সরিষার মহুয়া বনে

আমাদের এলাকায় রবি ফসলের জমিন তৈরির কাজ শুরু হয় পৌষ মাঘ মাসে। আমন ধানের জমিতে ধানের খেড় বা আগাছা পরিস্কার করা হয় আগুনে জ্বালিয়ে। আবার কেউ কেউ হালকা লাঙল চষেও মাটি আলগা করে। পাটের জমিনের পানি শুকিয়ে গেলে ওই জমিন রবি ফসল আবাদের জন্য উপযুক্ত হয়ে যায়। এসব জমিতে রাই, সরিষা, তিল, তিশি, মটর কলই, মুষুর ডাল, মুগডাল, খেসারি ডাল বীজ বিনে বা ছড়িয়ে দিলেই কয়েক দিনের মধ্যে চারা গজিয়ে যায়। তবে শাক সব্জির আবাদ, বাঙ্গী, তরমুজের আবাদ করতে হলে মাঘ মাষের মধ্যে জমিন ভালো করে লাঙল দিয়ে চষে মাটি ঝুরি ঝুরি করতে হয়।

আমাদের রবি ফসলের একটি অংশ কুমার নদীর পাড়ে কোলচরীতে আবাদ করা হোত। কোলচরীর জমিতে মটর কলই এর মধ্যে রাই সরিষার হালকা আবাদ করা হোত। মুষুর ডালের জমিতেও দ্বিফসলী হিসেবে রাই সরিষার হালকা আবাদ করা হোত। তবে নিরেট রাই সরিষার জমিন ছিলো বেশ কয়েকটি। কোল চরীর জমিম ছাড়াও ঢোনের জমি, চরের পাড়ের জমি দোয়ালের জমি, ডাঙ্গীর নামোর জমি, বড়ো ভুইয়ে মুসুর ডাল, মাসকলাই, তিল, তিশি প্রভৃতি রবি ফসলের আবাদ করা হোত। উল্লেখ্য এ সময়ে আমাদের আরও অনেক জমিতে বিপুল পরিমান গম ও পায়ড়ার আবাদ করা হোত। কোন কোন জমিতে কাউন ও চিনার আবাদ হোত এই মৌসুমে।

আমি রবি শস্য বপনের কালে উপস্থিত না থাকলেও এই ফসল গুলো তোলার সময় লেখা পড়ার ফাকে ফাকে উপস্থিত থাকতাম। শীত কালে মটরশুঁটি, মটর কলই শাক তোলার সময় বাড়ির বুয়াদের অর্থাৎ নারী কর্মীদের সাথে বিপুল উত্সাহে অংশ গ্রহণ করতাম। মটরশুঁটি শীম, মটরকলই শাক তোলার কাজে আমি ব্যপৃত হতাম। ইয়ারজান বুয়া যে আমাকে আদর করে বাজান ডাকত- সেই আমাকে কি ভাবে বুড়ো আঙুল ও তর্জনী আঙুল একত্রিত করে একটু হালকা চিমটি দিয়ে শাকের ডগা ছিড়তে হয় তা আমাকে শিখিয়ে ছিলো।

মটরকলই শাক তোলার জন্য শুধু তাদের সাথে কোলচরীতে যেতাম না বরং সেখানে ছিলো আরেক মধুর আকর্ষণ, আর তা হল,শিম তোলা এবং ক্ষেতে বসেই কাচা শিমের বিচি চিবিয়ে খাওয়া। বাড়িতে এসে অবশ্য শিমগুলো সেদ্ধ করে আবার আয়েশ করে বিচি খাওয়ার পালা শুরু করতাম। মটর কলাইয়ের ফুল নীলাভ সাদায় মিশেল, সে এক আনন্দময় চিত্রকলা যে
একবার দেখে সে বারবার তাকে দেখে -হাতের পরশ দিয়ে কপলের ছোঁয়া দিয়ে কি এক অনিন্দ্য সোহাগ যে করে যে পায় সেইই বুঝে তার মর্ম। মটরকলই ক্ষেতের পাশেই আছে সরষের দিগন্ত প্রসারি জমিন- কি এক হলুদফুলের হৃদয় আকুল করা এক অনির্বচনীয় আনন্দ ময় জগত। আমি পাগলের মতো সেই হলদে সরষে ফুলের ছোঁয়া নেয়ার জন্য ছুটে যেতাম ফুল মঞ্জুরিতে আলতো করে মুখের পরশ নিতাম আর নাকটেনে রাজ্যের খোশবু ভরে নিতাম বুকের ভেতর। সরষে ফুলের এমন নিবিড় আদর যেন আমার মায়ের আদর,বোনের সোহাগ। সরষে ফুল নিয়ে আমার একটি কবিতার কয়েক চরণ:
সরষে ফুল সরষে ফুল
হলুদ সরষে ফুল
মায়ের আদর বোনের সোহাগ
কানে পরায় দুল।
হলদে পাখি হলদে শাড়ি
হলদে সোনার গাঁও
হলুদবরণ পাখির খোজে
মন ভোমরার নাও।
সরষে ফুলের এমন হলুদ
এমন ফুলের দেশ
কোথায় পাবে গানের পাখি
সোনার বাংলাদেশ।

