‘তেলে জলে কহনো মিশ খায় না, আমি তোরে ম্যালাবার কইছি। বুঝলি না কতাডা তহন। এহন দ্যাখ হাছা কইছি না মিছা কইছি!’

মালেকা বেগমের কথাকে তাচ্ছিল্য করে ভেংচি কেটে এগিয়ে আসে বারো বছরের রুবিনা। মালেকা বেগমের সামনে এসে স্টিলের ছোট্ট বাটিতে সরিষার তেল আর পানি মিশিয়ে শাহাদত আঙুল দিয়ে ঘুটতে ঘুটতে রুবিনা জবাব দেয়, ‘দ্যাহো দাদি, তেলে জলে মিশ খায় নাকি খায় না!’

কথাটা শেষ করেই আবার একটা ভেংচি কাটে রুবিনা। রুবিনার হাতে থাকা স্টিলের ছোট্ট বাটির ভেতরের তেল আর জল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এখন দেখতে ডিমের কুসুম গোলার মতো মনে হচ্ছে। বাটি থেকে ডান হাতের তালুতে খানিক তেল ঢেলে নেয় রুবিনা। তারপর আস্তে করে রাবেয়ার মাথার তালুতে দেওয়ার জন্য হাত বাড়ায়। তালুতে হাত রাখতেই রুবিনা চেঁচিয়ে বললো, ‘বুবু তোর মাথার তালুডা এত আগুন ক্যান! মনে হইতাছে পূব পাড়ার ইটের ভাটা। ভেতরটায় ইট পুড়াইতাছে কেউ।’

রাবেয়া জবাব দেয় না। মালেকা বেগম রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো, ‘এহন এত চিন্তা কইরা লাভ আছে, শরীরডারে কষ্ট দেওন ছাড়া আর কোনোই কাম অইতেছে না৷’
রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন, ‘দে ওর মাথায় ভালো কইরা তেল আর পানি দিয়া দে। গরমগুলান সব নাইমা যাক’

রুবিনা ফিক করে হেসে ওঠে বলে, ‘তোমার মাথাডাও দাও তোমারেও তেল জল মিশায়ে লাগাইয়া দিই, সকাল থেইকা তো কম চেঁচাইলা না। তোমার মাথাডা মনে হয় আমাগো উত্তর পাড়ার চাতালের মতো গরম হইয়া গেছে। ধান দিলেই এহন সিদ্ধ হইয়া যাইবে।’
কথা শেষ করে আবার ফিক করে হেসে ওঠে রুবিনা। মালেকা বেগম আড় চোখে তাকিয়ে চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পর পাশের ঘরে থাকা রোকেয়াকে ডাক দেয়।
‘ওই রোকেয়া আমার পানের ডালাডা দিয়া যা। পান খাইনা সেই কহন থেইকা, মুখটা কেমুন যানি খসখস করতাছে। দে একখান পান খাই।’

রোকেয়া পানের ডালা নিয়ে এগিয়ে আসে। তাঁর কোলে পাঁচ মাসের একটা বাচ্চা। মুখটা দেখতে ঠিক রাবেয়ার মতো। কপালে একটা চুমু খায় রোকেয়া। তারপর রাবেয়ার কোলে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘বুবু খিদা লাগছে দুলালের। তুই ওরে এহন দুধ খাওয়া। চিনি দিয়া ভাত মাইখা মুখে দিছি খাইতে চায় না। পেট টা তো খালি, না খাইলে অইবে! খালি কান্দে।’

রাবেয়া পাঁচ মাসের দুলালকে কোলে নিয়ে দুধ মুখে দিতেই দুলালের কান্না থেমে যায়। চোখ ভিজে পানি ঝরে রাবেয়ার।
বুলি আওড়ায় মালেকা বেগম, ‘এহন আর কাইন্দা লাভ কি! যা অওনের তা তো অইছে। সবই কপালের লিখন!’
কথা শেষ করে পান চিবুতে চিবুতে তিনি বের হয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, ‘রোকেয়া, আমি গেলাম। ঘরের কাম শেষ কইরা আইজ তুই একলা আইস চাতালে। রুবিনারে কইস যাওন লাগবে না কোথায়ও। রাবেয়ার কাছেই থাকতে কইস।’

রোকেয়া ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো দরজার কাছে। তেলে জলে কি সত্যিই মিশ খায় না! ভাবতে থাকে রোকেয়া।
ভাবনা ছেড়ে ঘরের কাজে হাত লাগায়। সব কাজ ঠিকঠাক শেষ করে ছুটতে হবে চাতালে ধান সিদ্ধের কাজে।
রুবিনা এসে পাশে দাঁড়ায়, ‘বুবু আইজ কি স্কুলে যামু না?’
রোকেয়া জবাব দেয়, ‘না দাদি বারণ দিছে। যাওনে কাম নাই। কয়দিন ঘরে থাক। বুবুর খেয়াল রাখ। চাতালেও যাওন লাগবে না আর বিহাল বেলায়। আর তমালের লগে রাস্তায় রাস্তায় টই টই করবি না। তোরে না বারণ দিছে দাদি, মানষে কি কয় এতে! বড় অইছে এহনও বোধবুদ্ধি অয় নাই।’

রোকেয়া দ্বিগুন চড়া গলায় বিরোধিতা করে বলে ওঠে, ‘সামনের সপ্তায় স্কুলে আমার পরিক্ষা। আমার যাওন লাগবে। আর রাবেয়া বুবুর খেয়াল তো আমি রাহি যতক্ষণ বাড়িতে থাহি। স্কুল থেইকা ফিইরা আবার যত্ন নিমু। আর তমাল তো আমার লগে পড়ে, ওর লগে রাস্তায় হাঁটলে তাতে মানষের কি! আমি কি ওরে লগে লইয়া কারো বাড়ির আম জাম চুরি করতে যাই!’

