একটানা দমকা বাতাসে কার্তিকের ঝলমলে দিনগুলো থকথকে কাদার নিচে তলিযে গেল। একদিন-দু’দিন নয়, মূষলধারা বৃষ্টির অত্যাচারে পনের দিন ধরে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। পথ-ঘাটে যদি বরফশীতল পানি আর দমকা বাতাসের মহড়া চলে তাহলে ধৈর্যে আর টানায় কত। এই খাড়াপাড়ার লোকজন বেক্কল আকাশকে যত গালি দিয়েছে তা মনে হয় গমচোর চেয়ারম্যানকেও কেউ দেয় না।
পেটে ক্ষুধা নিয়ে দিন আর কাটে না বাদশার। এ পাড়ার মানুষের যা খাউখাউ তাতে এক কেজি চাল আর একমুঠো লবণ সংগ্রহ করা সহজ কাজ নয়। একটা-দু’টো নয়, পাঁচ-পাঁচটা ছেলেমেয়ে তার। এ ক’দিনের উপোস-কাপাসে এক-একটা এমন নটনটে হয়েছে যে গায়ে বাতাস লাগলে মাটিতে পড়ে যায়। বড় মেয়ে আরজিনা পেটের ভোখ সহ্য করতে না পেরে মাথায় পলিথিন বেঁধে এক কোঁচা কলমিশাক আর একটা কচি কলার নোকা কেটে এনেছে। সেই কলার নোকা চিকন করে কেটে চোংগার সর্বশেষ লবণ দিয়ে শাকের সাথে সেদ্ধ করেছে। এই খাবারে যে কত মিষ্টি! কোলছাড়া আড়ুয়া ছেলেটা একমুঠো ভাত না হলে তা খাবে না। ভাত কী আকাশের বিষ্টি, না উত্তরের বানের পানি যে হা করতেই মেলে। বাদশার ইচ্ছে হল ওই বান্দরটার পাছায় দেয় একটা মনের মতো শট। এত যদি ভোখের খার তো এত এত আটখুড়ার ঘর থাকতে বাদশার বীর্যে জন্ম নিতে এসেছিস কেন? এখানে ঘি দিয়ে গোশত রান্না করে পাখার বাতাস করছি। বাদশার মেজাজের কাঁটা এতটা লাফিয়ে উঠল যে, সে ওই হাড্ডিসার রুগ্ন বাচ্চাটাকে বৃষ্টিভেজা উঠোনে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হল। আজ সে সব জঞ্জালের গোষ্ঠীপাত করে যেদিকে খুশি চলে যাবে। মুহূর্তে ঘরের মধ্যে কান্নাকাটি আর হৈ চৈ পড়ে গেল। স্ত্রী মোহনা বাদশার হাত থেকে ঝটকা মেরে ক্ষীণকায় বাচ্চাটাকে কেড়ে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
‘উয়ার সাতে অমন নাগাইচেন ক্যানে। ভাত দ্যাওয়ার খ্যাম নাই তার জন্ম দ্যাওয়ার হাউস। অদন করি চটকা দিলে অসুকভোগা ছওয়াটা বাইচপে?’
‘অত জেদ কীসের? যাক জুটপে তাকে খাইবে। দেখঙ পাক মারি ঝড়–য়া পানিত ফ্যালে দেঙ। তকোন জেদকোনা কোনটে থাকে।’
‘এইগ্লা করি মাইনষক কয় কাল্লাকাটা শিমর। দুদ না পাওয়া ছওয়াটাক তোমরা কোন পছন্দে বাইরা খুলিত চটকা মারেন। গোচে মাচে খোয়া ছওয়াক কী তাজাতুম্বা কইচ্চে দ্যাকেন না।’

