কবিতা। তিনটি অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ অথচ এর বিশালতা আর গভীরতা অকল্পনীয়। হ্যাঁ সত্যিকার অর্থেই অকল্পনীয়। জীবনের প্রত্যেকটি উপাদান আর উপাত্ত নিয়েই কবিতা। একটি জীবনের আলোকে সামগ্রিক জীবন নিয়ে লেখা হয় কবিতা।কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বলেছেন, “যে লেখাটি সমকালের স্মৃতি বা স্বপ্নকে তুলে আনতে সক্ষম এবং একই সঙ্গে সমকালকে অতিক্রমের যোগ্যতা রাখে, তাকেই বোধ হয় কবিতা বলা যেতে পারে।”তিনি কিছুটা সংশয় নিয়ে কবিতার সংজ্ঞাটি দিয়েছেন। তবে তাঁর দেওয়া সংজ্ঞা বেশ স্বতন্ত্র ও অর্থবহ। কবি সিকান্দার আবু জাফর বলেছেন, “আমি কবিতা লিখি অনায়াসে। যেমন সকলেরই ক্ষেত্রে জীবনের আশে-পাশে অসংখ্য সুলভ দূর্লভ মূহুর্ত নানা রূপে অনাবৃত হয়েছে আমার সামনে। আমি কোন কোন সময় সেই সব মূহুর্তের স্বাক্ষর লিপিবদ্ধ করেছি সত্য-বিচ্যুতি না ঘটিয়ে। সেই আমার কবিতা।” অসম্ভব অর্থপূর্ণ একটি সংজ্ঞা এবং এই আলোচনা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় , আমার চোখের সামনে যা দেখি তাকে অনুভব করেই যা সৃষ্টি হয় তাই কবিতা। কবি জাফর আলমের কবিতাগুলো উপরে উল্লেখিত কবিতার এই দুই সংজ্ঞার সাথে বেশ যায়। কবি তাঁর ‘তুমি জন্মেছিলে খোলা আকাশের নিচে ’কাব্যগ্রন্থে জীবনের আশে-পাশে অসংখ্য সুলভ দূর্লভ মূহুর্তের স্বাক্ষর লিপিবদ্ধ করেছেন সমকালের স্মৃতি বা স্বপ্নকে তুলে এনে। ‘বাগিচায় ফুল নেই’কবিতায় কবি সমসাময়িক রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিশ্ব মোড়লদের চরিত্র সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন-
“শকুনরাই এখন কর্ণধার
এখন রাখাইন নরকের চাইতে অভিশপ্ত
বাতাসে লাশের গন্ধ, নদ নদী নালা
বনি আদমের মৃতদেহে ভর্তি।”

‘তুমি জন্মেছিলে খোলা আকাশের নিচে ’ এটি কোন নাম কবিতা নয়। কাব্যগ্রন্থের সূচিতে এই নামে কোন কবিতা নেই। ফলে বইটি হাতে নিয়ে খুলে সূচীপত্র দেখার পরই প্রশ্ন জাগলো কার জন্ম হলো খোলা আকাশের নিচে? খোলা আকাশের নিচেতো অনেক কিছুর জন্ম হয়। পড়তে পড়তে চতুর্থ কবিতায় মিললো প্রশ্নের জবাব। ‘আলোর নিশান’ কবিতায় কবি এমন একটি প্রতিষ্টানের জন্মের ইতিহাস তুলে ধরলেন যার জন্ম হলো মতিঝিলে খোলা আকাশের নিচে ১৯৮২ সালের ৩০ মার্চ। কবির ভাষায়-
“অগ্নিঝরা মার্চে তিরিশতম দিনে
পূর্ব দিগন্তে একটি রক্তিম সূর্য
তিমিরপুঞ্জ ভেদ করে ছড়িয়েছে আলোর নিশান
সেই তুমি

……………….