রোকেয়া ধমক দেয়। তারপর শান্ত স্বরে বলে, ‘বইন তুই বড় অইছিস না! মানষে নানান কতা কয় এমনে পোলাপানের লগে ঘোরাঘুরি করলে। বুঝতে অইবে তো এগুলা। আর তুই স্কুলে যাইস পরশু থেইকা। আইজ আর কাল বুবুর খেয়াল রাখ ঘরে বইসা। আর ঘরে বইসা’ই পড়তে থাক। আমি রান্ধন-বাড়ন সব কইরা যামু। তোর ঘরের কোনো কামে হাত দেওন লাগবো না। তুই বুবুর কাছে থাহিস, মাঝে মধ্যে দুলালরে কোলে নিস।’

রুবিনার মন তবুও শান্ত হয় না। রোকেয়া রুবিনার মাথায় হাত রাখে। হাসি দিয়ে বলে, ‘যা বুবুর কাছে যা। দুলাল কান্দে, ওরে কোলে নে’

ঘরের কাজ শেষ করে চাতালের উদ্দেশ্য পা বাড়ায় রোকেয়া। এলাকার লোক সুযোগ পেলেই নানান কথা বলে রোকেয়াকে নিয়ে। উপরওয়ালা নজর কাড়া রূপ দিলেও, ভালোভাবে বাঁচার মত অর্থবিত্ত দেন নি রোকেয়াদের। তাদের তিন বোনের মত সুন্দরী এলাকায় আর একটা মেয়েও নেই। তাই অনেকেই হিংসে করে ভীষণ। হিংসেয় জ্বলে পুড়ে নানাজনে নানা বাজে কথা ছড়িয়ে বেড়ায়। এলাকার অসভ্য ছেলেগুলোও কম যায় না এসবে। পাত্তা না পেয়ে ক্ষিপ্ত প্রায় সকলে। আড়ালে আবডালে খারাপ চোখ এড়িয়ে চলার চেষ্টা তাই রোকেয়ার। রুবিনার মত লোকের মুখের উপর দশটা কথা শুনিয়ে দেওয়ার মত সাহস রোকেয়া চেষ্টা করেও অর্জন করতে পারেনা।

প্রতিদিন দাদির সঙ্গেই চাতালে যায় রোকেয়া। তাই অনেকেই সাহস করে ওঠে না কিছু বলতে। মালেকা বেগমের কথার ধাপে এলাকার ছেলেগুলোর বখাটেপনা টিকতে পারেনা। তাঁর সামনে পড়লে বখাটেগুলোর অবশিষ্ট মানসম্মানটুকুও যায় যায় অবস্থা হয়। তাই তার সামনে না পড়ার চেষ্টা থাকে সকলের। কিন্তু আজ রোকেয়া একা যাচ্ছে। অজানা ভয় মনের মধ্যে কুঁড়ে খাচ্ছে। মাথায় ওড়নাটা আরও একটু সামনে টেনে দিয়ে আস্তে আস্তে পা বাড়ায়। এই রাস্তাটা বেশ নীরব, গাছপালায় ঘেরা।
এমন সময় কেউ একজন বাম হাতটা টেনে ধরলো।
রোকেয়া চেঁচিয়ে উঠতে যাবে তার আগেই মুখটা চেপে ধরলো।

বড় বড় চোখে রোকেয়া তাকিয়ে দেখে সোহানের হাস্যজ্জল মুখখানা। হাত সরিয়ে নেয় সোহান। বুকে থু থু ছিটিয়ে জোরে নিঃশ্বাস নেয় রোকেয়া।
‘আপনি এই জায়গায়! আমি তো ভয় পাইছিলাম খুব। আল্লাহ! আমি ভাবছি কেডায় না কেডায় আমার হাত’ডা এরাম খপাত কইরা ধরলো।’
রোকেয়ার কথায় হো হো করে হেসে ওঠে সোহান।
‘তোমার ভয় পাওয়া চেহেরাটা দেখতে কিন্তু ভীষণ দারুণ লাগে।’
রোকেয়া লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে।
সোহান বলে ওঠে, ‘বেশি ভয় পেয়েছো? তোমার ওই হুজুর বাবা কি যেন নাম? তার থেকে পানিতে ফু দিয়ে আনতে হবে নাকি?’

