পাহাড়, নদী আর সাগর আমাকে বরাবরই টানে। যে কারণে মন খারাপ থাকলে সাগর অনেক দূরে তাই সেখানে যেতে না পারলেও বাড়ির কাছে হয় নদী অথবা পাহাড়ে ছুটে যাই। শেরপুর জেলায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড় ঘেষা ৩ টি উপজেলা রয়েছে। তাই মন চাইলেই সেই পাহাড়ে ছুটে যাই মাঝে মধ্যে।
২০১৯ সালের ৩ মে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাত হানার কথা বাংলাদেশে। ২ মে রাতে টিভির পর্দায় দেখছিলাম ফণীর হামলার সম্ভাব্য নানা খবর। এমন সময় নালিতাবাড়ির আমার সহকর্মী বৈশাখী টিভি প্রতিনিধি বিপ্লব দে কেটু আমাকে ফোন করে জানায় মজিদ ভাই, ‘আমি কাল আমার এক বিশেষ কাজে বারাঙ্গাপাড়া যাবো, আপনি কি যাবেন ? আমাদের জেলা সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডালু বর্ডারের সাথেই বারাঙ্গাপাড়া বাজার। সেখানে তার কিছু আত্মীয় থাকে সে কারণে তিনি বিভিন্ন কাজে এবং আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে প্রায়ই সকালে গিয়ে বিকেলে ঘুরে আসেন। আমি তখন বললাম, ‘ঘূর্ণিঝড় ফণী আসতেছে, এই অবস্থায় কি যাওয়া ঠিক হবে ?’ তিনি বললেন, ‘সমস্যা নাই ফণী যদি উড়িষ্যায় কাল আঘাত হানে তবে বাংলাদেশে প্রভাব পড়বে পরশু। আমরা তো কাল সকালে গিয়ে বিকেলেই চলে আসবো।’ আমি তখন আরো একটু আগ্রহ বাড়িয়ে বলি, ‘আচ্ছা কাল তো বৃহস্পতিবার। পরের দিন শুক্রবার ছুটির দিন, চলেন না বারাঙ্গাপাড়া আপনার কাজ শেষে তুরা গিয়ে রাত থেকে পরদিন অর্থাৎ শুক্রবার বিকেলে ফিরে আসি।’ তখন কেটু দা বলে ফেললেন, ‘আপনার প্রস্তাব মন্দ না, আমরা তুরা পাহাড়ে গিয়ে ফণীর তা-ব দেখবো সেখানে কি হয়।’
ভারতের তুরা এবং বাংলাদেশের আমাদের শেরপুর জেলার দূরত্ব মাত্র ৭০ কিলোমিটার। অনেকটা ময়মনসিংহের সমান দূরত্ব। তাই আবহাওয়াও শেরপুরের সাথে মিল থাকে অনেকটা। এসময় আমি মনে মনে ভাবলাম অনেক বারই তো তুরা গিয়েছি কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি পাইনি কোন বারই। দেখিনা ফণীর প্রভাব কেমন পড়ে সেখানে। এসব নানা কথা চিন্তা করে এবং পরিকল্পনা করে কেটুদার সাথে আমাদের তুরায় বৃষ্টি দেখার পরিকল্পনা পাকা করে বাসায় রাজি করিয়ে এক দিনের সফরের জন্য ব্যাগ গুছিয়ে ফেললাম রাতেই। এ বর্ডার দিয়ে আমাদের ভিসা লাগানো ছিল এবং আগের বারের ভারত সফরের বেশ কিছু ভারতীয় রুপি উদ্বৃত্ত থাকায় সেগুলো নিয়েই ঘুরে আসা যাবে বিধায় আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলো না।
কথা মতো কাজ, পরদিন ৩ মে আমি ভোর ৬ টায় উঠে তৈরি হয়ে ৭ টার দিকে সিএসজি ধরে নালিতাবাড়ি রওনা হলাম এবং কথা মতো আমার সিএনজি ছাড়ার সাথে সাথেই কেটুদাকে ফোন করে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলাম। এসময় তিনি বললেন, ‘আপনি আসতে থাকেন। নালিতাবাড়ি পৌঁছে সোজা হোটলে ‘সেহেরে’ চলে আসবেন। দু’জন এক সাথে নাস্তা সেরে সীমান্তের দিকে রওনা হবো।’ সকাল ৮ টার দিকে নালিতাবাড়ি পৌঁছে হোটেল সেহেরে দু’জন একসথে নাস্তা সেরে একটি অটো রিক্সায় রওনা দিলাম নাঁকুগাওয়ের উদ্দেশে।
