ঘোষ ও তেল সেই আদি কাল থেকে তাদের বন্ধুত্ব। ঠিক কবে তাদের জন্ম তা কোথাও লেখা নেই। মা বাবা জন্ম সাল কোথাও লিখে রাখেনি। তাদের কুষ্টি আগে মুখস্ত থাকলেও এখন আর মনে নেই। মনে রাখার দরকারও পড়েনি। কেননা পৃথিবী তাদের নিয়ে এতো ব্যস্ত। আর তাদের কদর এতো বেশী, আনন্দে সময় কাঁটতে কাঁটতে তারা তাদের অতীত হারিয়ে ফেলেছে। প্রতি দিনের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের কদর বেড়ে যায়। আদর আপ্পায়ন বাড়তে থাকে। তাজিম তওয়াজ নজরানা রাখার জায়গাও যে আর ঘরে নেই। তবে দিন দিন এতো দামী আর সুন্দর উপহার, বখশিষ তাদেরকে দেওয়া হয়, না করার মন চায় না, যে আর নেব না।

সে কালে এতো লিখা পড়াতো ছিল না। লিখবে কি করে। আবার কোন কাগজ কলমও ছিলনা, কি দিয়ে লিখবে? এইতো কয়েক শতক, হাজার বছর হলো পৃথিবী কাগজ দেখেছে। হয়তো বা কোন পশুর চামড়ায় আচর দিয়ে মা বাবা যত্ন করে জন্ম তারিখ লিখে রেখেছিল তা হাারিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। দিন মাস বছর শতক হাজার পেরিয়ে তারা আজও বেঁচে আছে। বরং তিন দিন যেন তারা যৌবন লাভ করছে। সব খানে তাদের আহার্যের আর কদরের কোন কমতি নেই। শরীরের চামড়ায় কোন ভাজ পরেনি। পরবেই বা কেন প্রতিনিয়তই তারা স্বাস্থ্যকর খাবার, স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করে। আর সব সময় অভিজ্ঞ ডাক্তার তাদের আশে পাশেই থাকে। শরীরের চামড়া টানটান মেদ ভুড়িতে চর্বি জমেনি। শরীরে কখনো সর্দি কাশি হয়েছে বলেও মনে নেই। বাজার করা হয় খুব চিন্তা ভাবনা করে। রাঁধুনী রান্না কবে খুব যত্ন সহকারে। করবেই না কেন সঠিক ভাবে কাজ না করে গাফলতি করলে চাকুরী যে হারাতে হবে। শুধু চাকরী নয় আজীবন জেলে পঁচতে হবে। ঘোষ এবং তেল এ রাজ্যের রাজা নয়। কিন্তু কোন রাজা মহারাজা, ওজির নাজির তাদের এই দুই বন্ধু ছাড়া চলতে পারে না। সেই রাজ দরবার থেকে শুরু করে গ্রামের দিন মজুর সবখানে তাদের কদর ই আলাদা। তবে কোথাও কোথাও একটু বেয়ারা টাইপের কিছু অথর্ব আছে ওদের ঘাড়ের রগ একটু বাঁকা থাকে ওরা আবার এই দুই বন্ধুকে খুব একটা পাত্তা দিতে চায় না। পাত্তা দিবি না ঘাড় মটকে দেব। এই জীবনে কত জনার ঘাড় মটকে সটকে দিয়েছে তার কোন কী হিসাব আছে। যারা রাজা বাদশাহ ওজির নাজিরকে চালায় তাদের সাথে বেয়াদবী, বরদাস্ত কি করা যায়? এতো ইজ্জতের প্রশ্ন। কী এক পুঁচকে বেয়ারা ছেলে মেয়ে ওরা সম্মান দিবে না। ওদের চৌদ্দ গুষ্টি দিবে। দিয়েই শেষ নয় সটান করজোড়ে দাঁড়িযে থাকবে, যতক্ষণ না হাত নামাতে বলা হয়, মাফ করা না হয়। আবার নাকে খত দিতে হবে, শুধু তোরা খত দিলেই হবে না তোদের পর তোদের যত আলি আওলাদ আসবে তাদের পক্ষ থেকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, আমরা দুই বন্ধু ঘোষ ও তেলের সাথে কস্মিন কালেও কেউ বেয়াদবী করতে পারবে না।

দুই বন্ধুর খুব ভাল ভাবেই দিন চলছে। হেসে খেলেই দিন গুজরান করছে। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে তাদের সৈন্য সামন্ত, পাইক পেয়াদা, চাকর নকর কোন কিছুর অভার নেই। একটি আঙ্গুলের ইশারাতে পৃথিবীর তাবৎ রাজা বাদশাহরা তাদের কদমে লুটিয়ে চুম্বন করে। আর প্রজা সাধারণ তাদের কোন অফিস আদালত, কোট কাচারী এই দুই জনকে ছাড়া হাটারও সাহস কেউ দেখাতে পারে না। সবাই তাকে প্রথম সঙ্গী হিসাবে সাথে সাথেই রাখতে হয়। না হলে যে সমূহ বিপদ।