বাচ্চা নিয়ে স্ত্রীর সাথে তুমুল কাজিয়া হয় বাদশার। সন্তানের জন্ম সে কী কোন বিশেষ আয়োজন করে দিয়েছে। অন্যরা স্বামী-স্ত্রীতে যেভাবে সংসার করে, সে তার চেয়ে বেশি কী এমন করেছে। এর মধ্যে নদির চরের কাঁকড়ার বাচ্চার মতো এত মুখ সংসারে যে কী করে এল তা সে ভেবেই পায় না। বড়ো মেয়েটাকে তো বলতে গেলে পরের বাড়ি পাঠাতেই হয়। তার পরের মেয়ে দুটোও তো দোআঁশ মাটির কেল্লা ঘাসের মতো লকলকিয়ে বাড়ছে। শেষের দিকের ছেলে দুটো তো এক্কেবারে পিঠাপিঠি। এদের নিয়ে কী করবে বাদশা। এই বাদলার দিনে কার কাছে সে হাত পাতবে? কে এমন দরদীজন আছে এই নিদানে তাকে সাহায্য করবে?

উনুনের কাছে বসে মাথা নিচু করে বাদশা ব্যথিত মনে শাকসেদ্ধ খায়। উপোস করা পেটে যেন নরকের আগুন জ¦লতে লাগলো। পচা লাউয়ের শুকনো খোলটার মতো ভারহীন মাথাটায় কোন বুদ্ধি খেলছে না তার। এভাবে গৃহবন্দি হয়ে থাকলে তাকে গুষ্ঠিশুদ্ধ মরতে হবে। এই সাতাও মাথায় নিয়ে কোথায় যাবে সে। তার পড়শিরা তো ভিটেবাড়ি লুফে নেয়ার ধান্দায় আছে। তাদের কাছে কর্জ পাওয়া যাবে শুধু একটা শর্তে। তা হল আদনা দামে বাড়ি চালাটা লিখে দেয়া। তার শেষসম্বল পৈতৃক এ ভিটে হাতছাড়া করে সে দাঁড়াবে কোথায়? এরকম কঠিন চিন্তার সাথে একটা অনুশোচনার চিকোন কাঁটা খট করে বিঁধে তার হতাশাকাতর মনটা খচখচ করতে লাগল। সকালে জেগে না বুঝে না সুজে এটা কেমন কাজ করল সে। কেন নিষ্পাপ বাচ্চাটার সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করল? ঘন ঘন অসুখ ভূগে বাচ্চাটা কেমন মলিন আর হালকা হয়ে গেছে। বুক জাবরে মায়ের দুধ না খেতেই তাকে কোল ছাড়তে হয়েছে। এমন বছরবিয়ানি বউ কারও ঘরে আছে কিনা বাদশার জানা নেই। তাদের গ্রামের উত্তর পাড়ার আমির মাস্টারের একটা হেঞ্জলি বউ আছে। বিয়ে হওয়ার পনের বছরে একটা বাচ্চাও প্রসব করেনি সে। বাদশার দুধ না পাওয়া রোগা আড়–য়া বাচ্চাটাকে মাস্টার পোষাণি নিতে চেয়েছিল। মোহনা দিতে রাজি হয়নি। তার কথা কোলের বাচ্চা কোলে মারবে তবু পরের হাতে তুলে দেবে না।

