বুড়ো ঠাকুরের বটগাছ

চড়ক পূজা ও নববর্ষের মেলা আমার স্মৃতিতে বুড়ো ঠাকুরের বটগাছ মাঝে মাঝে ঠাকুর ঠুকুর করে, মনের ভেতর বেজে ওঠে। বাবুবাড়ির স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান, ক্রিড়া প্রতিযোগিতা, চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, চড়ক পূজা বুড়ো বটগাছের তল্লাটে খোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত হত।আমি ক্লাস থ্রি থেকে ফাইভ পর্যন্ত এ স্কুলে পড়েছি ফলে স্কুলের সব অনুষ্ঠানে সরব হাজির ছিলাম। বুড়ো বটগাছের মাঠে স্কুলের ক্রিড়া প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতাম। একশ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় সিনিয়র ভাই পরান দাকে পিছনে ফেলে ফার্স্ট হয়েছিলাম। আমার আগে কেউ পরান দাকে দমাতে পারেনি। সেবার আমার নাম ছড়িয়ে গেল, ফোরের ফার্স্ট বয় আলীম খেলাতেও ফার্স্ট হয়!

বুড়ো ঠাকুর মুলত বুড়ো শিব। শিব দেবতার অন্যঅঙ্গের পূজা হল চড়ক পূজা। এই বটগাছের নিচে পূজার আগে একটি বংশ দন্ড বিশেষ ভাবে গাছের মত মাটিতে সংস্থাপন করা হত। এটিকে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করাহত। এখানে জলভরা পাত্রে শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ বা সিঁদুর লাগানো কাঠের তক্তা বা শিবের পাটা রাখা হয় যা পূজারীদের কাছে বুড়ো শিব নামে পরিচিত। নিয়ম হল এই চড়ক গাছে পতিত সন্ন্যাসীকে লোহার হুড়কো দিয়ে চাকার সাথে শক্ত করে বেধে দ্রুত বেগে ঘোরানো। তার পিঠে, হাতে, পায়ে, জিহ্বায় এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে বান শলাকা বিদ্ধকরা হয়। ১৮৬৩ সালে বৃটিশ সরকার আইন করে এ নিয়ম বন্ধ করলেও গ্রাম এলাকায় এর পালন রীতির খানিকটা পরিবর্তন করে পূজা চালনা করা হয়। আমার বালক বয়সে চড়ক পূজায় কোন সন্ন্যাসীকে চড়কে হুড়কো বেধে ঘোরাতে দেখিনি। তবে বুধেই নামের এক ভবঘুরে লোককে জিলিপি খাওয়ার লোভ দেখিয়ে চড়কের হুড়কোয় দড়ি গামছা দিয়ে শক্ত করে বেধে বো বো করে ঘোরানো হল। চড়কে প্রচন্ড বেগে ঝড়ের মত ঘোরার ফলে তার নাক মুখ দিয়ে লালার মত তরল পদার্থ গড়গড় করে ঝরতে লাগলো। ওমনি তার ঘোরানো বন্ধ করা হল। বুধেইয়ের হাতে পায়ে, মুখে নাকে, জিহ্বায় তখনও লোহার ধারালো শলাকা ফোটানো হয়নি, জানি না শিব দেবতা তাদের পূজা কতটুকু পাতে তুলবেন! তবে আমাদের মত শত শত বালক শিবেরা ঠিকই প্রসাদ পেয়েছিলাম। বুধেই বলে কথা অন্য ঠাকুরপোর বেলায় এ কান্ড ঘটলে লাল দালানের ভাত খেতে হত।

শিব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্বোচ্চ দেবতা। তিনি পরমেশ্বর। সৃষ্টি-স্হিতি-লয় তিন কারণের কারণ। তিনি জন্মরহিত, শ্বাসত, সর্বকারণের কারণ, তিনি স্বরুপে বর্তমান, সমস্ত জ্যোতির জ্যোতি, তিনি তুরীয়, আদি ও অন্তহীন।
ও নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয় হেতবে
নিবেদয়ামি চাত্মানাং ত্বং গাতি পরমেশ্বর।
তিনি অভাব শূন্য, পরমুখাপেক্ষীহীন। তার এ জতীয় কঠিন পূজা না নিলেও চলে। চৈত্র সংক্রান্তীতে এই অমানবিক কঠিন পূজা, এই চড়ক পূজা না নিলেও শিবের কোন ক্ষতি নেই। লিঙ্গ পুরাণ, বৃহদ্ধর্মপুরাণ,এবং ব্রম্মবৈবর্তপুরাণে শিবারাধনা প্রসঙ্গে নৃত্য গীতের উল্লেখ থাকলেও চড়কপূজার কথা নেই। পূর্ব পঞ্চাদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত গোবিন্দনন্দের বর্ষ ক্রিয়াকৌমুদি রঘুনন্দনের তিথিতত্বেও চড়ক পূজার উল্লেখ নেই। জনশ্রুতি আছে ১৪৮৫ সালে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা এই পূজার প্রথম প্রচলন করেন। চড়ক পূজা শিব পূজার অন্যঅঙ্গ। এ পূজা এখন বাংলাদেশ ও ভারতের সর্বত্র ব্যাপক ভাবে হয় না। চড়ক পূজা শেষে বুধেই জিলিপির কথা বারবার বলতে লাগলো। বুধেই সেদিন প্রায় শের দশেক জিলিপি খেয়েছিল। এই সেদিনই কোন সন্যাসীকে পূজার ভোগ ভোগ করতে দেখলাম।

