দশ হাজারেরও অধিক মুসলিম নারী স্কলারের জীবন ও কর্ম নিয়ে গতকাল (১৩/০১/২০২০) প্রকাশিত হয়েছে ৪৩ খণ্ডে ঐতিহাসিক এক গ্রন্থ। যে নারীরা বিগত চৌদ্দশত বছরের বিভিন্ন সময়কালে ইসলামি স্কলারশিপের বিভিন্ন শাখা উপ-শাখাকে সমৃদ্ধ করেছে, তাদের জ্ঞানার্জন, জ্ঞান বিতরণ সহ ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রিয় জীবনে তাদের নানান সাফল্যের ইতিহাস চিত্রিত হয়েছে এই গ্রন্থের প্রতিটি খণ্ডে, প্রতিটি পাতায়।

অতীতে নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সময়ে ইসলামি স্কলারশিপে নারীদের যে বিশাল অবদান আছে সেগুলো না জানার কারনে বর্তমান সাধারণ সমাজ তো বটেই এমন কি মুসলিম সমাজেও নানান ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়ে আছে। ইসলামি সভ্যতায় নারীদের জ্ঞান চর্চার পথ ও পদ্ধতি পশ্চিমাদের জ্ঞানচর্চার সাথে বরাবরই ভিন্ন ছিল। তাই বৃটিশরা আসার পর আমাদের এই উপমহাদেশে রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে নারীদের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে পড়া নিয়ে যে অনীহা আর হীনমন্যতা তৈরি হয়েছে সেটা নারীদের জ্ঞানচর্চা নিয়ে নয়, বরং জ্ঞানচর্চার পথ ও পদ্ধতি নিয়েই হয়েছে।

অথচ প্রতিনিয়তই নানান মিডিয়া ও একাডেমিক জগতে ইসলামকে এমন এক সেক্সিস্ট ও পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে যেন মুসলিম নারীদের জ্ঞানচর্চা বিষয়ে এই হীনমন্যতার উৎস হল ইসলাম। তবে এসবের পাশাপাশি ইসলামের এমন ভুল চিত্রায়নের পেছনে রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের একাংশও সমভাবে দায়ী।

কারন খোঁজ নিলে এটাও জানা যাবে, উপমহাদেশের পরিচিত অপরিচিত কিছু নামকাওয়াস্তে ‘আলেম’ নারী অধিকার মানেই ইউরোপ থেকে আমদানী করা ইসলামবিরোধী কাজ বা চিন্তা বলে ঘোষণা করছে এবং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রেখে নারীদেরকে ঘরের কোনে বসিয়ে রাখাকেই সর্বোত্তম বলে দাবি করছে। এভাবেই বর্তমানে নারীবাদীদের সাথে নারীবিদ্বেষী ‘আলেমদের’ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় এবং এই বিচ্ছিন্নতাই পরবর্তীতে সমাজের সাধারণ প্রগতিশীল এবং রক্ষণশীল মুসলিমদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে।

তাই ইসলামের উপর আরোপিত নারীবিদ্বেষের এই নিন্দা ও সমর্থনের বাইরে গিয়ে ড. আকরাম নদভী এই সময়োপযোগী এই গ্রন্থটি রচনা করেছেন। এই গ্রন্থটিই আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে যে, ইসলামে নারীপুরুষ কোন ইস্যু বা সমস্যা নয়। ইসলাম কর্তৃক নারীকে পুরুষের অধীনস্ত হিসেবে দেখাতে কিছু একাডেমি ও মিডিয়া বরাবরই উৎসাহী। এই অভিযোগ খণ্ডন করার উদ্দেশ্যেই শায়খ আকরাম নদভী দীর্ঘ ১৩ বছরেরও অধিক সময় ধরে নিরলস গবেষণা করে এই সুদীর্ঘ ৪৩ খণ্ডের ঐতিহাসিক গ্রন্থটি আমাদের সামনে এনেছেন।

গ্রন্থকার ডক্টর আকরাম নদভির জন্ম ১৯৪৬ সালে ভারতের জৈনপুরে। নিজ অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেই তিনি চলে যান ভারতের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুলউলুম নদওয়াতুল উলামা লাখনৌতে। নদওয়াতে তিনি দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করে হাদিস শাস্ত্রের উপর মাস্টারস শেষ করেন। তারপর নদওয়াতেই শিক্ষকতা জীবন শুরু করে শিক্ষকতার পাশাপাশি লাখনৌ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ এবং আরবি সাহিত্যে পিএইচডি লাভ করেন।

তৎকালিন নদওয়াতুল উলামার পরিচালক বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক স্কলার আবুল হাসান আলি নদভি রাহ. অক্সফোর্ডে ইসলামিক সেন্টার স্থাপন করেন। অক্সফোর্ড থেকে তখন কয়েকজন তরুণ গবেষক চাইলে আলী মিয়া নদভি আকরাম নদভিকে অক্সফোর্ডে পাঠান। অক্সফোর্ডে তিনি ভারতীয় সুফিবাদ, খানকাহ এবং ইসলামি শিক্ষাঙ্গন যাবতীয় বিষয় নিয়ে বিশদ গবেষণা করেন।

প্রখ্যাত এই ইসলামিক স্কলার, কর্মজীবনে ক্যামব্রিজ ইসলামিক কলেজ এর ডিন, আল-সালাম ইন্সটিটিউটের প্রিন্সিপাল এবং মার্কফিল্ড ইন্সটিটিউট অব হায়ার এডুকেশন এর অনারারি ভিজিটিং ফেলো। এছাড়া তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ এর রিসার্চ ফেলো ছিলেন, ১৯৮৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত।

এই অক্সফোর্ডে কাজ করতে গিয়েই তিনি লক্ষ্য করলেন যে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামে নারী শিক্ষা, অধিকার ও তার মর্যাদা নিয়ে যে ভুল ধারণা ও চিন্তাগুলো চালু আছে সেগুলো যথেষ্ট স্পর্শকাতর এবং বানোয়াট। বিষয়টি ভেবে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। এই ভুলের নিরসন করতেই প্রথমত তিনি ২০০৭ এ নিয়ে প্রাথমিক ভাবে ভূমিকা স্বরুপ একটি ছোট বই লেখেন। পরবর্তীতে একই চিন্তা নিয়ে ধারাবাহিক নিরলস কাজ চালিয়ে তিনি আজকের দীর্ঘ এই ৪৩ খণ্ডের গ্রন্থটি লিখে শেষ করেন।

আশা করা যায় যে এই গ্রন্থটি মুসলিম ফেমিনিস্ট এবং কনজারভেটিভ মুসলিম সহ সকলেকেই তাদের পারস্পরিক দূরত্বকে ঘুচিয়ে সামনের পথ চলতে অনেক সাহায্য করবে। বইটি আরবী ভাষায় লেখা হলেও লেখকের প্রায় সকল বক্তব্যই নিয়মিত ইংরেজিতে প্রচার করা হয়।

খুশির সংবাদ এও যে, মূল গ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার পরদিনই ঢাকা মাদরাসাতুল কাউসারের কৃতিসন্তান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তরুণ মেধাবী লেখক ও অনুবাদক তুহিন খাঁন সম্পূর্ণ গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ বিষয়ের প্রাথমিক পুস্তকটি আরবি এবং ইংরেজি থেকে তিনি ইতোমধ্যেই অনুবাদ করে ফেলেছেন। যা শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। সুতরাং অন্যান্য অসংখ্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশি ও সকল বাংলাভাষীদের জন্যও এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি নারী মূল্যায়নের এক অনন্য মাইফলক হয়ে থাকবে।