সকাল ৯ টার মধ্যে পৌঁছে পূর্ব পরিচিত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা মাসুদ ভাইকে ফোন দিয়ে তার আফিসে (ইমিগ্রেশন) বসলাম। তিনি এসে নানা কুশলাদি জানার পাশপাশি ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে কাস্টমস এবং বিজিবি’র কাজ শেষ করে ডালু সীমান্তের দিকে হাঁটতে থাকলাম। কিন্তু আমরা যথন ইমিগ্রেশনে বসা ছিলাম তখন কেটু দা বারবার বলছিলো ‘আমার বাসা থেকে অনেক মানা করেছে আসার সময়, কারণ ফণী আসতেছে, আজ না গিয়ে অন্যদিন গেলে হয় না। আবার পরোক্ষণেই কেটুদা ভাবেন যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি তখন আর ফণীর ভয় করে আর কী হবে। কপালে যা আছে তাই হবে।’
এসব নানা কথা আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছি আর সীমান্তের দিকে হাঁটছি। আমরা যাচ্ছি সীমান্ত বরাবর উত্তর দিকে । এসময় পেছন ফিরে দেখি দক্ষিণ দিকে আকাশ কলো হয়ে আসছে। সম্ভবত ফণীর আঘাতের কারণে বাংলাদেশে বৃষ্টির প্রভাব শুরু হবে। তাই তাড়াতাড়ি বিএসএফ, ভারতীয় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সেরে চলে যাই বারাঙ্গাপাড়া বাজারে। এদিকে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পর্যন্ত বাংলাদেশের সিম কাজ করায় বাসায় যখন মোবাইলে কথা বলি তখন জানতে পারি শেরপুর শহরে প্রচুর ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমাকেও ফোনে বাসা থেকে বারণ করছে যেনো এবার ইন্ডিয়া না গিয়ে ফিরে আসি শেরপুর। এসব নানা টানাপোড়েন আর পিছুটান আমাদের দু’জনের মনটা দুর্বল হয়ে আসছিল। উভয়ের পরিবারের মানা করা হচ্ছে যেন না গিয়ে ফিরে আসি। আবার পরোক্ষণেই ভাবি এসেই যখন পড়েছি কপালে যা আছে হবেই। হয়তো নতুন কোন ভ্রমনের অভিজ্ঞতা হবে আমাদের।
আমি এদিকে আল্লাহ আল্লাহ করছি কোন রকমে তুরার বাসে উঠতে পারলেই হয়। বারাঙ্গাপাড়া কেটুদার কাকার হোটেলে বসে আমাকে চা দিয়ে কেটুদা তার কাজ সারেন। এমন সময় বারাঙ্গাপাড়াতেও ঝড়ের নমুনা শুরু হয়ে যায়। বেলা তখন প্রায় ১২ টা বেজে গেছে। সাড়ে ১২ টায় উইঞ্জার নামক মাইক্রোবাসের টিকিট কেটে নিলাম আগে ভাগেই। বৃষ্টির অবস্থা দেখে অনেকটা চিন্তায় পড়ে গেলাম আমরা। এসময় আমরা ভাবছিলাম যে, আমরা কি ভুল করলাম। স্থানীয় লোকজন বলাবলি করছে, যেভাবে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এভাবে বৃষ্টি থাকলে তুরার রাস্তায় ধ্বস নামে ফলে সকল যান বন্ধ হয়ে যায়।
৩০ মিনিটের মতো ঝড় ও বৃষ্টি হওয়ার পর হঠাৎ করেই আমাদের ভ্রমণের আনন্দের দ্বার খুলে গেলো বৃষ্টি শেষে হালকা রোদের ঝিলিক দেখে। বারাঙ্গাপাড়া থেকে তুরা সড়কে প্রায় সকল যানবাহনের চালক সাধারণত গারো থাকে। কিন্তু আমাদের ওইদিনের উইঞ্জারের চালক ছিল বাঙ্গালি। নাম শ্যাম। চালকের পাশেই আমাদের সিট থাকায় শ্যামের সাথে প্রথমেই আমরা পরিচিত হই। শ্যামও আমাদের খুব পছন্দ করলো। পথ চলতে চলতে শ্যামের সাথে নানা আলাপচারিতায় মত্ত হই আমরা।
