আমার আঙিনা : ও টগর ও রজনীগন্ধা

আমাদের দোতলা ঘরের পশ্চিম উত্তর কোনের রুমটা ছিলো আমার জন্য বরাদ্দ। এ রুমে আমি লেখা পড়া করতাম। এখানে আমার পড়ার টেবিল চেয়ার, বইয়ের আলমারি, একটি চৌকি ছিল। চৌকিতে আমার ঘুমানো র ব্যাবস্হা ছিলো। রাত্তিরে এখানে ঘুমাতাম, পড়ার লেখার ফাঁকে ফাঁকে বিছানায় রেস্ট নিতাম।রুমের বাইরে ছিলো ফুলের বাগান। বাগানের বিভিন্ন রকমের ফুলের সুঘ্রাণ আমার নাসারন্ধ্রে সুড়সুড়ি দিত।এক অনন্ত আনন্দ জোছনার খোশবুতে আমার হৃদয় ভরপুর করে দিত। রুমের পাশের রুমটি ছিলো বৈঠক খানা
এই রুমের সামনের অংশ জাফরি কাটা লোহার নকশি করা বেড়ায় মানি প্লান্টের জড়োয়া ঝোপের বাহারি পাতার পাতাবাহারের মৌতাতে ঘুলি ঘুলি জোছনার
মায়া হরিণীর নান্দনিকতা মেঘ ছড়াতো।
আব্বা এই জোছনালোকের স্নিগ্ধ পরশে নিবিড় চিত্তে কখনো সাহিত্যের বিভিন্ন বই পড়তেন, কখনো আব্দুল হাকিমের কোরানের তফসির পড়তেন, আবার কখনও বা গ্রামের কারও কারও সাথে বিভিন্ন আলাপচারিতায়
মগ্ন থাকতেন। আব্বা পরম মমতায় এই ঘরের বাহির বাড়ির অংশে দৃষ্টি নন্দন দুটি ফুলের বাগান করেছিলেন। বাগানে সূর্যমুখি, অফিসফুল, হাস্নাহেনা, বেলীফুল, টগর, রজনীগন্ধা প্রভৃতি ফুলের ফ্লোরিকালচারের কাজ আব্বা তার কর্মসহকারী কালুমোল্লা কখনও বা লালুকে দিয়ে সম্পাদন করতেন।
বৈঠক খানার ডানপাশের ফুলবাগানে অবশ্য আগে থেকেই স্বতস্ফুর্ত ভাবে একটি জাম্বুরা গাছ, একটি কাঠাল গাছ সগৌরবে মাথা তুলে বসবাস করছিল।বাপাশের বাগান ছিলো একটুঅপ্রস্হ শুধু হরেক রকমের পাতাবাহার গাছের সম্মিলন। সেখানে অবশ্য একটি নারকেল গাছ ও কাঠাল গাছের সবুজ হাতছানি
এড়িয়ে যাবার উপায় ছিলো না। দু দন্ড তাদের সাথে ভাব বিনিময় করতেই হত যে কাউকে।
আমাদের দোতলা ঘর পেরিয়ে একটু সামনেই পশ্চিম দিকে আছে আলাদা কাচারি ঘর বা সতন্ত্র বৈঠক খানা
এখানে মহল্লার এবং গ্রামের বড়ো শালিস বৈঠক, একান্ত মিটিং সিটিং হয়ে থাকে।(চলবে)
আমাদের বাড়িতে দুটি কাচারি ঘর ছিলো। এখন একটি ঘরে ও সামনের খোলা স্হানে টেবিল চেয়ার বেঞ্চ বসিয়ে দরবার পরিচালনা করা হয়। আমার বালক বয়সে প্রায় মাস দিবসে ছোটো বড়ো দরবার হতে দেখেছি আব্বার নেতৃত্বে। এখন এসব বৈঠকাদী ছোটো ভাই হাফেজ শাহ হাবিবুল্লাহার পরিচালনায় হয়ে থাকে।
কাচারি ঘরের সামনে একটি বিশাল নিম ও জাম্বুরা বা ছলমের গাছ ছিলো। পেছনে নারকেল ও সুপারি গাছের
