সোনার নোলক : ধান পাটের কড়চা

কৃষি প্রধান আমাদের দেশ।প্রায় প্রতিটি গ্রামেই ধান পাট ও রবি ফসলের আবাদ হয়।আমাদের গ্রাম এর ব্যাতিক্রম নয়।আমার শৈশব ও কিশোর বেলার সিংহ কাল কেটেছে গ্রামের বাড়িতে ফুল ফসলের মিষ্টি ঘ্রাণে।
আমার বাবা মার সংসারে ছিলো ধান, পাট, তিল, তিশি, রাই সরিষা মটর শিম, আর নানাজাতের আানাজ পাতির উল্লাস। বাড়িতে পাঁচ ছয়জন বান্ধা কর্মী, আার ফসলের মৌসুমে ছিলো প্রায় শতজন কৃষান-কামলার আড়ং। আমি খুব নিবিড় ভাবে তাদের কর্ম কসরত দেখেছি। অনেক সময় বিভিন্ন ভাবে তাদের অবজার্ভার দিলাম, যদিও তাদের পরিচালনার জন্য আমাদের নির্দিষ্ট ম্যানেজার ছিলো। এই সব ম্যানেজারদের মধ্যে আদেল, শাজাহান ও কালুমোল্লার নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে। এদের কেউ কেউ ম্যানেজার কাম কর্মসদস্য ছিলো।
আমাদের বিভিন্ন জাতের ফসল বিভিন্ন উচুজমি, নীচুজমি, কুমারনদীর কোলচরী, বিভিন্ন নামের দোপ বা দোয়াব,বিল ও সমতল ভুমিতে উত্পাদিত হত।
নিজগ্রামের দোয়াল নামীয় দোপ, চরের জমি, চৈতার দোপ, কালীর দোপ বা কাইল্যার দোপ, ডাঙ্গীর নামো, কাটাওদের জমিন বা কাটা হ্রদের জমি, ঢোনের জমিন, কারিকর মহল্লার শিঙ্গীর দোপের জমিন, ময়েনদিয়া চকের জমিন, পরমেশ্বর্দীগ্রামের বিলের জমিনসহ আরও অনেক এলাকা ভিত্তিক নামীয় জমিনে আমাদের জমিন আছে। এসব জমিনের বেশির ভাগ জমি বিভিন্ন লোকদের আধি বা বর্গা চাষের জন্য হাওলা করা হত। নিজেদের চাষে রাখা হত মাত্র পঞ্চাশ একরের মত জমিন। এসব জমিনের চাষের ফসল, আধি জমিনের ফসল উতপাদন ও ফসল তোলার কাজে আলাদা লোক নির্দিষ্ট করা হত। এসব কামলাদের স্হানীয় ভাষায় দাওয়াল বলা হত।
দাওয়াল কামলারা অন্য কামলা থেকে আলাদা মর্যাদার ছিলেন। এরা কর্মে দক্ষ, শক্তিশালী, সত, ন্যায়বান, দামী ও চৌকস প্রকৃতির। আমাদের এলাকায় ধান পাট নিড়ানির সময়, বাছ পাট কাটার সময়, ধান কাটার সময় জমিতে কৃষকেরা কড়চা ও দোহাঁ পরিবেশন করত।এতে তাদের কর্মস্পৃহা বেড়ে যেত, কাজের একঘেয়েমি কেটে জড়তা দূর হয়ে যেত। আমি পড়াশোনার অবসরে আমাদের কৃষানদের ফসলকাটার দৃশ্য ও এ সব গান শুনতে সেখানে যেতাম।
আব্বা অবশ্য আমাকে তাদের কাজের তদারকির জন্য পাঠাতেন। উদ্দেশ্য ছিলো মিয়ার বেটাকে দেখে বেটারা ভয়ে ঠিক মত কাজ করবে। আব্বার এ উদ্দেশ্য অনেকটা পুরন হোত,আমাকে দেখে তারা অহেতুক গল্পগুজবে, বিড়ি টানা ও হুক্কা খাওয়ায় মেতে থাকতো না। তবে মিয়ার বেটাকে পটিয়ে তারা কখনও কখনও গল্প করত, কড়চা ও দোহাঁ বা ধুয়া গানে সপ্তমে সুর চড়াতো। মিয়ার বেটাকে আগেই বোঝানো হত কড়চা আর ধুয়া গানে কাজের গতি বেড়ে যায়। এ জন্য আমাকে কষ্ট করে গতি বিদ্যা আয়ত্ত করতে হয়নি। আসলেই বাছাধনেরা ধুয়ার সুরে বেহুলা সতির সাপের দংশন দিত না বরং মনষা দেবীর সর্প ভজনের মনভঞ্জন করত। আমি তাদের গানের মর্মার্থ না বুঝলেও মর্মমূলে বালক চিত্তের উন্নাসিকতা সৃষ্টি হত। কড়চা হল ছোট্ট ছোট্ট পদ্য বা খন্ড খন্ড পদবন্ধে সংখিপ্ত জীবনাচারন। বৈঞ্চনব সাহিত্যে অনেক কড়চা রয়েছে। মধ্য যুগের গোবিন্দদাসের কড়চা এক্ষেত্রে উল্লেখ যোগ্য। আামাদের এলাকায় ধুয়া গান অনেকটা দোহাঁ কবিতা বা দোহাঁ গানের মত। দোহাঁ হল মধ্যযুগে অপভ্রংশ ও হিন্দি ভাষায় প্রচলিত দুই চরণের ভাব কবিতা। কবীর হিন্দিতে দোহাঁর সার্থক স্রষ্টা। কবীরের কয়েকটি দোহাঁ:
০১.