কাজের কথা চিন্তা করল বাদশা। এই আকাশে কী কাজ হবে? সর্দিজ¦র আর আধকপালের বিষে সে এমন জোবরা লেগে আছে, এক ঘন্টাও পানিতে থাকতে পারবে না। দেখা যাক কর্জ-টর্জ মেলে কিনা। একটা ঢোল মানার পাতা মাথায় দিয়ে সে ছিরাব্দির ডারি ঘরের দিকে ছুটল। বিরাট একখানা দোচালা ডারি ঘর। বাদলা দিনে গ্রামের সবাই এখানে কমবেশি আড্ডা মারে। তার দলের একরাও মাটিতে দাগ টেনে এখানে পাইত পাইত খেলছে। একরা আর আমনুল পাইতের চাল দিতে ব্যস্ত। বাদশা ভেজা শরিরে তাদের পাশে গুটিসুটি মেরে বসল। একরা তার হাতের বিড়িটা টান দেয়ার জন্য বাদশার দিকে এগিয়ে দিল। টান দেয়ার মতো বিড়িতে কিছু বাকি নেই। তবু বিড়িটা দুই আঙুলের ফাঁকে নিয়ে সর্বশেষ ধোঁয়াটুকুতে নেশার হাউলাশ মেটানোর চেষ্টা করল বাদশা। কিছুক্ষণ বসে থেকে খেলায় তাল দিয়ে মিনমিনে গলায় বাদশা বলল,‘একরা একনা কতা শুনলু হয়। বাড়িত মোর খুব একনা তাকদা আছলো।’
বাদশায় কথায় একরা বিরক্ত হয়। মেজাজ চড়িয়ে বলে,‘কীসের একান ম্যালম্যালি ধরি আসলুরে। মোর অটে গুটি মাইর যায় আর উয়ার অইদকা ভ্যানোর ভ্যানোর। কতো দেখঙ কি তাকদা খ্যান বাজিল তোর।’
বাদশা একরার এ ধরণের রূঢ় আচরণে দমে যায়। তবু বলে, ‘বাড়িত খুব ঠ্যাকা। আসনু বইলে তোরটাই যদি পাইসা থাকে। ভাইটা নাগে মোর আগোত ভারিস না। এই ভর সাতাত ছওয়াগুলা বাসি মুকে আছে।’
একরা আমনুরের একটা ফিরতি চাল দিয়ে পাইত থেকে মাথা না তুলেই বলে,‘পাইসা কি ডুমরের গোটা যে হাত বাড়ে ছিঁড়লে হয়। কোন শরমে তুই এইগল্যা কতা মুকত আনিসরে। হ্যারে, হাফলা মো-রের পাতইলি গড়ের মাটিকাটা পাইসা তলপাটল করিস নাই। সে হিসাব না করি, আইজ আসছিস হাওলাত বিলি। ছ্যাদ্দোর চ্যাংড়া কোন ঠাকার।’
বাদশা ওখানে একটুও দেরি করে না। ওখানে যারা বসে আছে তাদের বিষাক্ত নজর থেকে সস যত দূরে থাকতে পারে তত ভালো। তার দু’খানা দূর্বল হাতের শক্তি দিয়ে সবাইকে সে বিপদে আপদে সাহায্য করে। তার বিপদের সময় কাউকে সে আপন করে পায় না।

বল্লাই যাবার সিদ্ধান্ত নেয় বাদশা। সে শুনেছে, ওখানকার পাকড়া হাজি ধানের মুলি দেয়। এখন এক মণ ধান নিলে মৌসুমে দেড় মণ দিতে হবে। যদিও তার এক ছিটে আবাদ নেই, তবুও ধানকাটা লাগলে দেনা শোধ করতে পারবে সে। বাদশার বাবা দরকারে-বেদরকারে হাজি সাবের নিকট অনেক জমি পানির দরে বিক্রি করেছে। তখন তাদের মধ্যে বিস্তর যাতায়ত ছিল। বাদশার বিশ^াস, হাজি তাকে খালি হাতে ফেরাবে না। টাকা খরচ করে আল্লার পাক জাগা দেখে এসেছে। সমাজের কাজে মাথা দেয়, জুম্মা জমাতে অর্থ খরচ করার সামর্থ আছে। ওর বাচ্চাকাচ্চার কষ্টের কথা শুনলে মুলির বদলে দু’এক মণ দানও করতে পারে। আল্লা ওনাকে অনেক সম্মান আর সম্পদ দিয়েছে। গরিব-দুঃখিদের দিকে উনি চোখ তুলে না তাকালে তাকাবে কে? দোনোমনো করে বৃষ্টিভেজা ময়দার পোটলার মতো জড়োসড় দেহে সে হাজি সাবের বসার ঘরে ঢুকল। গদি চেয়ারে বসে চান্দু মেম্বারের সাথে উনি আলাপ করছেন। কী যেন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ চলছে দু’জনের মধ্যে। অনেকটা দূরে বসে ঠা-ায় গুটগুট করে কাঁপতে কাঁপতে তাদের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে বাদশা।

