সবজা সব্জির সবুজাভ হাতছানি

আমাদের বাড়ির পালানে, গোহাল ও আথালের পাথালে, পুকুরপাড়ের কোমর ঘেষে হরেক রকম সবুজ ফলমূল, সব্জির আবাদ করতো একান্ত অনুগত আমিনুদ্দি। সে গরুর সেবা যত্নের ফাঁক ফোকরে লাউ, কুমড়া, শিম, বরবটি, লালশাক, পুড়া নটে শাক, নটে শাক, পুইঁশাক, তরমুজ, বাঙ্গীর আবাদ করতো। এ কাজে তার স্ত্রী ইয়ারজান যথা সম্ভব সাহায্য করতো। তারা দইজনে আমাদের বাড়িতে কর্মী হিসেবে থাকতো আর নিবিড় ভাবে কাজ করে যেতো।

আমিনুদ্দী ও ছমিরুদ্দী দুই ভাই পুব এলাকা থেকে আমাদের বাড়িতে কামলা দিতে এসেছিল। এ জাতীয় কামলা বিভিন্ন জেলা ও এলাকা থেকে অবস্থাপন্ন গৃহস্থ বাড়িতে, তালুকদার, জমিদার বাড়িতে কিষাণ বিক্রি করতে আসতো। এদের কেউ কেউ কোন কোনো বাড়িতে দীর্ঘ বছর থেকে যেতো, কেউ বা জাবতজীবন বসবাস করতো। এমনই একজন এই আমিনুদ্দী আমাদের বাড়িতে আমৃত্যু প্রায় থেকে যায়। তার ভাই ছমিরুদ্দী অবশ্য পুবদেশে ফিরে যায়।

আমিনুদ্দীকে আমাদের বাড়ির নারী গৃহকর্মী ইয়ারজানের সাথে বিয়ে দেন।ইয়ারজানের বাবার নাম মনে নেই তবে তার চাচা মদনমোল্লার বাড়িতে তার শিশু কাল বালিকাবেলা কেটেছে এর পরেই আমাদের বাড়িতে তার অবস্থান ঘটেছে। আমিনুদ্দি শুধু বাড়ির বাইরের পালান,কোলচুরীর বড়ো ভুইঁ, গোহালের নামোর জমিনে তরমুজ, বাঙ্গী, তামাক, আলু পটলের আাবাদ করতো। জমিন অবশ্য অন্য কামলার সাহায্যে আবাদের জন্য প্রস্তুত করা হতো। আমিনুদ্দি কেবল সেই প্রস্তুত জমিনে ওই সব শীত কালিন ফলফলাদির বীজ রূয়ে দিতো পরম যত্নে। চারা গজালে তাতে প্রতিদিন বিকেলে পানি ঢালতো পরিমাণ মতো। তামাকের চারা আলাদা বীজতলা থেকে তুলে নির্দিষ্ট দূরত্বের সারিতে লাগাতো এবং নিয়মিত ভাবে প্রত্যেকটি চারার গোড়ায় পানি ঢালতো। এই কাজের সিংহ ভাগই সে করতো এবং অন্য সহযোগীরও তদারকি করতো। বাঙ্গী তরমুজের চারায় পানি ঢালার সময় আমি নিরব দর্শক হিসেবে সেখানে হাজির হতাম প্রতি বিকেলে। মনের ভেতর ওই সব ফলের ঘ্রাণ, স্বাদ কেন যেন সুড় সুড়িয়ে উঠতো। আমিনুদ্দির প্রতি একটি মমতাবোধ জাগ্রত হতো এই ভেবে যে এই লোকটির পরিশ্রমের বিনিময়ে আমরা সুস্বাদু ফলফলাদি আস্বাদন করার সৌভাগ্য অর্জন করবো। আহা বেচারা কতনা দয়াবান!