মো কো কাহা ঢুণ্ঢে রে বান্দে
ম্যায় তো তেরে পাস
না মন্দির পে না মসজিদ পে
না কোয়ি অনন্ত নিবাস মে
য্যায় সে তিল মে তেল হোয়ে
য্যায় সে চকমক মে আগ
তেরা সাই তুঝমে হ্যায়
তু জাগ সাকে তো জাগ।

অর্থাৎ কবীরের এই শিক্ষা যে ঈশ্বর বা আল্লাহ কোন মন্দির বা মসজিদে থাকেনা। কোন ধামে থাকে না। যেমন তিলে তেল থাকে, চকমকিতে আগুন থাকে তেমনি মানুষের মধ্যে আল্লাহ বা ঈশ্বর বসবাস করেন।

০২.
হিন্দু কাহে মুঝে রাম পিয়ারা
তু কা কাহে রহমানা
আপোস মে দো লড়ে মুয়ে
মরম না কোয়ি জানা।

অর্থাৎ, হিন্দু বলে রাম আমার উপসনার, মুসলিম বলে বলে রহমান আমার। তারা দুইয়ে ধর্ম নিয়ে লড়াই করতে করতে আাসল সত্য ও স্রষ্টার মর্ম বুঝতে পারে না। বাংলায় কিছু ধুয়া বা দোহাঁ ও কড়চা আমার মনে ঘুলিঘুলি জোছনার রহস্যময়তা সৃষ্টি করে। যেমন:

০৩.
চোখের আড়ে ঘুলায় সকল রে
মনের আড়ে শামায় না,
চুলের আড়ে পাহাড় লুকায় রে
মনের আয়নায় লুকায় না।
ও সখি লো আমায় তুমি
কান্দাইয়া কোথায় গেলে গো
মনের মধ্যে আছ সান্ধাইয়া
শামাইতে পারলা না গো।

আমার ছোট বেলা অর্থাৎ ষাটের দশকে আমাদের ধানের জমিতে আউস ও আমন এই প্রকার ধানই প্রধান ছিলো। আমন ধানের আবার আলাদা আলাদা চিত্তাকর্ষক নাম ছিলো এই যেমন : লক্ষীলতা, পরাঙ্গী, নলচ, কালোবাউশ, বউপাগল, দীঘা। তবে বাসমতী ধানেরও আবাদ হত। এখনকার দিনের মত বরো, ইরি, বারি, ধানের চাষ হত না। এখন ধান বীজ করপোরেট ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। প্রতি বছরই বীজ ধান তাদের নিকট থেকে চড়া দামে ক্রয় করতে হয়। আগে কৃষকের বাড়িতে বীজধান পাওয়া যেত। ধান বীজ ছড়ানো পর চারা গজালে বৈশাখী বৃষ্টির ওপর ধানের ভাগ্য নির্ভর করতা এখন সেচের মাধ্যমে জমিতে প্রয়োজনীয় পানি দপয়া হয়। আল্লাহর দেয়া বৃষ্টির পানিতে যে ফসল হত তাতে কৃষকের খাদ্যাভাব হত না। অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টিতে ফসলের কাঙ্ক্ষিত পরিমাণের আবাদ হত না। খরাপীড়িত, বন্যাকবলিত এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিত।
আউস ধান একটু আগেই অর্থাৎ আষাঢ় শ্রাবণ মাসে জমি থেকে সংগ্রহ করতে হত। ধান কাটার পর মাড়াই দিয়ে খড় বিচালি থেকে ধান আলাদা করা হত। এর পর বীজ ধান কিছু পরিমাণ আলাদা করে খোরাকি জন্য বাকি ধান সেদ্ধ করে রৌদ্রে শুকানো হত। অনেক সময় টানা বৃষ্টির কারনে রোদে শুকাতে না পারলে পুরো ধান পচে যেত। কৃষকের মাথায় বাড়ি পড়ত।
কিন্তু আমন ধানের কপালে এ দূর্গতি ছিলো না। আমন ধান অগ্রহায়ণ পৌষ মাসে জমি থেকে তুলতে হত। মাড়াই, সেদ্ধকরা, রোদে শুকানো এর কোন স্তরে বৃষ্টির বালাই হত না।
পৌষ মাঘ মাসে আমন ধান কাটা হয়। এসময়ে আবহাওয়া শুকনো থাকে। ফলে ধান কাটা, মলনদেয়া বা ধান মাড়াই, ধান সেদ্ধ করা, রোদে শুকানো, খৈলানে সেই শুকনো ধান কুলায় করে বিশেষ কায়দায় বাতাসে ঝেড়ে ছোট্ট খড় অন্য আবর্জনা আলাদা করার কসরতে কোন অসুবিধা হয় না।
