বাবা আমার দিল মোহরে কাবা : ক. শিক্ষা বিস্তারের একাগ্রতা

আমার বাবার অনেক স্মৃতি আমাকে এখনো তাড়িত করে। আব্বার সব কথা, সব ঘটনা আমার জানা নেই যা আছে তাও কম নয়। অতি শৈশবের ঘটনা যা মায়ের মুখে শুনেছি এবং অন্যান্য নিকটজনের কাছে শুনেছি তা হয়ত সব গুছিয়ে বলা সম্ভব হবে না।

আমার বাবার জীবন ছিলো ঘটনা বহুল, তার কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব। যে বিষয়ে আমি সম্পৃক্ত তা খানিকটা বলার প্রচেষ্টা চালাবো। জীবনের সব ঘটনা সব রহস্যের উদ্ঘাটন করাও সম্ভব নয় আর অনেক ঘটনা এড়িয়ে যাওয়াই মঙ্গলজনক। আমার বাবা অনেকের কাছে প্রিয় ও সম্মানের আবার কারো কারো কাছে অপ্রিয়ও হয়ত ছিলেন। কারণ তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ করতেন অকুতোভয় চিত্তে। তিনি খুব সাহসী, নির্ভিক ও খোদপরস্তি ছিলেন।

এলাকার প্রভাবশালী, নামকরা ব্যাক্তিত্ত্ব, চল্লিশগ্রামের শালিসি ও বিচার কর্ম করেছেন তিনি অনেক সময়।নিজ এলাকার দূর্নীতি কঠোর হস্তে দমন করেছেন। কারো প্রতি কেউ অন্যায় করলে তার উপযুক্ত বিচার করেছেন। নিজের প্রজাদের দেখ ভাল করেছেন, বিপদে আপদে সাহায্য করেছেন,সহজ শর্তে ঋন দিয়েছেন, আবার গরীবদের ঋন মওকুফ করেছেন।প্রাপ্য টাকা এবং খাজনা আদায়ে দক্ষতা দেখিয়েছেন। অনেকের আবার খাজনা মাফ করে দিয়েছেন।

আমার বাবা শিক্ষানুরাগী ছিলেন।শিক্ষক ছিলেন সল্প সময়ে। তিনি শিক্ষাকতাকে পেশা হিসেবে নেননি। তিনি শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবৈতনিক প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষাকতার পারিশ্রমিক তিনি গ্রহণ করতেন না। শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিনিই একক উদ্যোগে উন্নিত করেন। ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন তিনি। লোকেরা খারদের মিয়াসাহেব জমিদার বংশের শেষ বাত্তি ইসরাইল মিয়াকে যখন মাষ্টার সাহেব বলে সম্মানের সাথে সম্বোধন করত তখন মিয়া সাহেবের ভালো লাগতো না। জমিদার বংশের পোলায় টাকার জন্য শিক্ষাকতা করছে তাইতো তিনি মাষ্টার! তিনি ওই পেশা ছেড়ে দিলেন। কারণ ইতিপূর্বে তিনি সরকারের কোন সারভেন্ট হতে চাননি, সরকারি চাকরি নেননি।

স্কুল দাড় করিয়ে তিনি সসম্মানে চলে এলেন। নিজ গ্রামের নিজ পাড়ায় পশ্চিম মিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করলেন। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠা কালীন নাম ছিলো ওকিদুন্নেছা প্রাথমিক বিদ্যালয়।কিন্তু একজন লোকের জোর আবেদনে নাম পরিবর্তন করা হয়। এই লোকটি এখন নিষিদ্ধ কুসুম-ধুতরার ফুল। আব্বা নিজ মহল্লার কোমলমতি শিশুদের জন্য আমাদের বাড়ির মসজিদে আরবি ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মক্তব চালু করলেন। এখানে সেপারা ও কোরান শিক্ষার তালিম হোত।

এলাকার লোকেরা শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতো না, তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতে অনিহা প্রকাশ করতো। এ জন্য আব্বা ওইসব শিক্ষাবিশ্রদ্ধ পরিবারকে আর্থিক জরিমানা করার ভয় দেখিয়ে তাদের শিশুদের মক্তব মুখি করার মহান ব্রত গ্রহন করেছিলেন। কোন পরিবারের সন্তান গর হাজির হলেই তাদের জরিমানার অর্থ প্রদান করতে হতো। আব্বা এই জরিমানার টাকা আবার তাদের ফিরিয়ে দিতেন। আমাদের কাচারি ঘর রাত্রে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রে পরিনত হতো। এই বয়স্ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কয়েকজন ছাত্রের নাম এই মূহুর্তে মনে পড়ছে, তারা হল-রাঙামিয়া,বাবু খা,হোসেন, ওয়াজেদ, মাজেদ, রাশেদ,আজিজ মোড়ল,জলিল সেখ প্রমুখ।

আমাদের বাড়িতে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন তিনটি একতলা দালান ঘর এবং একটি সুন্দর খেলার মাঠের সৌন্দর্য নিয়ে এলাকার শিক্ষা বিস্তারে ভালো ভুমিকা রাখছে। আমরা এই স্কুলের যাবতীয় দেখাশোনা করি। ছোট ভাই হাফেজ মাওলানা শাহ হাবিবুল্লাহ স্কুলের গভর্নিং বডির প্রধান।