রোকেয়া হেসে ওঠে, ‘লাগবো না। আমার যাইতে অইবে। আপনি সরেন। মানষে দেখলে নানান কতা রটাইবো।’
সোহান রোকেয়ার পথটা আরও আগলে দাঁড়ায়, ‘দেখুক লোকে। তাতে আমার কি!’
‘আপনার কিছু না অইলেও আমার অনেক কিছুই। লোকে এমনিই নানান কতা কয়। আপনি সরেন আমি যামু।’
সোহান আবার রোকেয়ার হাতটা ধরে ফেলে। তারপর আদরমাখা গলায় বলে, ‘এখনই যাবে? আরেকটু সময় থাকো না!’
‘দাদি গেছে ম্যালা সময় আগে। আমার আইজ ম্যালা দেরি অইয়া গেছে। আরও দেরি অইলে দাদি রাগ করবো। পরে আবার কতা কমু। এহন গেলাম।’
সোহান হাত ছেড়ে দেয়। রোকেয়া খানিক পথ সামনে হেঁটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখে সোহানের মায়া জড়ানো মুখটা। একটা মুচকি হাসি দিতেই সোহানের মুখ জুড়েও একই হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়ে। তারপর দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে রোকেয়া চাতালের দিকে।

চাতালে ঢুকতেই মালেকা বেগম এগিয়ে আসে। ফিস ফিস করে বলে, ‘এত দেরি করছোস ক্যা? মহাজন রাগ করছে ম্যালা। এত দেরি অইলে পুরা দিনের টাকা দিবে না কইছে। আমি ম্যালা বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠান্ডা করছি।’
রোকেয়া উত্তর দেয়, ‘কি করমু কও, রুবিনার সামনের সপ্তায় পরিক্ষা। ঘরের কাম সব গুছায়ে আওন লাগে তো। ওর উপর ফালাইয়া থুইলে পড়বে কহন! তার উপর বুবুর শরীর তো ভালো না। তারও তো যত্ন নেওয়া লাগে।’
‘কাইল থেইকা আর এত দেরি করিস না। তাড়াতাড়ি আইবি। আমি আগে আইসা এদিকডা সামাল দিমু, তুই সব কাম গুছায়ে রাইখাই জোর পায়ে হাঁইটা আইবি।’
‘আচ্ছা এহন চলো।’

সারাদিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাজার-সদায় হাতে এক রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে মালেকা বেগম এবং রোকেয়া।
রুবিনা এসে জানালো, ‘বুবু, লালু এহনও বাড়ি ফেরেনি’
রোকেয়া আর রুবিনা হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো লাল রঙের গরুটার খোঁজে। যার নাম দিয়েছে আদর কারে লালু। গরুটা বিকেলের মধ্যেই প্রতিদিন বাড়ি ফেরে।

রাস্তার মোড়ের দোকানদার মকবুল মিয়া এলাকার সব খবর রাখেন। কার বাড়ি আজ কি রান্না হচ্ছে সে খবরও তিনি জানেন। তাঁর কাছেই ছুলটো রোকেয়া আর রুবিনা।

খবর জানা গেলো। গরু খড়ে দিয়েছে সিকান্দার। তাঁর লাউয়ের মাচা থেকে লাউ শাক খেয়েছে। এবার হন্য হয়ে ছুটলো খড়ের দিকে। খড়ের মালিক কাশেম শেখ এক রোখা স্বভাবের। হাজার অনুরোধ করে বললেও গরু দিলো না। কথা একটাই, ‘সহালে টাকা দিলে এহন গরু নেওয়োন যাইবে না। এহন টাকা দিয়ে এহন গরু ছাড়ায়ে নিতে অইবে।’
রোকেয়া অনুরোধ করে বললো, ‘চাচা কাইল সহালে দুধ বেঁইচা টাকা দিয়া যামু। গরুডা এহন দেন।’
কাশেম উত্তরে বলে, ‘এহন টাকা না দিলে কাইল সহালে দুধও তোমরা পাবা না। দুধ আমিই দোয়ামু।’

আজকে চাতাল থেকে যা টাকা পেয়েছে সে টাকা দিয়ে চাল ডাল আর তেল কিনে বাড়ি ফিরেছে রোকেয়া আর মালেকা বেগম। হাতে এখন একটা টাকা নেই। টাকার জন্য ছুটলো পাশের বাড়ির করিমোন খাতুনের কাছে৷ করিমোন খাতুনের দুই ছেলে শহরে কাজ করে। একজন দোকানদারি করে আরেকজন গ্যারেজে কাজ করে। মেয়েটা গার্মেন্টসে কাজ করে। সবাই তাঁকে মাস গেলে বেশ কিছু করে টাকা পাঠায়। তার কিছু সংসারে খরচ হয়, বাকিটা জমিয়ে রেখে দেন। জমানো টাকার দাপট দেখিয়ে চলতে তিনি মোটেও কার্পণ্য করেন না৷

‘খালা পঞ্চাশটা টাকা দেওনা কাইল সহালেই ফেরত দিয়া দিমুনে।’
রোকেয়ার কথাটা তিনি শুনেও যেন না শোনার অভিনয় করলেন।
রোকেয়া আবার বললো, ‘লাল গাভিডা বাড়ি ফেরেনি, সিকান্দার ভাই খড়ে দিছে। কাশেম চাচা টাকা ছাড়া গরু দিবে না, বাছুরডা দুধ না পাইলে চিল্লাইতে থাকবে। তুমি কও এহন কি করমু! সহালে আবার মতিন চাচারে দুধ না দিলে খুব রাগ ঝাড়বে।’
করিমোন খাতুন আমতা করে বললো, ‘আমার কাছে তো এহন পঞ্চাশ টাকা নাইরে রোকেয়া।’
রোকেয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। রুবিনা চেঁচিয়ে বললো, ‘খালা তুমি কিছুক্ষণ আগেও না তোমার জমাইনা টাকা লইয়া খুব বড়াই দেহাইলা। আর এহনই টাকা ফুরায়ে গেলো! পঞ্চাশ টাকাই তো, সহালে না হয় তুমি গিয়া টাকার বদলে দুধ নিয়া আইসো।’
করিমোন খাতুন চুপ করে রইলো।
রুবিনা বললো, ‘দান করার চাইতে ধার দিলে সওয়াব বেশি হয় খালা। বুড়া বয়সে তোমার এহন বেশি বেশি সওয়াব দরকার।’

