হাসাম দিয়া স্কুলের রাজহাস

শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ ক্লাস অর্থাৎ ক্লাস ফাইভে আমি ফার্স্ট হয়েছি। হেড স্যার অনাথ বন্ধু কর্মকারের হাত থেকে গোল্ড পেন পুরস্কার পেয়েছি। এ খবর আশ পাশের স্কুলগুলোর মেধাবী ছাত্র ও শিক্ষকদের ভেতর কৌতুহল মিশ্রিত উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল। কেউ কেউ আবার ভেবেছিল হাসামদিয়া স্কুলের ফার্স্ট বয়ের সাথে প্রতিযোগিতা হলে আমি হেরে যাব তার মেধার কাছে। এ বিষয়টি আমার কানে গেল। আমি ফরিদপুর শহরের কোন স্কুলে ভর্তি না হয়ে কুমার নদীর ওপাড়ের হাসাম দিয়া স্কুলে ভর্তি হলাম। ফরিদপুর শহরে তখন আমাদের আরও একটি বসত বাড়ি ছিল। আমার জন্য শহরের ভালো স্কুলে পড়াশোনা করা কঠিন ছিলো না।

শেষ পর্যন্ত হাসামদিয়া ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। স্কুলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ শাহ জাফরের পিতা আলহাজ্ব আজিজ মুনশি সাহেব। ওই গ্রামের নকুল সাহা, তার বড়ো ভাই, ডাঃ ননীগোপাল সাহা, অমূল্য সাহা’সহ আরও অনেকে এই স্কুলের প্রতিষ্ঠা কালীন কমিটির সদস্য ছিলেন।

আমাদের হেড স্যার ছিলেন বাবু সন্তোষ গুহ। অন্যান্য শিক্ষক ছিলেন মাজেদ স্যার, কালীপদ স্যার, মৌলবী শিক্ষক মজিবর রহমান স্যার। মজিবর রহমান আমাদের বাড়িতে লজিংমাস্টার ছিলেন। আমার সহপাঠী হারুন ছিলো খুব চালাক চতুর। সে আমাকে ফোড়ন কেটে বলল, এই যে ফার্স্ট বয় আলীম সাহেব এইটা শ্রীনগর স্কুল না এখানের ফার্স্ট বয় সিরাজ। সে নাকি দারুণ ব্রেইনি। তার সাথে আপনার ফাইট দিতে হবে। এবার দেখবানে ক্লাস সিক্সে কে ফার্স্ট হয়। যুদ্ধে হেরে গিয়ে কিন্তু ভ্যাস্কায়ে যেও না। চেহারা মইজ্যার মার মত কইরো না আবার। আমি হেসে বল্লাম আমাকে হারানো এত সহজ নয়। উল্লেখ্য মইজা হল আমাদের পাড়ার কসিমুদ্দি মোড়লের প্রথম স্ত্রী, আজিজ মোড়লের সতালো মা। সে একটু পাগলাটে প্রকৃতির। সব সময় মুখ বিকৃত করে বিড় বিড় করে। কোন ছেলে মেয়েকে মজিত মোড়ল ওরফে মইজার মার সাথে তুলনা করলে ক্ষেপে যাবে। কিন্তু আমি হারুনের কথায় সেদিন চোটে যাইনি। কারণ হারুনও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে এরকম মাঝে মধ্যে আমার সাথে দুষ্টোমি করে। আরও অনেক বাল সুলভ আচরণ সে আমার সাথে করত। সমবয়সী, সহপাঠীরা যেমন করে থাকে, হারুন তার ব্যাতিক্রম নয়। আমি বরং মজাই পেতাম।

