বাবা আমার দিল মোহরে কাবা : খ. দরবেশী শাহ সাহেবী

আমার আব্বা খুব ধর্মপরায়ণ পরহেজগার মানুষ ছিলেন। আমার বালক বেলা থেকেই দেখেছি আব্বা কখনও নামাজ কাজা করেন নি, উপরন্তু তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, আউয়াবিন ইত্যকার নানা রকমের নফল নামাজ এবং অর্থসহ কোরান তেলাওয়াত করতে। আব্বাকে চল্লিশ বছর তাহাজ্জুদের নামাজের অজু দিয়ে ফজর নামাজ পড়তে দেখেছি।
আমার অবাক লাগে এই আধুনিক শিক্ষিত পোশাক আশাকে কেতাদুরস্ত মানুষটি কি ভাবে এমন পরহেজগার হলেন। জানি, তার রক্তে দরবেশ শাহ আবদুল্লাহ খান মজলিশ এর পবিত্র শোনিতধারা পদ্মার ঢেউয়ের মতো দজলা ফোরাতের তরঙ্গ তুরগের মতো গর্জন করছে! কিন্তু এত বছরের পরেও যে সে পবিত্র শোনিতধারায় মহুয়া চম্পক নগরের মধু মুগ্ধতা সৃষ্টি করবে পরম প্রভুর বিতানে বিনয়াবনত হবে সেটাই হয়ত বাস্তবতা।
আজ থেকে অনেক বছর আগে আমার, দাও সে সোনারগাওঁ, কাব্যগ্রহ্নে লিখেছিলাম :
আমার রক্ত কণিকা কেন্দ্রে সোনালী পুরুষ এক
শাহ আবদুল্লাহ খান মজলিশ
তকবির ধ্বনি দেন অবিরল মহান প্রভুর।
শ্যামল বাংলার সবুজ প্রান্তরে
রক্তঘাম ঝরেছিল যার তসবিদানার
আম জাম নারকেল বনে,
মরুবিয়াবান ছেড়ে জায়নামাজের ভুমি
এই দ্রাবিড় বাঙলা অসীম মমতা মাখা
বুটিদার সেজদার প্রিয়স্পর্শতল
ধন্য হয়েছিল যার কপাল ছোঁয়ায়,

সেই স্পর্শ শিহরণ থেকে কেঁপে ওঠে
রক্তের ভেতর অসংখ্য কৈতর।
তোমার কোমল ছায়াবনে মজলুম জনগন
ফিরে পেত প্রাণ,
অমর ঠিকানা মাতৃভূমি জন্মের সোহাগ।

এ নাম যাবেনা মোছা রক্তকণা থেকে
এ নাম হারিয়ে যাবেনা বাংলার
ধূলো মাটি থেকে,
দরবেশ যোদ্ধা তুমি বেঁচে রবে
এই মাটি এই মন রক্ত কণিকা সমুদ্রে চিরকাল।

আমাদের মসজিদে আরও একজন মহান দরবেশ ইবাদত বন্দেগি করতেন তিনি অধ্যাপক মাওলানা সাইয়েদ মোহাম্মদ আলীর বাবা সাইয়েদ আবু সায়ীদ সাহেব। তিনি আমাদের প্রতিবেশী এবং আমার খালুজান। তার পবিত্র সহবত পেয়েছিলেন আমার বাবা।

আব্বা কোরান শরীফ অধিক শুদ্ধভাবে পড়ার তালিম পেয়েছিলেন তাঁর নিকট থেকে। খালুজান সব সময় মসজিদে ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন। কেবল খাওয়ার সময় ঘরে যেতেন। তিনি প্রায় দিনেই মসজিদে এতেকাফে অবস্থান করতেন। আব্বাকে তিনি অনেক আমল, দোয়া, জিকির আসগর শিখিয়ে ছিলেন। খালুজান মসজিদে ওয়াক্তিয়া নামাজের ইমামতি করতেন। তার অবর্তমানে আব্বা নামাজের ইমামতি করতেন। তবে জুম্মাবারে আমাদের নির্ধারিত খতিব মহল্লাবাসী জনাব সুলতান আহমদ নামাজ পড়াতেন, খুতবা দিতেন এবং মিলাদ শরীফ পড়াতেন। আমিও ক্ষুদে মুসল্লী হয়ে নামাজ পড়তাম এবং মিলাদের সুরে সুর মেলাতাম। তবে তবারক বা শিরনী গ্রহণ করতাম না। কারণ মিয়ার পুতেরা অন্যের শিরনী খায় না সৈয়দ জাদারা জাকাত ফিতরা স্পর্শও করে না।

আব্বাকে তাঁর জীবনের শেষ তিন দশকে খালুজানের মতো দরবেশী চাল চলন করতে দেখেছি। ফজর নামাজ শেষে মহল্লার এবং আশপাশ গ্রামের লোকদের দেখেছি আব্বার নিকট থেকে পানি পড়া নিয়ে যেতে। তাদের ছেলে মেয়েদের যে কোন অসুখ, পোয়াতি নারীদের প্রসববেদনা লাঘব করে সহজে নবজাতকের ভূমিষ্ট হওয়া, এমনকি গরুর খুরা রোগের লাঘবের জন্য পানি পড়া মহৌষধ নিয়ে যেতে। আল্লাহর কি কুদরত এই পানিপড়া খেয়ে তারা রোগ থেকে মুক্তি লাভ করতে।

আব্বা তাহাজ্জুদ নামাজ ঘরে পড়তেন এবং জিকির আজকার করতেন তারপর মসজিদে ফজরের নামাজের জন্য যেতেন। নামাজে যাওয়ার সময় আব্বা আমাকে উচ্চস্বরে ডাক দিতেন, বাবা আলীম ঘুম থেকে ওঠো, ফজরের নামাজে চল। আব্বার ডাকের সাথে সাথে আমি ঘুম থেকে উঠে যেতাম। কারণ আব্বার জিকিরের সৌরভে আমার ঘুম আগেই ভেঙে যেতো। আব্বা আমাকে নামাজের জন্য সব সময় ডাক দিতেন। আর আমি তত্খনাত মসজিদে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতাম।

আব্বা খুব রাগী এবং মেজাজী ছিলেন, বিশেষত নামাজ রোজা, লেখা পড়ার ব্যাপারে কোন গাফলতী হলে খানা বন্ধ হয়ে যেতো। তবে আমার এ জন্য কোন কসুর ছিলো না। ছোট বেলায় আল্লাহকে ভয় করার চেয়ে আব্বাকে বেশি ভয় করতাম। তখন নামাজ আমার জন্য ফরজ না হলেও মসজিদে আব্বার ধমকে যেতে হতো, অজু না করেই বালক বেলায় নানাজে সামিল হতাম। এখন আমার নামাজ কাজা হয়না।তবে ফজরে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলেই এখনো আব্বা আমাকে ইল্লিন থেকে পরজগত থেকে নামাজের জন্য ডেকে তোলেন। ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠেই আব্বাকে খুজতে থাকি। আব্বার মধুর ডাক এখনো আমার কর্ণ।