এসময় তার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, শ্যাম একবার বাংলাদেশে গিয়ে নালিতাবাড়ি গিয়েছিল এবং সে নালিতাবাড়ির অনেককেই চিনেন। খুবই আন্তরিক ও স্বচ্ছ মনের মানুষ ভেবে শ্যামের মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে নিলাম। নানা গল্পের সাথে সাথে তুরা চলে আসলাম বেলা আড়াইটার দিকে। এসময়ের মধ্যে আমাদের ভ্রমনের রাস্তায় কখনও মাঝারি ধরনের আবার কখনও থেমে থেমে হালকা বৃষ্টি হলেও পথ চলতে তেমন কোন সমস্যা হলো না। তবে পেছন ফিরে দেখছিলাম ভারি বর্ষণ যেন আমাদের ধাওয়া করে আসছে।
যাইহোক আমার তুরা নেমেই শ্যামের সাথে কথা বলে নিলাম পরের দিন যখন তার উইঞ্জার তুরা শহর থেকে সকাল ৮ টায় বারাঙ্গাপাড়ার উদ্দেশে ছড়ে যাবে আমাদের তখন দু’টো সিট যেন রেখে দেয়। কিন্তু শ্যাম তখন আশংকা করে বলেন, ‘দাদা রাস্তার যে অবস্থা আর যে বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখছি তাতে প্রচুর বৃষ্টি হতে পারে এবং রাস্তা খারাপ হয়ে যেতে পারে। আর বৃষ্টি হলে এ পথে উইঞ্জার চালানো যায় না। আমার উপর নির্ভর না করে সকাল ১০-১১ টার দিকে সরকারি বাসগুলোতেই চলে যাইয়েন।’
এদিকে তুরা শহরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। ভাবলাম যদি প্রচুর বৃষ্টি হয় তবে তো বের হওয়াই যাবে না। তাই পাশেই সুপার মার্কেটে গিয়ে দু’জনে দু’টো ফোল্ডার ছাতা কিনে আমাদের পূর্ব পরিচিত হোটেল ‘রাজকোমল’ এ উঠলাম। হোটেলে যাওয়ার সময় মনে মনে ভাছিলাম আমাদের পূর্বের সেই রুমটি যদি পেতাম তাহলে রাতভর যদি বৃষ্টি হয়, তবে ওই রুমের বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখবো। হোটেলটি ছিল তুরার সবচেয়ে পুরাতন হোটেল। দো’তলা তবে উপর তলায় ছাদ নেই- টিন সেড। পাহাড়ের চূড়ায় হওয়ায় হোটেলের বিভিন্ন রুমের বারান্দা থেকে পুরো তুরা শহর দেখা যায়। এখানে একটি রুম আছে যেখান থেকে রাতের তুরা শহরে পাহাড়ের উচু দিয়ে বিভিন্ন রাস্তায় চলাচলরত গাড়ি দেখা যায় এবং রাতের তুরা শহরকেও দেখতে বেশ লাগে।
আমাদের ভাগ্য বশতে হোটেলের সেই রুমটাই পেয়ে গেলাম। রুমটি বুকিং করার পর রুমে গিয়ে ব্যাগ রেখে ফ্রেস হয়ে দেখি বৃষ্টি কিছুটা কমে আসছে। তাই আমরা দ্রুত দুপুরের খাবারের জন্য ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পরি। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে প্রচণ্ড বাতাস বইছিল তাই ছাতা নিয়ে হাঁটা খুব কষ্ট হচ্ছিল। ছাতা ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকায় বৃষ্টিতে ভিজেই হাঁটতে লাগলাম। এমন সময় হঠাৎ চলতি রাস্তায় কাকতালিয় ভাবে শেরপুরের তিনজন পরিচিত মুখ দেখে হতবাক হয়ে যাই আমরা। ওই তিনজনের একজন শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাফিজুর ভাই, একজন ঝিনাইগাতি উপজেলার মোখলেছুর রহমান মক্কু আমার খুব কাছের জন। এছাড়া অপরজন পরিচিত মুখ কিন্তু তার সাথে খুববেশি কথাবার্তা হয় না শেরপুরে। তারা