সরষে ফুলে মৌমাছিরা ঘোরাঘুরি করে, ফুলে বসে মনের আনন্দে মধু পান করে আর আমার মত বালক মৌমাছিরা ফুলে শুড় ঢোকাতে না পারলেও খোশবুর মৌতাতে যে চন্দ্রলোকের দোয়ার খুলেছে তারই বা মধুমুগ্ধতা কম কিসের! ঢোনের পরে খেজুর বাগানের ভেতর অনেকটা ফাকা থাকত।শীতের মৌসুমে সেখানে কুশর বা আখ লাগানো হোত। শীত সকালে খেজুর গাছ থেকে রসের হাড়ি নামাতো গাছিরা।এই বাগান এবং বাড়ি তিন পাশের রাস্তার ধারে আর অন্য সকল জমির আইলে প্রায় শতাধিক খেজুর গাছ ছিলো আমাদের। শীতের সময় এই গাছের কপাল চেছে খেজুরের রস বের করার জন্য আলাদা ভাগার গাছি ঠিক করা হোত। তারা দশ হাঁড়ির এক হাড়ি রস পারিশ্রমিক পেত। এদেরকে গাছি বলা হোত।আমার বালক বেলায় দেখেছি এই সব গাছিরা বিকেলে খেজুর গাছে রসের হাড়ি বাধত এবং ভোরে রসভরা সেই হাড়ি নামিয়ে আনতো। জলিল সেখ,কালু খাঁ,ওজিত সেখ,ওয়াজেদ ফকির প্রমুখ গাছি হোত আমাদের। শীতের ভোরে রাই সরিষার ফুলের ঘ্রাণের সাথে যুক্ত হোত প্রাণ আকুল করা খেজুর রসের ঘ্রাণ।

আমি ভোরেই খেজুর বাগানে যেতাম গাছিদের রস নামানোর দৃশ্য এবং কত হাড়ি রস হল এবং কত হাড়ি গাছিরা নেবে তা গণনা করার জন্য। আমাদের ভাগের রসের হাড়ি তারা বাগে ঝুলিয়ে এক একবার দশটা করে হাড়ি অন্দর মহলের চুলোর পিঠে কখনও কখনও রান্নাঘরের সামনের আঙিনায় জড়ো করতো। আমরা ছোট ভাই বোনেরা গ্লাস ভরে খেজুর রস খেতাম।কখনও কখনও রসের মধ্যে মুড়ি মিশিয়ে আনন্দে চুকচুক করে খেয়ে নিতাম। বুড়িরমা, ওজেদের মা, কখনও বা ইয়ারজান বুয়া এইসব রস বড়ো তাফালে ঢেলে চুলায় জ্বাল দিয়ে ঝোলা গুড় তৈরি করতো কখনও বা রস আরও ঘন করে পাটালী গুড় বা নারকেল মিসৃত পাটালী গুড় তৈরি করতো।