করিমোন খাতুন কথা বাড়ায় না। পানসে মুখে শাড়ির আঁচলে বাঁধা পঞ্চাশ টাকার নোটটা বের করে দেয় রোকেয়ার হাতে। টাকা নিয়ে দুইজন ছুটলো গরু আনতে। কাশেম শেখ মুখ খানা ফ্যাকাসে করে গরুটা দিয়ে দিলো।
রুবিনা বললো, ‘চাচা এবার আপনি আপনার খড়ের ষাঁড়টার দুধ দোয়াইয়েন সহালে।’
বলেই ফিক করে হেসে ওঠে।
রোকেয়া ধমক দিয়ে বলে, ‘রুবিনা চুপ কর। বড়দের লগে অভদ্রতা করতে নাই।’

গরু নিয়ে ফিরতেই রাস্তায় দেখা মেলে হানিফ আর আসলামের সঙ্গে। রোকেয়াকে ইঙ্গিত করে নানা কথা ছুড়তে থাকে তাঁরা। রোকেয়া চুপ করে থাকে। প্রতিত্তোর করে না। রোকেয়ার চুপ থাকাই ওদেরকে আরও সাহসী করে তুলছে।
রুবিনা বলে ওঠে, ‘বুবু তুই ওদের কিছু কইতে পারিস না?’
‘ওদের লগে কতা না বাড়ানোই ভালা।’
‘ক্যান ওরা চেয়ারম্যানের লোক তাই?’
রোকেয়া চুপ করে থাকে জবাব দেয় না।

রুবিনা চেঁচিয়ে বলে ওঠে, ‘ওই চেয়ারম্যানের বলদগুলা। সাহস থাকলে আমাগো বাড়ির সামনে আইস! গোবর খাইয়ে ছাড়মু কইয়ে দিলাম।’
রোকেয়া মুখ চেপে ধরে রুবিনার। রুবিনা তবুও চেঁচিয়ে যায়। কথা বাড়ায় না বখাটে দু’জন। এলাকায় ছোট ছেলেমেয়েদের সবাই খুব ভয় পেয়ে চলে। একবার একটা কথা রটিয়ে দিলে সেটা চলতেই থাকে। চেয়ারম্যানের খাস লোক বাবুল। চেয়ারম্যানের চামচামি করাই তাঁর কাজ। তাঁর বাড়ির আম গাছে ঢিল ছোড়ার অপরাধের জন্য একবার এলাকার প্রাথমিকের এক ছেলেকে কান মলা দিলো বাবুল।
রাগ করে ছেলেটি বললো, ‘চেয়ারম্যানের চামচা। তুই একটা চামচিকা।’ বলেই দিলো দৌড়।

তারপর থেকে স্কুলের সমস্ত ছেলেপুলে তাঁকে দেখলেই চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘চামচিকা বাবুল’
আস্তে আস্তে এটা প্রশস্ত হয়ে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বাবুল নামটা কেটে এখন সবাই তাকে ‘চামচিকা’ বলেই সম্বোধন করে। বাচ্চাটি এখন আর বাচ্চা নেই বড় হয়ে গিয়েছে কিন্তু বাবুলের চামচিকা নামটা এখনও তেমনই রয়ে গেছে। এরকম আরও দুই একটা ঘটনা ঘটার পরে ছেলেপুলেদের সাথে কেউ ঝামেলায় জড়াতে চায় না।

রাতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ে সবাই৷ রাবেয়া ডুকরে কেঁদে ওঠে। দুলালও কেঁদে ওঠে সাথে। মালেকা বেগম সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসে।
‘কান্দিস না। জীবনডা এমন।’
তারপর মালেকা বেগম আবার সেই পুরোনো ঘটনা পুনরাবৃত্তি করা শুরু করেন, ‘দুঃখতো ওইদিন থেইকা শুরু অইলো যেইদিন তোর বাজান নদীতে মাছ ধরতে গিয়া আর ফেরত আইলো না। দিন যায় সপ্তা যায় সবাই বাড়ি আয় রমিজ বাড়ি আয় না। তোর পোয়াতি মা নদীর ধারে গিয়া দাঁড়াইয়া চাইয়া থাকতো। দূর থেইকা কোনো নৌকা আইতে দেখলেই চেচায়ে উঠে আমারে কইতো আম্মা ওই নৌকায় মনে অয় আপনার পোলা আইতাছে। কহনও নৌকা পাড়েই ভিড়তো না, আবার কহনও ভিড়লেও রমিজ আইতো না। মানষে কইতো ডাকাইতরা মাইরা ফেলছে, কেউ কইতো ঝড়ে পইড়া মারা গেছে, কেউ কইতো ওদিকে নতুন সংসার পাতছে। তোর মা কিছুই বিশ্বাস করতো না, সে কইতো তোর বাজান ফিইরা আইবে। তোরা দুই বইন তহন ছোট। এদিকে তোর পোয়াতি মা দিনদিন অসুস্থ অইয়া যায়। আমি তারে লাইয়া দৌড়াদৌড়ি কইরাও কিছু করতে পারি নাই। অকালেই মারা গেলো। থুইয়া গেলো রুবিনারে। তোর দাদা তো গেলো আরও আগে। আমিই রইয়া গেলাম।’
মালেকা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রোকেয়া পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে রুবিনা ঘুমে তলিয়ে। মাথায় হাত রাখে।
কিছুক্ষণ পর মালেকা বেগমও ঘুমে তলিয়ে পড়ে। জেগে থাকে রোকেয়া।

