবে গালাগালি করায় নাড়ুর মনে বেজায় কষ্ট লাগে, প্রতিবাদ করতে তার ইচ্ছে হয়।

নাড়ু মামা বাড়ি থেকে জোড়াদহ স্কুলে দশ ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলো। এতদিন সে ভদ্রলোকদের সঙ্গে ওঠাবসা করে এসেছে। তার ইচ্ছে ছিলো আরো পড়াশোনা করার। কিন্তু দু’দিনের জ্বরে মামা বাদল পাটনি মারা যাবার পর নাড়ুর আর ওখানে থেকে পড়াশোনা করা সম্ভব হলো না। তাদের গ্রামের কেউই স্কুলে যায় না। আর বাড়ির কাছে হাই স্কুলও নেই। দক্ষিণে মাইল আষ্টেক দূরে আবাইপুর হাইস্কুল, আর পূর্বে মাইল বারো দূরে নাকোল হাইস্কুল।

নাড়ু তার মাকে বলেছিলো, ‘‘বাবার সঙ্গে আমি নাওয়ের দাঁড় টানতে পাববো না। বাবাকে বলে আবাইপুর হাই স্কুলে ভর্তি করে দাও।’’ ‘‘বাপকে বল্লি প্যারেই হবিনি, জলজঙ্গল পারায়ে ওই স্কুলে যাবি কেমনে?’’ নাড়ু আমতা আমতা করে কী যেন বলতে যায়। ‘‘তুই কী লায়েব হবি! কায়েত বাওনের ছাওয়ালরা লেহাপড়া করতিছে না, আর তোর বাতিক হইছে লেহাপড়া করার!’’ নাড়ুর মা বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, ‘‘দুগ্গো ঠাকরুনকে হানুগাঙের ডুবায়ে পশ্চিমপাড়ার গদাই বাবুর মাকে তোরা পেন্নাম করার পর কী বলিছিলো তোর মনে আছে?’’ মায়ের কথা শুনে নাড়ুর মুখটা কালো হয়ে উঠে। সে মাকে বললো, ‘‘হ্যাঁ, মা স্পষ্ট মনে আছে। গদাই বাবু’র মাকে প্রণাম করার পর ঠাকরুন আমাদের প্রত্যেকেরই মাথায় দূর থেকে গাত রেখে বলেছিলেন–আমার গদাইয়ের সোনার সংসার হোক, আর তোরা তার দুয়ারে খেটেখুটে খাস।’’ ‘‘তা তো ঠিকই কইছেন, পাটনির ছাওয়ালপলের লেহাপড়া শিহে কী হবি! লায়েব হতি পারবি?’’

মায়ের কথ শুনে হারু পাটনির ছেলে নাড়ু’র মনটা দুমড়ে মুচড়ে যাবার মতো অবস্থা হয়। সে মাকে কীভাবে বোঝাবে, পাটনির ছেলেও নায়েবের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে। সে মনে মনে বলে, যা হয় ভেবেচিন্তে করতে হবে, তাই বলে সে গদাইবাবু’র দুয়ারে খেটে খুটে খেয়ে কোনওক্রমেই বেঁচে থাকবে না। বড়দা পেরুকে আসতে দেখে নাড়ু’র ভালো লাগে, সে বাড়ি যাবার কথা ভাবে।

চিন্তামণি রায় বাহাদুর গত হলে সত্যি সত্যি মাশালে বাজারের হালচাল নড়বড়ে হয়ে পড়ে। পিতার মৃত্যুর পর ছেলে হরকুমার দে জমিদার হলেন। তাঁর বয়সই বা কত! একমাত্র ভরসা নায়েব বরদা পোদ্দার। লোকে যা ভেবেছিলো তা কিন্তু হতে দেন না নায়েব বরদা পোদ্দার। কলকাতায় গিয়ে নতুন জমিদার রায়বাহাদুর হরকুমার দে’র সঙ্গে দেখা করে মাশালে বাজারকে টিকিয়ে রাখবার ব্যবস্থা করে এসেই কাছারির সামনে গানের আসর বসানোর আয়োজন করেন তিনি।