আমাদের পেয়ে যেনো আসমানের চাঁদ পেলো। কারণ, তারা এই প্রথম এবং এই ঝড়ো হাওয়া মধ্যে এসে ভারতীয় রুপী করতে পায়নি এবং খাবার হোটেল খুঁজছিল কিন্তু পাচ্ছিল না কোথায় খাবারের হোটেল ? প্রথমে তারা আমাদের কাছে কিছু রুপী লোন চাইলেও আমাদের সীমাবদ্ধতার করণে তা দিতে পারলাম না। তাই পড়ে তাদের নিয়ে আমাদের পরিচিত বাঙালি হিন্দু হোটেলে সবজি ভাত খেয়ে সুপার মার্কেটের সামনে এসে এক সাথে চা খেয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা তুরা শহরের আমাদের পূর্ব পরিচিত চমৎকার একটি জায়গায় যাই দূরের মেঘ-বৃষ্টির খেলা দেখতে। সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখে মনকে সতেজ করলাম। এরই মধ্যে দেখতে পেলাম কালো ধূয়ার মতো কিছু মেঘ দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে শহরের দিকে। কেটুদা তখন বললো, ‘চলেন ভাই আজ আর বেড়ানো যাবে না। আকাশের অবস্থা ভিষণ খারাপ। ভাগ্য ভালো আমরা ভালই ভালই তুরা আসতে পেরেছি। এখন কালকের পরিবেশ কী হয় কে জানে। যেতে পারি কিনা ?’ কেটুদার এসব নানা চিন্তার কথায় আমি বলি, ‘সমস্যা কী, কাল না যেতে না পারলে পরশু যাবে। আরো এক রাত থাকবো, পাহাড় দেখবো, বৃষ্টি দেখবো। এই রকম মেঘ-বৃষ্টির খেলা কি আর কোন দিন দেখতে পাবে ?’
মেঘ যখন আমাদেরকে কুয়াসার মতো ছুঁয়ে যাচ্ছিল তখন যেন আমরা বার বার ফিরে যাচ্ছিলাম অন্য রকম অনুভূতিতে। এভাবেই নানা গল্প করতে করতে ওখান থেকে অন্য রাস্তায় হাঁটতেই ছাতা যেন আর ধরে রাখতে পারছিলাম না। প্রচ- ঝড়ো হাওয়ায় শুধু ছাতাই নয় আমরাও যেন উড়ে যাবো বাতাসে এমন মনে হচ্ছিল। তাই ছাতা বন্ধ করে আমি ফেইসবুকে লাইভে যাওয়া প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমন সময় কেটুদা দেখি পিছন থেকে নেই, বাতাসের ঝাপটায় অনেকটা উড়ে যাওয়া মতো দৌড় শুরু করেছে। আর আমি এগিয়ে যাচ্ছি সামনে ভেসে আসা মেঘের ভিডিও করতে। কিন্তু পরোক্ষণেই ভাবি অচেনা শহর ভিন্ন দেশ এখানে পদে পদে নানা বিপদ আছে। কিন্তু সেসব বিপদ সম্পর্কে আমার ধারনা নেই, তার উপর এমন বৈরী আবহাওয়া এবং দুর্গম পাহাড়। পাহাড়ের খাদের কথা চিন্তা করলে ভয়ে বুক কেঁপে উঠে। আমি তাই বেশিক্ষণ রাস্তায় টিকতে পারলাম না পেছন ফিরে কেটুদার মতোই দৌড়ে শহরের হোটেল সুন্দরির সামনের একটি মার্কেটের বারান্দায় এসে দাঁড়াই। দেখি যদি বৃষ্টি আবারও কমে, তবে মার্কেটে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করবো।
এখানে সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে সকল দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করে এবং রাত ৮ টার মধ্যে একেবারে ভুতুরে শহরের পরিণত হয় সেটা আমাদের জানা থাকায় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় ৬ টা বাজে। এভাবে সেখানে বেশ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে চা খেতে খেতেই বৃষ্টি কিছুটা কমে আসলো কিন্তু বাতাসের তিব্রতা বাড়তে শুরু করলো। এ অবস্থায় আমরা ঢুকে