একদিন কালীপদ স্যার সিরাজ আর আমার মেধার পরীক্ষা নিলেন। আমাদের দুজনকে তাঁর সামনে বসিয়ে খুব কঠিন কয়েকটি অংক করতে দিলেন। আমি সিরাজকে হারিয়ে দিলাম। কালীপদ স্যার এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন এই জন্য যে তাদের সরাসরি ছাত্র সিরাজ সেরা না কি আমি যে অন্য স্কুলের ফার্স্ট বয়। সেদিন থেকে কালীপদ স্যার আমাকে সুনজরে দেখতেন। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায়ও আমি সিরাজকে টপকে শীর্ষে অবস্থান করলাম। সপ্তম শ্রেনীতে আমি ফরিদপুর হাইস্কুলে ভর্তি হলাম। কলেজ জীবনে রাজেন্দ্র কলেজে সিরাজ আবার আমার সহপাঠী হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি রসায়নে বিএসসি অনার্সে ভর্তি হয়েছিলাম আর সিরাজ ভর্তি হয়েছিল গনিতে বিএসসি অনার্স। পরের বছর সিরাজ বুয়েটে ভর্তি হল। আমি পিছনে পড়ে গেলাম। আমি অবশ্য বুয়েটে ভর্তির চেষ্টা করিনি। কারণ ইন্জিনিয়ারিং আমার কাছে ইন্টারেস্টিং ছিলো না। এর অনেক পরে আমার ছোট ভাই আবদুল্লাহ আমাকে সিরাজের কাছে পারমানেন্ট ভাবে পরাজিত করার ব্যাবস্হা করে। সে সিরাজের ভাতিজীকে বউ বানিয়ে বোগলদাবা করে ঘরে তুল্ল। বন্ধু সিরাজ মুহূর্তে আমার তালই বাবাজী হয়ে চেয়ারে বসে ঠ্যাং নাচাতে লাগল। সিরাজ আমাকে ফোন করে বল্ল দোস্ত থুক্কু বাবাজী আমি তোমার তালই বলছি।

বন্ধু বর সিরাজ জনাব তালই সাহেবকে এখন দেখলেই আগে ভাগে সালাম দেই। বন্ধু যদি রেস্তায় বড়ো হয় তবে মজাই আলাদা, আদব কায়দা থাক দূরের কথা দুশ্টোমিতে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। ছোট ভাই আবদুল্লাহ তুমি মোনালিসাময় যে হীরাখন্ড লভেছো, তাতে তুমি একাই লাভবান হওনি আমিও সিরাজাম মনিরার সৌহার্দে সুশোভিত হয়েছি।

আমার আরেক ক্লাসমেট নীরে অর্থাৎ নীরেন্দ্রনাথ সাহা না কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নয়। সে শুধু হাসামদিয়াতেই নয় ফরিদপুর হাইস্কুলেও সে আমার সহপাঠী ছিল। এখন সে ময়েনদিয়া বাজারে ঔষধের ফার্মেসি দিয়ে ব্যাবসা কাম ডাক্তারী করে। তার সাথেও আমার এক কর্মযোগ রয়েছে। আমি রসায়নে এমএসসি করে বিভিন্ন ঔষধ শিল্প কারখানায় ঔষধ বিশ্লেষণ, গবেষণা ও উৎপাদনের সাথে জড়িত আছি। সেই সাথে সতিনের মত জড়িয়ে আছে কাব্যচর্চা না আমার দই সতিনে ঠোকাঠুকি করে না-ঔষধ গবেষণা আর কবতে লেখা চুলোচুলি করে না তবে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা জানতে পরলে তাদের মেয়েকে অর্থাৎ চাকরিটাকে একপোশাকে নিজের অন্দরমহলে ঢুকিয়ে দেবে।

তাই ম্যানেজ করে চলছি, নিজের বউকেও ম্যানেজ করে চলতে হয় নইলে খাওন, শয়ন বন্ধ হয়ে যাবে। তবে আমার শয়নের চেয়ে খাওনের চিন্তা মশহুর। এ জন্য খোদাকে বলে রেখেছি তোমার দোস্ত পেয়ারে নবী হাবীবে জীগর হযরত মোহাম্মদ যেন দয়া করে আমার রেজেকে তার পবিত্র থু থু ছড়িয়ে দেন যাতে তুমি খুশি হয়ে আমার রেজেকের পুকুর সমুদ্র প্রমান করতে পার।

ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা খাতা দেখতেন মুজিবর রহমান স্যার। তিনি আমাদের বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থাকতেন। রাত্রে আমার ছোট ভাই আসাদ ও ছোট বোন হামিদাকে পড়াতেন। আসাদ ছোট বেলা থেকে মিনমিনে চালাক একটু চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে। সে কিভাবে যেন আমার বাংলা খাতার মান বন্টন দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল দাদা বাংলায় লেটার মার্ক পেয়েছে। রচনা লেখায় বিশের মধ্যে বাইশ পেয়েছে। এটা কী ভাবে হল তা বিভিন্নভাবে বিনয় মিশ্রিত উচ্ছ্বাসে মজিবর স্যারের নিকট জানতে চেয়েছে। উনি বলেছিলেন অয় বাংলা অংকে আশির ওপরে পায়, তর কি? অয়তো ফার্স্ট বয়। অয় সব স্যারের কাছে বাংলায় লেটার পায়। আমি ওরে রচনায় বিশে বাইশ দিমু তর কি।

আসাদও মেধাবী ছাত্র। ও ক্লাসে প্রথম দ্বিতীয় হোত। বাড়িতে ওকে আমি অংক করাতাম। সমাধান করতে দেরি হলে ওর নরম তুলতুলে কপোল দূ’আঙুল দিয়ে টেনে যতটুকু লাল করে দিতাম তার চেয়ে আমার আঙুলে লেগে থাকা ফাউন্টেন কলমে কালী বেশি কলঙ্কিত করত। আমি মাঝে মাঝে আমার এই অদ্ভুত শাস্তি প্রদানের কৌশলে জন্য অস্বস্তি প্রকাশ করতাম।

মায়াময় কপলের আমাদের স্হানীয় কথন টাউয়া। আমার আদরের ছোট ভাই আসাদকে গনিতে পন্ডিত বানানোর প্রবল ইচ্ছায় ওর অংকের প্রাকটিস করাতাম বারাবার। কিন্তু একটু ভুল হলে ওর টাউয়া প্রবল বেগে দুই আঙুলের চিপ্পা দিয়ে টান মারতাম যাতে ব্যাথা পায় আর ভয়ে অংক কষতে ভুল না করে। ও এতই নিবেদিত যে বারবার চিপ্পা খাওয়ার কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য তুলতুলে টাউয়া মানে কপোলে সরিষার তেল মেখে পিচ্ছিল করে রাখতো না। কারণ সেখপুরার ফকো ভাই অতূল খাঁ স্যারের ওই অদ্ভুত ভয়ংকর টাউয়া চিপ্পার শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে, টাউয়া মোবরকে পাকা সরিষার তেল মেখে যেতেন। তিনি অংকে কাচাঁ থাকলেও আত্মরক্ষার উপায়ে মোটেও উদাসীন ছিলেন না। অতুল স্যার ক্ষেপে গিয়ে শুধু বলতেন রাঙামূলোটা দিয়ে কিছু হবে না ও হল The donkey, একটা গাধা আসাদ বোধ হয় অমন করে ওই প্রজাতির প্রাণী হতে চায়নি। আমাকে রাগাতে চায়নি। আসাদও শ্রীনগর স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিলো। ও পরে হাসামদিয়া স্কুলের ছাত্র হয়েছিল। ওর সহপাঠী ছিল নজরুল। বারিক মুনশি চেয়ারম্যান সাহেবের পুত্র আমাদের শাহ জাফর ভাইয়ের ভাতিজা। তাকে স্কুলের সবাই ভাইজান ভাকতো। ছোটো বড়ো সকলেই। এটি তার নামে পরিনত হয়েছিল। সে স্কুলের ছাত্র বিষয়ক নেতা ছিল। জনদরদী আবেগী হৃদয় সে ধারণ করত। তাকে সবাই ভালো বাসতো। সেই সোনার টুকরো ছেলে মরণব্যাধি ক্যানসারে মারা যায়।