ঘন বেষ্টনীর মধ্যে ঘুপচি মেরে দু একটি আমাগাছও গাবগাছের নিশ্চিন্ত সংসার চলেছে। আমি মাঝে মধ্যে কাচারি ঘরের ভেতর অলস সময়ে অনেককে সাপ লুডু, সাতগুটি বাঘ বন্দী, হরতন রুহিতনের চকচকে সোল্লাসে উত্ফুল্ল হতে, দেখেছি। কাচারি ঘরের পশ্চিম দক্ষিণ দিক দিয়ে গ্রামের প্রধান পাকা সড়ক চলে গেছে। সড়কের দু পাশেই সারি বদ্ধ ভাবে তাল, নারিকেল, আম,সুপারি গাছের সবুজ নিবিড় আচ্ছাদন এক মোহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
কাচারি ঘরের পশ্চিম উত্তরে রয়েছে আমাদের একতলা পাকা মসজিদ। এটি আমাদের বাড়ির জমিতে ওয়াকফো করা মহল্লারই মসজিদ। প্রথমে এই মসজিদের ডোনার ছিলেন রাজেক মামা এবং আমার
পিতা। তখন মসজিদ সংলগ্ন ফাঁকা স্হানে ফুলের বাগান ও নানা রঙের পাতা বাহারের বাহারি মিলন মেলা ছিলো। নামাজ শেষে কেউ কেউ খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে বিভিন্ন আলাপচারিতায় মেতে উঠতো।
বাড়ির পূর্ব পাশে রয়েছে প্রায় দুই একরের বাগান বাড়ি।
বাড়ির পূর্ব পাশের গেট পার হলেই স্মৃতিময় টলটলে স্বচ্ছতোয়ার তালাব বা পুকুর। পুকুর পাড়ে রয়েছে নানাজাতের ফল ফলাদীর বাগ বাগান।আম, জাম, লিচু, কুল বরই, বেল, কদমি করঞ্জা, বাতাবিলেবু,জাম্বুরা প্রভৃতি ফল গাছের মিলন মেলা রয়েছে পুকুর পাড়ের সরনি সরন্দীপে। জৈষ্ঠ্যমাসে এসব গাছের ফল ফলাদি পেড়ে নিতে দারুণ ব্যকুল হয়ে যেতাম। কোন কোন ফলের গাছ বেয়ে পরমানন্দে
ফল পেড়ে নিয়ে গাছের তলাতেই খাওয়া শুরু করতাম। চিকুন বাঁশের কোটা দিয়ে আগ ডালের আম, জাম লিচু পেড়ে নিতাম। কখনোবা মহল্লার আজিজ মোড়ল, মাজেদ ফকির, রাশেদ ফকির,পান্নু, লালু,বুড়া,প্রমুখের সহযোগিতা নিয়ে বাগানের ফল পাড়া হোত।
পুকুর পাড়ের পরেই আরও ফলফলাদি, আম, জাম, সুপারি,নারকেল, গাছের ঘন বাথান। এখানে আমার বালক বেলার দূরন্ত অথচ নিবিড় নিঃশব্দ সময়
পার হয়েছে। আমি শিশু বেলাতে এই বাগান বাড়িতে খেলার সাথীদের নিয়ে কখনও বা একাকী কোন গাছের নীচে, কখনও বা সেখানে বেড়ে ওঠা টগর ফুলগাছের
পাশে কি এক অব্যাক্ত আনন্দ জোছনায় ভিজে যেতাম।
মা আমাকে সারা বাড়ি খুঁজে অবশেষে এখানে এসে পেতেন।
কখনও কখনও মধুচারা আমের রসে আবার কখনও ধলাসে আমের মিষ্টি মধুর রসে প্রাণ ভরে সুস্বাদু মাখন
মমতা মাখিয়ে ভরিয়ে জড়িয়ে নিতাম। আহা সেই সোনা
মাখা দিন গুলো এখনো আমার বুকের পুকুরে শোল গজার মাছের উচ্ছলতা সৃষ্টি করে। আমাকে হাতছানি
দেয় বর্নালী অতীত।
আমার একটি বৈশাখী কবিতা মনে পড়ছে :

এলোমেলো বৈশাখ
ঝড়ো বৈশাখ