পুকুর পাড়ের জমিনে, ভেতর বাড়ির উঠোনের কোনে লাউ কুমড়ার জাংলা সবুজাভ শ্যামল মমতা বিতরণ করতো। এই জাংলার লাউ কুমড়ার গাছের গোড়ায় পানি এবং উঠোনের ঝুরি মৃত্তিকাময় সবুজ সার দিয়ে তাদের তত্বাবধান করতো ইয়ারজানবুয়া, বুড়ির মা, কখনও, কখনও মাজু খাতুন। লাউয়ের জাংলায় লাউ ধরে থরে থরে ঝুলে থেকে মাথা ঝিমধরা সবুজের কোলাহল সৃষ্টি করতো। আমার হৃদয়ে ওই সবুজের চিত্কার করে ধূর্জোটি ঋড় বইয়ে দিতো। কোন কোন ঘরের চালায় চাল কুমড়ার বাথান সৃষ্টি হতো। শীত কালে লাউ ভাজি, লাউ টাকির ঘন্টো, লাউ শোলের মিশ্রণ তরকারি খাওয়ার রসনা বৃদ্ধি করতো। আবার লাউ ঝুরি দুধের সাথে ঘন করে মিষ্টান্ন জাতীয় খাদ্য তৈরি হতো এই শীতে। এই বিশেষ খাবার আমাদের এলাকায় দুধকদু হিসেবে ব্যাপক পরিচিত এবং আকর্ষণীয়। আমাদের শহরের বাড়ীতেও এই দুধকদু তৈরি হতো।

কবি জসিমউদদীন আমাদের বাসায় বেড়াতে এলেই শাহিদা আপা অর্থাৎ আমার মেজো আপাকে তিনি দুধ কদু পরিবেশনের আগাম বার্তা দিতেন। কবি জসিমউদদীনের প্রিয় খাবার ছিলো এই দুধকদু। চাল কুমড়া দিয়ে দারুণ মোরাব্বা তৈরি হতো আমার ছোট বেলায়। মা আমাকে চালকুমড়ার মোরাব্বা আর দুধকদু বানিয়ে কোমল আদরে খাওয়াতেন। মোরাব্বার গরম মশলার মোহাব্বত আর দুধকদুর কিশমিশের কিসমিস পরশ আমার অন্তরে এখন বিরহের চন্দ্র গ্রহণ সৃষ্টি করে। এখন আর এসব এতো সহজে ধরা দেয় না। আমিনুদ্দি ছিলো সহজ সরল কর্মঠ ও দয়াদ্র হৃদয়ের মানুষ। আমাদের বাড়িতে গৃহকর্ম ও গবাদি পশুর তত্ত্বাবধানে তাকে আমার বাবা বছর শেষে নির্ধারিত পরিমান টাকা দিতেন। তিন বেলা পেটপুরে খাবার আর তাকে দুই রমনীর স্বামী হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। তার দুই স্ত্রী সহ তাকে বসবাসের আলাদা রুম ছেড়ে দিয়েছিলেন। উত্তরের পোতার ঘরের একটি থাকার রুম বড়ো বারান্দা বরাদ্দ ছিলো তার। আমিনুদ্দি কাশার বড়ো থালায় খাবার খেতো। আমরা যে তরকারি দিয়ে খেতাম তাই সে তার বউদের নিয়ে খেতো। কেবল চিকুন চাল পেটে বেশিক্ষণ থাকেনা বলে তাদের জন্য আউশের আলাদা মোটা চালের ভাত রাধতে হতো। শুধু মাছ তরকারি তার সব সময় রোচেনি। সে সকালে পান্তা ভাত খেত।পান্তা ভাতে কয়েকটি পুড়া মরিচ তাজা দু চারটে আস্ত পিয়াজ সে কামড়িয়ে খেতো পরমানন্দে। কখনও বা পুড়া মরিচ ও কাটা পিঁয়াজ টাটকা সরিষার তেলে ভর্তা করে পান্তা ভাতে মিশিয়ে খেতো। দু তিন জনের খাবার সে সব সময়ই খেতো। তার পান্তা ভাতে পানির ভাগ বেশি করে নিত, ফলে সুড়ুৎ করে খাওয়া সমাপন করেই হুক্কার কপোলে চুম্বন একে দিয়ে কড় কড়াত শব্দে চেখ বুজে পরমানন্দে হুক্কা টানতে টানতে ধুয়ার কুন্ডলি আকাশে ছেড়ে দিতো। তার এই সচ্চিদানন্দ ভাবে বিমোহিত হয়ে আমি সেই সময়ে ছড়ার সুড়সুড়ি দিতাম :
পান্তা ভাতে মরিচ পিয়াজ
সুড় সুড়ুৎ
হুক্কা টেনে কুড় কুড়ুত
তার পরে সে
ফুর ফুড়ুৎ।
পান্তা ভাতে সুড় সুড়ুৎ
হুক্কাহুয়া কুড় কুড়ুত
ফর ফরানি ফুর ফুড়ুৎ।