আমার ক্লাসমেট মেয়ারা ছিলো। তবে তাদের নাম এ মুহুর্তে মনে পড়ছে না। আমি ওই প্রজাতির সৃষ্টি থেকে একটু দূরে দূরেই থাকতাম। তবে শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েক জন মেয়ে সহপাঠী আমার প্রতি কৌতুহলী ছিলো। আমার ক্লাস মেট করুনা, যমুনা, প্রমীলা। নীচের ক্লাসের রচনা, সবিতা, অর্চনা, উপরের ক্লাসের চায়না দিদিমণিরা আমাকে কেমন যেন কার্তিকী কোয়াশার মত ঈশদোষ্ন মায়া মরীচিকায় পরিবৃত্ত করত। আমি অনেক পরে স্কুল ত্যাগ করার পরে বিষয়গুলো অনুভব করেছি।

হাসামদিয়া হাই স্কুল আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের স্কুল আর আমদের গ্রামের হাটখোলার হাইস্কুল তিন কিলোমিটার দূরের। তাই নিজগ্রামের স্কুলে ভর্তি হই নি তাছাড়া লেখা পড়ার মান হাসামদিয়া স্কুলের চেয়ে উন্নত ছিলো না। হাসামদিয়া স্কুলে আমার অন্যান্য ভাই বোন লেখাপড়া করেছে। আসাদ, ফরিদা, চন্দনা, সাইফ ও আবদুল্লাহ লেখা পড়া করেছে এই স্কুলে।

ফরিদা চন্দনাকে একা স্কুলে যেতে দোওয়া হত না। সাইফ আবদুল্লাহ ওদের অনেক ছোট হওয়ায় ওদের স্কুলের সাথী হতে পারেনি। আমার এই দুই বোনোর সাথে তাদের সহকারী, সাহায্যকারী হিসেবে ছিলো, খবিরুন্নেছা, জবেদা, সফেদা’সহ আরও অনেকে। তারা আমার বোনদের, বইয়ের ব্যাগ, টিফিনের নাস্তা বহন করত। মিয়া বাড়ির মেয়েরা যত কিশোরী, বা বড়ো হোক না কেন তাদের সহকারী ছাড়া বাইরে যেতে দেওয়া হত না। ওদের সহপাঠীরা স্কুলে একাকী যেত। এতে ওদের সাথে কেউ কখনও বিরূপ আচরন করেনি।

নজরুলের বোন ফরিদা আমার বোন ফরিদা চন্দনার বান্ধবী ছিল। ওরা অনেক বার আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। হেডস্যার সন্তোষ গুহ মহাশয়ের মেয়ে বিউটি, পুত্র অলোক, অশোক, ডাঃ কার্তিক দার ছেলে
মেয়েরা আমাদের বাড়িতে ঈদ উপলক্ষে বেড়াতে এসেছে। আমার মা বাবা এবং আমার বোনের বড়ো ভাইয়েরা এতে খুব খুশি হতাম। ওদেরকে ঈদের দিনের কোর্মা, পোলাও, ফিরনি জর্দা খাইয়ে পরম তৃপ্তি লাভ করতাম। আমার বোনেরা এবং আমরা ভাইয়েরাও ওদের বাড়িতে দূর্গাপূজা, লক্ষী, স্বরসতী পূজা উৎসবে অংশ নিতাম।

মাজেদ স্যার আপাদমস্তক ভদ্রলোক ভদ্র ব্যাবহারের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ক্লাসে স্মিতহাসির মিষ্টি চাঁদ ফুটিয়ে আমাদের ইংলিশ পড়াতেন। অনেক যত্ন করে ইংলিশ গ্রামার বোঝাতেন। সন্তোষ গুহ স্যার প্রমিত বাংলা উচ্চারণে চমৎকার করে বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। এক জন উসকো খুস্ক চুলের বৃদ্ধ হিন্দু গনিতের শিক্ষক ছিলেন তখন। তিনি শীতের দীনে মাঝে মধ্যে আমাদের নির্বাচিত দু’চার জন ছাত্রকে স্কুলের মাঠে বসিয়ে গনিতের জ্যামিতি অংশ চমৎকার করে পড়াতেন। তিনি জ্যামিতির জটিল প্রমাণ মাঝে মাঝে তার চুলের মধ্যে হাত চালিয়ে কি এক উদাস আচরণের মাধ্যমে সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন। আমি তাকে মনে মনে আইস্টাইন ভেবে সুখ পেতাম। সেই শিক্ষকের নাম আজ মনে পড়ছে না।