আমেনা বুজির কোলের ওম : মত্তদাদুরীর ডাক

আমাদের গ্রামের বাড়ির দোতলা ঘরের পাশে একই সারির পশ্চিম পোতায় আরও একটি বড়ো ঘর ছিলো। এই ঘরেও আমরা রাতে ঘুমাতাম। আমাদের এই ঘরের পাশে একই পঙক্তিতে আমেনা বুজিদের বাড়ি। এটা আমেনা বুজির মামাবাড়ি। তার রাজেক মামা নিসন্তান ছিলেন। তাই তার ভাগ্নে-ভাগ্নীকে নিজের বাড়িতে রেখে দিয়েছেন। রাজেক মামা তার সহায় সম্পত্তি তার বোন আক্তারুন্নেছা অর্থাৎ বুজির মাকে লিখে দিয়েছেন। বুজির বাবা সাইয়েদ আবু সায়ীদও পাবনার মাসুমদিয়া থেকে চলে আসেন শ্বশুর বাড়িতে। তাকে আমরা খালুজান বলে সম্বোধন করতাম। খালুজী দরবেশ প্রকৃতির লোক ছিলেন। তার মেয়ে আমেনা ছাড়াও এক বিখ্যাত পুত্র সন্তান ছিল। তাঁর নাম সাইয়েদ মোহাম্মদ আলী। তিনি বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত আলেম, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি করটিয়া সাদাত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। এরপর তিনি ইসলামি ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও দারুল ইফতার ডাইরেক্টসহ আরও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বড়ো বড়ো পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি বোখারী শরীফের প্রথম বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। ইসলামী অর্থনীতির ওপর ইংরেজিতে লেখা তার একটি বইসহ আরও অনেক বই রয়েছে। তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছিলেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দী ছিলেন তারই ফুফাতো ভাই কে.এম. ওবায়দুর রহমান।

আমেনা বুজি আমার সরাসরি খালাতো বোন না হলেও তিনি আমার পিতৃপুরুষের দিক দিয়ে বোন নন বরং আমার বাবা তার নানা মীর গওহর আলী বা গহের আলীর ভ্রাতা সম্পর্কিত। অর্থাৎ আমার বাবা তার নানা আর আমরা তার মামা। কিন্তু আমার বাবার অন্য আর এক সম্পর্কের কারণে আমেনা বেগম আমাদের খালাতো বোন হয়ে যান।আমি খুব ভক্তি ভরে আমেনা বুকে বুজি বলে ডাকতাম।

আমার মমতাময়ী মা আমাদের বিশাল সংসারের অন্দরমহলের সামাল দিতে কখনও কখনও হিমসিম খেতেন। বাড়ির সহকর্মীরা বিভিন্ন কাজে ব্যাস্ত থাকতেন। আমদের বাড়িতে মায়ের কোন দেবর ননদ ছিলো না। মার কোন ছোট বোনও ছিলো না। মা’ই আমার নানাজীর আদরের ছোট মেয়ে। ফলে এই আমেনা বুজিই আমার মার ননদের মত, ছোট বোনের মত। তিনি আমার মাকে কি বলে সম্বোধন করতেন তা আমি ছোট্ট বেলায় শুনিনি, তবে তার ভাবি অর্থাৎ সাইয়েদ মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী সাইয়েদা শাহজাদী ছাদেকা ভাবি আমার মাকে রেস্তা মোতাবেক নানীআম্মা বলে ডাকতেন।

এই আমেনা বুজি আমাকে ছোট ভাইয়ের মত দেখতেন। মা সংসারের কাজে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়লে আমার ঠাই মিলত আমেনা বুজির আঁচলের মায়াবী খোঁটে। এক শ্রাবন রাতের বৃষ্টি ভরা রাতের কথা মনে পড়ছে। গভীর রাতে বৃষ্টির ঘনাগমে পাশের কদমতলার ছোট্ট তালাব থেকে শতশত দাদুরীকূলের দীর্ঘ বিরহের ঘ্যাঙর, ঘ্যাঙর শব্দে আমি আমেনা বুজির কোলের কাথা সরিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলাম। আমি আনমনা চত্তে বিরহী রাধার মত কী এক অনির্বচনীয় আনন্দ বেদনায় কোকিয়ে উঠলাম। বুজিও ঘুম থেকে জেগে আমার ভাবালুতা অনুভব করে নিরবে আমাকে আবার তার কোলের নরম জোছনায় ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। ওই রাতেই আমার বুকে কবিতার অহী নাজেল হয়েছিল কিন্তু তার বিকাশ ঘটেছিল অনেক পরে। কোন জিবরাইল আমার দূর্বল বক্ষ আবেষ্টন করেনি।

