বাবা আমার দিল মোহরে কাবা : ঙ. মুক্তিযুদ্ধে আমার প্রিয় অঙ্গনে

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ফরিদপুর শহরের বাসায় থেকে লেখাপড়ায় নিমগ্ন ছিলাম। আমি তখন ফরিদপুর হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণির সেকেন্ড বয়। হাসামদিয়া স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ফার্স্ট বয় এই আমি এখানে এসে ৩৫০ জন ছাত্রের সাথে প্রথম বারের মতো প্রতিযোগিতা করে ফার্স্ট হতে না পেরে মর্ম যন্ত্রণায় ভুগছিলাম।সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষায় তাই দ্বিতীয় স্হান অধিকার করলাম। অষ্টম শ্রেণির সেকেন্ড বয় আমি বছর শেষে পরীক্ষা না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কারণে অটো পাশ করে নবম শ্রেণিতে উন্নিত হলাম। অষ্টম শ্রেণিতে আমার বয়স ছিলো তেরো বছর।মে মাসের দিকে স্কুল বন্ধ হয়ে যায়।শহরের বাসায় থেকেই পাঠ্য পুস্তক ভালো করে অধ্যয়ন করছিলাম। ক্লাস এইটে আমাকে যে ভাবেই হোক ফার্স্ট হতে হবে। কিন্তু যুদ্ধ যখন তুমুল ভাবে চলছিল বিভিন্ন সেক্টরে, ভারতীয় মিত্র বাহিনী আকাশ পথে,স্থলপথে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লড়াই করছিলো তখন আমরা শহরের বাসা ত্যাগ করে গ্রামের বাড়িতে চলে গেলাম।

গ্রামের বাড়িতে আবার শ্রীনগর,হাসামদিয়া স্কুলের পুরোনো সহপাঠীদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ হতে লাগলো। গ্রামের বড়ো বাজার, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি পাক মেলেটারী ও রাজাকার বাহিনীর আক্রমণ চলছিল। অবস্থাপন্ন হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে মুসলিম নামধারী কিছুলোক জন লুঠপাট চালাতে লাগলো। রাস্ট্রপক্ষ থেকে এদেরকে উত্সাহিত করা হোত। শ্রীনগর গ্রামের অনেক বাড়িতে লুঠপাট হয়েছিল। আমার ক্লাসমেট সুশীল তাদের দোকানের স্বর্নের গহনা ও প্রায় আধা মন বা বিশ সের কাঁচা সোনা আমাদের বাড়িতে গচ্ছিত রেখেছিল এবং যুদ্ধ শেষে অক্ষত অবস্থায় তা ফেরত নিয়ে যায়। সুশীল সে সময় আমাদের বাড়িতে অবস্থান করছিল। ডাঃ মুকুন্দ লাল সাহা মামা এবং তার আত্মীয় স্বজনসহ প্রায় আট দশ জন লোক আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলো। আব্বা তাদের থাকার জন্য আলাদা একটি ঘর ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাদের খাবারের জন্য চাল ও ডালের ব্যাবস্হা করেছিলেন। ওই গ্রামের আরও কয়েক ঘর হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আমাদের এলাকায় রাত্র যাপন করতো, এদের মধ্যে বিধান সাহা ও অখিলবোনদের কেউ কেউ।

আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সহ আমাদের ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হবে বলে কোন এক তরফ থেকে আব্বাকে হুমকি দেয়া হলো। মুকুন্দ মামা এটা জানতে পেরে আব্বাকে বল্লেন, আমাদের জন্য আপনার ক্ষতি হোক,আমাদের ক্ষতি হোক তা আমি চাইনা।আপনি আপনার মহল্লার বিশ্বস্ত লোক দিয়ে বর্ডার পার করে দেন।আব্বা তার বন্ধুবর মুকুন্দ মামার পরিবার পরিজনকে নিরাপদে কলকাতা যাওয়ার ব্যাবস্হা করে দিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে খেয়েছেন।অনেককে আব্বা আর্থিক সহযোগিতা করেছেন।