পড়ি পাশের একমাত্র বৃহৎ সুপার মার্কেটে। এরপর শুরু করি ঝটপট কিছু কেনাকাটা। রাত ৮ টার মধ্যে কেনাকাটা শেষ করে দেখি শহর ইতিমধ্যে ফাঁকা হয়ে গেছে। এমনিতেই সন্ধ্যায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, তার উপর এই বৈরি আবহাওয়া লোকজন অনেক কমে গেছে। এদিকে কেনাকাটার জন্য রাতের খাবার খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। ততক্ষণে সব হোটেল ও খাবারের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বেশ কয়েকটা দোকান ঘুরে ঘুরে কিছু কলা, বিস্কুট, কেক ও কোমল পানিয় সাথে নিয়ে হোটেলে ঢুকে পড়লাম।
হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে রাত ৯ টার দিকে রুমে বসে নানা গল্পের ফাঁকে এবং তুরা ভ্রমনের ইতিপূর্বের নানা স্মৃতিচারণ করতে করতে কেক-কলা-বিস্কুট খেয়ে নিলাম। এদিকে বাইরে শুরু হয়েছে ঝুম বৃষ্টি আর প্রচন্ড ঝড়ো হাওয়া। রাত বাড়ছে আর বৃষ্টির তান্ডবও বাড়ছে। আমাদের পূর্বে থেকেই ভারতীয় সিম থাকায় বাসায় ফোন করে জানলাম শেরপুরেও প্রচ- বৃষ্টি হচ্ছে। রাত ১০ টার দিকে আমাদের রুমের সামনে বারান্দায় এসে দু’জন দুটি চেয়ার নিয়ে বসলাম তুরা শহরের বৃষ্টি দেখতে। বৃষ্টির সাথে প্রচ- ঝড়ো হাওয়া বইছিল। কিন্তু আমাদের ভাগ্য ভালো ছিলো ঝড়ো হাওয়াটা আমাদের হোটেলের পেছন থেকে বইছিলো, তাই সামনের বারান্দায় কোন বাতাস বা বৃষ্টি লাগছিল না। তবে মাঝে মধ্যে বৃষ্টির ঝাপটা এসে মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছিল আমাদের। এসময় কেটুদার সাথে নানা গল্পে আর আড্ডায় মেতে উঠি ঝড়ে পড়া বৃষ্টির গানের সাথে।
সত্যি বৃষ্টি দেখেছি অনেক, আমাদের গারো পাহাড়েও। তবে তুরা পাহাড়ে এরকম বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়া দেখার সৌভাগ্য হয়নি কখনও। আর হবেও না হয়তো কখনও। কারণ ফনির প্রভাব তখন বাংলাদেশের শেরপুরের দিকে আসতে শুরু করেছে। সেই সাথে তুরা শহরেও এর রেশ ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রচ- ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির কারণে এক সময় আমাদের বেশ শীত লাগতে শুরু করলো। তাই বাইরে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না, কিছুক্ষণ পর রুমে চলে আসলাম। দু’জনে বিছানায় শুয়ে শুয়ে এফবি দেখছিলাম আর বৃষ্টির গান শুনছিলাম। বলে রাখা ভালো, আমাদের এই হোটেলটি অনেক পুরোনো এবং টিনসেড। তাই বিনে পয়সায় বৃষ্টির গান শুনছিলাম বেশ আয়েস করে। আমি রাত ১২ টার দিকে আবারও রুমের বাইরে বেরিয়ে বারান্দায় বসে ঝড়ো হাওয়ায় পাহাড়ি গাছের দোল দেখছিলাম এবং বৃষ্টির অদ্ভুত শব্দ শুনছিলাম। সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা, অন্য রকম শিহরণ এবং অন্যরকম অনুভূতি অর্জন করা হলো আমার।
