সাজেদুল আলম পল্লীবিদ্যুৎ এর চাকুরী থেকে পেনশনে এসেছেন বছর চারেক হবে। চাকুরী শেষেই হজ্ব করবেন ভাবছিলেন কিন্তু সময়ই পাচ্ছেন না! ঢাকার শহরে তার বেশ কয়েকটা আবাসিক দালান আছে, লাখ টাকার মত বাসা ভাড়া পান। তিন চার টা ব্যবসার ভাগেও টাকা ছড়ানো আছে। দুই মেয়ে আর এক ছেলে। ছেলে-মেয়েদের তিনি উচ্চ শিক্ষিত করে চাকুরী সমেত বিয়ে দিয়ছেন। তবুও আফসোস তার লেগেই আছে। শিডিউলের অভাবে ছোট মেয়ের বিয়েটা, রেডিসনে দিতে পারেননি। লোকাল কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজন করতে হয়েছে। মেয়ের জামাইদের তিনি দু-হাত ভরে দিয়েছেন, তবুও নাকি বড় জামাইর অভিমান শ্বশুরের প্রতি! একটা ফ্লাট কিনার টাকা চায়েছিল, পুরোটা দিতে পারেনি বলে। এক মাত্র ছেলেকে আর্মি অফিসার বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চাকুরী হলো ব্যাংকে।

আশুলিয়ায় তার আলিসান ছয়তলা দালান, পরিবার নিয়ে আপাদত এখানেই থাকছেন। এদিকে বনানীতে আটতলা বিল্ডিং এর কাজ চলছে পুরোদমে।

আলম সাহেবের বাসার উপর তলার একটি ফ্লাটে থাকে আলী দিয়াত ও ফাইজা। তাদের ছোট্ট সংসারে টুনটুনে একটা কন্যা সন্তান। দিয়াত একটি বেসরকারি ফ্যাক্টরির অফিস করনিক। কিছুদিন হলো এই বাসায় উঠেছে। বাড়িতে তার মা, ভাই, আর এক বোন রয়েছে। দিয়াতের স্ত্রী ফাইজার অনেক দিনের আশা কিছুদিন স্বামীর সাথে শহরে থাকবে। আর একটা অসুখ তার বিয়ের পর থেকেই লেগে আছে তার একটা ট্রিটমেন্ট করাই মূল উদ্দেশ্য। তাই অনেক বলে, ক’য়ে (শ্বাশুরি) মাকে রাজি করানো।

নীলনা আর দীলনা, বাসার মালিকের দুই মেয়ে। কাছাকাছি বিয়ে হওয়ায় প্রায়ই তাদের দেখা যায় এখানে। বয়সের সামঞ্জস্যতায় ফাইজার সাথে তাদের একটা সখ্যতা গড়ে উঠে। তারপর থেকে নীলনা-দীলনা বাসায় এসেছে আর ফাইজার সাথে দেখা হয়নি, এমনটি যেন আজকাল ভাবাও যায়না। ফাইজাও এ সঙ্গটা খুব উপভোগ করে। দিয়াত যখন অফিসে থাকে তখন তার একলা সময়টা এভাবে কেটে যায়।

আজও তেমনি, দীলনা এসেই ফাইজার দরজায় নক করলো, ‘আন্টি কি করেন?’

ফাইজা চমকিত হলো! ‘ওমা দীলনা আন্টি, ‘কখন এলেন?’

এই দুপুরবেলা একজন সাথী পেয়ে তার বেশ আনন্দ লাগছে, ‘ভিতরে আসেন।’ বলতে বলতে ফাইজা দীলনাকে ঝাপটে ধরে খাটে এসে বসলো দু’জন।

‘আঙ্কেল?’

‘আপনার আঙ্কেল অফিসে। আসতে আসতে চারটা!’

‘রান্না-বান্না শেষ?’

‘হুম।’

দীলনা একটু কমই আসে বাপের বাসায়, তার হাজবেন্ড ব্যবসা করে। সেও একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরী নিয়েছে! তাই খুব একটা সময় হয়না এখানে আসার।

ইন্ডিয়ান চ্যানেলের সিরিয়াল দেখতে দেখতে গল্প চলে দুজনার সুখ-দুঃখের গল্প।

‘আন্টি এই শাড়িটা কাল কিনেছি, দেখেন তো কেমন লাগছে আমাকে?’

‘খুব সুন্দর।’

শাড়ীর আচঁলটা একটু ছুঁয়ে দেখে, তারপর দাম জিঞ্জাসা করে, ‘কত দিয়ে কিনলেল?’

