পোদ্দার বাড়ির গীতগোবিন্দ :

বিনয় পোদ্দার বাবু বাড়ি স্কুলের আমার সহপাঠী ছিল। বিনয় পোদ্দার আসলেই খুব নরম স্বভাবের বিনয়ী ও নিরহংকারী ছিল। ওর বাবার নাম বিষু পোদ্দার, বিষু পোদ্দার কাকার বাবার নাম ছিল কমল পোদ্দার। কিন্তু লোকে তাকে কমলের পরিবর্তে নরম বানিয়ে কোমল পোদ্দার বলত। স্কুলে ক্লাস চলা কালে ওদের নাট মন্দিরে ঢাকের বিকট শব্দ আমাদের কর্ণকুহরে ঝড় তুলত। বিনয় আমাকে ফিসফিস করে বলত, আলীম যাবি না কি আমাগের বাড়িতে আজ গীত গোবিন্দ হবে। ও আমার ছোট্ট বেলার কবতে লেখার বাতিক জানত। আমি মূহুর্তে সায় দিয়ে ক্লাসশেষে যাওয়ার কথা বলতাম। বাবু বাড়ির নাট মন্দিরের উত্তর পাশে বিনয়দের চারতলা সু নন্দন দালান বাড়ি ছিল। এমন সু-উচ্চ ভবন তখন ফরিদপুর শহরেও সহজে দৃশ্যমান হয়নি। বাড়ির সিংহদরজা পেরুলেই সামনে বৃহত আকারের নাট মন্দির দেখা যেত। লোকনাথ সাহার দালান বাড়ি অবস্য চারতলা নাহলেও চারপাশ পরিবৃত্ত সু দৃশ্য দোতলার বিল্ডিং সগৌরবে রাজত্ব করেছে শত বরষ। গীত গোবিন্দ সরব বৃন্দ আবৃত্তি করার আগে বিষু কাকা ভুমিকা দিতেন- যা গীত শুনতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে দিত।

লক্ষ্মণসেনের (১১৭৮-১২০৬) রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম কবি ছিলেন জয়দেব গোস্বামী। অন্যরা ছিলেন গোবর্ধন আচার্য, শরণ, ধোয়ীও উমাপতিধর। পশ্চিম বংগের বীরভূমের কেন্দবিল্ব বা কেদুলিতি জয়দেবের জন্ম। তিনি সংস্কৃত ভাষায় গীতগোবিন্দম রচনা করেন। গোবিন্দ হল শ্রীকৃষ্ণ বা বিন্ঞ্চু। গোবিন্দ ও গোপাল কৃষ্ণের দই নাম ও দুই রুপ। গোপাল রূপী কৃষ্ণ বৈদিক দেবতা ইন্দের পূজা করতে রাজি ছিলেন না। এ জন্য তাঁকে অবৈদিক দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়। কৃষ্ণ ইন্দ্রের পূজা না করার একটি কারণ তিনি ভগবান হিসেবে খ্যাত ছিলেন, যনি তার গুরু গৌতম ঋষির স্ত্রী অহল্যাকে ভোগ করেছিলেন। এ জন্য ঋষির অভিশাপে তার সর্বাঙ্গে নারীর ভগ বা যোনির ছবি ফুটে উঠেছিল। ভগ চিহ্নে কীর্তিমান বলেই তিনি ভগবান হলেন। জয়দেব গোস্বামীর গীতগোবিন্দে শ্রীকৃষ্ণের লীলা-লাস্যের যতটা না লীলা আছে তার চেয়ে সাধন ভজনের বর্ণনা বেশি। ১২৯০ সালে কলকাতা থেকে অসমীয়া ভাষায় রাম স্বরসতীর অনুদিত গীত গোবিন্দের ভুমিকা :