বৃষ্টির পাশাপাশি আকাশে থেমে থেমে যখন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল তখন পুরো নিস্তব্ধ শহরকে মৃত মনে হচ্ছিল। তবে মাঝে মধ্যে দূরে দু’একটি গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখছিলাম রাতের পাহাড়, রাতের বৃষ্টি ঝড়া রাস্তা আর ঝড়ো হাওয়ায় দোল খাওয়া প্রকৃতির খেলা। তুরা শহরের পাহাড় জুড়ে রয়েছে সবুজ বৃক্ষ আর ঘন বন। ফলে গাছের উপর ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টি ঝড়ার অন্যরকম শব্দে মনকে শিহরিত করে তোলে ভিন্ন রকম।
এভাবে বৃষ্টি দেখতে দেখতে কখন যে রাত ২ টা বেজে যায় তা বুঝতে পারিনি। আবারও রুমে গিয়ে দেখি কেটুদা চেটিং এ ব্যস্ত। বললাম দাদা ঘুমাবেন না, ‘তিনি ইশারায় উত্তর দিল আপনি ঘুমান আমি বাইরে বৃষ্টি দেখি।’ বুঝলাম গুরুত্বপূর্ন চেটিং। তার সাথে আবারও আমি বৃষ্টি দেখতে বারান্দায় চলে যাই। আবারও চেয়ারে বসে শুরু করি বৃষ্টির নাচন দেখা। আমি তখন ইয়ার ফোনে বাদল দিনের গান ছেড়ে চোখ বুজে কিছুক্ষণ বৃষ্টির সাথে সদ্ধি করছিলাম। হঠাৎ দেখি আমি ঝিমিয়ে পড়ছি এবং গায়ে ভিষণ শীত অনুভব করছি। তখন আর বারান্দায় কুলাতে না পেয়ে আবারও রুমে গেলাম। মোবাইলের স্কিনে দেখি রাত ৩ টা বাজে। আমার সাথে কেটুদাও চলে এলো। রুমের ভিতর আরো কিছুক্ষণ আড্ডা-গল্প হয় আমাদের। আবারও মোবাইল ঘড়িতে চোখ রেখে দেখি রাত ৪ টা প্রায়, মোবাইলেও চার্জ শেষের দিকে।
বৃষ্টি থামলেই তো কাল সকালেই ফিরতে হবে আমাদের। ফলে মোবাইল চার্জে বসিয়ে আর দেরি না করে শুয়ে পড়ি আমরা। শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছিলাম ভোরে উঠে যদি দেখি এভাবেই বৃষ্টি ঝরছে তবে কাল হয়তো ফেরা হবে না। উইঞ্জার চালক অবশ্য আমাদের বলেছে, বৃষ্টির অবস্থার উপর তার বারাঙ্গাপাড়া যাওয়া হবে এবং সে ফোন করবে। যদি বৃষ্টি না কমে তাহলে কী আর করা, তুরা পাহাড়ে রাতের বৃষ্টি তো দেখা হলো, এরপর দিনের বৃষ্টি দেখবো এবং আকাশ ভালো হলেই দেশে ফিরবো। এসব নানা কথা চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি বুঝতে পারি নাই।
তবে ভোর ৬ টার দিকে শীতের কারণে এমনিতেই ঘুম যাই। ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বাইরে যাই বৃষ্টির অবস্থা দেখতে। যা ভাবছিলাম তাই, বৃষ্টি ঝরছেই। এরপর কেটু দা কে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম এবং বললাম দেখেন বাইরের অবস্থা। আমি তখন রুমের দরজা খোলা রেখেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতেই কখন যে সকাল ৭ টা বেজে গেলো বুঝতে পারিনি। এবার উঠে ওয়াস রুমে গিয়ে ফ্রেশ হই আমরা। এমন সময় সকাল ৮ টার দিকে বৃষ্টি কিছুটা কমে আসলো। সেইসাথে উইঞ্জার চালক শ্যামের ফোনও বেজে উঠলো। ফোন রিসিভ করে সুখবর পেলাম। শ্যাম বলছিলো, ‘রাস্তার অবস্থা মোটামুটি যাওয়া যাবে। আপনারা সাড়ে আটটার মধ্যে সুপার মার্কেটের সামনে এসে দাড়াবেন। সেখান থেকে আপনাদের নিয়ে যাবো।’ এ কথা শুনে ছাতা নিয়ে আমরা বেড়িয়ে পরি প্রথমে পেটে কিছু দানাপানি দেওয়ার জন্য। চা-নাস্তা করেই হোটেলে এসেই সুপার মার্কেটের সামনে যাওয়া পরিকল্পনা করে হোটেলে সবকিছু গোছাগাছ করে রেখে চলে আসি সুন্দরি হোটেলের সামনে।