তাঁর ভাবনা জুড়ে এখন বসবাস সোহানের। সোহানের কথা ভাবতেই মনে পড়ে তাঁর রাবেয়া বুবুর কথা। ওপাশে তাকাতেই দেখে রাবেয়া নেই। রোকেয়া উঠে পড়ে। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় দরজা খুলে। চমকে ওঠে। উঠোনের কোণের আমগাছটায় গলায় ফাঁশ লাগানোর রশি বাধঁছে রাবেয়া। দৌড়ে যায় রোকেয়া। জাপটে ধরে থামিয়ে দেয় তাঁকে।
‘বুবু তুই কি করতেছিস এইসব?’
কান্না বাড়ে রাবেয়ার। উত্তরে কাঁদতে কাঁদতেই বলে, ‘আর কোনো পথ নাইরে আমার, মরণই আমার উপায়। আমি মইরে গেলেই বাঁইচা যামু।’
রাবেয়াকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রোকেয়া। সুনসান রাতে ডুকরে ডুকরে কেঁদে চলছে দু’জন।

বুবুকে যত দেখে সোহানকে নিয়ে রোকেয়ার ভয় তত বাড়ে। রাবেয়া শহরের ফারুক তালুকদার নামের এক প্রভাবশালী লোকের বাসায় কাজ করতো। মতিন চাচার মাধ্যমেই সেখানে রাবেয়ার কাজের ব্যবস্থা হয়। রাবেয়ার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় ফারুক তালুকদারের বড় ছেলে ফারদীন তালুকদার। রাবেয়ার অমত থাকলেও একদিন সেও ধরা দেয় ভালোবাসার জালে। মালেকা বেগম টের পেয়ে বারণ দেয় রাবেয়াকে। নানাভাবে বোঝাতে থাকে, ‘তেলে জলে মিশ খায় না’
দাদির কথা কানে তোলেনি রাবেয়া। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, সবাই মেনে নেবে ফারদীনের এমন প্রতিশ্রুতিতে গোপনে বিয়ে করতে রাজি হয় সে। কিন্তু দিন থেমে থাকে না। রাবেয়ার মা হওয়ার খবরের সাথে বিয়ের খবরটা বের হয়ে যায় সবার সামনে। বাসা থেকে বের করে দেয় তাকে ফারুক তালুকদার। সবার চোখ আড়াল করে রাবেয়ার পাশে এসে দাঁড়ায় ফারদীন। কিন্তু খুব বেশি দিন সে পাশে থাকার স্থায়িত্ব মেলে নি। মা হয় রাবেয়া। খবর যায় তালুকদার সাহেবের কানে। ছেলেকে বাধ্য করে তালাকনামা পাঠিয়ে দেয়। তারপর ওখানেই সম্পর্কের সাথে সব যোগাযোগও বন্ধ। টিকে থাকতে চায় রাবেয়া ছেলেকে নিয়ে শহরে। কিন্তু কয়েক মাস যেতেই কানে আসে ফারদীন তালুকদারের বিয়ের খবর। সেই তিক্ত খবরের বিষাক্ততা যেন সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। শহর ছাড়ে রাবেয়া, পাঁচ মাসের ছেলেকে নিয়ে পাড়ি জমায় চিরচেনা সেই গ্রামের আপন মুখগুলোর কাছে।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চোখে পানি জমে রোকেয়ার। মাঝেমধ্যে তারও সোহানকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কেন যেন পেরে ওঠে না।

চাতালে যাওয়ার পথে আজও পথ আটকায় সোহান। রোকেয়া চলে যেতে চাইলে আরও শক্ত করে ধরে রাখে তাকে।
‘এ্যামনে পথ আগলাইয়া রোজ রোজ দাড়াইলে লোকজন দেখে ফেইলবে তো।’
‘তুমি এত ভয় পাও কেন লোকজনকে?’
‘আমরা আপনাগো মতো বড়লোক মানুষজন না। লোকজনরে ভয় পাইয়াই তাই চলতে অয়।’
‘কে বলেছে তোমায় যাদের টাকা কম তাঁরা সবাইকে ভয় পাবে?’
‘এডাইতো নিয়ম।’
‘নিয়ম আপনাআপনি তৈরি হয় না। আবার আপনাআপনি ভাঙ্গেও না৷ আমরাই তৈরি করি, তাই আমাদেরই ভাঙ্গতে হবে।’
‘আমি এত কিছু জানি না, জানতে চাইও না। আমি খালি জানি আপনারে নিয়া আমার ভীষণ ডর লাগে।’
‘এত কিসের ভয়?’
‘হারিয়ে যাবার ভয়।’
‘তোমার কি মনে হয় আমি হারিয়ে যাওয়ার জন্য এভাবে তোমার কাছে বারবার ফিরে আসি?’
‘বুবুও ভেবেছিলো ফারদীন ভাইজান তাঁর পাশেই থাকবো।’
‘রোকেয়া, সবাইকে এক পাল্লায় মেপে অবিচার করো না।’
‘সেই আশাতেই তো দিনের পর দিন স্বপ্ন লইয়া বাঁইচা থাহি।’
‘আমি তোমাকে কখনও অসম্মান করবো না, মনে রেখো।’
‘চেয়ারম্যান চাচারে খুব ভয় অয়।’
‘একদিন চাচাই তোমায় খুব ভয় পাবে। দয়া করে অপেক্ষা করো ততদিন। আমাকে বিশ্বাস করো, সবাই নিষ্ঠুর নয়।’