‘সাত হাজার!’

দীলনা জানায়, ব্যান্ডের শাড়ী তো দাম একটু বেশি। ফাইজার মনে কৌতুহল জাগে ব্যান্ড আবার কী? দীলনার পড়নে শাড়ীর সাথে ম্যাচিং থ্রি কোয়াটার ব্লাউজ, ম্যাচ করা কানের দুল, আংটি, লিপিস্টিক; সাজ-সজ্জার রুচিশীলতায় তাকে একদম পরী পরী লাগছে। এমতাবস্থায় ফাইজা তাকে কি প্রশ্ন করবে ভেবে পাচ্ছেনা। মুখটা ক্রমশ মলিন হয়ে যাচ্ছে ফাইজার। সে টিভির সিরিয়ালে মনযোগ দেয়।

‘জানেন আন্টি কেনাকাটা সব আমিই করি, আপনার আঙ্কেল কখনো কিছুই কিনে দেয় না!’

‘কেন? আপনি কিছু বলেতে পারেন না।’

‘আগে বলতাম, এখন আর কিচ্ছু বলি না।’ কথা শেষে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে! তারপরে আবার বলে, ‘কি আর বলবো। প্রতিদিন বাসায় আসে রাত এগারটায়।’

‘প্রতিদিন?’

‘হুম।’

‘তাহলে?’

দীলনা একটা বালিশ টেনে বুকের সাথে চেপে ধরে তারপর অন্য দিকে চোখটা সরিয়ে নেয়, গাঢ় গলায় বলে, ‘এমনিতেই থাকি। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে!’

কি ইচ্ছে করে এটা ফাইজার অজানা নয়। তবুও কথার পৃষ্টে কথা। কিছু তো একটা বলতে হবে, ‘আপনি ও তো চাকরী করেন। শুধু শুধু আংকেলের দোষ দিলে হবে?’

‘তা বলতে পারেন। তবে একা একা থাকতে হয় বলেই চাকরি করা।’

দীলনা মূলত টাইমপাস করার জন্য ই চাকুরী করে, স্বামীর অর্থ আর প্রাচুর্যের গভীরে ডুবে যাওয়া সরস জীবনের পালে একটু হাওয়া লাগানো।

‘জানেন আজ এক সাপ্তাহ হলো আমরা একে অপর কে ছুঁয়েও দেখিনি।’

‘এক সাপ্তা! কী বলেন?’ কথাটি বলতে যেয়ে ফাইজা নিজেই লাজে পড়ে গেলো। তৎক্ষণাৎ তার মুখটা নিচু করে নেয়।

কিন্তু দীলনার লজ্জা-শরম যেন সিলিং ফ্যানের বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। উড়ছে তার মাথার এলোমেলো চুল, শাড়ীর আঁচল। সৌডল বক্ষদেশ যেন আরে ফেঁপে উঠেছে অভিমানে। মনের গোপন কথাগুলো অনায়াসে বলে দিচ্ছে সব! অভিজাতিক কমিউনিটির গভীরে মিছে মিছি সুখ খুঁজে বেড়ানো এক অসুখী মানবী।

‘‘নারী এক আজব হৃদয় নিয়ে বাস করে! যেখানে সুখ দুঃখের গণকবর।’’

দিয়াত অফিস থেকে ফোন করে জানিয়ে দিল। আসতে দেড়ি হবে, সন্ধাও হতে পারে। রোজকার অভ্যাস মত ফাইজা তার খুকিটাকে জোর করে ঘুম পাড়ায়, এই সময়টাতে তারও খুব ঘুম পায়। এ নিয়ে দিয়াত তাকে কম খোটা দেয়নি। ফাইজা মুচকি হেসে সেটা মেনে নেয় বিনা দ্বিধায়। কিন্তু একটা বিষয় সে ভালভাবে খেয়াল করলো। যখন দিয়াত বাসায় থাকে, তখনি তার ঘুমটা বেশি পায়। কারন কী? হয়তো ও কাছে থাকলে কোন টেনশন থাকে না তাই।
নয়তো একা থাকলে ঘুম আসবে না কেন? প্রশ্নগুলো ফাইজার মনে ঘুরপাক খেতে থাকে, একা থাকলেই যত চিন্তা মাথায় আসে। ফাইজা ভাবছে তো ভাবছে।

‘‘ভাবনারও একটা জগত আছে, এ জগতে সব সময় ঢোকা যায়না। আর একবার ঢোকতে পারলে সহজে বেড়োনোও যায়না!’’