আমিনুদ্দি আষাঢ় শ্রাবণ মাসে গরুর খাবার বিশেষ করে কাঁচা ঘাস কেটে আনত চরের সবুজ সন, বাকশা ঘাস, কোলচরীতে বেড়ে ওঠা কলমি লতা, কচুরিপানা জাতিয় সবুজ ঘাস বাধলা। যেদিন বৃষ্টিতে ভিজতে তার মনে সায় দিতোনা, সেদিন শুকনো খড়ের সাথে তেলের ঘাইনের গাদঁ, ফেন পানি বা ভাতের মাড়ের সাথে কুড়োঁ মিশিয়ে গরুর খাবার তৈরি করতো।

বৈশাখ জৈষ্ঠ্যমাসেও সে মাঝে মাঝে এই প্রকৃয়ায় গরুর খাবার তৈরি করতো এবং বিশেষ ভাবে যত্ন নিতো। গৃষ্মকালে সে ফেনাভাত, কোনো কোনো দিন খাবারের মেনুতে পান্তা ভাতের সাথে তেতুলের শরবতের বয়না ধরতো। তার যুক্তি ছিলো তেঁতুলের শরবত, আমের খাটা শরীরের গরম কেটে দেয়। ডিহাইড্রেশনে এটা ওষুধের মতো কাজ করে। আমি জানি না ভেষজ রসায়নের গুঢ় তত্ত্ব বোকা বলদা আমিনুদ্দিনের মগজেকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার দুই বিবির ঘরে তিন সন্তান, ইয়ারজানের পেটে সখিনা, আর বুড়ীর পেটে হাকিমুদ্দি ও দিলা। এরাও আমাদের বাড়িতে পরিপালিত হয়েছে।

ফালগুন মাসের শেষ অবধি তখনও গ্রামের বাড়িতে শীতের হিম কুয়াশার চাদর ঝুলে থাকত। ভোর বিহানে তরমুজ বাঙ্গীর ক্ষেতে যেতাম তাদের হালহকিকত বোঝার জন্য। আর কত দেরি রসালো ফলের ঘ্রাণ চেখে নিতে! কতো ভোর বিহানে, কতো বিকেলের কোমল ছায়ায় সেখানে গিয়েছি আমি। জলের কলসি থেকে কত জল ঢেলেছি গাছের গোড়ায়! কতো যত্নের আচরে কত আঙুলের পরশে তাদের জাগাতে চেয়েছি।কত যে অপেক্ষার লবন গুলিয়ে খেয়েছি, হে গুল্মলতা, হে মৌসুমি ফলের সোনারা তোমরাকি জাগবেনা, তোমার ডালের ফাঁকে ফাঁকে শির্ষের মিনারে কি পুষ্পিত হবেনা ফুল মঞ্জুরী। তুমিকি এখনো ফলবতী হবে না। তুমি কি হাসবেনা সবুজাভ পৃথিবীতে। তুমিকি তৃষ্ণার জ্বালা মেটাবেনা তুমিকি মধুর মোলায়েম রসালো ফলের আপ্যায়নে আমাকে ভরিয়ে দেবে না। আমিনুদ্দি তুমি কত আর পানি ঢালবে গোড়ায় কত আর আাগাছার জঞ্জাল ছাপ ছুতরো করবে? কত শ্রমের ঘাম ঝরাবে দোয়াশ মাটির বিবরে, তোমার আযানে ভোর কি হবে না, ফুল কি ফুটবেনা লতায় লতায় ফলের সৌগন্ধে কি মৌমাছি আসবেনা ছুটে?