সন্ধ্যের আগ থেকে হেদু বয়াতির জারি গানের আসর বসবে। লোকজনের ভীড়টা তাই বেশি। নাড়ুর দাদা পেরু নাওয়ের বৈঠা ধরলে নাড়ু নাও থেকে হাটের পথ ধরে। এগিয়ে যেতেই সে বুঝতে পারে, জারি গানের আসর বসে গেছে। গানবাজনার নাম শুনলে নাড়ু’র মন নেচে ওঠে। সে বাড়ির পথ না ধরে আসরে গিয়ে বসে। নায়েব বাবুও আছেন, দেখে।

হেদু বয়াতির গলায় সারিন্দা ঝোলানো। সারিন্দা আর ডুগিতবলা, খুঞ্জরি, বাঁশি ও ঢালকের বাজনার তালেতালে গান শুরু হয়। দেদার বক্স, আতা মল্লিক, মানিক দাস, মামুদ আলী ও বিনোদবিহারী দোহারকীতে আসর মাতোয়ারা হয়ে উঠে। দেদার বাজায় বেহালা, আতা জুড়ি আর মানিক বাজায় ঢোলক। বটকৃষ্ণ বাঁশি।

গলায় ঝোলানো সারিন্দায় সুর তুলে হেদু বয়াতি গান ধরে: ‘‘বলবো কী আর সে সুখের সমাচার/ বলতে বুক ফুলে ওঠে আমার/ লাগলো সাধের মাশালের বাজার/ জমিদার চিন্তামণি ধর্মবতার/ নায়েব হলেন বরদা পোদ্দার/ সুখে সব প্রজা চালায় কারবার/ মাশালে লাগলো বাজার চমৎকার/ সুখে সব প্রজা চালায় কারবার।’’ হেদু বয়াতি গান শেষ করতে না করতে পেছনে বসা দোহাররা ধুয়ো গেয়ে ওঠে: ‘‘বলবো কী আর সে সুখের সমাচার।’’

হানুগাঙের পূব পাড়ের নোয়াগাঁও থেকে খেয়া পার হয়ে লোকজন আসতে থাকায় আসর জমজমাট হয়ে উঠতে থাকে। হেদু বয়াতি বলে আসরে লোক না থাকলে গান জমে না। আসর জমজমাট দেখতে পেয়ে হেদু বয়াতিকে খুশি খুশি লাগে। সারিন্দার বাজনার সঙ্গে ডুগিতবলা, খুঞ্জরি, বাঁশি ও ঢালক আবার গানের সুর তোলে। হেদু বয়াতি আবার গান ধরে: ‘‘বলবো কী আর সে সুখের সমাচার/বলতে বুক ফুলে ওঠে আমার/ ও আমার সাধের মাশালের বাজার/ হরগোবিন্দ হলেন নতুন জমিদার/ হবেন তিনি ধর্মবতার/ নায়েব আছেন বরদা পোদ্দার/ আসে কলকাতার বাঈজী মেয়ে আবার/জমলো আবার নতুন করে কারবার/ মাশালে হলো বাজার চমৎকার/ সুখে প্রজারা চালায় কারবার।’’

নাড়ুর মনটা এতক্ষণ পর ভালো ভালো লাগে। তার রক্তের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাওয়ার আভাস পায়। সে ভাবে, ‘আসে কলকাতার বাঈজী মেয়ে আবার’ কথাটার মানে সে এখন বুঝতে পারে।গতকাল কাছারির দিঝির ঘাটে স্নান করতে গিয়ে সুন্দর সুন্দর কয়েকটা মেয়েকে সে নাইতে দেখেছিলো। সে তখন ভেবেছিলো, এ গাঁয়ে তো এমন সুন্দরী মেয়েদের দেখিনি। গত বছর পুজোয় জোড়াদার জমিদার বাড়িতে কলকাতা থেকে আসা যাত্রা দলে এ ধরনের সুন্দরী সুন্দরী মেয়েরা নাচগান করে লোকজনের মন মাতিয়ে গিয়েছিলো।