আমাদের নিজ চাষের জমিতে এবং বর্গা দেওয়া জমিতে আমন ধানের আবাদ বেশি হত। এ জন্য এ সময়ে আমাদের বাড়িতে বিরাট কর্ম যঞ্জ শুরু হত পুরো বাড়িতে একটা কর্মকুশলের আনন্দ জোয়ার বইয়ে যেত। এই বিরাট কর্মপ্রকৃয়ায় তিন স্তরের কর্মীসহযোগী নিয়োগ দেয়া হত। আমার আব্বা এ সময় এসব কাজের দায়িত্ব দিতেন বাড়ির ম্যানেজার সাজাহান, কালুমোল্লা অথবা লাল্লু সমাদ্দরকে। সমগ্র কাজ সুচারুভাবে সম্পাদন করার জন্য প্রথম ধাপে জমি থেকে ধান কাটার জন্য বিশ পচিশ জনের একদল চৌকশ দাওয়াল ঠিক করা হত। চাকরিতে কর্মী বা অফিসার নিয়োগের জন্য যে ভাবে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, এখানেও সেই পদ্ধতি অবলম্বন করা হত।তবে বিষয়টি ছিলো বেশ ইন্টারেস্টিং বেশি লেখা পড়া জানলে সে অযোগ্য বলে বিবেচিত হত। তবে এদেরকে কর্মে দক্ষ, শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত অবশ্যই হতে হত। কাজের জন্য কোন টাকা মুজুরী হিসেবে দেওয়া হত না। এরা আপখোরাকি ও জমির উত্তোলিত ফসলের ভাগীদার হত। জমি থেকে ধান কাটা, ধানের আটি বা বোঝা মাথায় করে গৃহস্তের বা মালিকের বাড়ির উঠোনে গাঁদি মেরে রাখা, সপ্তাহ অন্তে সেই ধান মলন দেয়া বা ধান মাড়াই দেওয়া, এর পর ধানবীজ পৈকায় করে মেপে মালিকের অংশ বুঝিয়ে এবং নিজেদের ভাগও তদ্রুপ মেপে নেওয়া ছিলো দাওয়ালদের কাজ। বাড়িতে ধান মলাই ও ধান, ভাগ করার সময় আমি ম্যানেজারদের সাথে অতিরিক্ত পাহারাদার কাম উত্সাহী দর্শকের ভুমিকা পালন করতাম মাঝে মাঝে।
আব্বা বাড়িতে থাকলেও অধিকাংশ সময় এতে তিনি সম্পৃক্ত হতেন না। তবে কয়শ পৈকা ধান আমরা পেয়েছি আর দাওয়ালেরা পেয়েছে কত পৈকা তা আমার নিকট থেকে শুনে নিতেন।আমি এসবের হিসাব আলাদা খাতায় লিপিবদ্ধ করতাম। এই হিসাব নিকেশের জাররা জাররা আমাকে যত না আকর্ষণ করত তার চেয়ে দাওয়ালদের ধান মলন দেয়ার সময় গরু খেদানোর মনোরম কৌশল বেশি আকৃষ্ট করত। ধান মলন বা মাড়াইয়ের কাজে আট দশটি গরুর গলায় দড়ি বেধে সাজোড়ে তাদের একটি গাছের শক্ত খুঁটিতে বেধে বৃত্তাকারে ঘোরানো হত।
গরুগুলোর পায়ের নীচে পিষ্ট হত পালান মারা ধানেরগাছের দঙ্গল। এতে ধান গুলো ধানগাছের আলতো বোটা থেকে ঝরে পড়ত। তবে বিষয়টি এত সহজ নয় গরুবৃন্দের এক নাগাড়ে ঘন্টা খানেক বৃত্তাকারে ঘুরতে হত। গরুদের বৃত্তাকরে ঘোরাতে উত্সাহী শক্তিমন্ত যুবক শ্রেনীর দাওয়াল নিযুক্ত করা হত। একাজ অত্যন্ত আনন্দের সাথে সম্পাদন করত হোসেন মোল্লা, শুকুর সেখ, মকো, আকোসহ আরও অনেক করত। তবে এখানেও গনতান্ত্রিক প্রকৃয়া চালু ছিলো।
ধান মলন দেয়ার সময় বৃত্তাকারে গরু ঘোরানোর কাজ বেশ পরিশ্রমের। পালাক্রমে সকল দাওয়ালরাই এ কাজে অংশ গ্রহণ করত। তবে তাদের ভেতরের লিডার বা মাতব্বর সর্বশেষে গরুঘোরানোর কাজ করতেন। আমি মালিক পক্ষের খুদে পাহারদার মিয়ার বেটা মিয়া কাচারির বারান্দায় চেয়ারে বসে বাড়ির বহিরাঙ্গনের খলটে বা উঠোনের এই কর্মকান্ড যতটা না নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম তার চেয়ে তাদের গরুঘোরানোর সময় গুরুর গায়ে কখনো বাঁশের নড়ি দিয়ে খোচানো, মৃদু কঠিন বাড়ি মারার নিৃর্মমতায় বিদীর্ণ হতাম। কখনও বা নড়ি দিয়ে গরুর গায়ে বাড়ি মারার সময় বা খোঁচা দেওায়ার সময় দাওয়াল সোনা মুখ ভেংচি দিয়ে বা মুখের আকৃতি বিবর্তন করে গরুর প্রতি যে অদ্ভুত আওয়াজ করত যেমন হুত-হু-হু-হু, হৈ-হৈ-হৈ, হুররে-হুর-রুর-রুর-হুররে। আ-লো-দেকছনি। আররে যা-যা-যা-দৌড়, হুর-হুর-রে-রে-রে। ইশশি-রে, আলো-যা-যা,দৌড়, দৌড় হুহ্, হু, হুট-হুররে। এ রকম অদ্ভুত সুন্দর নতুন নতুন অনুকারময়, ধ্বনিব্যান্জনা তারা সৃষ্টি করত, তা তারা কোন ধ্বনিতত্ত্ব পড়ে শিখেনি বরং নিজেরাই এর স্রস্টা। আমি বিস্ময় বিমুগ্ধ চিত্তে তাদের ওই আনন্দময় ধ্বনিআবৃত্তি উপভোগ করতাম।
