বাবা আমার দিল মোহরে কাবা : গ. ক্ষুদে রাজা যেন এক মহারাজা

আমার বাবা কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজের পাঠ অসমাপ্ত করে খালেক চাচার এক চিঠিতেই চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। পাড়ার প্রজাবৃন্দ ঠিক মতো, খাজনা দিচ্ছে না, বর্গাদার কৃষকেরা ফসল ও টাকা দিচ্ছে না,ধান পাট ও রবি ফসলও নেয্য দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না। চাচা অসুখে ঘরে পড়ে আছেন। তিনি নিঃসন্তান। কে তাকে দেখা শোনা করবে? কে এসে সংসারের হাল ধরবে?

আব্বা সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসারের হাল ধরলেন। খালেক চাচা আমার জন্মের আগেই মৃত্যু বরন করেন। তাঁর স্ত্রীকে আব্বা ভাবী সাহেবা বলতেন। আব্বার এই ভাবীছাপকে আমরা বোঁচা চাচিআম্মা বলতাম। তনি খুব রাশভারি ও সুন্দরী মহিলা ছিলেন। তাঁকে আমি কয়েক বছর জীবিত দেখেছি। তাঁকে আমরা অবশ্য বোঁচা চাচিআম্মা বলতাম না, শুধু চাচি বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে খুব আদর করতেন। বাটা ভরে পান সেঁচে তিনি খেতেন। তাঁর খেদমতে নিয়োজিত ছিলো গোলাপি নামের একটি ফুটফুটে মেয়ে। ঝড়বৃষ্টি শুরু হলেই চাচি আম্মা তার দেবর ছোটো মিয়া,অর্থাৎ আমার বাবার দোতলা ঘরে চলে আসতেন।

খালেক চাচার মৃত্যুর পর আব্বা তাঁর বাজার হাট, ক্ষেতের ফসল দেখভাল করার জন্য রইসুল হককে নিযুক্ত করে দেন। রইসুল হক তাঁকে মা বলে সম্বোধন করতেন। আমরা তাকে ভাই বলে ডাকতাম যদিও তিনি আমার সহপাঠী বাকীর আপন মামা, ড. আবদুল মান্নানের ছোটো মামা হোতেন।

আমাদের মহল্লার অনেকেই আমার বাবার ভিটে বাড়ির প্রজা ছিলেন। তখন অর্থাৎ পঞ্চাশ ষাট দশকে প্রজাসত্ত্ব
বিধান প্রায় লোপ হয়ে গিয়েছিল। তবে আমাদের অনেক ফাঁকা জায়গা ছিলো বসত বাড়ি করার মতো। এ সব জায়গা জমিনে অনেক অনেক লোকজনকে আব্বা নতুন করে ঘরবাড়ি বানিয়ে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। তারা কেবল বার্ষিক খাজনার টাকা আব্বকে প্রদান করতেন।

রোকন সিকদার, পাচু সরদার, মোজাম ফকির, হোসেন ফকির, আজিজ মোড়ল, ওয়াজেদ সেখ, মাজেদ সেখ, রাশেদ সেখ, সেখ’সহ আরও অনেকে। তবে মহল্লার আরও পনেরো বিশ ঘর লোকদের আব্বা তাদের বসতের জন্য জায়গা বিক্রি করেছিলেন। আমাদের মহল্লায় তখন খুব কমলোক স্হায়ী বাসিন্দা ছিলো। নগরকান্দা উপজেলার কামদিয়া থেকে এসেছিলেন মৌলভী সুলতান আহমদ। তিনি নগত দামে জমি কিনে স্হায়ী ভাবে বসবাস করেন। তার ভাই আমানুল্লাও আমাদের ফাকা জায়গা কিনে বসবাস শুরু করেন বদিয়ারজমার ভুইয়ের আংশিক তখনও আমাদের বাথানে ছিলো। আমানুল্লা এই জমির দেখভাল করতেন। রোকন শিকদার, আলেম সেখরা পাশের বাংরাইল গ্রাম থেকে এসেছিল। আজিজ মোড়লের বাবা কসিমুদ্দিন মোড়ল, মোজাম ফকিরের বাবা এরাদত ফকির সম্ভবত পূব এলাকার কোন এক গ্রাম থেকে এসে আমাদের ফাঁকা জায়গায় বসবাস সুরু করে। তারা সকলে খাজনা দিতো আব্বাকে। তবে কোনকোন বছর তাদের খাজনা মাফ করে দেওয়া হতো। মোজাম ফকিরের কোন কোন ছেলে এখনো আমাদের নলডুবির জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছে। আব্বার বৃদ্ধ বয়সে অর্থাৎ সত্তুর আশির দশকে এই সব প্রজাবৃন্দকে জমিন লিখে দেন। আব্বাস খা, গহের খাঁ পুব এলাকা থেকে আমাদের মহল্লায় আমাদের জমিন কিনে বসবাস করে। মহল্লার রশিদ মিয়া অর্থাৎ লাল মিয়ার বাবাঅবস্হাপন্ন গৃহস্থ ছিলো। সে মহল্লার স্হায়ী বাসিন্দা ছিলো। মোবারক সরদার, ঈশারত সরদার ছিলো স্হায়ী বাসিন্দা। এরা প্রত্যেকে আব্বাকে সহযোগিতা করতো এবং আব্বার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো।