কয়েকদিন পরেই রথযাত্রা। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে কাছারির সামনে যাত্রাগান হবে, কলকাতা থেতে নতুন জমিদার আসবেন। নাড়ু আবার মামাবাড়িতে ফিরে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু যাত্রাগানের কথা শুনে মামাবাড়ি যাওয়ার কথা সে ভুলে গেলো। সত্যি সত্যি রথযাত্রায় যাত্রা গানের আসর বসলো। এলেন নতুন জমিদার হরগোবিন্দ। নতুন জমিদার হানুগাঙের ওপারে একটা নতুন গ্রামের পত্তনি দিলেন।জমিদার বাবুর সঙ্গে নাড়ু দেখা করলে তিনি তাকে বড়ই পছন্দ করলেন। নাড়ু তার বাপকে জানিয়ে দিল সে ঘাটে নাও-এ বসবে না। জমিদার বাবু তাকে বড়ই পছন্দ করেন। তিনি তাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চেয়েছেন। নাড়ুর চেহারা সত্যি সত্যি নাড়ু গোপালের মতো। জমিদার বাবু কলকাতার মানুষ। রেস খেলা, একটু আধটু ড্রিঙ্ক এর অভ্যাস না থাকলে চলে! অন্য অভ্যাসটা থাকাও বিচিত্র নয়। কয়েকদিনের মধ্যে নাড়ু জমিদার বাবুর পেয়ারের লোক হয়ে উঠলো। জমিদার বাবু নাড়ুকে কলকাতায় নিয়ে না গেলেও কাছারিতেই ছোটখাট একটা কাজ দিয়ে গেলেন।

এক বর্ষা গিয়ে আর এক বর্ষা আসে। প্রতি বর্ষায় জমিদার বাবুর বোট কাছারি বাড়ির ঘাটে ভেড়ে। এভাবেই বছরের পর বছর গড়িয়ে যায়। জমিদারির অবস্থা রমরমা। এলাকার একমাত্র বাজার।বাজার জমজমাট হয়ে উঠে।

কয়েক বছরের মধ্যে দিন বদলের পালা শুরু হয়। হঠাৎ করে নায়েব বরদা পোদ্দার মারা যাওয়ায় এবার নায়েব হলেন চাকদহ গ্রামের ললিত মজুমদার। এদিকে গাঙও শুকিয়ে আসতে থাকে। বর্ষাতেও গঙে জল নেই। ললিতবাবু নায়েব হয়ে এসেই জমির খাজনা বৃদ্ধি করেন। পাশের গ্রামের জমিদার সমাজদারবাবুরা এই সুযোগে তলে তলে মাশালে বাজার ভেঙে দেওয়ার তালে থাকেন। হারু পাটনির নাও বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে, নাড়ু জমিদারির থেকে ভালই গুছিয়ে নিয়েছে এর মাঝে। এখন লোকে তাকে নাড়ু বলে ডাকে না। ডাকে নাড়ু বাবু বলে।

কিছুদিন যেতেই জমিদার বাবুর মৃত্যুর খবর এলো। আর তারপরই শোনা গেল নাড়ু বাবু সমাদ্দার জমিদারীর নায়েব হয়েছে। এবার বাজার ভেঙে যাবার পালা। সমাজদার জমিদারদের চক্রান্তে মাশালের বাজার ভেঙে গড়াই নদীর তীরে সমাজদার জমিদারীর এলাকায় নতুন বাজার বসলো।