ধান মলন শেষে খড় কুটো পরিষ্কার করে তারা বেতের তৈরি পৈকা দিয়ে ধান মাপত অর্থাৎ কত কেজে কত মন হয়েছে তার পরিমাপ করত। তখন পালা পাথরের মাধ্যমে জিনিস পত্র ওজন দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও এই পৈকার সহযোগিতা নেওয়া হত। পৈকা হল আমাদের এলাকায় বেত দিয়ে ঋষিরা ধান চাল মাপার যে বিশেষ পাত্র যার আকার আায়োতন বেতের শের এর চেয়ে বড়ো এবং বেতের তৈরি ধামার চেয়ে ছোট যার মধ্যে প্রায় দশ কেজির মত ধান ধরানো যেতো।
দাওয়ালরা এই পৈকার মাপের সাত ভাগের এক ভাগ পেত। ধান মাপার সময় দাওয়ালের মধ্যে একটু চতুর প্রকৃতির লোক এই মাপ পরিমাপের কাজে নিয়জিত হত। তারা ধান মাপার সময় গৃহস্থের অংশের ধান দ্রুত তালে মেপে যেত এবং মাঝে মধ্যে সংখ্যা গনণের ধারাবাহিকতায় গোজামিল দিত।নিজেদের অংশের ধান যেতে ঠেশে পৈকার ভেতর চালান দিত,তখন মিয়ার বেটা মিয়ার মনে হত,নব বধুকে যে ভাবে ক,জন ধরে ঠেলে ঠেশে পাল্কির ভেতর ভরে দিত, ব্যাপারটি যেন তাই হচ্ছে। মিয়ার বেটার অন্তরে দয়ালু মেঘ গুড়গুড় করত ধরিস নে ওদের ইচ্ছাকৃত ভুল ওরা গরীব বেচারা কত আর বেশি নেবে।
দাওয়ালরা ভাবত বড়ো মিয়ার বেটা একটু সহজ সরল নে মেপে নে একটু বেশি মেপে নে,তাদের কত আছে, টান পড়বে না। আমরা একটু খেয়ে বাচি। কিন্তু মেয়ার বেটা যে গরীব গোবরার প্রতি মেহেরবান তা তাদের বুঝতেই দিত না। দাওয়ালেরা পৈকায় ধান ভরে একের পর এক মেপে যেত আর সুর করে নামতার ক্লাসের ছাত্রদের মত একটু গেয়ো ভাষায় উচ্চস্বরে বলে যেতো : এক-এ অ্যাক, অ্যাক, অ্যাক, অ্যাক, আরে দুই এর দুই… এগারো, গারো, গারো, গারো… আঠারোর ঠারো, ঠারো, ঠারো, উনিশের নিশ, নিশ, নিশ… ইত্যাদি।
এইভাবে শত পৈকা, দ্বিশত পৈকা ধান মাপা হলে তাদের সাত ভাগের অংশের ধান মাপতে থাকত। ধান মলন শেষে দাওয়াল বৃন্দ পৈকায় মাপা ধান অপেক্ষাকৃত বড়ো ধামায় ভরে অন্দর মহলের উঠোনে রাশ দিয়ে রাখত। সেই ধান পরেরদিন খড়কুটো বাছাই করে আরও পরিস্কার করার জন্য ভিন্ন কর্মী নিয়োজিত হতো। সাধারণত মহিলা কর্মী বৃন্দ এ কাজের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হতো। পাশের বাড়ির বিধবা বুড়ীর মা, তারা খাতুন, মুজাম ফকিরের মা, খবিরের মা, ইয়ার জান, কুমা, এই ধান পরিস্কারের জন্য বাহির বাড়ির খৈলানে নিয়ে যেত। খৈলান হচ্ছে এক টুকরো খোলা উঠোন, যেখানে পর্যাপ্ত উত্তরে বাতাস পাওয়া যায়। খৈলানে জমা করা ধান পরিমান মত কুলায় তুলে নিজের বুক বরাবর উপরে তুলে আস্তে আস্তে কুলা নেড়ে ঈশত কাত করে ধান গুলে বাতাসের উল্টোমুখে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে ধানের ভেতরে লুকিয়ে থাকা হালকা পাতলা খড়কুটোর ভগ্নাংশ বাতাসে উড়ে দূরে চলে যায় আর তাদের তুলনায় ভারী ধান নীচে পায়ের কাছে জমা হয়। এই প্রকৃয়ায় চিটা ধানও উড়ে গিয়ে দূরে চলে যায়।এই কাজ করা সহজ নয়।সব মেয়েরা এ কাজ করতে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেনা।কারন ধান শুধু উড়িয়ে দিলেই হত না, এ জন্য কুলার নীচে হাতের আঙুল দিয়ে খোট মারার সাথে হাতের কুলাকে বিশেষ ভাবে কাত করে নাড়াতে হয় যাতে করে আবর্জনা আলাদা হয়ে সহজেই বাতাসের টানে উড়াল দিতে পারে। আমার বালক বয়সী মন এটাকে একটা খেলনা ভেবে বুড়ীর মার কাছে বায়না ধরতাম ধান উড়ানির খেলায় অংশ নিতে। বুড়ীর মা তখন রাগ আরভয় মিশৃত কন্ঠে আমাকে বলত, দেহ দি কিশের নাইগা এহানে আইছেন। আপনের আব্বায় দেখলে মারব। আমি বলতাম, না আব্বা এখন বাড়িতে নাই। সে আমার অনুরোধে কর্নপাত না করে বলত, না আপনে না মিয়ার বেটা! বড়ো নোকে এই কাম করেনা। সইরা যান, আমারে কাম করতে দেন। কাম না করলে আপনের বাবায় খাওন দিবে না। আমি তার মিথ্যা অভিযোগ বুঝতে পারতাম।
কারণ আমার দয়ালু মা এক জন কর্মীর কাজের বিনিময়ে তার সংসারের পুরো জনগোষ্ঠীর খাবার ঢিশ ভরে প্রদান করতেন। আর কাজের শেষে সন্ধ্যা বেলায় তারা আচলের আড়ালে করে সেই সব খাবার তাদের বাড়িতে নিয়ে যেত। উল্লেখ্য যারাই আমাদের বাড়িতে দিন কাবারি কাজে নিয়জিত হত তারা সন্ধ্যাবেলায় পুরো ঢিশ ভরে খাবার নিতে পারত আমার মায়াবতী মায়ের হাত থেকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তাদের দিতেন। গরীব খেটে খাওয়া মানুষ জনের প্রতি মায়ের একটু বাড়তি টান ছিলো। আব্বা এই ভেতরের খবর অনেক সময়ই জানতেন না। আব্বা কাজের বিনিময়ে কাউকে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিতেন না। কারণ এতে শ্রমিকের বাজার দর অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় বলে তার ধারণা ছিল। তবে অন্য সময়ে অন্য ভাবে আব্বা গরীবদের বিভিন্ন রকম সাহায্য করতেন। ঈদুল ফিতরের আগেই হিসাব করে জাকাতের কয়েক হাজার টাকা সেই ষাটের দশকে আব্বা মহল্লার গরীব লোকদের মধ্যে বিতরন করতে দেখেছি। অনেককে সজজ শর্তে ঋন দিতে দেখেছি আবার সেই ঋনের টাকা মওকুফ করতেও দেখেছি। ধান ওড়ানো শেষে সেই ধান পরেরদিন ভোরে বড়ো তাফালে পানি সহযোগে সেদ্ধ করতে দেখেছি। এ কাজে বুড়ীর মা,ওয়াজেদের মা তারা খাতুন, মোজাম ফকিরের মা মাজু খাতুনকে নিয়জিত হতে দেখেছি। আমি তাদের কর্মযজ্ঞের কথা বার্তায় ও সেদ্ধ ধানের সৌগন্ধে বিছানা থেকে চনমনিয়ে উঠতাম। চুলার পিঠে কখনও কখনও ঘুরঘুর করতাম আর এক অনির্বচনীয় আনন্দে মোরগদের কুক কুরুকু শব্দের মৌতাতে বিমুগ্ধ হতাম।
সেদ্ধ ধান পানি ঝরে গেলে উঠোনে রোদে শুকানো হত। এখানেও নারী শ্রমিক অক্লান্ত পরিশ্রম করে। তারা কিছু সময় পর পর উঠোনে নেড়ে দেয়া বৃত্তাকার ধানের চাতালে পা দিয়ে বৃত্তাকারে আরও অসংখ্য সমকেন্দ্রিক বৃত্ত একে দতো। আমি এ দৃশ্য দেখে দারুণ পুলক অনুভব করতাম। অংকের খাতায় কাটা কম্পাস দিয়ে ছাত্ররা যেখানে বৃত্ত আঁকতে গলদঘর্ম হত সেখানে লেখা পড়া না জানা এ সব মহীয়সী নারী কি ভাবে পা দিয়ে একটি বৃত্ত নয় বরং অসংখ্য বৃত্ত অর্থাৎ সমকেন্দ্রিক বৃত্ত নিখুঁত ভাবে একে দিত তা ভেবে কূল পেতাম না। একেই বলে প্রকৃতির ছাত্র! ধান শুকিয়ে গেল কিনা ঠিক মত তা তার পরীক্ষা করত কিছু ধানের খোসা মুক্ত করে চাল দাঁতে কামড় দিয়ে। কারণ বেশি শুকিয়ে গেলে ধান ভানার সময় ঢেঁকির মনাইয়ের গুতোয় গুড়ো হয়ে যাবে পাতে ভাত উঠবেনা। আবার ধান সামান্য ভিজে থাকলেও ঢেঁকির সোহাগে তা চিড়া চেপ্টা হয়ে যাবে। ধানের আদ্রতা মাপার জন্য তাদের সোহাগি দন্তমোবারকই, যথেষ্ট- ট্যাবলেট তৈরির জন্য আদ্রতা দেখার ময়েশ্চারাইজার ব্যালেন্স এবং কাঠিন্য পরখের জন্য হার্ডনেস টেস্টার যন্ত্রের এখানে অচল। এমন সুবিজ্ঞাত রসায়নবিদ যেন তারা!