তুমি জন্মেছিলে খোলা আকাশের নিচে
তুমি জন্মেছিলে,
মানবতার মুক্তির প্রত্যাশায়
অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ভাঙ্গার অঙ্গীকারে
কিংবা বেকারত্বের অভিশাপ নির্মূলে ।
তুমি আজ
যৌবনে দুরত্ব, মহামহীরুহ !
মহিমান্বিত তোমার কীর্তি !
জাতির ইজ্জতের মিনার
ষোল কোটি মানুষের প্রাণ।
(আলোর নিশান)
কার জন্ম হয়েছিলো সেদিন কবিতায় তার নাম না বললেও আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না য়ে ঐ দিন জন্ম হয়েছিলো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রথম সুদমুক্ত ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। নৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাহীন সুদভিত্তিক অর্থনীতি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা ও ভারসাম্যহীনতার জন্ম দিয়ে সমাজকে অশান্ত সাগরের বুকে হালবিহীন জাহাজের মতো বিপন্ন করে তুলছে। বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান অর্থনৈতিক অনাচার ও অরাজকতার ফসল সর্বগ্রাসী এ দারিদ্র্যকে অর্থনীতিবিদ ডেনিশ গলেট ‘দোযখ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এ থেকে মুক্তির জন্য বহুমুখী প্রক্রিয়া অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন । ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড হলো সেই বহুমুখী প্রক্রিয়ার অংশ যা ইসলামী অর্থনীতির প্রায়োগিক দিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুদের বিলোপ সাধন ও আর্থিক অবস্থার পূনর্বিন্যাস করে দারিদ্র্যের দোযখ হতে মুক্ত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক আজ বিশাল মহীরূহ। দেশের অর্থনীতির দুইটি গুরত্বপূর্ণ পিলার রেমিটেন্স ও রেডিমেট গার্মেন্টসে ইসলামী ব্যাংকের অবদান অনেক বেশী। সত্যিই ইসলামী ব্যাংক জাতির ইজ্জ্বতের মিনার। কবি সে কথাই তাঁর কবিতায় বলেছেন। কবি জাফর আলম একজন প্রতিথযশা ব্যাংকার। জীবনের বেশীর ভাগ সময় কাটিয়েছেন ইসলামী ব্যাংকে। তিনি ভালো করেই জানেন ইসলামীব্যাংকের অবদান কি। সেটাই তার কবিতায় ঠাঁই পেয়েছে। বতর্মানে তিনি বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পৃথিবীতে মা- বাবা শব্দযুগল মায়া, মমতা ও স্নেহঘেরা স্বর্গীয় ভালোবাসার দুইটি শব্দ। মা- বাবার ভালোবাসার নেই কোন পরিমাপ, নেই কোনো তুলনা। মা -বাবার ভালোবাসাতে নেই কোনো লোক দেখানো কৃত্রিমতা। আমরা যারা চাকুরীর কারণে গ্রামের বাইরে থাকি তারা সুযোগ পেলেই গ্রামে ছুটে যাই মা-বাবার কাছে। গ্রামকেই খুব আপন মনে হয়। নিজ বাড়ী, নিজ ঘরকে মনে হয় স্বর্গোদ্যান।আর সেটি হয় মা বাবার কারণে। মা বাবা না থাকলে সেটি আর তেমন টানে না। কবির কথায়-
“এখন তো মা নেই, বাবাও নেই
এজন্য বাড়ির আর ঐ রকম শ্রী নেই
বড়ই শূন্যতা, একবারে হাহাকার।
……………………………….
স্বদেশই প্রবাসের মতো।”
(তবুও নাড়ীর টান)

চাকুরীর সুবাদে আমাদের বেশীর ভাগ সময়ই কাটে ইট পাথরের জেলখানা শহরে। কিন্তু মন পড়ে থাকে গাঁয়ের সোঁধা মাটিতে, গাঁয়ের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে; যেখানে স্তরে স্তরে সাজানো শৈশব, অস্তিত্বের প্রথম প্রহর। তাই গ্রামে ফিরতেই হয় নাড়ির টানে কিন্তু থাকা হয়ে উঠে না আর ।যেমনটি কবি বলছেন-
“ঢাকা ছাড়ি নাড়ির টানে
ফিরে আসি পেশার বানে।”
(ঢাকা ছাড়া চলে না)