চাতালে ইদানীং মন বসে না রোকেয়ার। রাবেয়াও এখানে আসা শুরু করেছে কয়েকদিন হলো। রুবিনা স্কুল শেষে বিকেলের সময়টুকুতে চাতালে কাজ করে।
মাধ্যমিকের গন্ডিতে পা দিলেও শেষ করতে পারেনি রোকেয়া। তাই রুবিনাকে নিয়ে তার স্বপ্নের অন্ত নেই। দুলাল এবার সবার আদরে রইলেও, বাবার চাহিদাটা অপূর্ণই রয়ে যায়।

চেয়ারম্যানের পূব পাড়ার ইটের ভাটায়ই কাজ করতো একসময় রোকেয়ারা। কিন্তু শয়তান চেয়ারম্যানের কুনজর পড়ে রোকেয়ার উপর। ঘরে দু’টো বউ থাকা সত্বেও মালেকা বেগমের কাছে একদিন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েই বসে সে। ওখান থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। বন্ধ হয়ে যায় কাজ। মালেকা বেগমের জোর আছে বলতে হয়। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মহাজনকে বলে কয়ে কাজ জুটিয়ে নেয় উত্তর পাড়ার চাতালে।

চেয়ারম্যানের বড় ভাই শহরের একজন বড় ব্যাবসায়ি। তাঁর একমাত্র সুপুত্র সোহান। শহরেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পরিপাটি স্বভাবের সোহান দেখতে বেশ সুদর্শন। কত মেয়েরা গোপনে তাঁকে নিয়ে সংসার সাজায়, সে হিসেব সোহানেরও অজানা। চেয়ারম্যানের দুই সংসারের বড় দুই মেয়েই সোহান বলতে পাগল। সোহানের কল্পনাতে আশ্রয় মেলেনি তবুও কারো। একবার গ্রাম পরিদর্শনে এসে দর্শন মেলে রোকেয়ার, মুগ্ধতা বেড়ে যায় তাঁর। তারপর মাঝেমধ্যে নানা বাহানা করে গ্রামে আসে রোকেয়ার সংস্পর্শ পাওয়ার আশায়। রোকেয়ার ভয় আর সংশয় দূর করে এখন সে রোকেয়ার জন্যই গ্রামে পড়ে আছে। তবে খুব বেশিদিন নয়, কিছুদিন পরেই আবার পাড়ি জমাবে শহরে। তারপর আবার কোনো একদিন কোনো এক ছুঁতোয় গ্রামে আসবে রোকেয়ার জন্যই।

সামনে বর্ষাকাল। পিঁপড়াগুলো তাদের দলবল নিয়ে ডিম সাথে করে লাইন ধরে ছুটছে নির্দিষ্ট আশ্রয়ে। খড়কুটোর গোয়াল ঘরের সাথে সাথে ঘরের গোলপাতার ছাওনিটাও ঠিক করার চিন্তা এবার মালেকা বেগমের। এবার ঠিক না করালে বৃষ্টিতে ভেসে যাবে ঘরবাড়ি।

ভরন্ত সাদা গাভীটা চেয়ারম্যানের ধানখেতে মুখ দিয়েছে বলে বেঁধে রেখেছে। চেয়ারম্যানের লোকজন এসে খবর জানানোর পাশাপাশি শাসিয়ে গেছে বাড়িতে থাকা রাবেয়া আর রোকেয়াকে। চেয়ারম্যানের সামনে গাভীর জন্য এবার মাথা নিচু করতে হবে ভেবেই মালেকা বেগমের মুখ শুকিয়ে গেলো।
রোকেয়া মালেকা বেগমের পাশ ঘেঁষে বসে পড়লো। বললো, ‘দাদি তোমার যাওন লাগবো না। আমিই গরু আনতে যামু।’
মালেকা বেগম বাঁধা দিয়ে বললো, ‘তোর মাথা আমি নিচু অইতে দিমু না। ওই শয়তানের লগে যা কওনের আমি কমু।’
বলেই হন হন করে পা বাড়ায় মালেকা বেগম। বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় উঠতেই দেখে রুবিনা গরু নিয়ে হাজির।

মালেকা বেগমের মুখে শান্তির হাসি ফুটে। জিজ্ঞেস করে, ‘ওই রুবিনা গরু পাইলি কই?’
রুবিনা কড়া গলায় জবাব দেয়, ‘চেয়ারম্যান বাড়ি দিয়া লইয়া আইছি।’
‘ক্যামনে?’
‘মকবুল চাচা কইলো চেয়ারম্যান ধলুরে বাইন্ধা রাখছে। আমি আর তমাল দিলাম ছুট। গিয়া দেহি চেয়ারম্যানের গোয়াল ঘরে গরুর লগে ধলুরেও বাইন্ধা রাখছে। আশেপাশে কেউ ছিলো না, তমাল পাহারা দিছে আর আমি ধলুরে লইয়া দিলাম দৌড়। কে পায় আর আমাগো।’
কথা শেষ করেই খিলখিল করে হেসে উঠলো রুবিনা। সঙ্গে হেসে উঠলো মালেকা বেগম।