আমি গ্রামের বাড়িতে আব্বাকে নিবিড় ভাবে অনুসরণ করেছি প্রায় বারো বছর। ফরিদ পুর শহরে লেখা পড়া করলেও মাঝে মাঝেই বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। ছয় বছর বাড়িতে টানা থেকেছি এরপর শহরের বাড়ীতে বাকি ছয় বছর। শৈশবের পাঁচ বছর অনেকটাই স্মৃতির মোড়কে আবৃত থাকে যে মোড়ক খোলার সামর্থ্য অনেকের থাকে না। তাই গ্রাম আর ফরিদপুর শহরের সতেরো বছরের সতেরো সওয়ারী বখতিয়ার এই আমি মধ্য ষাটের কোঠায় বসে স্মৃতির সাগরের বেলাভূমিতে নুড়ি আর চকমকি পাথরের সন্ধান করছি জানি না তাতে আমার ঝুলি কতটুকু ভারী হবে।

আব্বা তাঁর পূর্ব পুরুষের সব সম্পত্তি উদ্ধার করতে পারেননি। শুনেছি কয়েক হাজার বিঘা জমির মালিক ছিলেন আমার দাদার দাদা পরদাদারা। গ্রামের অধিকাংশ জমির মালিক ছিলেন তারা। এ ছাড়াও রায়েরচর গ্রামের দুটি মহল্লা আমাদের তাল্লুকে ছিলো। আব্বার মালিকানায় সর্ব সাকুল্যে মাত্র দুই শত একর জমিন ছিলো। এসব জমিনের বেশ কিছু জমিন আমি এখনো ভালো ভাবে ঠাহর করতে পারিনি। নিজ গ্রামের জমিনের সব দাগে এখনো ভালো করে দাগ রাখতে পারিনি। পার্শ্ববর্তী ময়েনদিয়া শ্রীনগর গ্রামে, পরমেশ্বরদী গ্রামের সব জমিন এখনো ভালো করে ভালোবসতে পারিনি। ভালো বাসতে হলে নিকটে যেতে হয়, আগাছা সাপ সুতরো করে আবেগের পরশ দিতে হয়, নিজ হাতে মৌসুমে বীজ ফেলতে হয়- কিন্তু আমি চিরকেলে অদৃশ্যের অনির্নয়তায় আমোদিত, অস্পর্শের অনির্দিষ্টতায় পুলকিত, আমার ভালোবাসা কে বুঝে- জমিন সে কোন সার!

আমাদের জমিনের বেশির ভাগ জমিই বর্গা চাষিরা চাষ করতো। কেউ আধাআধি ফসল দিতো, কেউ বা টাক বর্গাদার হিসেবে পূর্ব নির্ধারিত টাকা দিতো। তবে আমার ধারনা আব্বার পরিচালনায় বাড়ির ম্যানেজারের দায়িত্বে শত একর জমিন নিজস্ব চাষের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। আমাদের বাড়িতে ফসলের মৌসুমে প্রায় শতেক কৃষাণ কাজ করতো। বছর কাবারী পুরুষ মহীলা মিলে আট দশজন গৃহ কর্মী সম্পূর্ণ কাজ সামলে নিতো। অন্দরমহলের জাবতীয় কাজ আমার মমতাময়ী মা পরিচালনা করতেন।

ধান পাট, রবি ফসলের মৌসুমে আমাদের বাড়িতে কর্মযজ্ঞের হুলুস্থুল পড়ে যেতো। এসময়ে আমাদের বাড়িতে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতো খলিল, শাজাহান, কালু মোল্লা। দূরের জমিন এবং অন্য গ্রামের জমিনের তদারকি করত শুকুর সেখ, মুজাম ফকির সহ আরও অনেকে। আব্বা মুজাম ফকির, শুকুর সেখকে দারুণ বিশ্বাস করতেন এবং নিজস্ব লোকের মতো একান্ত স্নেহ করতেন। ধান পাট রবি ফসল বছর খোরাকি রেখে বাকীটা বিক্রির ব্যাবস্হা করা হোত। আর এ কাজে বেশি নিযুক্ত ছিলো মুজাম ফকির। কখনও কখনও মোছলেম খাও হাসেম সেখ এ দায়িত্ব পালন করতো।

জমিনের খাজনাপত্র বা থানায় কাজ থাকলে আব্বার গহযোগি হতো চার পাঁচ জন লোক। আব্বার একটি দোনালা বন্দুক ছিলো এটা বহন করার জন্য আদেল, রোকন সিকদার কখনও বা অন্য কাউকে সফর সংঙ্গী হিসেবে দেখেছি। বন্দুকের লাইসেন্স রিনিউ করার জন্য দু তিন দিন আগে থেকেই বন্দুক পরিস্কার করা হতো। এ কাজে কর্মীসহযোগী সাত্তারের সাথে আমিও অংশ গ্রহণ করতাম।আমি বন্দুক চালনা করতে পারতাম না। তবে আমার মমতাময়ী মা ও ছোট বোন ফরিদা চন্দনাকে আব্বা বন্দুক চালনা শিখিয়ে ছিলেন। তখন কার দিনে গ্রামের ধনি, অবস্হাপন্ন ও এলিট শ্রেণীর লোকেরা সরকারের নিকট থেকে এই আগ্নেয়াস্ত্র রাখার সুযোগ পেত।