শুকনো ধান দ্রুততার সাথে কাঠের তৈরি সরপোশ দিয়ে টেনে গাদা করা হত পিরামিডের মতো, এখানেও জ্যামিতিক কর্মকান্ড! এরপর পিরামিড ভেঙে ধামা ভরে গোলাঘরের গোলায় ধান রাখা হত। বিজ ধান অবশ্য সেদ্ধ করা হয় না। বিজ ধানও গোলা ঘরের বাকি অংশে বিভিন্ন আকারের ডোল, মাটির কোলায় রাখা হত। বিভিন্ন জাতের আমন ধান, আউশ ধান, বিজ ধান রাখার প্রচুর ডোল ও কোলা ছিলো আমাদের ফসল রাখার গোলাঘরে। ধানের চিহ্নিত করনের জন্য আব্বা কখনও বা আমার দয়াবতী মা, আমকে দিয়ে ধানের ট্যাগ লেবেল লিখিয়ে ও সব পাত্রে সেঁটে দেয়ার ব্যাবস্হা করতেন। আমি সেই যে কিশোর বয়সে ধান, চাল, বিভিন্ন রবি ফসলের ট্যাগলেখার কাজ শিখেছি তা এখনও করছি ওষুধ তৈরি কারখানার বিভিন্ন কাচামালের ও উত্পাদিত মালের ট্যাগ লেবেল সহঅন্যান্য বিশ্লেষণাত্মক কর্মকান্ড করে। সেই কিশোর বয়সে লেবেলে লিখতাম :
ধান-বৌপাগল, মাস-পৌষ, উত্পাদন কাল। জমিন-কালীর দোপ। ধান-পরাঙ্গী, মাস-মাঘ, জমিন-দোয়লের রোকন শিগদারের চাষ ইত্যাদি। লেবেলের নীচে ডান পাশে লেখকের নাম লিখতে হত। লেবেল লেখার কাজে মোটা দাগের জন্য বাশের কনচি দিয়ে বিশেষ ধরনের কলম বানাতে হত। এক ডিব্বা দোয়াতের কালী এ কাজে ব্যাবহার করা হত।
উল্লেখ্য, বিজধান খাওয়া নিষিদ্ধ বিধায় তার ট্যগ লেখা হত লাল রঙের কালী। আমাদের দোতলা ঘরের বাহির পাশে যে গোলাঘর ছিলো তা পরবর্তীতে বাড়ির ভেতরে স্থানান্তর করা হয়। রবি ফসল যেমন, রাই, সরিষা, তিল, মষনে, মটর কলাই, মুগ ডাল, মুসুরি ডাল, খেসারি ডাল, গম, পায়ড়া, চিনা, কাউন প্রভৃতি রাখার জন্য অন্য আর একটি ঘর ব্যাবহার করা হত।
মাঝে মাঝে এসব ফসল রোদে শুকানো হত যা তে পোকায় না ধরে। পোকা মাকড়ের সংক্রমণ থেকে বাচার জন্য কোন কোন ফসলের পাত্রে শুকনো আস্ত নিমপাত এবং কোন কোনটাতে ছাইয়ের আলাদা ছোট পট রাখা হত।
বাড়ির ফসল গোলা ঘরের বিভিন্ন ডোল ও মাটির কোলায় রাখা হতো। এ সব জমাকৃত ফসলে জীবানু বা ক্ষুদ্র কীটের সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য যে প্রিজার্ভেটিভ ব্যাবহার করা হতো রাসায়নিক মিথাইল প্যারাবিন, প্রোপাইল প্যারাবিন বা সোডিয়াম বেনযোয়েট নয় বরং প্রাকৃতিক নিমপাতা, ছাতিম পাতা, রক্তপদ্মের পাতা, আবার কখনও বা ছাইয়ের পাত্র ব্যাবহার করা হত। এ ক্ষেত্রে তারা ফাইনারের অর্গানিক কেমিস্ট্রি বা কোন ফার্মাকোলজি বা ফাইটোকেমিস্ট্রি অধ্যায়ন করেনি। অথব আজকাল ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করতে প্রাকৃতিক প্রিজার্ভেটিভ এলুপ্যাথিক মেডিসিন তৈরিতে যে পরিমাণ ব্যাবহার করা হয় তার প্রায় দশ গুণ ব্যাবহার করে। আমার ধারণা এই অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যাবহারের ফলে মানব দেহে বিভিন্ন পার্শ্ব প্রতিকৃয়া সহ বিরুপ অবস্থা ঘটতে পারে অত্যান্ত ধীরে ধীরে। আজকাল অসাধু ব্যাবসায়ীরা ধান চালসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে রাসায়নিক প্রিজার্ভেটিভ ও রাসায়নিক কীটনাশক ব্যাবহার করছে। ফলে মানব দেহে বিভিন্ন জটিল রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
ধান থেকে চাল বের করার জন্য ষাটের দশকে ব্যাপক ভাবে ঢেকি ব্যবহার হত বৃহত্তর গ্রাম বাংলায়। অবস্থাপন্য গৃহস্থের বাড়িতে ঢেকিঘর ছিলো। ঢেকিঘর গ্রাম বাংলার গৃহস্থ বাড়ির প্রধান অনুষঙ্গ ছিলো। আমাদের বাড়িতে একটি ঢেকি থাকলেও তার ব্যবহার হত খুব কম। আমাদের ধান ভাঙানো হর ময়েনদিয়া বাজারের সুবল সাহার কলঘরে বা চাউলের মেশিনে। ঢেঁকি ছাটা চাউল বেশ পুষ্টিকর কারন চালের মেরুন রঙের কুড়োতে ভিটামিন-এ বিদ্যমান থাকে।
