আবদুল মান্নান সৈয়দ আমাদের সাহিত্যের নানা ধারার পটিক। শিশুচৈতন্যের নিবিড় অন্বেষায় সতত চলিষ্ণু। তার মত সাহিত্য মগ্ন, নিমজ্জিত, বিচরণশীল ও বৃত ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে বিরল। সেদিক থেকে বলতে হয়, তার এই সাহিত্য লগ্নতা মরুভূমিতে প্রবল বর্ষণের মত। সাহিত্যের সকল শাখাতেই প্রায় তিনি সমান দক্ষ। কবিতা, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ঔপন্যাস, অনুবাদ, গবেষণা প্রতিটি মাধ্যমেই কাজ করে চলেন ধ্যানী সাধকের মত। যে সমাজে তিনি বেড়ে উঠেছেন সেই সমাজের ঋণ স্বীকারে নির্ভীক ও অকপট। তার পূর্বক্ত ও সমকালীন সাহিত্যশিল্পীদের নিয়ে তার সমান আগ্রহ। এই শ্রদ্ধা প্রদর্শণ মান্নান সৈয়দের চরিত্রের একটি বিশিষ্ট লক্ষণ। কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) থেকে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ; নজরুল থেকে শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩) কিংবা মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর (১৮৯৬-১৯৫৪) ব্যাপারে তিনি সমান আগ্রহী। সৃষ্টির দিক থেকে ন্যূন বলে কোনো লেখকের প্রতি বিমুখ নন। বরং তিনি মনে করেন সকলেই তার ঐতিহ্যের অংশ এবং এই সমতাপূর্ণ প্রীতি আমাদের সমকালীন ইতিহাস বোধের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ইতিহাসের ক্ষেত্রে যদি ব্যাপারটা এরকম হয় যে, রাজন্যবর্গের কাহিনীই কেবল ইতিহাস নয়, নিম্নবর্গীয় মানুষও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তাহলে সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য যে, বড় সাহিত্য প্রতিভাই শুধু আলোচনার অংশ নন, একজন এমদান আলীও (১৮৭৬-১৯৫৭?) গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে সম্প্রদায় প্রীতি থাকলেও কিভাবে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা কাটিয়ে ওঠা যায় তিনি তার উজ্জ্বল প্রমাণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) ও ত্রিশের অন্যান্য লেখক-কবির প্রতি তার ঐকান্তিকতাতেই প্রমাণ হয়, প্রতিজ্ঞার যোগ্য সম্মান দেবার ব্যাপারে তার মধ্যে কোনো ভেদ-বুদ্ধি নেই।
সৃষ্টিশীল মাধ্যমে যেমন তার সদর্পে বিচরণ, তেমনি সমালোচনা ও গবেষণার জন্যও তিনি সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে তার একটি নিজস্ব কণ্ঠবৈভব প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সাহিত্য যখন সমালোচকশূন্যতায় ধুকছে তখন মান্নান সৈয়দের এই আত্মপ্রকাশ আশার আলো জ্বালে। এ মাধ্যমেও তিনি বহুকীর্ণ। পূর্বজ, সমকালীন ও অতি তরুণদের ওপর পর্যন্ত তিনি আলোচনা করেছেন ধীমান মনস্বীতায়। এ তার সাহিত্যপ্রেমের আরেক দীপ্র প্রকাশ। আমাদের সাহিত্য ইতিহাসের অধিকাংশ কালপুরুষদের নিয়ে তিনি নিবিড় অনুধ্যানে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন তাদের কৃতীগাথা। সমালোচক মান্নান সৈয়দের মত আবার গবেষক মান্নান সৈয়দ যখন সামনে দাঁড়ান, তখনও আমরা তার নিষ্ঠায় মুগ্ধ হই। আজ সমগ্র বাংলাসাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ নামক যে অসাধারণ কবির ব্যাপক বিস্তারণ তার মূল গবেষক মান্নান সৈয়দের রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। জীবনানন্দের ওপর গ্রন্থ লিখে, তার বিভিন্ন রচনাবলি সম্পাদনার মাধ্যমে প্রকাশ করে, বলা যায় বাংলাদেশে তিনিই জীবনানন্দ দাশকে সুধী সমাজে একজন শুদ্ধতম কবির প্রতিকৃতি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
জীবনানন্দ দাশ যে বড় কবি, গুরুত্বপূর্ণ কবি এই আবিষ্কারের অনেকখানি কৃতিত্ব এ সব্যসাচী স্রষ্টার প্রাপ্য। একইভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১), কাজী নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) প্রমুখের ওপর তিনি নিরলস কাজ করেছেন ও করছেন।
প্রবন্ধে তার ব্যাপক অবদান থাকলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কবি ও গল্পকার। এ দুক্ষেত্রে তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: নিরীক্ষা প্রবণতা। তিনি যখন কবিতা লেখেন তখন তার চেতনায় থাকে বিশ্ব কবিতা ইতিহাসের চালচিত্র। ফলে এ মাধ্যমে কিভাবে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যেতে হবে সেটা তার মননে ভাস্বর। তার কবিতার মূল মূত্র অন্বেষণ করতে চাইলে আমাদের বলতেই হবে, তিরিশি কাব্যান্দোলনের সফল উত্তরাধিকার তার কাঁধে; যদিও তা নিজস্ব মাত্রিকতায় দীপ্তিমান। ত্রিশ থেকে বাঙালি কবিদের অন্বেষণের ক্ষেত্র সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকরণ ও শিল্পসিদ্ধির খোঁজে বাঙালি কবিরা চষে বেড়ান সারা দুনিয়া। আবদুল মান্নান সৈয়দের মধ্যেও এই প্রবণতা আমরা লক্ষ করি। তবে তা বাঙালি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করে নয়। কবিতার ক্ষেত্রে অনেকের মত মান্নান সৈয়দও এ ব্যাপারে সতর্ক যে, তিনি আর যা কিছু হন না কেন এ অঞ্চলের আলো-বাতাসেই তার বেড়ে ওঠা। ফলে তার কবিতা বৈশ্বিক প্রলেপে ঢাকা থাকলেও ঐতিহ্যিক বৃষ্টিতে সিক্ত। তবু সমকালীন কাব্যের প্রবণতাগুলি থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হন নি। একজন লাতিন কবির সাথে তার কবিতাকে মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে :
That curtain of yellow silks
that a sun still gild and sigh ripple.
In one breath yesterday sways and rustles.

