শেকড়ের সৌগন্ধে

আমার বাবার বাবার নাম শাহ আবদুর রহিম। দাদারা তিন ভাই ছিলেন। শাহ আবদুল করিম ও শাহ আবদুল হালিম দাদার আপন দুই ভাই। আবদুল করিম দাদার এক পুত্র ছিলেন তার নাম আবদুল খালেক। তার আর কোন সন্তান ছিল না। আমার আব্বা তাঁকে শুধু ভাই বলে ভাকতেন।তিনি আমার বাবার বড়ো ছিলেন। আমার বাবা তাকে খুব ভক্তি ভরে সম্মান করতেন এবং আপন ভাইয়ের মত প্রগাঢ় শ্রদ্ধা করতেন। আমার বাবার আপন কোন ভাই বোন ছিলোনা। বাবার অপর চাচা আবদুল হালিমের কোন পুত্র সন্তান ছিলো না।
তবে আমার এই দাদার তিন কন্যা ছিল। তাদের দুইজনের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তারা হলেন বেগম আমিরুন্নেছা ও ওয়াহিদুন্নেছা। আমার এই দাদার তিন মেয়েকে বিবাহ দেন বেশ নাম করা ঘরে।
আমার বাবার বয়সে বড়ো ছিলেন তারা। আমার বাবা তাঁর এই চাচাতো বোনদের আপন বোনের মত শ্রদ্ধা করতেন। আমার এই তিন ফুপুর নামকরা ঘরে বিয়ে হয়। এক ফুপুর বিয়ে হয় গোপালগঞ্জের মহিষপুরা গ্রামের বিখ্যাত খোন্দকার বাড়িতে। আমার সেই ফুপাতো ভাই শুকুর খোন্দকার মাঝে মাঝে আমাদের খারদিয়া গ্রামের বাড়িতে এবং ফরিদ পুর শহরের বাড়ীতে বেড়াতে আসতেন। শুকুর খোন্দকার ভাইয়ের এক নাতি মাসুদ আমাদের বয়সী। তিনি ফরিদ পুর শহরে এক সময়ে জাসদ ছাত্র লীগের বড় নেতা ছিলেন।
আরেক ফুপুর বিয়ে হয় সালতা থানার নটখোলা গ্রামের খোন্দকার ফ্যামিলিতে। আমরা ফুপা এলাকায় খুব পরহেজগার পীর প্রকৃতির লোক ছিলেন। আমার এই ফুপার দুই ছেলে নান্নু খোন্দকার ও জাফর খোন্দকার। নান্নু ভাইয়ের এক ছেলে জিয়াউর রহমান খোন্দকার আমার সহপাঠী ছিলেন। বাবলু খোন্দকার জিয়ার বড়ো ভাই। সে মাদরাসাতে লেখাপড়া করে বড়ো আলেম হয়েছে। নান্নু ভাইয়ের এক বোনকে মাদারীপুরে বিয়ে দিয়েছেন। আমার এই ফুপাতো বোনের দই পুত্র। একজন ইনজিনিয়ার মাসুদ আমার ইমিডিয়েট বড়ো ভায়রা।আমার স্ত্রীর সেজ বোন ডাক্তার মেরী তার সুযোগ্য স্ত্রী। মাসুদ সাহেব উয়িংকমান্ডার পোস্ট থেকে সর্বশেষে অবসরে গেছেন। তার ছোট ভাই লুলু সচিব পদমর্যাদায় চাকরি করছেন। আমার অপর বিয়ে হয়েছে গোট্টির সৈয়দ ফ্যামিলিতে। আমার ফুপুর নাতি সম্পর্কিত হন জাতীয় সংসদের উপনেতা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। তিনি আমাদের এলাকার এমপি। নির্বাচন উপলক্ষে এবং এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকিতে এলে তাঁকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতাম কখনো কখনো। তিনি আমাদের আত্মীয় তাছাড়াও তিনি এলাকার সুযোগ্য নেতা।জাতীয় নেতা। এ জন্য তার প্রতি আমাদের একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।

শাহ আবদুল্লাহ খান মজলিশের পূর্ব পুরুষ যে হালাকু খানের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল সেই হালাকুখান ও তৈমুর লং এর উত্তর প্রজন্ম ভারতের সম্রাট আকবরের রাজ্যে স্হান পেলেন এবং রাজসভায় সম্মানিত হলেন। এটাই হল খোদার লীলা বা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর ছিলেন একই সাথে তৈমুর লং৷ এবং চেঙ্গিস খানের বংশধর। বাবর মাতার দিক দিয়ে চেঙ্গিস খানের সাথে যুক্ত এবং পিতার বংশের দিকে তৈমুর লং এর অধঃস্তন পুরুষ।