হৈ রৈ ঝান্ডা পঙ্খীর পাখ।

আম পাকে জাম পাকে
পাকে কত ফল
বৈশাখে মধুমুখ ইতল বিতল।
বৈশাখ বৈশাখ
চারদিকে হাকডাক।
ফুল ফলে ভরা থাকে বৃক্ষের শাখ
আদর সোহাগ করে ভাই বলে ডাক।
বৈশাখ বৈশাখ
চিরকাল সুখে থাক।

আমাদের পুরান বাড়ির ভিটা, পুকুর, পুকুর পাড়ের অাম কাঁঠাল বাগান, বিভিন্ন রকম গুল্মলতার ঝোপ,দরগা তলার আল্লাহর নামে শিন্নির মোরগ মুরগী আমাকে
বারবার তাড়িত করে শেকড়ের সৌগন্ধে হারিয়ে যেতে।
সব সময় পুরান বাড়ির টান থাকলেও বৈশাখ জৈষ্ঠ্যমাসে কাউকে না কাউকে সাথে নিয়ে আম কাঠাল
সংগ্রহ করতে যেতাম।
আমাদের পুরান বাড়ির পুকুর পাড়ের ঘন জঙ্গলের বাথানে চুপুড়ে আমগাছ, দুধখিস্যের আমগাছ, অদূরে সিদূরে আমগাছ, ফজলিআমগাছ, আনারসে আমগাছ , খাজা কাঁঠাল গাছ,গইজাকাঠাল গাছ, হাজারীকাঠাল গাছ প্রভৃতি ফল ফলাদিতে ভরপুর ছিলো। এই ফল ফলাদি আমরা পুরো জৈষ্ঠ্যমাস আাষাঢ় মাস ভরে ভোগ করতাম। এখানে কিছু ফলগাছের নাম করনের ব্যাখ্যা দিলে বিষয়টি উপোভোগ্য হবে।
চুপা বা টক স্বাদের কারণে চুপুড়ে আম নাম হয়েছে। এই আমের ওজন প্রায় আধাকেজি পরিমান টক মিষ্টি মিশ্রণে একটি, আকর্ষণীয় সুগন্ধিতে পরিকীর্ণ।
ফজলি আম দারুণ মিষ্টি ও আকর্ষণী সৌগন্ধের, এ জাতীয় আম আশ্বিন মাসে পেকে খাওয়ার উপো যোগী হতো। সিদূরে আম সিদূরের মত লাল টকটকে রঙের ও মিষ্টি স্বাদের ও অন্যএক মনোহরা সুগন্ধিযুক্ত।
খাজা কাঁঠাল শক্ত ও নরম জাতীয় মিষ্টি সুগন্ধময় সুস্বাদু। গইজা কাঁঠাল মুলত খচখচে গজগজে মিষ্টি, সুঘ্রাণ ময় সুস্বাদু যুক্ত।হাজারী কাঁঠাল আকার আকৃতিতে ছোট এবং গাছে হাজারের কাছাকাছি এদের ফলন। এ কাঁঠাল খেতে দারুণ মজাদার।
পুরান বাড়ির ভিটা ও সেখানের ফলের বাগানে যেতে আগে সাথে দূ চার জন সাথী ও বয়সে বড়ো মানুষ নিয়ে
যেতে হত।কারণ ওখানে যাওয়ার পথটি ছিলো একধরনের ভয় ও দূর্গমতা মেশানো। ভুত প্রেতের অস্তিত্ব না থাকলেও শিশু কিশোরদের মনে এ জাতীয় ভয় সামাজিক ভাবে পারিবারিক ভাবে আমাদের চল
রয়েছে। দূ পাশের ঘন সন্নিবিষ্ট বাঁশ বাগান, তার মধ্যে জারুল, দেবদারু, ছাতিম, জটাজুটধারী, পরগাছা মিশৃত বুড়ো আমগাছের বাগানের ভেতর দিয়ে নীচু নালার মত হালোটের পথই ছিলো একমাত্র রাস্তা- যা পেরিয়ে নিমেষে পৌঁছে যাওয়াই ছিলো একমাত্র চেষ্টা।
বাঁশঝাড় সমৃদ্ধ বাগানে হালোটের মাঝ পথে গেলেই কর্ণকুহরে প্রবেশ করতো রাজ্জির ভুতুড়ে শব্দ – ক্যাক কুর কুর কুর্রুত- ক্যাক ক্যাক, ক্যাচ-ক্যাচ-,ক্যাচ,কট-কট-কট,কুট কুট কুট -কুট্টুস, খ্যাচ-খ্যাচ,খট খট খট,খট্টাস-খ্যাট।আবার শোনা যেত শো শো শো শউ,শউ,শউ, শ্যাট-শ্যাট-শ্যাট,শট,টট-ঠট-টট-ঠট,ট্যাট-ট্যাট,ঠ্যাট,ঠট,শট,শাট। এখন এই ভুতুড়ে বাগানটি বসত