এই গ্রামকে, নিজের বাড়িকে শহরে বেড়ে উঠা আমাদের ছেলে-মেয়েরা নিজের বাড়ি মনেই করে না। মনে করে দাদুর বাড়ি/দাদার বাড়ি। তারা তাদের শিকড়ের খোঁজ করে না। এক আত্মপরিচয়হীন প্রজন্ম আমাদের। তাই আমাদের নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের দিকে টানতেই হবে, টানতে হবে আমাদের জন্ম ঠিকানায়।
“আমার সেই প্রিয় বাড়িকে
বাবু মণিরাতো নিজের বাড়ি বলে মানে না
বলে ’দাদুর বাড়ি’
আমি বলি তাহলে তোমার বাড়ি কই?
এমন আত্মপরিচয়হীন অবস্থা।
শিকড়ের সন্ধান বড়ই প্রয়োজন আজ
তাই আসি ভিড় ঠেলে, যানজট মাড়িয়ে
স্বজন স্বগ্রাম নাড়ির টানে
বাবা দাদা আর আমার বাড়িতে
আমার গ্রাম, জন্মের ঠিকানা বলে। ”
(তবুও নাড়ীর টান)

রোহিঙ্গা বিশ্বের মধ্যে নিপিড়িত নির্যাযিত জাতি।রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমার সেনাবিাহিনীর নির্মম অত্যাচার নরকের চেয়েও ভয়াবহ ছিলো। নিজ গৃহে তারা ছিলো পরবাসী। এ বিষয়টি ফুটে উঠেছে কবির ভাষায় এভাবে-
“আমি কেমন যেন পুড়ে ছারখার হচ্ছি
অহিংসার নির্মমতায়
‘জীব হত্যা মহাপাপ’ এমন অময়ি বাণী
আজ শাস্ত্রে বন্দি পাপাচারে গণহত্যায়
আজ বাতাস ভারী ক্রন্দন সবদিকে
নরক বুঝি আরও নির্মম!

……………………….

আমি জন্মেছি অথচ আমার জন্মস্থান নেই
আমি নাগরিক অথচ নেই নাগরিকত্ব।
আপন কুটির ছেড়ে কেউ কি পালাতে চায়?
মাতৃভুমি, যেখানে জন্ম বেড়ে ওঠা
কেন আমি বিতাড়িত হব !”
(নরক বুঝি আরও নির্মম)

নরকের নির্মম যন্ত্রণায় রোহিঙ্গারা ধুকে ধুকে মরছে। কিন্তু বিশ্বমোড়লরা ঘুমাচ্ছে । রোহিঙ্গাদের নির্মম আর্তনাদ তাদের কর্ণকুহুরে প্রবেশ করছে না।বিশ্ব মজলুমের পক্ষে নেই।‘পৃথিবী আজ শক্তির পক্ষে’। কবি যেমনটি বলেছেন-
“মানবতাবাদীরা ঘুমোচ্ছে এখন
শকুনের সাথে বন্ধুত্ব ওদের
লাশের গন্ধে খুশবু খুঁজে ওরা

…………………..

ভুলন্ঠিত মানবতা, বিধ্বস্ত সভ্যতা
বিবেক করছে হাহাকার। ”
(নাফ নদীর তীরে)

বিবেক হাহাকার করা বিবেকহীন এই সময় আজ জরাগ্রস্ত। মানবতা উপেক্ষিত কোথাও কোন স্বাভাবিকতা নেই।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের করে তুলেছে চরম অসামাজিক। ছেলে বুড়ো আবাল সবাই বন্দী স্মার্ট ফোনে।কবির ভাষায়-
সর্বত্র অবক্ষয় অধঃপতনের দৌরাত্ম্য
বিধ্বস্ত বিবেক, মহানুভবতা!

……………………………

মানুষ আজ বড়ই জড়তগ্রস্থ বিবেকশূন্য।
(৪৬ বছর পর)

কিংবা
‘বিবেক আজ নিজেই বিবেকহীন’
অফিসে স্বাভাবিকতা নেই, নানা ধান্দা
বাসায় বন্ধন নেই, আলাপ নেই, গল্প নেই
এমন কি ছোট্ট বাবুরও সময় নেই
ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, ইমু টুইটার
হোয়াটস অ্যাপ আরও কতকিছু
প্রিয় প্রিয়তমা সবাই বন্দি স্মার্ট ফোনে।
(যেন ঠিকানা নেই)