বুধেইয়ের এই কর্মকাণ্ডে তার বোন বাগদীর সে কী পেরেশানি। বাগদী সেদিন গালাগালি করে পূজার আয়োজকদের মুন্ডুপাত করেছিল। ঝগড়াটে বাগদিরও যে একটি দয়াদ্র হৃদয় আছে তা তার ভবঘুরে ভাইয়ের বুড়োশিবের সিঁদুর লিঙ্গমের বো বো ঘূর্ননের তরল নির্ঝরনে পরিদৃষ্ট হয়েছিলাম।

বুড়ো ঠাকুরের বটগাছ তলার আর একটি আনন্দ জোছনার জল জোয়ার ছিলো আড়ং। চড়কপূজা চৈত্র মাসের শেষ দিবসে হলেও এ পূজার আড়ং বৈশাখ মাসের দু-তিন পর্যন্ত চলত। পহেলা বৈশাখে এ মেলার নাম হত বৈশাখী মেলা। নববর্ষের বৈশাখী মেলায় গৃহ পরিচালনার জিনিস পত্র যেমন বাঁশের তৈরি কুলা, খালই পলো, ধান রাখার ডোল, বেতের ধামা, চাল মাপার বেতের তৈরি শের, মাছ ধরার চাঙাড়, শাজার, মাটির তৈরি হাড়ি, পাতিল, জালা, তাগারি, কাঠের তৈরি লাঙল, মই, যোয়াল, বাশের তৈরি মাথাল, গরুর মুখের বাশের তৈরি মুখাল বা টোনা প্রভৃতি। ছোট শিশুদের খেলনা, মেয়েদের চুলের ফিতা, কাচের চুড়ি, সুগন্ধি কদুরতেল হরেক রকম জিনিস পাতি। পসরা সাজিয়ে বসা দোকানী ছোট ছেলেমেয়েদের হরেক পদের রঙিন জিনিস কেনার জন্য তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্ন রকম ছড়া কাটত। যেমন :
চুলের ফিতা কাচের চুড়ি
কিনবে কে কে ছুড়ি বুড়ী।
হলদে সবুজ রাঙা ফিতা
কেশবতী কইন্যের মিতা।
ফিতায় চুল বানবে
রাজকন্যায় সাজবে।

ছড়ার সব কথা দোকানীর নয়। অনেকটা বানিয়ে মানিয়ে নিলাম। কেবল বুড়ো ঠাকুরের বটগাছ তলায়ই নয় বরং আশ পাশ গ্রামেও এমন আড়ং মেলা হত। তবে ঠাকুরের মেলা জমত বেশ। শুনেছি কাটাগড়ের শাগের শাহ দেওয়ানের মেলার লোক সমাগম এই মেলার কয়েক গুণ বড়ো হত। আমাদের এলাকার হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই সে মেলায় সম্মিলিত হত মোলাকাত করত পরস্পরে।

আমি বাবার সাথে নববর্ষের প্রথম দিনে হালখাতার দাওয়াত খেতে ময়েনদিয়া শ্রীনগর বাজারের মুকুন্দ মামার ফার্মেসিতে যেতাম। কখনও তার বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। ডাঃ মুকুন্দলাল সাহা আমার বাবার ঘনিষ্ট বন্ধু শ্রেণির ছিলেন। তিনি আমাদের হাউস ফিজিশিয়ান ছিলেন। তিনি বেশ অমায়িক, ভদ্রলোক ছিলেন। নববর্ষে তিনি হালখাতা খুলতেন তাঁর ক্লায়েন্টদের মিষ্টি মুখ করাতেন। শুধুকি মিষ্টি, রাজভোগ রসগোল্লার সাথে থাকত আমৃতি, তরমুজ, বাঙ্গী। আব্বা বাইরে বেরুলে কিছু খেতেন না। তাই আমাকে বিশেষত হালখাতা পর্বে সঙ্গে নিয়ে যেতেন, তা ছাড়া তার সোনাচানকে এমন মিষ্টান্নলোকের মৌমুগ্ধতা থেকে মাহরুম করতে চান না।