চোখ দুটি বন্ধ করতেই ফাইজার মনে পরে সাত বছর আগের স্মৃতিগুলো, তখনো ওদের বিয়ে হয়নি। এক ফাল্গুনে। কথা নেই, বার্তা নেই, হঠাৎ করে বিয়ে; বিয়ে নিয়ে যে একটা স্বপ্ন দেখবে সেই সুযোগটাও পেল না। দিয়াতের বাবা অসুস্থ। মৃত্যুর পূর্বে তার শেষ ইচ্ছে ছেলের বউ দেখে যাবে। সবাই মিলে তার ইচ্ছে পুরনে নেমে পড়লো। শেষমেষ সেই দায়ীত্বটা এলো ফাইজার ঘাড়ে। ছাত্রজীবনে দিয়াতের সাথে ফাইজার একটা ভালো লাগার সম্পর্ক ছিল, এতটুকুই সেই সূত্র ধরেই বিয়ের প্রস্তাব, কথাবার্তা। এই সম্মতিতে দুই পরিবার যখন আল-হামদুলিল্লাহ্ বললো, চুপটি করে সেদিন তাদেরও কবুল পড়তে হলো।
সব কিছুতেই যেন একটা ঘোরলাগা ভাব ছিল। অবশ্য সেই ঘোর কাটতে বেশি সময় লাগেনি তার। কারণ শশুর বাড়ীতে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেবার মত কোন পরিবেশ ছিলনা। দিয়াতের বাবা গুরুতর অসুস্থ সবাই তাকে নিয়েই বেস্ত, অগত্যা তাকেও বেস্ত হতে হলো। বিয়েটা আসলে কী? কৌতুহলই রয়ে গেল।

ফাইজার মন বলে, দিয়াত তার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে তাকে সুখে রাখার। কখনই মনে হয়নি সে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে কিংবা কোন কারনে অবহেলা করছে। এমন ভাগ্যই বা ক’জনে পায়। ব্রান্ডের কোন যিনিস আমার নেই তাতে কী? প্রয়োজনের তাগিদে যা পেয়েছি এইতো যথেষ্ট। শরীর ভর্তি স্বর্নালংকার সে আমাকে দিতে পারেনি! কিন্তু দিবে বলে মিষ্টি হাসিতে আশস্ত করেছে এই ঢেড়। আলমিরা ভর্তি কাপড়-চোপর আমার নেই। কিন্তু আজ অবদি যা পড়েছি পরম মমতায় সেটা সে ই কিনে দিয়ছে। পরন্ত বিকালে অথবা চাঁদনি রাতে সে যখন আমার হাতটা টেনে বলতো, ‘চলো বাইরে হাটতে যাই?’ বরং আমিই যাইনি লজ্জায়, কিংবা কাজের অজুহাতে। আমার প্রতি রন্দ্রে রন্দ্রে আমি সদা তার উপস্থিতি অনুভব করি। এর বাইরে আমার আর কী চাওয়ার থাকে? সংসারি জীবনের এতো টানপোড়নের মাঝেও সে আমার পাশে ছিল। আমি আর কী চাইবো তার কাছে? আমি সুখিই। আমি সুখে আছি, আমি এর চেয়ে বেশী সুখ চাইনা। বাকি দিনগুলো যেন এ ভাবেই কাটে আল্লাহ তায়ালার কাছে এ আমার চির প্রার্থনা।

শ্বশুরের অসুস্থতায় সেদিন হুট করে আসতে হয় এই সংসারে। মায়া, মমতা, আর ভালবাসায় ভরা একটা র্নিঝঞ্ঝাট সংসার। কিছুদিন পরেই তার শ্বশুর মারা যান। সংসারের সমস্ত তারা স্বামী-স্ত্রী কাধে চাপে! তখন যদি আমার শ্বশুর অসুস্থ হয়ে মৃতবরণ না করতেন। তাহলে কোন অর্পূন্নতাই আমাদের স্পর্শ করতে পারতো না।

সন্ধা প্রায় হয়ে এলো, ভাবনার জগতে বাধা পরে ফাইজার। এখনো কী করছে অফিসে? খুকিটা এতক্ষণে উঠে পড়ার কথা, তবুও ঘুমাচ্ছে! ফাইজা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা, আগে মেয়েটাকে ডেকে তুলবে। নাকি অফিসে একটা ফোন দেবে।