নমো নমো নারায়ন ভর-ভয় বিনাশন
ব্রম্মা হবে চিন্তে যার অরুণ চরণ।
প্রনমো গোপাল নিরাকার শিরকান্ত
গোপীজনবল্লভ প্রনমো লক্ষীকান্ত।
গ্যান চক্ষু দিলাহা সোদর রূপ ধরি
নমো কবি চন্দর চরণে আগ বাঢ়ি।
জয়দেব নামে কবি আছিলা পূর্বত
গীত গোবিন্দ বিরচিলা নানা মত।
গোবিন্দের রাস ক্রীড়া গোপিকা সহিত
একত্র করিয়া ভগরন্ত সমন্বিত।
দুয়োকথা নিবন্ধ করিবো তকে ঠাই
যাহাকে স্মরণে লোক বৈঠক যাই।

এখানে গোপীজন বল্লভ গোবিন্দ বা শ্রীকৃষ্ণের গোপিকাদের বা গোপিনীদের সাথে রাসক্রীড়া বা যৌন লীলার বর্ণনা সহ ভজন সাধনের বিযদ বিবরন রসাত্মক ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ পরমানন্দে তার ষোল হাজার গোপিনীর সাথে লীলা খেলা করেছেন যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই তিনি পরমেশ্বর,গোপাল নিরাকার।

মেঘৈম্মৈর্ দুরষ ম্বরং বনভূরঃশ্যামৈ স্তমালদ্রুমৈ
নক্তং ভীরারয়ং ত্বমেব তাদশং রাধে গৃহংপ্রাপয়।

এখানে সংস্কৃত ভাষায় রাধার শ্যামাঅনুরাগের আভাস পাওয়া যায়। কৃষ্ণের কামলীলা তার জীবনের একটি অধ্যায় হলেও তিনি যুগে যুগে অধর্মের বিনাশ করে শিশ্টের লালান করতে আসেন এমন দর্শনই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তার একটি বিখ্যাত বাণী :

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানিভাবর্তি ভারত
অভ্যথানম ধর্মস্য তদাত্তানং শ্রী জাম্যহম
পরিত্তরানায় সাধুনাং বিনাশায় দুষ্ক্রিতম।
ধর্ম সংস্হাপনার্থায় সম্ভাবমি যুগে যুগে।।

এর অর্থ, পৃথিবীতে যখন ধর্মের গ্লানি হয় এবং পাপ বৃদ্ধি পায় তখনই আমি শরীর ধারণ করে পৃথিবীতে অবতীর্ন হই।আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হয়ে সাধুদিগের পরিত্রাণ, পাপীদের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপন করি। গীত গোবিন্দের গীতানুষ্ঠানের সেদিনের বিষু কাকার সার কথা আজ আমার সবটা মনে থাকলেও গীত পরিবেশকদের রঙচঙে পোশাক আর ঢোলের শব্দ অনেকটা অক্ষত আছে।

আমার জীবনের তৃতীয় চাকরি ছিলো ম্যাকস ড্রাগ লিঃ নামের একটি ঔষধ শিল্প কারখানার ল্যাবরেটরীতে ঔষধ বিশ্লেষক পদে। সেখানে জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন ফজলুর রহমান, প্রশাসনিক ম্যানেজার ছিলেন হাসান মাহমুদ, প্রোডাকশনের দায়িত্বে ছিলেন বাবু নিখিল চন্দ্র ভৌমিক, সেলস ম্যানেজার কবির শরীফ কিউসিতে ফার্মাসিস্ট ছিলেন শাহীন আরা বেগম।

দুপুরে লাঞ্চের বিরতিতে চায়ের টেবিলে আমাদের নানা রকম কথা বার্তার আড্ডা চলত। একদিন কথাপ্রসঙ্গে হাসতে হাসতে নিখিল দা বলেই ফেল্লেন আপনাদের শেষনবী তো তেরটা বিয়ে করছে। আমি তার কথার উত্তরে চটজলদি বলেছিলাম আপনাদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তো ষোল হাজার গোপিনী ছিল। আমার এ বেরস জবাবে আড্ডা থেকে যাচ্ছিলেন নিখিল দা।তাকে আশ্বস্ত করে বল্লাম কেন এত রমনি রমনে তিনি গোপীজন বল্লভ হলেন তার উত্তর শুনে যান আমার কবিতায়।