বাংলা নববর্ষের প্রচলন হয় মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে। কয়েকজন ঐতিহাসিক বাঙ্গালা দিনপঞ্জি উদ্ভবের কৃতিত্ব দিয়েছেন সপ্তম শতকের রাজা শশাঙ্ককে। পরে সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলাসনের প্রবর্তন করেন। তার রাজ জ্যোতির্বিদ ফতেউল্লা সিরাজিকে প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কারের নির্দেশ দেন। তিনি সৌরসন ও আরবি হিজরি সনের ওরপ ভিত্তি করে বাংলা সনের নিয়ম করেন। ১৫৮৪ সনের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলাসন গণনা শুরুকরা হয়। তবে এটি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহনের কাল ১৫৫৬ এর ৫ নভেম্বর থেকে। শুরুতে এর নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

বাংলাসনের মূল নাম ছিল তারিখ-এ-এলাহী। এই তারিখে এলাহীর বারো মাসের নামছিল কারবাদিন, আর্দি, বিসুয়া, কোদার্দ, তীর, আমাদার্দ, শাহরিয়ার, আবান, আজুর, বাহাম ও ইস্কান্দার মিজ। কারোপক্ষে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয়নি এসব নাম কি করে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র হল। ধারণা করা হয় বারোটি নক্ষত্রের নাম নিয়ে পরবর্তী কালে বাংলা মাসের নামকরণ করা হয়।

বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়ীস্হা থোকে জৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রায়হন থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, ফাল্গুনী ফেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র।

আধুনিক নববর্ষ পালনের খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। বৃটিশদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোমকীর্তন ও পূজার ব্যবস্হা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সনেও অনুরূপ কার্যক্রমের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী কালে ১৯৬৭ সনের পূর্বে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি। এরপর ঢাকার ছায়ানটের, উদ্যোগে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের এস হে বৈশাখ এস এস। এটি মূলত বৈশাখের আবাহন সূর্যের আগমনী প্রার্থনা সঙ্গীত। বাংলা বর্ষের বারো মাসের আবাহন নিয়ে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি সুন্দর সঙ্গীত রয়েছে। নজরুল একাডেমি থেকে এই গানটি সকলকে নববর্ষে গাইতে অনুরোধ করা হয়। নজরুল ইসলামের এই গানটি হল:

একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী
ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনি।
রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে চাহ জল
আম কাঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল।
ঝঞ্ঝার সাথে প্রান্তরে মাঠে কভু খেল লযে অশনি।।
কেতকী-কদম-যুথিকা কুসুমে বরষায় গাথ মালিকা
পথে অবিরল ছিটাইয়া জল খেল চঞ্চলা বালিকা।
তড়াগে পুকুরে থইথই করে শ্যামল শোভার নবনী।।
শাপলা শালুক সাজাইয়া সাজি শরতে শিশির নাহিয়া
শিউলি -ছোপানো শাড়ি পরে ফের আগমনী গীত গাহিয়া।
অঘ্রাণে মা গো আমন ধানের সুঘ্রাণে ভরে অবনি।।
শীতের শূন্য মাঠে তুমি ফের উদাসী বাউল সাথে মা
ভাটিয়ালী গাও মাঝিদের সাথে গো কীর্তন শোনো রাতে মা,
ফাল্গুনে রাঙা ফুলের আবিরে রাঙাও নিখিল ধরনী।।
(রাগঃবেহাগ মিশ্র, তালঃ দাদরা)

ছায়ানটের অনুষ্ঠান এখন জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়। এতে গ্রামীণ জীবন যাত্রা, বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও প্রাণীর প্রতিকৃতি শোভিত থাকে। বিশেষ ভাবে লক্ষীপেচা, ড্রাগনসহ অন্যান্য প্রাণীর ছবি ও মোড়কে লোকেরা সজ্জিত হয়। অনেকের মতে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিশাল পরিচয় বহন করে বৃহত্তর সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য পাশকাটিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানে পর্যবসিত হয়েছে। বুড়ো ঠাকুরের বটগাছ ও বটতলা হাটখোলা আমাদের আনন্দের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।