বাড়িতে প্রায় ভরে গেছে।এখন হালোটের নালাপথ পিচঢালা সড়কে শৃঙ্খলিত হয়েছে। এই বাগানের কিছু জমিন কোন কোন ভুমিহীনদের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে।
আমাদের বাড়ির প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে কুমার নদীর পাশ দিয়ে চরের জমি ও তার পুবে দোয়ালের জমিন রয়েছে। দোশালে ধান পাটের জমি প্রায় বিশ একরের মত। চরের পর আরও পনেরো একর জমি রয়েছে। এসব জমির মধ্যে আম জাম লিচুর বাগান প্রায় পাঁচ একর এবং মেহগনি গাছের বাগান প্রায় আরও পাঁচ একর হবে।বাকি জমিন ফসলি ক্ষেত। মেহগনি বাগান নতুন করা হয়েছে, এর পূর্বে এ জমিন খেজুর বাগ ছিলো।(চলবে),
চরের পর খেজুরগাছের বাগান আমার জন্মের পর থেকে দেখে এসেছি। শীতের সময় মিঠে খেজুর রস খেয়েছি অনেক।এই রসে মুড়ি মিশিয়ে গ্লাস গ্লাস খেয়েছি কত। আমাদের বাড়ির পাশে রাস্তার পাড়েও অনেক খেজুর গাছ ছিলো। পৌষ, মাঘ মাসের ঠকঠক শীতের ভেতর গায়ে মোটা চাদর পেচিয়ে রোদে বসে আসুদা পুরন করে কত যে সুগন্ধি মিঠে খেজুর রস খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। শীতের দিনে খেজুর রসের জাউ,ফিরনি,নারকেল গুড়ি মেশানো খেজুরের পাটালি গুড় দিয়ে রশনা পুরন করেছি।আবার আশ্বিন কার্তিক মাসে এই খেজুর গাছের পাকা খেজুর খেয়ে পরাণ ভরেছি। অথচ এখন আর আমাদের এলাকায় বড়ো বেশি খেজুর গাছ দেখা যায়না।আমাদের খেজুর বাগান পুরান হয়ে ফলন কম হয়ে যাওয়ায় এখন সেটা আম কাঠালের বাগান ও মেহগনি বাগানে পরিনত হয়েছে
এ জন্য কৃতিত্ব দিতে হয় ছোট ভাই সাইফ, আবদুল্লাহ ও সর্বোপরি শাহ হাবিবুল্লাহকে।
বাড়িতে গেলে অনেক সময় এসব বাগ বাগিচা ও ধান পাটে, রবিফসলের ক্ষেত খামার ঘুরে দেখি আর সোনালী অতীতের বর্ণাঢ্য জোছনায় হারিয়ে যাই।
আমার মনের মণিকোঠায় বাবার সাজানো গোছানো বাড়ির ফুল কাননের ফুল পরীরা নৃত্য করতে থাকে।
আমি যেন রাজকুমার ফুল কাননের সুঘ্রানে মাতোয়ারা হয়ে বলতে থাকিঃ
ও টগর ও রজনীগন্ধা
তুমি মুখ ফিরিয়োনা
এখনি নামবে সন্ধ্যা
পাখিরা কোলায় যাবে
সূর্যের লাল আবিরে
চাঁদের চন্দ্র কথায়
ঘুচবে কাল বন্ধ্যা।
তোমার খোশবু দিয়ে
আমাকে মাতাল করোনা
আমি যে কাকবন্ধ্যা।
ও টগর ও রজনীগন্ধা
তুমি এসোনা নিলয়ে
এখনি হারিয়ে যাবে
গোধুলি সন্ধ্যা।