একদিন দুই বন্ধু এক জায়গায় বসে আড্ডা দিচ্ছে। দুই বন্ধু একে অপরে বলছে দোস্ত, আমাদের আদর আপ্যায়নের তো কোন অভাব নেই। যেখানে যাই সব খানেই আমাদের খুব তাজিম করে। চল আজ আর কোন কাজ নেই, দু জনে একটু চিন্তা করি। জন্ম থেকেই তোমার আমার মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। আমাদের বন্ধুত্বে কেউ চিড় ধরাতে পারে নি। যারা আমাদের সাথে সম্পর্ক করে তারা এক সময় হারিয়ে যায়, যারা বেযারা তারাও হারিয়ে যায়। এভাবে কত হাজার কোটি হারিয়ে গেছে হিসাব নেই। হারিয়ে যাবে আবার নতুন আসবে আমাদের কদর দিন দিন বাড়তেই থাকবে। এসো আজ দুজনে মিলে গল্প করি। এই খেলায় তোমার আমার মধ্যে কার অবদান বেশী। মানুষ কাকে বেশী ব্যবহার করে। কার কদর মানুষের কাছে সব সময় বেশী।

তেল, ঘোষের চেয়ে কয়েক দিনের বড়। এই সামান্য বড় হওয়াতে তাদের মধ্যে কোন সমস্যা হয় না। তেল ঘোষকে বলে তুমি যখন একটু বয়সে ছোট্ স্বাভাবিক ভাবেই তোমাকে একটু সুযোগ দিতে হয়। তুমিতো আমার আদর পাওয়ার বেশী হকদার। আমি তোমাকে আদর করলেইতো কেবল তোমার শ্রদ্ধা পাওয়ার আশা করতে পারি। তোমাকে আদর না দিয়ে তোমার কাছে কি মান্যতার আশা করা যায়। তবে আমি তুমি এই বিষয়টি মানলেও তুমি আমি দুজন মিলে মানব সমাজের কাছ থেকে অভ্যাসটি মোটামুটি ছাড়াতে পেরেছি। আমরা ওদের কাছে এই আাশা এবং কাজ করলে অন্তত দুই বন্ধুর মধ্যেতো অনিয়ম করা যাবে না। কী বল তুমি। আর বিষয়টি যখন দুজনের কাজের যোগ্যতা আর দক্ষতার বিষয়?

ঠিক আছে দোস্ত। তুমি যখন আমার বন্ধু ও শ্রদ্ধার পাত্র তোমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। দোস্ত তুমি কিছু মনে করো না, আসলে আমাকে কোথাও ব্যবহার করলে কাজ হয় না, এমনটা নেই। কাজ করতে চায় না, বুকে টেনে নিতে চায় না, এমন জায়গায় আমাকে একটু একটু বাড়াতে থাকলে অনায়াসেই কোলে তুলে নেয়, যেন এমন আদর আর সোহাগের লোক তার কোন দিনই ছিল না। আমাকে অফিসের কেরানী থেকে বস সবায় আশা করে। আমার নামের কচকচে নোট দেখার পর লালা ঝরে না এমন লোক কমই আছে। আবার কোথাও কোথাও আমি বখসিস নামে হাজির হই, কোথাও চা পানের খরচ নামে, কোথাও উপটৌকন, উপহার নামে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে। জান্ইোতো কারো কি এক কাপড় পরিধান করতে, এক ধরনের খানা খেতে দীর্ঘ দিন ভাল লাগে। মাঝে মাঝে রুচির পরিবর্তন করতে হয় এই আর কি। আমাকে কেউ চেয়ে নেয়, আবার কাউকে সমিহ করে দিতে হয় । বাড়ির গিন্নিও চেয়ে থাকে তার স্বামী আমাকে যতœ করে নেয় কি না। যে দিন আমি খুব বেশী করে তার ঘরে যাই। স্বামীর হাতে বাজারের বড় ব্যাগ থাকে ওহ ভুল হয়ে গেছে এখনতো আবার হাতে করে ব্যাগ নিয়ে যায় না, গাড়ি করে বাজার নিযে যায়। দোস্ত অনেক দিনতো ব্যাগ বহন করার রেওযাজ ছিল তাই ব্যাগের কথা চলে আসে থুক্কু, আর এমন হবে না। সে দিন স্বামীর যে আদর সোহাগ। এমন লক্ষী স্বামী আর কার আছে। আর ছেলে হলে অমুকের ছেলেতো বাপের বেটা। আমাকে পেয়েও খুশি, দিয়েও খুশি। দিয়ে কষ্ট পেলেও খুশি থাকে কারন আমার দ্বারা তার মনের আশা পূরণ হচ্ছে। তার অসাধ্য কাজটি সাধন হচ্ছে। আবার দেখ মেয়ে বিয়ে দিতে গেলেও আমার খুঁজ নেয়, জামাইর উফরি বা বাড়তি ইনকাম আছে কি না। আজকাল আমার কদর এত বেশী, বাাবও ঘোষখুর ছেলেকে বেশী ভালবাসে। যে ছেলে সৎভাবে রোজগার করে বাবাকে খুব বেশী টাকা দিতে পারে না, তাকে বাবা খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। তাছাড়া দেখ দোস্ত চাকুরী জীবনে যে আমার বেশী কদর করে সব সময় আমাকে কাছে কাছে রাখে, অনেক টাকার মালিক হয়। সে দান করে দানবীর সাজতে পারে। হজ্জকরে হাজী সাহেব হতে পারে। স্কুল কলেজ মাদ্রাসা করে সমাজে নামী দামী মানুষ বনে যায়। তার কদর দেখলে অন্যের ঈর্সা হয়। আমার কদর না করলে অনেকের বউয়ের বকুনি খেতে হয়। বল দোস্ত আমার কদর কত। আর কত বলব। আপাতত এখানেই থাক।