সেখানে সকাল বেলা ফুটপাতে লুচি ও চা পাওয়া যায়। তাও আবার সকাল ৮টার পর তা শেষ হয়ে যায়। ফুটপাতের ওইসব দোকান গুলো মূলত তুরা থেকে ভোর বেলা ছেড়ে যাওয়া শিলিগুঁড়ি, গুয়াহাটি, শিলংসহ বিভিন্ন স্থানের বাসের যাত্রীদের জন্য মাত্র ২ ঘণ্টার জন্য বসে। এরপর বেলা ৯-১০ টার মধ্যে অন্যান্য হোটেল খুলতে থাকে। আমরা যেহেতু সকাল সাড়ে ৮ টার মধ্যে ফিরবো তাই হোটেলের নাস্তার উপর নির্ভর না করে ফুটপাতের ওই লুচি-চা খেয়েই প্রস্তুতি নেই দেশে ফেরার উদ্দ্যোশে বরাঙ্গাপাড়া যেতে। ফুটপাতের ওই লুচি নাস্তা মোটমুটি ভালই লাগে। গরম গরম লুচির সাথে আলুর দম, ডিম ভাজি এবং স্থানীয়দের প্রিয় খাবার শুকরের মাংসের দম। জেনেশুনে ভিন্ন এলাকায় এসে ওসব হারাম খাবারের চিন্তা করে নাক ছিটকিয়ে কোনলাভ নেই তাই পছন্দের আলুর দম দিয়েই আমরা নাস্তা এবং চা খেয়ে দ্রুত চলে আসি হোটেলে।
এদিকে বৃষ্টিও আপাতত নেই। আকাশ পরিষ্কার হতে যাচ্ছে। তবে দূর পাহাড়ে কোন কোন স্থানে মেঘ ও বৃষ্টির ছুটাছুটি দেখা যাচ্ছিল। হোটেলের চেক আউট সেরে ঠিক সাড়ে ৮ টার মধ্যে চলে আসি সুপার মার্কেটের সামনে। এসেই দেখি শ্যাম কেবলমাত্র আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। শ্যাম আমাদের জন্য আগেই দ্বিতীয় সারির দুটো সিট রেখে দেয়। ঠিক এসময় চোখে পড়ে রাস্তার পাশের একটি দোকানের সামনে দাড়িয়ে আছে ইতিপূর্বের তুরা ভ্রমণের সফরসঙ্গী এক বাংলাদেশি গারো ভাই পিংকু দাদা। তার সাথে প্রায় এক বছর আগে আমি ও কেটুদা যখন প্রথম তুরা ভ্রমণে বারাঙ্গাপাড়ায় বাসে উঠি তখন তার সাথে দেখা ও পরিচয়। ঠিক এক বছর পর আবারও তুরা শহরে তার সাথে দেখা হওয়ায় আমরা বেশ আপ্লুত হই। সেবার অনেক কথা হলেও এবার কুশলাদি ছাড়া অন্য কোন কথা বলার সুযোগ পেলাম না উইঞ্জার চালক শ্যামের তাড়ার জন্য। তারপরও এই এক ঝলক দেখার মধ্যে পিংকু দাদার মোবাইল নাম্বার এবং একটি সেলফি তুলে নেই আমরা। পিংকু দাদা গারো এবং খ্রীস্টান ধর্মের লোক। বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, তবে থাকেন ঢাকা উত্তরায়। তুরায় তার বোনের বাড়ি, তাই বছরে দুই-চার বার আসা-যাওয়া হয় তার। খুব বন্ধু সুলভ, আন্তরিক ও হেল্পফুল মানুষ। প্রথমবারের তুরা ভ্রমণে তার বেশ কিছু টিপস্ আমাদের বেশ কাজে লেগেছিল।
এদিকে শ্যামের তাড়ায় আমরা আর সেখানে থাকতে পারলাম না উইঞ্জারে গিয়ে বসার সাথেই ছেড়ে দেয় গাড়ি। যাবার পথে বেশ কয়েকবার বৃষ্টির কবলে পড়ায় বেশ ধিরে ধিরে চালাচ্ছিল উইঞ্জার চালক শ্যাম। শ্যাম খুবই পাকা চালক তা তার ড্রাইভিং দেখেই বোঝা যায়। ফেরার পথে দূর আকাশের মেঘের ছুটাছুটি আর গাছের উপর ঝড়ে পড়া বৃষ্টির আওয়াজ মনটা সতেজ হয়ে উঠে। তুরা পাহাড়ে এমন বৃষ্টি দেখার ভাগ্য হয়তো আর হবে না। এখানে বর্ষায় বৃষ্টি হয় তবে ফণীর প্রভাবে যে বৃষ্টি ও ঝড় দেখে গেলাম তা হয়তো আর ভাগ্যে হবে না। রাতে কম ঘুমের কারণে ও গাড়ির দোলা আর মনোরম বৃষ্টির দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি এবং বেলা সাড়ে ১০ টা বেজে যায় বুঝতে পারিনি।