কিন্তু তাতে কি হবে আমার আব্বা ঢেঁকি পারানো বা ঢেঁকি বাড়িতে থাকা নিম্নগৃহস্তের লক্ষন বলে মনে করতেন। তাই বাড়িতে বিদ্যমান ঢেঁকিটি প্রায়ই অব্যবহৃত থাকত। তবে আব্বা বাড়িতে নাথাকলে কখনও কখনও ঢেঁকির এস্তেমাল হতো। আমাদের বাড়ির স্হায়ী কর্মী কুমা, ইয়ারজান, কখনও বা পাশের বাড়ির তারা খাতুন ঢেঁকিতে পার দিয়ে আতপ চাল কুটতো। উদ্দেশ্য বাড়িতে মেহমান অতিথি আসবে নানান রকম পিঠা পায়েশ করতে হবে।
নতুন ধানের আবাহনে শীতের বিভিন্ন পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যেতো। আমি ঢেঁকি পারের শব্দের সাথে তাদের শয়লা গানের প্রমোদে উল্লসিত হতাম। ঢেকির অদ্ভুত আওয়াজ ছিলো মনোলোভা :
ঢেক্কুর-কু-ঢেক্কুর, ঢিপ-ঢিপ-ঢিপ-ঢেক্কুর, ঢেক্কুর-কু-ঢেক্কুর। ঢেঁকির এই বাজনা বাদনের সাথে যেন মিয়া তানসেনের যোগাযোগ হয়ে যেত নইলে আমি অমন উতলা হয়ে যেতাম কেন! তারা খাতুনের কন্ঠে সুর ঝরে পড়ত:
ও ধান বানি রে ঢেকিতে পাহার দিয়া
ঢেঁকি নাচে আমি নাচি
ঝুলিয়া ঝুলিয়া।
ধান বানি রে নাচিয়া নাচিয়া
আসবে কুটুম খড়ম পায়ে
হেলিয়া দুলিয়া।
কুটুম আসবে পিঠা খাইবে
হাউস করিয়া,
সেচিঁ পানের খিলি দেবে
মুখেতে পুরিয়া।
ও ধান বানি রে ঢেকিতে
পাহার দিয়,
ঢেকি নাচে আমি নাচি
হেলিয়া দুলিয়া।

এই গানের কথা যা ষাট বছর আগে শুনেছি তা হয়ত হুবহু লিখতে পারিনি, এর অধিকাংশ কথা আমার সৃষ্টি করা। এ জন্য দুঃখিত। চৈত্রমাসের শেষে, চৈত্র সংক্রান্তিতে বা তার দু তিন দিন পরে বৈশাখের শুরুতে কাল বৈশাখী ঝড় বৃষ্টি শুরু হলেই পাট বীজ বপনের কাজ শুরু হয়ে যেত। এর আগেই কৃষক চৈত্রের দাবদাহেই পাটের জমিন জমিনে হাল চালনা করে মাটিকে ঝুরি ঝুরি করে রাখে।
হালকা বৃষ্টি হলেই জমিনে বীজ ফেলা হোত। ভারী বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে গেলে বীজ বপনের উপযোগীতা থাকেনা। আবার বীজ বপনের পর ভারী বৃষ্টি হলেও বীজ নষ্ট হয়ে যায়। বীজ বোনার পর মই দিয়ে অবশ্য বীজগুলো মাটির ভেতরে লুকিয়ে ফেলা হয়। পাটের চারা গাছ জন্মানোর পরে হাল্কা বৃষ্টি হলে, জমিতে পানি জমে না থাকলে পাটের ভালো ফলন হয়।জমি থেকে এক দেড় ফুট উচু চারা গাছ হলে বৃষ্টির আর ভয় থাকে না। এর পর রোদ বৃষ্টিতে পাট গাছের তেমন কোন ক্ষতি হয়না। আমাদের পাটের জমি ছিলো প্রায় ৫০ একরের মত।কুমার নদীর পাড়ের জমিকে বলা হয় কোলচরীর জমিন। এই জমিনে সাধারণত পাট চাষ করা হতো। বাড়ির কাছের কুমার নদী থেকে বিল বা দোপ পর্যন্ত একটানা এক কিলোমিটার পর্যন্ত আমাদের চাষের জমিন।এর মধ্যে দু’এক জায়গায় বসতি রয়েছে।
বিল বা দোপের অপেক্ষাকৃত উচু জমিন যেমন ঢোনের জমিন, ওমেদের দরুন ভুইঁ, আইড়ার ভুইঁ, বড়ো ভুইঁ যা এক দাগে চার একরের, কাঁচা বেড়ার ভুই, নলডুবির ভুইঁ, পুরোন বাড়ির পাশের জমিন,দোয়ালের উচু জমিন, সনের ডাঙ্গীর নামোর ভুইঁ,ময়েনদিয়া গ্রামের চকের জমিন প্রভৃতি প্রধান।
আমি তখন ফরিদপুর হাইস্কুলের মেধাবী ছাত্র। গৃষ্মকালিন ছুটিতে বাড়িতে এলে পাট চাষের কৃষকদের কর্মকাণ্ড পরিদর্শনে আব্বার নির্দেশেই মাঠে যেতাম। পাটের জমিন নিড়ানি দিতে,বাছ পাট কাটতে প্রায় ৫০/৬০ জন কামলা নিযুক্ত করা হত। এরা ফজর নামাজ পড়েই পান্তা খেয়ে কাস্তে হাতে মাথায় গামছা বেধে কাজে নেমে পড়ত। আমি কখনও কখনও ছাতা মাথায় ক্ষেতের পাশে অবস্থান করতাম আাবার কখনও বা অদূরে আম গাছের ছায়ায়, বটপাকুড়ের ঝিরিঝিরি আবাহনে অনন্ত আনন্দ উপভোগ করতাম। সকাল দশটার দিকে তারা আমাদের বাড়িতে নিয়ম মাফিক নাস্তা খেতে হাজির হোত।নাস্তা হিসেবে পানি খেচুড়ি, দলা খিচুড়ি দেওয়া হতো। খিচুড়ির সাথে কাগজি লেবু, আবার কখনও বা কাঁচা আমের খাটা, অথবা, তেতুলের ঘোল দেওয়া হতো।