In space it still cerists
but conceives itself or sees itselt.
Asleep, whoever looks at it does not reply,
for he sees a silence,
or is a sleeping love.
(yesterday)

এটি হলো ভিনসেন্ট আলেকজাণ্ডারের কবিতা। অপরদিকে মান্নান সৈয়দ :
আকশে সম্পূর্ণ সূর্য বাতাসে চৈত্র-খুশি
দিন জ্বলছে সোনায় বোনা মসলিনের মতো
এরোপ্লেন ভেদ করে চলে যায় সূক্ষ্ম সোনার মসলিন
(নিঃশব্দ মিছিল? ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ)

উদ্ধৃত কবিতা দুটিতে একটি বিষয়ে আশ্চর্য সাদৃশ্য চোখে পড়ে। সাদৃশ্যটি হলো, উভয় কবির শব্দ ব্যবহারের একমুখিনতা। মালার্মে যেমন বলেছিলেন ‘শব্দই ঈশ্বর’। আমাদের এই কবি যেন সেই বোধ দ্বারা বেশ খানিক উদ্বোধিত।
অবিরত ভাংচুর ও বাঁক পরিবর্তণ মান্নান সৈয়দের কবিতার বিশিষ্ট লক্ষণ। ‘মাছ সিরিজ’ (১৯৮৪) – এর কবির সাথে ‘আমার সনেট’ (১৯৯০) – এর কবির অনেক পার্থক্য। আবার ‘পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি’ (১৯৮৩) –র সাথে কোন সামঞ্জস্য নেই ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ (১৯৯৩) কাব্যগ্রন্থের। এভাবে কবিতায় মান্নান সৈয়দ নানা ভূখণ্ডে পরিভ্রমণ রত। তার এই বৈচিত্র্যময় কাব্য যাত্রার আরেকটি প্রমান পাই পরাবাস্তবধর্মী কবিতাগুলোতে। এই মান্নান সৈয়দ যে স্বকীয়তার অন্বেষণে নিরীক্ষামগ্ন একথা তার সৃষ্টিতেই প্রমাণিত হয়।
একইভাবে ছোটগল্পের লেখক হিসেবে এই লেখক শুধুমাত্র একটি স্থির বিন্দুতে স্থান নন। ক্রমাগত তার ছোটা- নতুন গল্পের উৎসে। আমরা জানি, এক সময় তার আন্দোলনই ছিল কিভাবে নতুন ধারার গল্প লেখা যায়। তার এই আন্দোলনের সহযাত্রী ছিলেন সমসাময়িক বাংলাসাহিত্যের আরেক শক্তিশালী কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭)। গল্প লেখার শুরুকেই যাদের এরকম ঘোষণা ছিল, তাদের গল্প যে সাহিত্য ধারার প্রচলিত শৈলীকে অস্বীকার করে এগিয়ে যাবে তাতে আর অসম্ভব কি! মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মত বদমাস’ (১৯৬৮) গল্প গ্রন্থটি তার এই মানস-ধারাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। ‘মাতৃহননের নান্দী-পাঠ, গল্পটি পড়লে গল্পকারের রীতি বিরুদ্ধতার একটি সপ্রাণ চিত্র পাওয়া যায়। শুধু এই গল্পটি নয়, তার আরো কিছু গল্প আছে যেগুলোতে একই গল্প যে শাখাতেই হোক না কেন, এই দুই মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে মান্নান সৈয়দ তার মৌলিক প্রবণতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে নিজের শিল্প চৈতন্যকে বিকশিত করে তুলেছেন। তিনি সফল এখানেই যে, এই দুঃসাহসী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েও তিনি অনমনীয়, দ্বিধাহীন।
সাহিত্যের বহু শাখায় তার অবাধ বিচরণ বলে, অনেক সময় আমরা তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বিস্মৃত হই। তেমনই একটি ক্ষেত্র হলো মান্নান সৈয়দের অনুবাদ। আমাদের হয়তো মহন থাকার কথা যে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছিলেন তার অনুবাদ সাহিত্যের জন্য মান্নানের কবিতার অনুবাদ এমন প্রভাময় যে দেখলে অবাক হতে হয়। তিনি নিজেও একজন কবি বলে কবিতার অনুবাদে তিনি অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ, প্রানবন্ত , সাবলীল। অনুবাদের ক্ষেত্রে তার আরেকটি স্বকীয়তা হলো, তাতে কবিতার স্বাদ একেবারে অক্ষুণন থেকে যায়। তার অনুবাদ যেন অনুবাদ নয়- টি. এম. এলিয়টের ভাষায় (১৮৮৮-১৯৬৫) ‘ট্রান্সক্রিয়েশন’। কিন্তু দু॥খের বিষয় হলো, বহুদিন ধরে তার আর কোনো অনুবাদ আমাদের চোখে পড়ছে না। তিনি কি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন অনুবাদ থেকে? তার অনূদিত কয়েকটি কবিতা সামনে আনলেই বিষয়টির প্রমাণ পাব :