অনেক সময় কেটে গেলেও তাদের আলাপ শেষ হতে চায় না। বিরামহীন বৃষ্টির মতো ক্ষান্তহীন তাদের এই সলাপরামর্শ বাদশার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে ফেলে। একবারও কেউ তার দিকে দেখল না। পাকড়া উম্মর হজ করে হয়েছে পাকড়া হাজি। তার গায়ের সাদা সাদা চক্কর এখন ওষুধ খেয়ে ভালো হয়েছে। আর চান্দুয়া আজকার ভোট করে হয়েছে চান্দু মেম্বার। যতয় ভালো মানুষ সাজুক বাদশা জানে ওদের টিকাত চিটকা গু আছে। পরার ধন না গাপছে দুনিয়াত কাঁয় বড়লোক হইচে। বাদশার বাবা বেঁচে থাকতে হাজি পরিবারের সাথে ওদের কত সখ্যতা ছিল তা সবাই জানে। বাদশার বাবাকে উনি প্রাণের দোস্ত বলে ডাকতেন। একদিনের কথা ভুলতে পারে না সে। তখন হাজির অবস্থা ততটা ভালো ছিল না। তখনও তিনি পশ্চিমে গিয়ে হজ করেননি। এক সন্ধ্যায় তিনি এলেন ওদের বাড়ি। সময়টা ছিল শীতকাল। হালকা কুয়াশা আর নবান্নের আমেজে সারাটা গ্রাম ছিল আনন্দে মুখরিত। চাঁদনি রাত। মাঠে-ঘাটে গলে পড়ছিল জোসনার বৃষ্টি।

দোস্তকে দেখে বাবা খুশিতে আকুল হলেন। কোথায় বসাবেন, কী খাওয়াবেন-এমন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। দক্ষিণ দুয়ারি ঘরে জোড়বাঘ খাটে নকশিকাঁথা পেড়ে তাকে বসতে দিলেন বাবা। মুরগির গোস্ত, ঘন মসুরের ডাল, ছোট মাছের চচ্চড়ি আর বনভাদুরির ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দিলেন মা ঘোমটার আড়ালে লজ্জাবতি মুখখানা ঢেকে। মায়ের হাতের রান্নার ভূয়শি প্রশংসা করে করে খুব মজা করে ভাত খেলেন তালুই সাব। খাওয়ার পর জর্দা দেয়া পান মুখে দিয়ে অনেক রাত অবধি চলল গল্প আর গল্প। দোস্তকে কাছে পেয়ে বাবার গল্পের মতুয়ার দড়ি ঢিলা হয়ে গেছিল সেদিন। একটা গল্পের রেশ ধরে হাসাহাসি এতটা বেগবান হয়েছিল যে তা একদম থামতে চাচ্ছিল না। বাদশাও সেদিন রাত জেগে মনের আনন্দে পাগলের মতো প্রচুর হেসেছে। তারপর আস্তে আস্তে সংসারে দুর্দিন এল। বাবা অসুস্থ হয়ে বহুদিন বিছানায় পড়ে থাকল। বাবার চিকিৎসা আর সংসারের খরচ চালাতে জমিগুলো হাজি সাবের কাছে চলে গেল।