এদিকে গাড়িটি বারাঙ্গাপাড়া বাজারে আসার পর শ্যাম তার ব্র্যাক কষতেই আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। শরীরটা আড়মোড়া দিয়ে আস্তে আস্তে নেমে কেটুদার কাকার হোটেলে যাই। সেখানে ফ্রেশ হয়ে চা খেতে বসতেই শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। কী আর করা হোটেলে বসে বসে কেটুদার কাকাত ভাই বাপ্পার সাথে বসে গল্প করতে করতে প্রায় ঘণ্টা খানিক পর বৃষ্টি আবারও কিছুটা কমে আসলে আর দেরি না করে চলে যাই ভারতের ছৈপানি ইমিগ্রেশনে। সেখানের বর্হিগমনের ছাপ্পা বা সিল মেরে চলে যাই ভারতের কাস্টমসে। সেখানের কাজ শেষ করতেই আবারও বৃষ্টির বাগড়া। এসময় হঠাৎ করেই অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখা হয় আমার পূর্ব পরিচিত বন্ধুর মতো সম্পর্ক মেঘালয়ের টিকির কিল্লা এলাকার সাবেক এমএলএ মাইকেল দাদার সাথে। আমাকে দেখেই সে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘কই গেছিলা, আমাকে জানাইলা না।’ আমিও উল্টো প্রশ্ন করলাম আপনি এখানে কেন ? তখন তিনি বললো, ‘আমার পাথরের ব্যবসার জন্য এখানে ট্রাক আনলোড করতে আসছিলাম।’
এসময় হঠাৎ করে বৃষ্টি কমে যাওয়া কেটুদা তাড়া দিচ্ছিল বর্ডার পার হতে তাই মাইকেল দাদার সাথে খুব বেশি কথা বলা হয়নি। শুধু বললাম বাংলাদেশে আসলে যেন আমার সাথে দেখা করে। মাইকেল দাদার সাথে আমার এর আগে শিলং ও তুরায় বেশ কয়েকবার ঘোরাঘুরি করেছি। কিন্তু সেদিনের সেই মাইকেল দাদার সাথে যে শেষ দেখা হবে তা জানতাম না। তার সাথে দেখা হলো আমার ২০১৯ সালের ৪ মে আর তিনি স্ট্রোক করে গ্রামের বাড়ি টিকির কিল্লায় মারা গেলো ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম তার মৃত্যুর খবর পেয়ে। কোন দিন আবার সময় পেলে মাইকেল দাদার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার সমাধি দেখে আসবো। একজন ভিন দেশি, ভিন জাতি এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষ হয়েও তার মাঝে যে আন্তরিকতা ও সহানুভবতা পেয়েছি তা কোন দিনই ভুলার নয়।
এদিকে আমরা আবারও বৃষ্টির কবলে পড়ার আগেই দ্রুত বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশের বিজিবি, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পার হয়ে নালিতাবাড়ি শহরে চলে আসি। সেখানে এসে কেটুদার অনেক অনুরোধেও তার বাসায় না গিয়ে নিজের বাড়ি ও পরিবারের প্রতি টানের কারণে শেরপুরের সিএসজি ধরে বেলা ৩ টার দিকে চলে আসি নিজ শহরে। শহরের খোয়ারপার থেকে সিএনজি থেকে নেমে অটোকরে মেইনে শহরের বাড়ির উদ্দ্যেশে আসতে আসতে শহরের রাস্তা-ঘাটের করুণ দশা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না যে, এখানেও যে বৃষ্টি হয়েছে তার হয়তো বিগত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙ্গেছে। তবে তুরা শহরে এক রাতের বৃষ্টির কথা ভুলবো না কোন দিনই। সে এক রোমাঞ্চকর স্মৃতি ও হৃদয়ে নাড়া দেয়া অভিজ্ঞতা।