এখন সেই জমিদার নেই, তবে জমিদারী আছে, কিনে নিয়েছে কলকাতার আর এক ধনী ব্যবসায়ী। হানুগাঙের পাড়ের সেই বাজার আজ আর নেই, নেই বাজারের সেই বেপাড়াটা। ওটা এখন উঠে গড়াই নদীর তীরের নতুন বাজারে পত্তনি নিয়েছে। নাড়ু বাবু এখন নতুন বাজারের হর্তাকর্তা। হানুর পাড়ে বাজার না থাকলেও এখনও আছে বটপাকুড় ছাওয়া বটতলা। পাকুড়তলা। আছে হেদু বয়াতি ও তার দোহাররা ও বাজারের ইজারাদার আর দোকানদাররা। হেদু বয়াতির বয়স বেড়েছে, মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে, দাঁত দুএকটা পড়েছে। এখন হেদু বয়াতি বলে বেড়ায় সারিন্দায় তার ছিঁড়ে গেছে।গান আর সে কী গাবে! হেদু বয়াতির শেষ ইচ্ছে, তার ছেঁড়া তারের সাবিন্দায় তার জীবনের শেষ আরে গান গাবে, তার গানের আসর বসবে ভাঙা বাজারের বটতলায়।

সত্যি তার শেষ ইচ্ছে মত গানের আসর বসে ভাঙা বাজারের বটতলায়। হেদু বয়াতির নাম শুনে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে গানের আসর। বয়াতির সাগরেদরা একে একে এসে জোটে। তার ছেঁড়া সারিন্দায় হেদু বয়াতি দরাজ গলায় গান ধরে। ‘‘বলবো কী আর সে দু:খের সমাচার/ বলতে বুক ফেটে যায় আমার/ এমন সাধের মাশালে বাজার/ জমিদার ছিলো চিন্তামণি ধর্মাবতার/ নায়েব ছিলো বরদা পেদ্দার/ সুখে ছিলো যত প্রজাগণ/ তারা চালাতো কারবার/ বলবো কী আর দু:খের সমাচার/ ভাঙলো মাশালে বাজার।’’ তার সাগরেদ দেদার বক্স তার বেহালায় সুর তুলে ওস্তাদকে চাঙ্গা করে তোলে। হেদু বয়াতি আবার গান ধরে, ‘‘গত হলে চিন্তামণি ধর্মবতার/ কেঁদে বুক ভাসায়/ যত সব প্রজায়/ ভাঙলো বুঝি এবার/ সাধের মাশালের বাজার।’’ হেদু বয়াতি গান থামিয়ে সারিন্দায় সুর তোলে।সেই সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোহাররা গেয়ে ওঠে, ‘‘বলবো কী আর সে দু:খের সমাচার…’’ দোহারদের গান শেষ হলে হেদু বয়াতি আবার গান ধরে, ‘‘বলবো কী আর সে দু:খের সমাচার/ গত হলেন চিন্তামণি ধর্মবতার/ কেঁদে বুক ভাসায়/ যত সব প্রজায়/ ভাঙলো বুঝি এবার/ সাধের মাশালের বাজার।’’ হেদু বয়াতি গান থামিয়ে সারিন্দায় আবার সুর তোলে। সেই সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোহাররা গেয়ে ওঠে, ‘‘বলবো কী আর সে দু:খের সমাচার…’’ শ্রোতাদের মুখে কোনও কথা নেই।

হেদু বয়াতি চোখ মুছে আবার গান ধরে: ‘‘তারপরেতে ললিত মজুমদার/ কলকাতা যেয়ে করে দরবার/ হয়ে এলেন নায়েব চমৎকার/ বৃদ্ধি করলেন হাটের খাজনা/ করলেন বড় অবিচার।’’

দোহাররা গেয়ে ওঠে, ‘‘বলবো কী আর সে দু:খের সমাচার…’’ শ্রোতারা হেদু বয়াতির শেষ গানটা শোনার জন্যে ঠায় বসে আছে। হেদু বয়াতি গানের শেষটুকু গেয়ে আসরের সমাপ্তি টানলো…‘‘ভাঙলো যদি মাশালে বাজার/ কাঁদে যত দোকানদার/ আরো কাঁদে মনাউল্লা/ চণ্ডীখালি হাফজ মোল্লা/ তিনি হাটের ইজারদার/ কেঁদে বলে আল্লাহ পরোয়ারদিগার।’’