জোহরের আযান হলে অনিচ্ছাসত্বে উঠল চান্দু মেম্বার। হাজি সাব নামাজের জন্য ব্যস্ত হল। চাকরকে ওজুর পানি আনার জন্য আদেশ করল। এই সুযোগে বাদশা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সুদিনের সম্পর্ক আর নেই। সময়ের নির্মম আচরণে আজ সে যে অবস্থানে নেমে এসেছে তাতে তালুই শব্দটা মুখে আনতে দারণ হোঁচট খেল। শুকনো গলায় অনুচ্চ স্বরে বলল,‘শুননু বইলে তোমরা ধানের মুলি দিবার নাইগচেন। মুই আধ মণের মুলি নিনু হয়। জান সালামত ভালো থাইকলে মশমত শোদ করিম। তওয়াই হইলেও হন, বাপ হইলেও হন। পাগলা বাদশার পাকে একনা নজর আকেন।’

বাদশার কথা শুনে হাজি সাবের চেহারা ঝড়ো মেঘের মতো কালো হয়ে গেল। মেম্বরের সাথে গল্প করার সময় তার বদনে যে প্রসন্নতা ছিল তা বাদশার বিরক্তিকর আগমনে ম্লান হয়ে গেল। জবানে তিক্ত বিষ উদগীরণ করে চোয়ালে কথা পিষে তিনি বলতে লাগলেন,‘ তোমরা যে কোনটে থাকি এইগল্যা ফাউয়া খবর পান, শুনলে মোর মেজাজ জ্যাটমাসি দ্যাওয়ার মতো হিড়হিড়ায়। কামাই করি খাইতে বুঝি গাও বিষায়। বাপের সম্পত্তি তাসোত উড়ি এ্যালা আইসচেন ধানের মুলি কইরবার। মুই কিন্তুক কামাইচোরা খেলটু ফেলটু মাইনষক একনাও সহ্য কইরবার পাঙ না।’

ওজু করার পর সিরাজগঞ্জি বড়ো গামছা দিয়ে ভালো করে হাত মুছল হাজি সাব। বাদশাকে সে ধানের বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলল না। সে কেবলামুখি হয়ে জায়নামাজে দাঁড়াল নামাজ পড়ার জন্য।এমন সময় বসার ঘরে প্রবেশ করল তার বড়ো মেয়ে সাহেরা। ‘আব্বাজান নামাজ পড়ি ভাত খাইবেন’ বলে সে বাদশার দিকে তাকাল। বাদশা তাকে চিনতে পারল। কত সুন্দর হয়েছে সাহেরা। তার শরিরের শুকনা ভাবটা এখন কেটে গেছে। গোলগাল পূর্ণতার ছাপ এসেছে তার চেহারায়। খাটো খাটো লালচে মাথার চুল ঘন আর লম্বা হয়ে কোমর ছুঁয়েছে। তার কৈশরের কৃশ মলিন রোগাটে দেহটা উজ্জ্বল মোহনীয় হয়ে অভুক্ত বাদশার বিধ্বস্ত মনটাকে কেটে ফালা ফালা করে দিল। একদিন এই সাহেরার সাথে তার বিয়ের আলাপ হয়েছিল। বাদশার অপছন্দের জন্যই তা হয়নি। আজ বৃষ্টিভেজা দুপুরের অস্বচ্ছ আলোয় অবসন্ন প্রকৃতির সব দীনতা ছাপিয়ে বাদশার মনের ভূবনে উজ্জ্বল সূর্য হয়ে উদিত হল সাহেরা। বাদশা বলতে যাচ্ছিল,‘সাহেরা মুই বাদশা, তুই মোক চিনিস নাই?’ কিন্তু পারল না। তার বুকে অনীহার দৃষ্টি হেনে আধখোলা পিঠে ঘনচুলের দাঁড়াশ নাচিয়ে সে ভেতর বাড়িতে চলে গেল। হাজি সাব নামাজ শেষ করে বড়ো বড়ো দোয়া করতে লাগল। ইহকাল পরকালের সব বালা-মুছিবত থেকে সে যেন সুরক্ষিত থাকে-এই প্রার্থনা সে বারবার পেশ করল মাবুদের দরবারে।