গোপকন্যা গোপীদের দখল দিলে
ষোল হাজার গোপিনীর সুস্বাদ নিলে,
কারাগার খুলে তাদের জাত বাচালে
ঢুকালে তাদের শেষে নিজ গোহালে।
নারীর মাখনে তুমি মধু রস পেলে
এমন সুধাকর আর কোথায় মেলে।
দাদা হেসে দিয়ে বল্লেন আপনি তো কবি
যা লেখেন না!

দাদাকে আরও বল্লাম ভগবান কাহিনি জানেন? তিনি একটু রাগত: স্বরে বল্লেন, না আমি জানি না। আপনি বলেন দেখি? বল্লাম ভগবান ইন্দ্রের সারা গায়ে নারীলোকের ভগ বা যোনির ছবিতে ভরে গিয়েছিল। কেন তা জানেন? তিনি তার গুরু গৌতম ঋষির স্ত্রীর ভেজা কাপড়ে লেপ্টানো যৌন বতী শরীর দেখে কামস্পৃহায় পীড়িত হচ্ছিলেন। তাকে ভোগ করার মানসে গোতমের আকৃতি ধারণ করলেন এবং যুবতী অহল্যাকে সংগম করলেন। গৌতম শিস্যের এ অন্যায় আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে অভিশাপ দিলেন। গুরুর শাপে ইন্দ্রের সমস্ত শরীরে স্ত্রী লোকের যোনি বা ভগে ছেয়ে গেল। ইন্দ্র লোকলজ্জার ভয়ে গৌতমের পা ধরে মাপ চাইলেন। কিন্তু গুরু অভিশাপ একবার লেগে গেলে তা আর খন্ডানো যায় না। যোনির পুষ্ট আকার কিছুটা হালকা ভাবে থেকে যায় দূর থেকে তা দেখতে লোচন বা চোখের মতো মনে হত। তাই তার অন্য নাম শতলোচন। এর রুপ অন্য কারো ক্ষেত্রে ঘটলে তারও বিধান মনুসংহিতায় বিবৃত আছে।

গুরু তল্পে ভগঃ কার্য্যঃ
সুরাপানে সুরাধ্বজঃ।
স্তেয়ে চ স্বপদং কার্যঃ
ব্রক্ষ্মহন্যশিরা পুমান।
(মনুসংহিতা, অনুবাদ-সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপধ্যায়, অধ্যায়-নবম, শ্লোক-২৩৭, পৃষ্ঠা-২৭৫)

অর্থ, গুরু পত্নী গমনেঅপরাধীর কপালে স্ত্রী যোনি চিহ্ন,সুরাপানে সুরাপাত্র চিহ্ন,চৌর্যে কুকুর চিহ্ন,ব্রহ্ম হত্যায় কবন্ধ চিহ্ন একে দিতে হয়।

আমরা সবাই যার যার ধর্ম পালন করব। অন্য ধর্মের আঘাত করব না। কারো এক লেখায় দেখেছিলাম হযরত আলী রাঃ কৃষ্ণকে নবী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। কোরানে মাত্র বিশ বাইশ জন নবীর নাম পাওয়া যায়। অথচ ইসলাম ধর্মের প্রচলিত বিশ্বাস লক্ষাধিক নবী রসুল পৃথিবীতে যগে যুগে আগমন করেছেন। গৌতম বুদ্ধও কারো কারো মতে নবী হতে পারেন। হযরত মোহাম্মদ সা.এর পরে আর কোন নবীর আগমন ঘটবে না। তিনিই খাতেমুন্নবী অর্থাৎ তিনিই পৃথিবীর শেষ নবী।