আমি ছোটো বেলায় খেজুরের ঝোলা গুড়ের সাথে মুড়ি মিশিয়ে খেতাম।কখনও বা চিত্তহারী নারকেল পাটালী গুড় মুড়মুড় করে পরমানন্দে চিবিয়ে খেতাম। আমার মাও বেশ গুড় খেতে পারতেন।তিনি পাটালী গুড় ঝোলাগুড়ের সাথে মিশিয়ে খেতেন অতিরিক্ত মিস্টির আশায়। ফরিদপুর যশোর এলাকায় খেজুর গুড় ও তালের গুড় বেশি উত্পাদিত হোত। দুর্মুখেরা ছড়া কাটত:
চোর চুট্টা খেজুর গুড়
যত পাবেন ফরিদপুর।

যারা আমাকে এই ছড়া শুনিয়ে আনন্দ পেত, তাদেরও আমি শুনিয়ে দিতামঃ
পীর দরবেশ খেজুর গুড়
পাবেন কেবল ফরিদপুর।

কারণ ফরিদপুর মহান সাধক, অলী-এ-কামেল হযরত শেখ ফরিদ বা শাহ ফরিদ এর নামের জন্য, তার দরগা এবং অত্র এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য হয়েছে, তাই এমন বেয়াদবী করা ছড়া হতে পারেনা। কেবল আমার ছড়াই যথার্থ। শীতের সময় আমাদের খেজুর বাগানের ভেতরে ফাঁকা জায়গায় কুশর বা আখের প্রচুর আবাদ হোত। আমরা আখ চিবিয়ে রস খেতাম।এই রসের অন্য একটা আলাদা ঘ্রাণ আছে যা কেবল আখের রসেই পাওয়া যায়। আখের রস জ্বাল দিয়ে খেজুর রসের মত একই প্রকৃয়ায় পাটালি গুড় তৈরি করা হোত। উল্লেখ্য অতিরিক্ত খেজুর গুড়,আখের গুড় বাজার জাত করা হোত। শীতের দিনে একটি বাড়তি আনন্দ ছিলো নানান রকম পিঠা পুলির আস্বাদন গ্রহণ করার মওকা পাওয়া।

আমাদের বাড়িতে শীতের বিকেলে আবার কখনও বা সকালে ধুপিপিঠা বা ভাপাপিঠা, চিতুই পিঠা, দুধচিতই পিঠা, কলার বড়া পিঠা, আন্দোশা পিঠা, ছিত রুটি, কাটা পিঠা, শেওই পিঠা, ধাপড়া পিঠা হরেক রকম পিঠায় আমরা রসনা মেটাতাম। এক নতুনের সৌগন্ধিক মৃগনাভি হরিণী আনন্দ আমাদের স্বপ্নের রাজ্যে চারিয়ে নিয়ে বেড়াতো। আমি পুলকানন্দে পিঠা বিষয়ক ছড়া কবিতা লিখতাম সেই কিশোর বেলায়।তবে অনেক পরে আমার পিঠার ছড়া আমার ছড়ার বই পান্না সোনা মান্নাতে স্হান পেয়েছে :
এত্ত মধুর তালের পিঠা
কে বানালো কে?
তিতকুটে স্বাদ নেই মোটেও
একটু খেয়ে নে।
তালের পিঠা ঝালের পিঠা
মিষ্টি কলার পিঠা
পিঠা মানেই সুস্বাদু ও
মুখরোচক মিঠা।
পিঠা পিঠা পিঠা
হরেক রকম আকার প্রকার
হরেক স্বাদের পিঠা
পাকান পিঠা, ধুপি পিঠা
ছিত রুটি ও দুধচিতুই
হাতান্দোশা পাটিসাপটা
জিবে ঝরে জল নিতুই।
পিঠার কারিগর
কোথায় তাহার ঘর?
মায়ে বানায় বোনে বানায়
বানায় মনের লোক
মায়ের হাতের চিতুই পিঠা
তাতেই আমার ঝোক।(পিঠা)

শীতের দিনে চারদিকে কেবল পিঠা বানানো আর পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যেত নয় কেবল খেজুর রসের জাউ, ক্ষির, খেজুর রসের পায়েস প্রভৃতি মিষ্টান্ন ভোগোর মহৌতসব পড়ে যেতো। বাড়ি বাড়ি পিঠা খাওয়ানো, আর জামাই দাওয়াতের পাল্লা লেগে যেতো।