বাদশা বুঝল এখানে বসে থেকে লাভ নেই। অতীতকে যে ভুলে যায়, নিরন্নের অসহায় চোখ দেখে যার মনে দয়া জাগে না তার দরজায় মাথা টুকে কী হবে। হাজির বসার ঘর থেকে বের হয়ে সে শূন্যের দিকে তাকাল। সে দেখল বিধাতার অনড় নির্দেশে মেঘ থেকে গলছে পাথরকুচির মতো ঠা-া বৃষ্টির দানা। এখন কার কাছে যাবে সে। ক্ষুধায় তার হাত-পা কাঁপছে। একটা বোন আছে তার সারোডোবে। অবস্তাপন্ন ঘরে বিয়ে হয়েছে বোনের। সে গরিব বলে বোনজামাই খোঁজ নেয় না। বোনটাও যে কেমন হয়েছে। বাদশার বাড়ি ভিটেয় তার অংশ মাত্র চার শতক জমি চক্রান্ত করে গোপনে লিখে দিয়েছে ফখর তেলির কাছে। এই কাদাপ্যাঁকের দিনে চামড়াওঠা কুকুরের মতো চেহারা নিয়ে তার কাছে গেলে হয়ত কথাই বলবে না। কথাটা মনে হতেই তার চোখ গরম পানিতে ভরে গেল। বোনকে কত আদর করেছিল সে। মেয়েকে বড়ো ঘরে বিয়ে দিতে বাবা দাগের তিন বিঘা জমি বিক্রি করেছে। ব্যথিত মনে ধীর পদক্ষেপে বাদশা বাড়ির দিকে রওনা দিল। বড়ো রাস্তা বাদ দিয়ে সে মাঠের সোজা পথে হাঁটতে লাগল।

দু’পাশে সারি সারি বৃষ্টিমগ্ন ধানখেত। চান্দুর চাকলা পার হয়ে পাকড়া হাজির পাঁচদোনের চাইলতার তল। তা পার হয়ে ফখর তেলির দশসেরি দোলার পাড়ে একটা ঝাঁকড়া জগডুমরের গাছ দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে। তার নিচে দিনের বেলা অন্ধকার করে আছে ভাটি আর বনপাকড়ীর ঝোঁপ। সেখানে একটা উত্তেজিত মেছো আলাদ দেখে ভড়কে গেল বাদশা। সাপটা তার দিকে দ্রুতবেগে তেড়ে আসতে লাগল।

আশেপাশে কিছু নেই। শুধু একটু দূরে একটা গাছের মোটা ডাল পড়ে আছে। সেটা নেয়ার জন্য ছুটল বাদশা। ততক্ষণে তাকে সাপ আক্রমণ করে ফেলল। বাদশা গাছের ডাল হাতে নেয়ার আগেই তার পায়ে কামড় বসাল সাপটা। বিষের যন্ত্রণায় তার দেহ নীল হয়ে গেল। টলতে টলতে সে জলমগ্ন ধানের খেতে পড়ে গেল। অল্প সময়ের মধ্যে সে চেতনা হারিয়ে ফেলল। জনহীন জগডুমরের নিচে তার দু’চোখে ঘনিয়ে এলো মৃতুময় অন্ধকার। সহসা অজ্ঞানতার ঘোরে বাদশা দেখে, বড়ো বড়ো দাঁত বের করে হো হো করে হাসছে পাকড়া হাজি। তার মুখ থেকে বের হচ্ছে বিষময় আগুনের শিখা। তার দেহের সাদা চক্কর উদ্ভট বিভীষিকার জালে বাদশাকে ঘিরে ফেলেছে। চেতনার শেষ গন্তব্য পর্যন্ত বাদশা গাছের ডালটা দু’হাতে শক্ত করে ধরে রাখে। আর তা দিয়ে সে প্রতারক পাকড়া হাজিকে মারতে থাকে। মারতেই থাকে।