বাবা আমার দিল মোহরে কাবা : ঘ বাবার খাদ্যাভ্যাস

আমার বাবা গৌর বর্ণের মধ্যম আকৃতির সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। তাঁর অসুখ বিসুখ তেমন একটা হতে দেখিনি। তিনি ভালো হকি প্লেয়ার ও ভালো ফুট বল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি সুস্বাস্হের অধিকারী ছিলেন ফলে ভালো ভোজন রসিকও ছিলেন। তবে তিনি কখনও তার চাহিদার অতিরিক্ত ভোজন করতেন না।বাইরের কোন খাবার যেমন হোটেল রেস্তোরাঁয় তিনি খেতে পছন্দ করতেন না। বাইরে কোথাও ভ্রমণ বা দরবর বৈঠকে গেলে নফল রোজার নিয়ত করতেন এবং সূর্য ডোবার আগেই বাড়িতে ফিরতেন। ফরিদপুর শহরে কখনও গেলে ওই নফল রোজার নিয়ত করতেন এবং শহরের বাড়ীতে পৌঁছে তবে ইফতার ও খানা খেতেন।বাইরে কোথাও খাবেন না বলেই তিনি এ পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। ফলে বাইরের কোনো খাবার তাকে খেতে দেখিনি।

বাড়িতে সারাদিনে খাবার খাওয়ার আব্বার নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ছিলো, তা তিনি সারা জীবন মেনে চলার চেষ্টা করেছেন। ফজরের নামাজের পর ইশরাক নামাজ ও কোরান তেলাওয়াত শেষে অন্দর মহলে আসতেন আব্বা। মা ততক্ষণে আব্বার পড়ার টেবিলে এক গ্লাস শুকনো পাট পাতার রস রেখে দিতেন। এরপর আব্বা আধাঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে আবার এক গ্লাস মধুর সরবত খেতেন। কোনো কোনো দিন মুড়ি ও নারকেল শাস খেয়ে বাড়ির চারপাশের বাগ বাগিচায় পায়চারি করে সকাল দশটার দিকে আবার ঘরে আসতেন। তখন খিচুড়ি ভুনা, ডিম ভাজি অথবা দুটি হাফ বয়েল ডিম, বেগুন ভাজি ও ঘি দিয়ে খেয়ে নিতেন। কোনো কোনো দিন খিচুড়ির পরিবর্তে গরম ভাত, সরপুঁটি ফ্রাই, টাটকিনি মাছ, ফ্রাই, দুটি হাফ বয়েল ডিম, ঘি ও ঘন ডাল খেতেন। পাট পাতার রস, ছাড়াও আব্বা নিম পাতার রস খেতেন।

পাট পাতার লিগনিন, তিক্ত বস্তু, নিমপাতার নিমবীন, নিমবিডীনসহ অন্যান্য তিক্ত বস্তু, এলকালয়েড, এন্টিঅক্সিডেন্ট, এন্ট্রিক্যানসারের রাসায়নিক বস্তু সম্পর্কে আব্বার জানা না থাকলেও এসবের ঔষধী গুনাগুনের ওপর তার দৃঢ আস্হা ছিলো। তিনি রোজার মাসে ইফতারের সময় সর্ব প্রথম পাটপাতার তিতকুটে রস এক গ্লাস খেতেন। আমাদের ও কোনকোন দিন ওই তিতে রসের শরবত পরমানন্দে মুখ বিকৃত করে গলাধঃকরণ করতে হতো, নইলে আব্বার চোখ রাঙানির সাথে বজ্জ্রখাই ধমক খেতে হতো।

দুপুরে গোছল সেরে জোহরের নামাজ পড়েই আব্বা খাবার ঘরে ঢুকতেন। আগে আমাদের আলাদা খাবার ঘর ছিলো। সেই ঘরে আব্বার জন্য বড়ো তক্তপোষ ছিলো। সেখানে আসন গেড়ে খেতে বসতেন। আমরা তার পাশে ভিন্ন পিড়িতে বসতাম। এরপর মাদুর বিছিয়ে ছোটো ভাই বোনেরা একত্রে খেতে বসতাম। আমার পঞ্চম ক্লাস পর্যন্ত এ নিয়মেই খাবার খেতে বসতাম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর আমরা দোতলা ঘরের ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার খেতে বসার সুযোগ পেলাম। দোতলা ঘরেদুটো ডাইনিং রুম ছিলো। একটি রুমে ফ্রিজ, দুটো মিটসেফ ও অন্যান্য আনুসাংগিক বস্তু এবং অন্য রুমে ডাইনিং টেবিল ও চেয়ার ছিলো।