শাহ আবদুল্লাহ খান মজলিশ এর পুত্র শাহ মুরাদ ও শাহ ইরান বাংলাদেশের শেরপুর কিশোরগঞ্জ এলাকায় চলে আসেন।কারো কারো মতে তারা ওই এলাকার জঙ্গলবাড়ী নামক স্হানে বসবাস করতে থাকেন। শাহ ইরানের দুই পুত্র শাহ মোরশেদ ও শাহ ওয়াহাব ফরিদ পুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার ফুকুর হাটিতে চলে আসেন।শাহ মোরশেদ নিঃসন্তান ছিলেন।
শাহ ওয়াহাবের দুই পুত্রের নাম যথাক্রমে শাহ শামসুদ্দিন ও শাহ মোহসেন উদ্দিন। বিমাতার সাথে তাদের প্রায়ই মনোমালিন্য হত। তাই তাদের পিতা বাধ্য হয়ে মনের দুঃখে দূরে সরিয়ে দেয়ার চিন্তা করলেন। একদিন বালক পুত্রদ্বয়কে হাতির পিঠে সওয়ার করিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। হাতিটি রাজকীয় পোশাক পরা দুই বালক নিয়ে চলতে চলতে নগরকান্দা উপজেলার ফুলবাড়ীয়া হাটের কুমার নদীর পাশে দাড়িয়ে যায়।

কুমার নদীর ওপর পাড়ে ছিল খারদিয়া গ্রামের সেখপাড়া। বালকদের সুন্দর মায়াবী জোছনা মাখা চেহারা কোন এক সেখের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিঃসন্দেহে এরা কোন জমিদার পুত্র। পথ হারিয়ে হাতির পিঠে একাকী এখানে এসেছে। এদের আশ্রয় দেয়া দরকার। এই অবুঝ বালকেরা কোথায় যাবে?একদিন এদের বাবা মা খোঁজে এখানে আসবে।এই চিন্তায় সেখ মহোদয় সহৃদয়ে নিজ বাটিতে আশ্রয় দান করে। শাহ শামসুদ্দিন বড় হয়ে সেখ পরিবারে বিবাহ করেন। এ দিকে তাদের পিতা ফুকুরহাটি থেকে পুত্রদ্বয়ের খোঁজে সেখদের বাড়িতে হাজির হয়।পুত্রদের ফিরে পেতে চাইলেন।কিন্তু সামসুদ্দিন গেরস্ত ঘরে বিয়ে করেছে বলে তাঁকে আর ফেরত নেননি। যানা যায় অকৃতদার পুত্র শাহ মোহসেন উদ্দিনকে তিনি চলে যান। শাহ শামসুদ্দিন দিনে দিনে কৃষি জমি ক্রয় করে লোকজন দিয়ে চাষাবাদ,পশুপালন করিয়ে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক হয়ে যান।আস্তে আস্তে সরকারি খাস জমি ও লোকদের বেশ জমিজমা কিনে নেন। গ্রামের প্রশাসন দক্ষতার সাথে চালাতে থাকেন। সুবে বাংলা আমলে তিনি সুবেদার শাসকদের নিকট থেকে অত্র গ্রামের তালুকদারী জমিদারী সুবিধা গ্রহণ করেন এবং সরকারি কোষাগারে খাজনা প্রদানের দায়িত্ব নেন।

জমিদারী তালুকদারী পেলেও তিনি শান শওকত দেখাতেন না।কারণ তার রক্তে তখনও ওলী-আউলিয়ার শোনিত প্রবাহমান। তিনি পোড়া মাটির ইটে দালান ঘর বানাতে অনিহা করেছেন। পিতৃকূল থেকেই শুধু বঞ্চিত হন নি বরং বংশিয় লকব শাহ লিখতে পারলেও খান মজলিশ লিখতে পারবেন না বলে তার বাবা কড়া নির্দেশ দিয়ে গেছেন। কেউ এ নির্দেশ অমান্য করলে সে নিসন্তান হবে। শাহ শামসুদ্দিন এর এক পুত্রের নাম সাঈদ রমজান। তার তিন পুত্র হল মকিম মিয়া, বরকত উল্লাহ মিয়া ও দিদার মাহমুদ। দিদার মাহমুদ নিসন্তান ছিলেন। মকিম মিয়া ও বরকত উল্লাহ মিয়ার উত্তর প্রজন্মের অনেকেই বর্তমান আছেন। বরকত উল্লাহ মিয়ার দুই পুত্র। এরা হলেন কমর উদ্দিন ও পবন মিয়া। কমর উদ্দিন এর তিন পুত্র আবদুল করিম,আবদুর রহিম ও আবদুল হালিম। আবদুর এর এক পুত্র। তিনি আলহাজ্ব শাহ ইসরাইল মিয়া।শাহ ইসরাইল মিয়া হলেন আমার জন্মদাতা পিতা। আব্বা আমার নাম রাখেন শাহ মোহাম্মদ আলীম উল্লাহ। আলীম উল্লাহ কি ভাবে হাসান আলীম হল সে বয়ান একটু পরেই দিচ্ছি।