বর্ষা শুরু হয়ে গেলো। মালেকা বেগমের বাড়ির উঠোনে জমে থাকা বর্ষার পানি থৈ থৈ করছে। হাঁসের বাচ্চাগুলো সে পানিতে সাঁতার কেটে বেশ আরাম পাচ্ছে। সোহান শহরে গেছে বেশ কয়েকমাস হয়ে গেছে। এলাকায় সোহান আর রোকেয়াকে নিয়ে ইতিমধ্যে বেশ গুঞ্জন রটেছে। মালেকা বেগম এবার বারবার ভয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন রোকেয়ার জীবনেও রাবেয়ার ঘটনা পুনরাবৃত্তি হবে বলে।
রাবেয়া রোকেয়ার মাথায় হাত রাখে। নরম স্বরে দুঃখ মিশিয়ে বলে, ‘বইন আর যা করিস, আমার মতো করিস না। আমারে দেখছো তো।’
কথাটা বলেই কেঁদে ফেলে রাবেয়া। দুলালকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে।

দিন কাটে কিন্তু সোহানের খবর মেলে না। মালেকা বেগম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাবেয়ার মতো ঝামেলা ডেকে না এনে তিনি মকবুলের দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের ছেলের সাথেই এবার বিয়েটা দিবে রোকেয়ার।

ছেলে খুবই ভালো। দেখতে মাশা-আল্লাহ। নায়ক সালমান শাহ্। নাম হায়দার। বয়স একটু বেশি, এইট পাশ। গঞ্জে চারটা দোকানসহ একটা চালের আরত আছে নিজের। মাছ ধরা নৌকা আছে খান তিনেক, মাছ ধরার জালও আছে তাঁর। একটা মটরগাড়ি আছে নিজেই চালায়। বিঁড়ির নেশা নাই, পান খায় দিনে তিন চারটে। বাড়ি দালানের, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। জায়গা জমিও আছে অনেক, বাব দাদার সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারি সে’ই। একবার বিয়া করছিলো, বউ বিয়ার রাইতেই তার প্রেমিকের লগে ভাইগা গেছে। তবে হায়দার মানুষ হিসেবে খুবই ভালো। এলাকার লোকজন তারে খুব ভালো জানে। কেউ তারে খারাপ কইতে পারবে না।
ছেলে সম্পর্কে এমনই বর্ণনা মকবুলের।

মালেকা বেগম যখন ছেলের বর্ণনা দিচ্ছে রুবিনা খিলখিল করে হসে ওঠে বলে, ‘দাদি সম্বন্ধডা আমার ম্যালা পছন্দ হইছে। বিয়া ফাইনাল কইরা দাও।’
রুবিনার কথায় খুশি হয়ে হেসে ওঠে মালেকা বেগম।
রুবিনা বলে ওঠে, ‘তয় রোকেয়া বুবুর লইগা না। রাবেয়া বুবুর লইগা।’
সাথে সাথে মুখ চুপসে যায় মালেকা বেগমের। আড় চোখে তাকিয়ে উঠে পড়েন তিনি।

বাহিরে অমাবস্যা। রোকেয়া চুপচাপ বসে আছে পেছনের বারান্দায় হোগল পাতার পাটি বিছিয়ে। অন্ধকারের দিকেই তার চোখ। রুবিনা গিয়ে আস্তে রোকেয়ার পাশে বসে।
‘বুবু তোর মন খারাপ?’
রুবিনার দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়, ‘নাহ্। ক্যান কিছু কইবি?’
‘তোর জন্য দুইডা খবর আছে।’
অন্ধকারের দিকে আবার ঘুরে তাকায় রোকেয়া। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘বল’
‘একটা ভালো খবর, আর একটা খারাপ খবর। কোনডা আগে শুনবি বল?’
‘তোর যেডা শোনাইতে মন চায়।’
‘তাইলে আগে ভালো খবরডাই কমু।’
রোকেয়া চুপ থাকে প্রতিত্তোরে কিছু বলে না।
রুবিনা নিজ দায়িত্বে বলে, ‘সোহান ভাইজান তার বাবা মায়রে নিয়া সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান বাড়িতে আইছে।’
চমকে ওঠে রোকেয়া। মুখ ঘুরিয়ে খানিকটা নড়ে চড়ে ওঠে। খুশি হয়ে উঠবে পরক্ষণেই মনে পড়ে রুবিনার বাকি খবরটা খারাপ। মুখ চুপসে বলে, ‘তা দিয়া আমি কি করমু!’
রুবিনা হাসি চেপে রেখেই বলে ওঠে, ‘বুবু তুই কি জানিস গ্রামের প্রায় সব মেয়েরা সোহান ভাইজানরে কি নামে ডাকে?’
খানিক থেমে রুবিনা নিজেই উত্তর দেয়, ‘ স্বপ্নের নায়ক কয়। আমার কইলাম সোহান ভাইজানরে ম্যালা পছন্দ। আমারে দেখলেই আদর করে ছুটকি বলে ডাক দেয়। মকবুল চাচার দোকান দিয়া চকলেট কিইনা দেয়, তমালডা লগে থাকলে ওরেও দেয়।’
রোকেয়ার চোখে টলমল করে ওঠে পানি। জিজ্ঞেস করে, ‘খারাপ খবরডা কইস না ক্যান?’
রুবিনা ফিক করে হেসে ওঠে বলে, ‘তুই আর বেশিদিন নাই এ গ্রামে। আমাগো ছাইড়া তুই শহরে চইলা যাবি কয়দিন বাদেই সোহান ভাইজানের লগে।’