এবার তেলের পালা। তেল বলে দোস্ত তুমিতো অনেক বললে, আমারও কিন্তু কেরামতি কম নয়। আমার বয়স যখন একটু বেশী তোমার চেয়ে এই পৃথিবীর আলো বাতাস একটু বেশীই পেয়েছি। আমার কাজ সংখ্যাায় হয়তোবা কম হতে পারে। কিন্তু তুমি যেখানে ব্যর্থ, আমি সেখানে সফল। তোমার দ্বারা কোন একজন উপকার পায় বা একক ভাবে কেউ ক্ষতির সম্মুখিন হয়। দোস্ত আমার কাজ এতো বিস্তৃত আমি পুরো জাতির ঘাড়ে আছর করি। আমার দ্বারা পুরো জাতি নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় খুব সৎ ব্যক্তিট্ওা আমার পাল্লায় পড়ে খেই হারিয়ে ফেলে। সে বুঝতেই পারে না, কিভাবে তার দ্বারা অন্যায় কাজ হচ্ছে। তার দ্বারা কেউ স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে। এই দেখ, তোমাকে নেওয়ার সময় একটু হলেও লজ্জা পায়, দেখনা রমজান মাসে যখন তোমাকে নেওয়া হয়, ঘোষখুর বেটা তার ড্রয়ার বের করে দিয়ে বলে, ড্রয়ারে রেখে দেন, রোজাতো, ইফতারের পরে ধরব। তার পরও তোমাকে নেওয়া বা দেওয়ার সময় একটু এদিক ওদিক তাকায়, কেউ দেখে ফেলে কি না। কিন্তু দেখ আমার মধ্যে এমন মজা তেল দাতা ও গ্রহিতা কেউ আমাকে অন্যায় মনে করে না। আমি সব জায়গায় সমান তালে ব্যবহৃত হই। আমাকে নিয়ে কারো দুশ্চিন্তার কারণ থাকে না। রোজা বেরোজা, গোপনে প্রকাশ্যে সবখানে আমার কদর আছে। আমি পৌছতে পৌছতে এমন জায়গায় পৌছেছি, কোন কোন তেলদাতা তাদের কাজ জায়েজ করার জন্য এমন কথাও বলে ফেলে আল্লাহ তায়ালা না কি তেল দেওয়া শিখিয়েছেন। সুরা ফাতেহা না কি তেল দেওয়া বুঝায়। নাউজুবিল্লাহ। দেখতো আমরা তেল ও ঘোষ হলেও আমরা আল্লাহর শানে এমন বেয়াদবী মূলক কথা বলতে পারি না। আর মানুষ শ্রেষ্ঠ জাতি, ওরা কিভাবে আল্লাহর শানে এমন কথা বলতে পারে। কোথায় আমরা তেল ঘোষ আর কোথায় আল্লাহর শান। দোস্ত বুঝ, আমি বনি আদমকে কোথায় নিয়ে ছেড়েছি! তবে দোস্ত যারা সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর প্রিয় আমি সেখানে হেরে যাই, তাদেরকে শ্রদ্ধা করি। তারা যেমন তোমাকে নেওয়া হারাম মনে করে তেমনি আমাকেও হারাম মনে করে। তাদের বেলায় তুমি ব্যর্থ আমিও ব্যর্থ । একটা বিষয় মনে রাখতে হয়, সব জায়গায় তেল দেওয়া যায় না। আবার কোন কোন জায়গায় মাত্রা অনুযায়ী তেল সেবন করতে হয়। তাই তেলবাজ লোকেরা ঘোষদাতা থেকে একটু চালাক হতে হয়। বুঝনা বয়সের একটা বিষয় আছে না। আমার বয়সতো তোমার থেকে একটু বেশী। তোমার থেকে একটু হিসাব বেশীই করতে হবে। ছোটরা ভুল করলে কেউ কিছু বলেনা, বড়রা ভুল করলে, সবাই বলে ও কিভাবে এই কাজটি করতে পারল। মান সম্মানতো একটু কষ্ট করেই ধরে রাখতে হয়। দোস্ত আজ এই পর্যন্তই থাক। আরো একদিন দুজন মিলে গল্প করা যাবে।