আমেনা বুজির বিয়ে ছিল কখন তা আমার স্মরণে নেই। কারণ যখন তার বিয়ে হয়েছিল তখন আমি শিশু বয়সের। বুজির বড়ো ছেলে জাহিদ আমার চার পাঁচ বছরের ছোট। এরপর শাহীদ, রফিক, সালমা ওরফে মাহবুবা, আতিক ও আব্দুল্লাহ জন্ম গ্রহণ করে। বুজিকে বছরে একবার ঢাকা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসতেন দুলাভাই। দুলাভাইয়ের নাম মাহবুবুর রহমান গোরহা। তিনি বুজিকে নিয়ে ঢাকার নাখাল পাড়া নিজবাড়িতে বসবাস করতেন। তার হোম ডিস্ট্রিক্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া। দুলাভাই ঢাকা থেকে একটি দোতলা বজরা জাতীয় নৌকায় করে সরাসরি আমাদের ফরিদপুরের গ্রামের বাড়ি খারদিয়ার পশ্চিম মিয়া পাড়ায় চলে আসতেন। বুজি দুলাভাই, জাহিদ শাহীদকে পেয়ে হাতে চাঁদ পাওয়ার মত আনন্দ পেতাম। জাহিদ আমার ভাগ্নে হলেও ওর সাথে আমার বন্ধুর মত খাতির ছিল।

ভাগ্নে ভাগ্নীকে নিয়ে আমরা অর্থাৎ আমার ছোট ভাই আসাদ ও ছোট বোন সারাদিনমান আনন্দে মেতে বেড়াতাম। সকালে নাস্তা খাওয়ার পর আমরা সকলে মিলে দোতলা ঘরের ওপর তলায় সাপ লুডু খেলতাম, খেলার ফাঁকে ফাঁকে মুড়ি, নারকেল, খেজুরের পাটালী গুড় খেতাম। আমাদের মিলন মেলা চলত প্রায় দুপুর পর্যন্ত। এর গোছলের আগে কোনদিন ছলম বা জাম্বুরা, কোনদিন, তালেরশ্বাস, নারকেলের ফোপা বা তালের আঁটির ভেতরের ফোঁপা, ডাবের পানি খেয়ে পাশের কুমার নদীতে অথবা বাড়ির পুকুরে ঘন্টা খানেক ঝাঁপাঝাপি, জলকেলী, ভুব সাঁতার, বাটার ফ্লাই করে হৈ রৈ শব্দে পুরো এলাকা মাতিয়ে তুলতাম। গোছল শেষে নিজেদের মসজিদে জোহর পড়ে দুপুরের খাবার খেতাম। খাবারের মেনুতে পুড়ানটে শাক, পুইশাক, ছোট ইচামাছ, নারকেলের মিশ্রণে বাইম মাছ, কোন কোন দিন মুরগীর গোস্ত, ডাল, খিচুড়ি থাকত। ঝালতরকারীর খাওয়াশেষে অবশ্যই দুধকলা মিশিয়ে ভাত খেতে হত। দুধ কলার পরিবর্তে কোন কোন দিন দুধ-আম, আবার দুধ আমের পরিবর্তে আমসত্ত্ব দুধে ভিজিয়ে ভাত দিয়ে মেখে খেতে হত।

আমার ভাগ্নেরা সাথে থাকলে খাওয়ার বৈচিত্র্য বেড়ে যেত। বিকেলে ছি বুড়ী, ফুটবল খেলে আবার সন্ধ্যাবেলায় একত্রিত হয়ে গল্প করতাম কখনো বা বানেছা পরীর কিচ্ছা শুনে রাত পার করতাম। এখন এসব কেবলই আনন্দ বেদনার স্মৃতি। আমেনা বুজি মারা গেছেন মধ্য শত্তুর দশকে। ভাগ্নেরা ঢাকায় থাকে। মাঝে মাঝে ওদের সাথে দেখা হয়, গেট টুকেদারও হয় কালেভদ্রে। এ জন্য আমরা মামুরা শত ক্রোশের তেপান্তরে। আমেনা বুজিকে আমি মনের ভেতরে লালন করি যার কোলে আমার কবিতার কৈতর পাখা মেলেছিল প্রথম।
তাকে নিয়ে আমার একটি কবিতা যা আমার কিশোর কলি কাব্যগ্রন্হে স্হান পেয়েছে :

আমেনা বু

তিনি আমার বোন ও
তিনি আমার মায়ের মত
তাহার কথা শোন।

বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে
কোলা ব্যাঙের ডাক
মধ্য রাতের ঝি ঝি পোকা
মনে দিত তাক।
ভুলিয়ে দিত ঘুম
লক্ষ মায়ের চুম।
তাহার কোলের চাদর থেকে
সুখ সারিদের সুরে
যেতাম উড়ে মন-যমুনার তীরে।

কাব্য-কলা যাদুর কাঠি চান্দী সোনার মোম
আমার গায়ে জড়িয়ে আছে আমেনা বু’র ওম।