রোকেয়ার চোখ দু’টো ছলছল করে ওঠে। বিশ্বাস হতে চায় না এসব তাঁর। রুবিনা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য চালাকি করে এসব বলছে, এটাই ভাবছে সে। তবুও সংশয় কাটাতে প্রশ্ন ছুড়ে, ‘তুই জানলি ক্যামনে?’
রুবিনা স্পষ্ট স্বরে জবাব দেয়, ‘কিছুক্ষণ আগে তমাল আইছিলো। আমারে ডাইকা কইয়া গেলো। তমালের মায় তো চেয়ারম্যান বাড়িতে কাম করে। তমাল ওর মায়রে ডাকতে গিয়া…..’
বাকি কথা আর শুনতে চায় না রোকেয়া। দৌড়ে যায় মালেকা বেগমের কাছে।
রাবেয়া জানায়, ‘দাদি চেয়ারম্যান বাড়িতে গেছে। চেয়ারম্যানের দুই লোক ডাকতে আইছিলো। চেয়ারম্যানের বড় ভাই আর ভাবি আইছে শহর থেইকা। তেঁনারা ডাকছেন কতা কওনের লইগা। লোকগুলোর ভাবসাব দেখে মনে অইলো ভালো খবর। খুব আপ্যায়ন কইরা সম্মান দিয়া ডাইকা নিলো যে। চেয়ারম্যান যে মানুষ, খারাপ খবর অইলে এলাকা চেচায়ে শাসায়ে নিয়ে যাইতে কইতো।’

রাবেয়ার চোখে ছলছল করছে পানি। এ পানি কষ্টের নয় খুশির। রুবিনা সারাবাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে খুশিতে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে মালেকা বেগম বাড়ি ফিরলেন। তাঁর মুখটা মলিন। চুপচাপ বসে রইলেন সামনের বারান্দায়।
ভয় আর সংশয় নিয়ে এগিয়ে যায় তিন বোন।
জিজ্ঞেস করে, ‘কি অইছে দাদি?’
মালেকা বেগম কান্না করে দেয়। তাঁর কান্না দেখে আঁতকে ওঠে রোকেয়ার ভেতরটা।

চোখের পানি মুছে বলে মালেকা বেগম, ‘তোরা আমারে ছাইড়া সবাই চইলা গেলে আমি ক্যামনে থাকমু এ বাড়িতে। তোগো ছাড়া থাকতে যে আমার ম্যালা কষ্ট অইবে।’

তাঁর কথা বুঝে উঠতে পারেনা কেউ।
মালেকা বেগম নিজেই বিস্তার করে বলে, ‘চেয়্যারমান বাড়ি থেইকা ফেরার পথে মকবুলের বাড়িতে গেলাম রোকেয়ার সম্বন্ধডা ভাঙ্গতে। গিয়া দেহি হায়দার পোলাডা ওই বাড়িতেই। পরে কইলাম সোহান আর রোকেয়ার বিয়া পাকা হওয়ার খবরডা। মকবুলই তহন প্রস্তাব দিলো রাবেয়ার লগে হায়দারের বিয়ার কতা। হায়দার নাকি রাবেয়ারে আইজ চাতালের সামনে দিয়া বাইর অওনের সময় দেখছে। তাঁর পছন্দ অইছে। সে দুলালরেসহ রাবেয়ারে তাঁর ঘরে নিতে চায়। আমি আর তহন দুই চোহের পানি আটকায়ে রাখতে পারলাম না খুশিতে। তয় বাড়ি ফেরার পথে তোগো লইগা খুব মায়া অইলো। তোরা পরের বাড়ি চইলা গেলে আমার খুব কষ্ট অইবে, তোগোরে মনে পড়বে।’
বলতে বলতে আবার কেঁদে ফেললেন তিনি। তার সহজ সরল হৃদয়টা ফুটে উঠলো তাঁর কথায়।

রোকেয়া এসে জড়িয়ে ধরে মালেকা বেগমকে। রুবিনা এসেও জাপটে ধরে তাঁকে। দুলালকে বুকে জড়িয়ে রাবেয়া এসে কান্না জড়ানো কন্ঠে বললো, ‘দাদি তুমি অইলা আমাগো বটগাছ। তোমারে ছাড়া আমরা ক্যামনে ভালো থাকুম৷ আমি যেথায়ই যাই তোমারে লগে লইয়া যামু৷’

সারাবাড়ি জুড়ে আনন্দ বইছে এ’কয়দিন। রুবিনার খুশি বেড়ে দ্বিগুণ হলো যখন রোকেয়া বললো, ‘তোর সোহান ভাইজান কইছে তোরেও শহরে লইয়া যাইবে। তুই এহন থেইকা শহরের স্কুলেই পড়বি।’

স্টিলের ছোট্ট বাটিতে সরিষার তেল আর পানি মিশিয়ে শাহাদত আঙুল দিয়ে ঘুঁটতে ঘুঁটতে কুসুম রঙ করে ফেলেছে রুবিনা। বাটি থেকে তেল তুলে মালেকা বেগমের মাথায় দিতে দিতে রুবিনা বললো, ‘কইছিলাম না তহন তেলে জলে মিশ খায়।’