বাংলাদেশ ভারতের প্রতিবেশী এবং বন্ধু রাষ্ট্র। কিন্তু তাদের আচরণ সে রকম নয়। ভারত বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকে রাখে কিন্তু বর্ষাকালে পানি ছেড়ে দেয়। যার কারণে প্রতিবারই প্রতিবেশী দেশের ছেড়ে দেয়া পানিতে বাংলাদেশে বন্যা হয়। এ বিষয়টি কবির কলমে ক্ষ্যাধোক্তির সাথে প্রকাশ পেয়েছে।
“পানির অপর নাম জীবন
তাই বলে কি বন্ধুবর দেশ
পানি ছেড়েছে উজান থেকে”
(শ্রাবণের দিনমান)

পৃথিবী এক বিশাল কর্মক্ষেত্র। কালের পরিক্রমায় বিবর্তনের নানা স্তর পেরিয়ে আধুনিক বিশ্বসভ্যতা যে ঐশ্বর্যময় রূপ পরিগ্রহ করেছে, তা পরিশ্রমেরই সম্মিলিত যোগফল। শ্রম বর্তমান সভ্যতার সৌধকৃতির অনবদ্য উপাচার। শ্রমকে ভিত্তি করেই সমাজ সংস্কৃতির বিকাশ, পরিপুষ্ট ও প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। লক্ষ কোটি মানুষের যুগ যুগান্তরের শ্রমেই গড়ে উঠেছে সভ্যতার সৌন্দর্য বিলাসিত তিলোত্তমা মূর্তি। তারা পাহাড়-পর্বত কেটে পথ তৈরি করেছে, নদীর উপর সেতু বানিয়েছে, নির্মাণ করেছে আমাদের ঘরবাড়ি, সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, সুরম্য অট্টালিকা।
“পৃথিবীর যা কিছু সুন্দরতম সৃষ্টি
চিত্তাকর্ষক, উন্নততর সভ্যতা
মসজিদ, মন্দির
তাজমহল, হোয়াইট হাউস, ক্রেমলিন
সারি সারি অট্টালিকা
শিল্পবিপ্লবে কলকারখানা
সবই শ্রমিকের ঘর্মাপ্লুত সৃষ্টি। ”
(শ্রমের সৃষ্টি)

এত কিছুর পরও শ্রমিকরা সব সময় থাকে উপেক্ষিত। কিন্তু ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা দিয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সবসময় নিজের কাজ নিজে করতেন এবং সাহাবিদেরকেও নিজের কাজ নিজে করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করতেন। রাসূল হওয়ার পরও তিনি কঠোর পরিশ্রম করে আয় করতেন। মহানবী (সাঃ) শ্রমের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেন “শ্রমিককে তার ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।” তাই কবি বলেন-
“শ্রমিক তোমার সম্মান
বাড়িয়েছে মোহাম্মদের ইসলাম
মোহাম্মদ তোমার সগোত্রীয়”
(শ্রমের সৃষ্টি)

জন্মদিন, হ্যাঁ জন্মদিন। অনেকেই এই দিনকে খুব ধুমধামের সাথে পালন করি। অনেক আনন্দ আর হৈ হুল্লোড করি। কিন্তু জন্মদিনে খুশি হওয়ার কিছু নেই। কারণ জন্মদিন মানে, জীবন থেকে আরো একটা বছর হারিয়ে ফেলা !পুরানো স্মৃতিগুলো আবারো মনে করা ! কাছে থাকা মানুষ গুলি কখন হারিয়ে গেছে স্মৃতির অঘোছরে তা ভেবে মনটা খারাপ হওয়া ! এতো কিছুর পর খুশি কি করে হওয়া যায় ?
“জন্মদিন মানে অনেক দিনক্ষণ ফেলে আসা
জন্মদিন মানে জীবনের একাংশের পরিসমাপ্তি
জন্মদিন মানে দীর্ঘশ্বাস, হারানোর বেদনা
জন্মদিন মানে মৃত্যুর প্রহর গোনা
সময়ের কবর, মৃত্যুপানে ধাবিত হওয়া। ”
(জন্মদিন)