কামলা কৃষাণ কূল পেট চুক্তিতে যে যার মত মনের আসুদা পুরন করে খেতে পারত। কেউবা আবার বাজি ধরে একাই সাত কামলার খিচুড়ি খেয়ে যেত। এতে আমি দারুণ পুলক অনুভব করতাম। এই ৫০/৬০ জনের নাস্তা অন্দর মহল থেকে লালু সমাদ্দর, কালু মোল্লার বহন করতে ঘাম বেরিয়ে যেত। আমার দয়াবতী মা জননীর নির্দেশে ইয়ারজান, ফুলজান বড়ো বড়ো ডিশে এই খিচুড়ি সমুহ অড়ং দিয়ে ডেকচির উদর কেড়ে ভরে ভরে খাবার ঘরের বারান্দায় রাশ দিয়ে রাখত। এই কৃষান কূল গড়ে দূ তিন জনের খিচুড়ি একাই সাবাড় করত।
এদের খাবার এলুমিনিয়ামের প্লেটে দেওায় হলেও তারা কলা পাতা কেটে তার ওপর খিচুড়ি ঢেলে মাটিতে গামছা বিছিয়ে বসে আয়েস করে খেতো। কেউ কেউ খিচুড়িতে আমের খাটা মিশিয়ে খেত কেউ বা আবার আলাদা করে আমের টকখাটা খেয়ে মুখে সেচিপানের খিলি পুরে দিয়ে পরমান্দে ঊর্ধ মুখি হয়ে প্রভুর দরবারে দু’হাত তুলতো। কেউ কেউ বিড়ি টেনে নাক দিয়ে ধুয়া ছাড়ত,কেউ বা আবার হুকো মুখে দিয়ে কড়াত্, কড়াত শব্দে সাত রাজার ধন সংগ্রহ করত।
দূপুর দুই টা পর্যন্ত এরা পাটের খেতে নিড়ানি দিত, বাছ পাট কাটত। তারপর সদল বলে পারিশ্রমিক নিতে বাড়ির কাচারি ঘরের বারান্দায় ভিড় করত। আমি টোক খাতা এনে এদের হাজিরা লেখে জনপ্রতি দু টাকা করে প্রদান করতাম, এটাও আবার নির্দেশে পরিপালন করতাম।আব্বাই এদের পারিশ্রমিক দিতেন। কাউকে কাউকে অগ্রিম টাকা দেওয়া হতো। তখন চাউলের কেজি ছিলো ৫০ পয়শা। এটা ষাটের দশকের ঘটনা।
শ্রাবণ ভাদ্র মাসে আমাদের এলাকার পাট কাটা হয়। আমি কিশোর বয়সে পাট কাটা, পাটের আটি বাধা, ডাঙায় এই আটি গাদা করে রেখে পাতা ঝরানো হয়। তারপর নদীর কোলে অল্প পানিতে, খাল বিল, ডোবা, নালায় পাতা ঝরা পাটের আটি পানিতে দশ পনেরো দিন ডুবিয়ে পাট পচিয়ে আাশঁ বের করা হয়।
এই প্রকৃয়াকে পাট জাগদেওয়া বলে। এক একটা জাগে দুই আড়াই শত পাটের আটি থাকে। জাগ দেওয়া পাট যাতে ভেসে না যায় এ জন্য জাগের ওপর চার পাচটা আস্ত কলা গাছের ভারা দেওয়া হয় এবং জাগের চার কোনায় চারটি বাশের কোরা গেড়ে দেওয়া হয়।
নির্দিষ্ট সময় পর জাগ থেকে পাট ডাঙায় তুলে পাটের কান্ড অর্থাৎ পাটখড়ি থেকে পাটের আশ তোলা হয় বা পৃথক করা হয়। পচা পাটের আটিকে তখন গোল্লা বলা হয়। ডাঙায় তোলা পাটের আশ তোলার প্রকৃয়াকে পাটলওয়া বলে। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ছেলেমেয়ে যারা এই পাট লওয়া কাজ সুচারু রুপে সম্পাদন করতে পারে তাদেরকে এই কাজে নিয়োগ দেয়া হতো।
এদের পারিশ্রমিক গোল্লার হিসেবে পরিশোধ করা হতো। সাধারণত বাছ পাট লওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রকৃয়া অবলম্বন করা হোত। তোষা ও বগীপাট জাগ দেওয়া হতো দাওয়ালদের মাধ্যমে। দাওয়ালরা জমির পাট কেটে জাগ দিয়ে আশঁ ছড়ানোর কাজ বুক পানিতে দাড়িয়ে সম্পাদন করত এবং আশঁ তোলা পাট পরিস্কার পানিতে ধুয়ে আলাদা আাটি গোল্লা আাকারে বেধে এক একটি গাইট করা হতো। এই ভেজা পাটের গাইটকে স্হানীয় ভাষায় গইচা বলা হতো। এই গইচাগুলো অন্দর মহলের উঠোনে আয়তাকারে ভিড় দিয়ে রাখা হত একদিন। গইচার পানি ঝরলে গোল্লা গুলোর বাধন মুক্ত করে বাশের আড়ায় রোদে নেড়ে দেওয়া হতো ভালো করে শুকানোর জন্য। পাট শুকিয়ে গেলে পাচ কেজি করে আলাদা আলাদা গাট বেধে গুদামজাত করা হতো। ওজনের সাত ভাগের এক ভাগ বা দশ ভাগের এক ভাগ করে দাওয়ালরা পাটের ভাগকে পারিশ্রমিক হিসেবে গ্রহণ করত। দাওয়ালদের সাথে পাটের বাজার দরের তুলনা করে প্রতি বছরই এই দাওয়াল ভাগা নির্ধারণ করা হতো।