বাবু বাড়ির নাট মন্দির : স্কুলের গোশালা

লোকনাথ শাহা বোয়ালমারী, মধুখালি থানার ভেতর নামকরা হিন্দু জমিদার ও ব্যাবসায়ী ছিলেন। ফরিদ পুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় এবং যশোর খুলনা জেলায় তাদের গুদাম ঘর ও আড়ত ছিলো। শ্রীনগর গ্রামে তার
প্রাসাদোপম প্রাচীর ঘেরা বাড়ি ও কুমার নদীতে শান।বাধানো ঘাটলা ছিল। বাড়ির পশ্চিম পাশে স্কুলের উত্তর পাড়েও শান বাধানো পদ্ম পুকুর ছিল। বাড়ির ভেতরে দক্ষিণ দিকে লাগোয়া নাট মন্দির ছিল। সেখানে একত্রে হাজার দুয়েক লোক একত্রে বসে যাত্রা থিয়েটার দেখতে পেত। লোকনাথ সাহার বড়ো পুত্র শ্রী রামকানাই সাহা, মেঝো জন বলাই সাহা, তৃতীয় জন রমেশ সাহা। রমেশ সাহা কোলকাতা বসবাস করতেন। তার এক পুত্রের নাম ছিল পম। অন্যজনের নাম বেনী মাধব সাহা। সে বাড়িতে তার বড়ো কাকার সাথে এ দেশেই ছিল। বেনী মাধব সাহা আমার এক ক্লাস নিচে পড়ত।সে ও তাদের দাদুর দেয়া স্কুল শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। বেনী মাধবও ক্লাসে ফার্স্ট হোত তবে আমার সমান মার্ক সে পেত না।

আমি পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা দিব এবং নিশ্চিত বোর্ড বৃত্তি পাব। আমি বৃত্তি পেলে একই স্কুল থেকে পরের বছর কাউকে বৃত্তি দেওয়া হবে না বলে প্রচলিত বিশ্বাস ছিল অনেকের। আমার বৃত্তি পরীক্ষার সময় হলে রমেশ সাহাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। তিনি এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের লোক। কোলকাতা থেকে এসেছেন। নিশ্চয়ই কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসেছেন। সে তার ছেলের পথের কাটা তুলতে এসেছেন। যাহোক আমি খুব সুন্দর পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তি পেলাম না। স্কুলের হেডস্যার অনাথ বন্ধু কর্মকার মনে দুক্ষ পেলেন। আমাদের সাথে স্যারদের মধ্যে হরিপদ স্যারের বড়ো পুত্র তিনিও শিক্ষক হলে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন তুমি তোমার খাতার সঠিক সমাধানের অংকগুলো কেন কেটেছিলে? আমি বলেছিলাম স্যার আমি খাতায় কোন কাটাকাটি করিনি। তিনি বলেছিলেন তাহলে কে করেছে এই সর্বনেশে কাজ? আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না কে কাটা তুলতে কাটাকাটি করেছে।

আমি বৃত্তি না পেয়ে ভীষণ আহত হয়েছিলাম। অনেক পরে শুনে শুনেছি আমাদের স্কুলের বৃত্তি পাওয়া বেনী মাধব সাহা ব্রেন টিউমার অপারেশনে পরপারে চলে গেছে। শুনে আবার একটি অন্য রকম কষ্ট পেয়েছিলাম। আমার পিতা শাহ ইসরাইল মিয়া তার প্রথম জীবনে এই স্কুলে অনারারি হেডমাস্টার ছিলেন। তিনি বিনা পয়সায় বিদ্যাদানে বিদ্যাপতি হয়েছিলেন। জমিদার পুত পয়সার অভাবে শিক্ষাকতা করছেন না বরং বিদ্যাদানের সুযোগ না পাওয়ার অভাবে শিক্ষাকতা করছেন। তিনি ইংরেজি পড়াতেন। এই স্কুলেই তার একান্ত ইচ্ছায় বাবুদের নিয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পর্যন্ত বর্ধিত করেছিলেন। তিনি বেশি কাল শিক্ষাকতা করেন নি। চলে এসেছেন শিক্ষাকতা ছেড়ে নিবিড়ভাবে নিজের সংসারে, নিজের এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হতে। আমি যখন এই স্কুলে পড়াশোনা করি তখন আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন না।

আমাদের সময়ে স্কুলের পাশে লাগোয়া আলাদা বারান্দায় গোহালঘরে গুরুর বাথান হল। গোমাতার পবিত্র গোবর-গোচোনা অর্থাৎ মা জীর হাগু মুতুর পবিত্র খোশবু নাসারন্ধ্রে সুড়সুড়ি দিতে লাগলো। এ বিষয়ে বাবুদের বলে লাভ হোত না কারণ তারাতো যে সে গাই গরু নয়, জমিদার বাড়ির সদস্য, গো দেবতা! এদের গোবর গোমূত্র, বড়ো পবিত্র হালের করোনা কালের ঘটনা হলে গোপূজারীদের ভীড় লেগে যেত। আগের দিনের মহামারী ছিল কলেরা বসন্ত। তাদের কুনজর আক্রম বিক্রম থেকে বাচার জন্য কাত্যায়ানী দেবী দূর্গার অবতার রুপে যে ভাবে ধরাধামের নরাধমদের বাঁচাবার জন্য চতুর্ভুজা শীতলা দেবীর আবির্ভাব ঘটেছিল তদ্রূপ কোন কাত্যায়নী গোমাতার পৃষ্ঠে চড়ে দ্বীভূজা রুপে এক হাতে গোমুত্রের পেট বোতল অন্য হাতে গোবর পূর্ণ কাশার থালা হাতে আগমন করতেন। ভাগ্য ভালো স্কুলটি এখন বাবু বাড়ির দেউড়ি থেকে ময়েনদিয়া বাজারে প্রোমোশন নিয়ে চলে গেছে।

নাট মন্দিরে দূর্গাদেবী বিগ্রহসহ মা কালি লক্ষ্মী সরস্বতীর মনোহরা মূর্তি দেখেছি। সেখানে অসুর বধের পালা হোত, যাত্রা থিয়েটার হোত। এ সব কর্মযজ্ঞ রাত্রে চলত বিধায় আমার মত বালকের অংশ গ্রহণ সম্ভব হতো না তদুপরি বাবার কড়া নিষেধ ছিল এ জাতীয় কর্ম কান্ডে না জড়াতে।