মানুষের জীবন-কাল খুবই সামান্য। একদিন সবাইকেই মৃত্যুবরণ করতে হয়। এই সংক্ষিপ্ত মানবজীবন শেষে তাকে চলে যেতে হবে ওপারে। অনন্ত সে জীবন।অথচ আমরা সে জীবনের জন্য কোন পাথেয় সংগ্রহ না করে পার্থিব ভোগ বিলাসে মগ্ন। বড়ই ধোঁয়াশা পরকালের জীবন আমাদের কাছে। কবির কলমে বিষয়টি উঠে এসেছে এভাবে-
“আমার গন্তব্যে বড়ই অস্পষ্ট আমি
চাওয়া পাওয়া বিলকুল হিসাববিহীন
সর্বত্র কেমন যেন সর্বনাশা লোভাতুর দৃষ্টি
নৈতিক অনৈতিক ভালোমন্দের বিভেদ
অনেকটা তিরোহিত বিবেক শূন্যতায়
অথচ নশ্বর এ ভূ ধরাায়
জীবন বড়ই ক্ষণিকের, কেবলই বিশ্রাম।
……………………………….
জীবনের স্তরে স্তরে প্রস্তুতি
জীবন সাজাতে, জীবন বাঁচোতে
কেবল একটি জায়গায় শূন্যতা !
প্রস্তুতি নেই মৃত্যুর, আসল ঠিকানার!”
(বড়ই অস্পষ্ট আমি)

আমাদের শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা পড়ালেখা করে টাকা-পয়সা কামিয়ে শহরে বাস করে। নিজেরা শহুরে বাবু হিসেবে বাহাদুরী দেখায়। মা-বাবা বড় সেকেলে তাদের কাছে । মা-বাবার স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে কিংবা পাড়াগাঁয়ের জরাজীর্ণ পুরোনো বাড়িতে। কী অদ্ভুত জীবন। তারা তাদের ভবিষ্যতের কথা মোটেই চিন্তা করে না।
“পিতামাতা এখন নাকি সেকেলে!
তাই কখনো কখনো ঠিকানা মেলে
বৃদ্ধাশ্রম কিংবা পাড়াগাঁয়ের
সেই জীর্ণ কুঁড়েঘর অথবা
অনেকটা পরিত্যক্ত পুরানো বাড়িতে।
যেখানে জন্ম, মায়ের ঠিকানা
সবকিছু এমন ধোঁয়াশা, তিমিরাচ্ছন্ন
জীবন বড়ই এক অদ্ভুত সমীকরণ!”
(জীবন এক অদ্ভুত সমীকরণ-১)

স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল একরাশ স্বপ্ন বুকে নিয়ে। ৪৯ বছরের এ পথপরিক্রমায় সে স্বপ্নের কতটা পূরণ হয়েছে, আজ সে হিসাব মেলাতে চাইবে সবাই। আমাদের যে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে তা আমরা জনপ্রিয় গায়ক হায়দার হোসেনের গানে দেখতে পাই। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন- “কি দেখার কি দেখছি, কি শোনার কি শুনছি, ত্রিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি।”ঠিক সে রকমই আপেক্ষই আমরা দেখতে পাই কবি জাফর আলমের কবিতায়। পরিশেষে আমরা কবির মতো আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
“৪৬ বছর পর ,
ফিরে পাবার আকুতি নব জীবনের
গাছে ফুটুক জুঁই জবা চামেলি
সৌরভ ছড়িয়ে দিই জনে জনে !
হাসি ফুটুক ঘরে ঘরে প্রতিজনে।”
(৪৬ বছর পর)

৪০ টি কবিতার সমন্বয়ে কবি জাফর আলমের কবিতার বই ‘তুমি জন্মেছিলে খোলা আকাশের নিচে ’। কিছু দূর্বল শৈলীর কবিতা থাকলেও বেশ কিছু কবিতা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্বল। কাব্যগ্রন্হটিতে পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণ করার বেশ উপাদান রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদে ৬৪ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে রুনা তাসরীন, প্রচ্ছদ করেছে শতাব্দী জাহিদ। একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মত কর্মঘন পরিবেশে থেকে কবিতার মতো একটি দ্রষ্টা জগতে প্রবেশ সাহিত্যের প্রতি কবির গভীর অনুরাগের প্রকাশ।
বইটির বহুল পাঠ, প্রচার ও সমাদর প্রত্যাশা করি…