সেপ্টেম্বর মাসের দিকে একটি দোমাল্লাইয়া নৌকায় করে প্রায় বিশ বাইশ কেজি চাল ও অন্যান্য জিনিসপত্র সহ আমরা কয়েক জন তরুণ ও যুবক বয়সী লোক শহরের বাসার উদ্দেশ্যে কুমার নদী দিয়ে যাচ্ছিলাম। বাখুন্ডা ব্রিজের নিচ দিয়ে আমাদের নৌকা যাওয়ার সময় ব্রিজের পাহারাদার রাজাকার বাহিনী আমাদের মুক্তিযোদ্ধা মনে করে থামিয়ে দিলো।আমাদেরকে গুলি করে মারার জন্য নদীর পাড়ে লাইন দিয়ে দাড়াতে হুকুম করল। আমাদের সকলে মৃত্যুর জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে গেলো। আমি সাহস করে হাত উঁচিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে চাইলাম।

ব্রিজের গোড়ায় ওদের ক্যাম্পে আমি গেলাম। এ দিকে ওদের একটি দল আমাদের নৌকা তল্লাশি করে চাউলের বস্তা ছাড়া কোনো আগ্নেয় অস্ত্র পেল না। ওরা উপরে এসে ভালো রিপোর্ট দিলো। আমি বল্লাম আমরা শহরের বাসার জন্য গ্রামের বাড়ি থেকে খাওয়ার চাল নিয়ে যাচ্ছি। আমি তখন ফরিদপুর শহরের মুসলিম লিগের নেতা বিশিষ্ট এডভোকেট আফজাল সাহেবের কথা বলে বল্লাম তিনি আমাদের অনেক ঘনিষ্ঠ জন।আমরা অন্য কিছু নই। আমাদের ছেড়ে দেন। আল্লাহর রহমতে আমি সে যাত্রায় রাজাকারের বন্দুকের নল থেকে বেঁচে গেলাম। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম মনে মনে।

ডিসেম্বরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতীয় মিত্র বাহিনী আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ করলো, শহরে ও শহরের উপকন্ঠে। মুক্তিযোদ্ধারা শহরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে। পাকসেনারা তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালিয়ে যেতে ব্যাস্ত। বাখুন্ডা ব্রিজ একদিন প্রচন্ড শব্দ করে আংশিক ভেঙে পড়লো। আমি তখন ফরিদপুর শহরের বাসায় অবস্থান করছি। ষোলই ডিসেম্বরের পর বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ নাসিরুদ্দিন নাছির ভাই আমাদের বসায় বিজয়ের বেশে বেড়াতে আসেন। তিনি শাহিদা আপার ক্লাসমেট ছিলেন। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি আতিকুর রহমান, আতিয়ার রহমান, মুক্তিযোদ্ধা বতু ভাই আমাদের শহরের বাসায় অনেক অনেক বার বেড়াতে এসেছেন। আমি তাদের খুব নিকট থেকে দেখেছি।

আব্বা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় বাড়িতে ছিলেন। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় তের বছরের বালক, অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করতাম, ফলে আমি মুক্তি যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের আগে সম্ভবত সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে আমি গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। এই সময়ে মা আমার ছোট ভাই বোনদের নিয়ে মামাবাড়িতে বেড়াতে যান। মা এ সময়ে বেশ অসুস্থ ছিলেন। সাইফ তার ক,মাস পরে অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বরে মামা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করে। সাইফ জঙ্গ যুদ্ধের সময়ে জন্মেছিল বলে তার ডাক নাম জং বা জঙ্গু। মেহেদী ভাই খুলনায় চাকরির সুবাদে অবস্থান করছিলেন।তিনি মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আমাদের চাচাতো ভাই ইউসুফ আলী চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বরিশাল এলাকায়। তিনি পরবর্তীতে আমার ছোট বোন হামিদাকে বিবাহ করেন।