আব্বা দুপুরে প্রধানত আমন চালের ভাত, শাক সব্জি, ছোট মাছ চচ্চড়ি, সরপুঁটি বা টাটকিনি মাছ ফ্রাই, বোয়ালমাছ, আইড় মাছ অথবা ইলিশ মাছ ভোনা এবং মুসুরি ডাল খেতেন। দুপুরে খাওয়ার মেনুতে এ জাতীয় শাকসব্জী ও মাছ ছিল। কোনো কোনো দিন বেলে মাছের ঝুরি, কাইকা মাছের ঝুরি, নারকেল সহযোগে বাইম মাছ, চিংড়ি মাছ, ষোল মাছ ভোনা। কোন কোন দিন মুরগীর গোস্ত, ডিমের কোরমা, চিতল মাছের বড়া, শোল বা চিতল মাছের দোলমা, অথবা মৃগেল, রুই, কাতলা মাছ খেতেন। মা এসব খাবার অধিকাংশ সময় নিজ হাতে রান্না করতেন। কখনও কখনও রুইমাছের মাথা,কাতলা মাছের মাথা অথবা ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে রান্না মুড়িঘন্ট খেতেন। তবে আব্বার পছন্দসই মাছ ছিল ইলিশ ও রান্দোল মাছ।

কুমার নদীর টাটকা তাজা মাছ খগেন জেলে, মেঘা জেলে আমাদের বাড়িতে সকাল সকাল দিয়ে যেতো। এই জেলেরা আব্বার খুব অনুগত ছিলো। নদীতে মাছ ধরার জন্য কাঠা এবং ভেসাল পাতার জন্য প্রয়োজনীয় বাঁশ ও গাছের ডালা আমাদের বাগান নিয়ে কাজে লাগাতো। তারা ইচ্ছে হলে টাকা দিতো অথবা এর বিনিময়ে বড়ো রুই, কাতল, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার মাছ আমাদের বাড়িতে এসে দিয়ে যেতো। আব্বা কখনও কখনও বাজারে গেলে বিশেষত মাছ বাজারে গেলে অন্য লোক জন আব্বার কাছে আসতো না আব্বার কেনাকাটা হলে তারা জেলের কাছে ভিড়তো। জেলেরাও মাছের দাম দস্তুর না করেই বড়ো মাছ আব্বার বাজারসহকারীর হাতে ঝুলিয়ে দিতো।

শীত মৌসুম থেকে আমাদের বিলের মাছ ও পুকুরের মাছে গৃষ্ম কাল পর্যন্ত চলে যেতো। পুকুরের বিভিন্ন মাছের মধ্যে আকর্ষণীয় ছিলো বড়ো বড়ো কৈ মাছ, মাগুর মাছ, শিং মাছ, গজার মাছ, শোল মাছ প্রভৃতি। আমরা প্রায় পাঁচ মাস ব্যাপি এই সব মাছ খেতাম। দুপুরে ঝাল তরীতরকারী মাছ, গোস্ত খাওয়ার পর আব্বা দুধ ভাতে কলা মিশিয়ে খেতেন। আমের দিনে দুধ আম খেতেন। আমের সময় পার হলে রাতের খাবারের সময় দুধে আমসত্ত্ব মিশিয়ে ভাতের সাথে খেতেন। দুপুরে খাওয়ার পর আব্বা হাল্কা ঘুমিয়ে আবার আসরের নামাজে যেতেন। নামাজ শেষ করে অন্দর মহলে আসতেন এবং প্রায় আধা কেজি ঘন দুধ খেতেন। কোন কোনো দিন দুধের পরিবর্তে দুধের ছানা খেতেন এক বাটি। আব্বার সাথে আমরা ভাই বোনেরাও গরুর ঘনদুধ বা দুধের ছানা খেতে বাধ্য থাকতাম। নইলে আব্বার কড়া ধমক খেতে হতো।

মাগরিব এশা পড়ে আব্বা ভেতর বাড়িতে ঢুকে ঘন্টা খানেক সাহিত্যের বিভিন্ন বই পড়তেন। আমাদের রাতের পড়া শেষ হলে আব্বা আমাদের নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসতেন। রাতে দুপুরের মত বিভিন্ন আইটেমের খাবার খেতেন না। সামান্য ঝাল ভাতে কয়েক টুকরো মাছ ও ডাল খেতেন। তবে অবশ্যই দুধভাত খেতেন। দুধ ভাতে যথা রীতি রুম্বিকলা বা দেশীয় কলা অথবা সবরীকলা, অথবা আমসত্ত্ব মিশিয়ে খেতেন। কোন কোন রাত্রে ঝাল ভাত না খেয়ে শুধু দুধভাত খেতেন। আব্বা কখনও খাওয়ার মাঝে পানি খেতেন না। এটা সুন্নতি তরীকা। খাওয়ার আধাঘন্টা আগে পরে পানি পান করতেন। আমি এখনো আব্বার দেখাদেখি রসুলের এই সুন্নত মেনে চলি। এ নিয়মে খাদ্যাভ্যাস বিজ্ঞান সম্মত। কারণ আমাদের পাকস্থলীতে যে তরল হাইড্রোক্লোরিক আছে তাতে পানি যোগ হলে এসিড আরও তরল হয়ে হজম প্রকৃয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। পেটে অগ্নিমান্দ হয়। টক ঢেকুর ওঠে এবং হাইপারএসিডিটি ও হাইপোএসিডিটি দেখা দেয়। রাতে খাওয়ার একঘন্টা পর আব্বা ঘুমোতে যেতেন।