১. এক মুহুর্তের তরে ঝুলবারান্দায়
আমরা দুজন একা, একাকী দুজন।
আর সেই অভিরাম সকাল থেকেই
আমরা পড়েছি পেমে পরস্পরের।

শরতের সূর্যাস্তের গোধূলি – ধূসর
দিগন্ত অবধি টানা আকাশের নিচে
তন্দ্রাচ্ছন্ন গ্রামান্তের খুব আবছায়া
সেদিন ঘুমিয়ে ছিল গভীর নিবিড়।
বয় : সন্ধি/হোয়াল রামোন হিমেনেথ)

২. রেশমের খশখশ থেমেছে কখন,
প্রঙ্গনে ছেয়েছে ধুলা,
পদশব্দ নেই কোনো, জন্মেছে পত্রালি
স্তুপে স্তুপে, সেই মেয়ে হৃদয়ের অমরার থেকে
চলে গেছে মাটির অনেক নিচে :
হৃদয়দুয়ারে শুধু ভিজে এক পাতা লেগে আছে।
(লিউ শি/ এজরা পাউণ্ড)

৩. মেয়েটি একেবারে আমূল নগ্নিকা,
আমরা শুহন যাই জানালা ঘেঁষে আছে
যে-বীথি-পপলার-দুলছে আঁকাবাকা,
দুষ্টু পাতাগুলি কী কাছে, কত কাছে!

মস্ত কেদারায় আধে´গ্নিনী,
আমাকে কেদারায় আধে´গ্নিনী,
আমাকে এড়িয়েছে বছ, দুটি কর,
হরষে হেলে-দুলে ছোট্ট পা দুখানি,
ছোট্ট পা দুখানি মধুর বিস্তর।
(প্রথম প্রদোষ/ জাঁ আতুঁর ব্যাবো)
একই সময়ে মান্নান সৈয়দ বহুমাত্রিক।তার সৃষ্টি কর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে সময় তিনি কবিতা লিখছেন সেই সময়ই হয়তো লিখছেন ছোটগল্প, ঔপন্যাস বা প্রবন্ধ। একই সাথে বিশ্বের বহুশাখার এই সমন্বয় শুধু অত্যধিক প্রতিভাবান শিল্পীর ক্ষেত্রেই সম্ভবত ঘটে থাকে। কারণ সাহিত্যের শাখাগুলি যেমন একটি আরেকটি থেকে দূরত্বময় তেমনি তাদের সাদৃশ্যও অনস্বীকার্য। অনেক সময় অক্ষমতার কারণে অনেকের পক্ষে সব মাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু মান্নান সৈয়দ তার জাদুকরী প্রতিভায় কাটিয়ে উঠেছেন দুর্বলতা। যেন সাহিত্যের বিভিন্ন মেরুতে পরিভ্রমনের জন্য তাকে আলাদা করে কোনো প্রস্তুতি নিতে হয় কি। অত্যধিক সাহিত্য মগ্নতার কারণে সম্ভবত শিল্পের চাবিগুলি অতি সহজেই তার মুঠোতে এসে ধরা দিয়েছে; আর তিনি একটির পর একটি খুলে চলেন তার রূপালি পর্দা।
বহু স্রোতধারায় মিলন আবদুল মান্নান সৈয়দের মাঝে। একটি থেকে আর একটিকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে চেনা অসম্ভব। তাকে মূল্যায়ণ করতে হলে পূর্ণাঙ্গ মান্নান সৈয়দকেই সামনে রাখতে হবে। এই পরিপূর্ণ আবদুল মান্নান সৈয়দ সৃষ্টির প্লাবনে যে ভূখণ্ডের অধিশ্বর তা থেকে তার বিলয় নেই। তার সৃষ্টির গুনেই আজ তিনি আমাদের সাহিত্যের এক অনন্য পুরুষ।