আমি জানি তোমার পাকা হাতের কাস্তে আগাছা উপড়ে দিয়েছে। তোমার কোমল আদরে গুল্মেরা ফলবতী হবে পাকাফলের খোশবু ছড়িয়ে পড়বে লোকালয়ে আমার রসনা মিটে যাবে আমি মুগ্ধ হৃদয়ে আনন্দ জোছনায় ভিজে যাব।

চৈত্রের প্রথমে বাঙ্গী তরমুজে আমাদের ঘরের বারান্দা ভরে যেতো। জৈষ্ঠ্যের আবাহনে আম কাঠাল লিচুর মৌতাতে যে ভাবে আমরা ভাই বোনেরা আনন্দে উল্লাস করতাম, তেমনি মুগ্ধতায় আমরা ভাই বোনেরা আমোদিত হতাম। ছোট বোন হামিদা, ছোট ভাই আসাদ, হাবিব’সহ আমিনুদ্দির ছেলে মেয়ে হাকিমুদ্দি, সখিনা আমাদের সাথে বিভিন্ন ফল ফলাদি খেতে অংশগ্রহণ করতো। ওদেরকে আলাদা চোখে দেখা হতো না। এসময়ে ফরিদা, চন্দনা খুব ছোট ছিলো। সাইফ, আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেনি। তবে ওরাও এমন আনন্দের অংশিদার হয়েছে। কিন্তু তখন আমিনুদ্দির অবর্তমানে ছত্তার, নালু আমাদের বাড়িতে ওই কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করতো। নালু বা লালু একটু সহজ সরল ও কর্মঠ ছিলো পক্ষান্তরে ছাত্তার ছিলো দারুণ চালাক ও আমার অনেকটা বন্ধু সুলভ। সে আমার প্রায় সমবয়সী না হলেও দু’চার বছরের বড়ো ছিলো। সে আব্বার অগোচরে আমার সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করতো, তবে তাতেও তার ভক্তি শ্রদ্ধার কমতি ছিলো না। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাকে সঙ্গ দিতো।

গ্রামের বাড়ি থেকে শহরের বাড়ীতেও ছাত্তার আমাদের গৃহকর্মী হিসাবে অনেক বছর সময় অতিবাহিত করেছে। সে দারুণ মিশুক ও সংস্কৃতবান ছিলো। শহরের বাড়ীতে আমার সাথে কখনও বা হালিম ভাই, সেলিম ভাই ও ওলী ভাইয়ের সাথে বাজার করার সঙ্গী হতো আর এই মিয়ার বেটাদের বাজারের থলি বহন করতো। কখনও কখনও ব্যাংকে বিদ্যুত বিল পরিশোধের জন্য লাইনে দাড়াতো। আর অফিসারের নিকটবর্তী হলেই মিয়ার বেটারা বিল পরিশোধের জন্য ব্যাবিব্যাস্ত হয়ে যেতো।

এই ছাত্তার খুব চালু এবং দূরন্ত ছিলো, সে তার ক্যারিসম্যাটিক চারিত্রিক গুনে মিয়ার বেটাদের বন্ধু বান্ধব শহরের জামাল, কামাল, মাবুবব, পাগলা জামাল ভাইদের মত ছেলেদের বন্ধু বনে গিয়েছিল। পরবর্তী জীবনে সে শহরের একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন হয়েছিল।