বাবা আমার দিল মোহরে কাবা : ছ. মুক্তিযুদ্ধে, আমার অঙ্গনে

আমার একটা ইচ্ছে ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি দেখতে, কিন্তু আমি তখন অষ্টম শ্রেণির বালক। লেখা পড়ার কাজেই বেশি নিমগ্ন ছিলাম। আমার মনের ভেতর একটা জিদ ছিলো ক্লাসে প্রথম হওয়ার। কারণ ইতিপূর্বে আমি কখনও কোন ক্লাসে ফার্স্ট ছাড়া অন্য কোনো পদে পদস্পর্শ করিনি। কিন্তু গ্রামের স্কুল থেকে ফরিদপুর হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর সপ্তম শ্রেনীর ফাইনাল পরীক্ষায় ৩৫০ ছাত্রের মধ্যে দ্বিতীয় হলাম। এইস্কুলের ফার্স্ট বয় আবদুল মালেক আবারও ফার্স্ট হলো, তবে সামছুল হককে তৃতীয় করে আমি দ্বিতীয় হলাম। এতে অন্যান্য ছাত্রদের দৃষ্টি আমার দিকে নিবন্ধ হলেও আমি ফার্স্ট না হাওয়ার লজ্জায় ও ক্ষোভে মর্মাহত হলাম। কিন্তু এ সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। যুদ্ধ শেষে আমরা অটোপ্রমোশন পেয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। রোল নম্বর যার যা ছিলো তাই বলবত রইলো। তাই পরীক্ষা না দিয়েও আমি ওই দ্বিতীয় শ্রেণিরই রয়ে গেলাম। পরে অবশ্য এসএসসির টেষ্ট পরীক্ষায় আমি ওদের সবাইকে পিছনে ফেলে সামনে গেলাম অর্থাৎ ফার্স্ট হলাম। এটা আমার জীবনের একটি বড় যুদ্ধ ছিলো এবং আমি বিজয়ী হয়েছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের মতন।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমি কখনও গ্রামের বাড়িতে আবার কখনও শহরের বাড়ীতে ছিলাম। পাকবাহিনী আমাদের নিকটবর্তী ময়েনদিয়া বাজারে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। প্রায় শতকের মত দোকান পাট,গুদাম ঘর,ঔষধের দোকান পুড়ে ছাপ হয়ে যায়। পাকসেনাদের ভয়ে অধিকাংশ পুরুষ লোকেরা রাতে আত্মগোপন করতো। অনেকে বাড়িতে না থেকে ঝোপ ঝাড়ে, বনে জঙ্গলে আশ্রয় নিতো। আমাদের মহল্লার লালু সমাদ্দর একটু বেশি ভীতু প্রকৃতির ছিলো। সে রাত্রে জঙ্গলে আশ্রয় নিতো এবং তাকে মশায় কামড়ালেও তাদের হাত দিয়ে শব্দ করে মারতো না পাছে পাকসেনারা মশা মারার শব্দ শুনে বন্দুক উঁচিয়ে গুলি করে। সে হয়তো মনে মনে মশাদের বলতো, যাও মশা রক্ত খাও, কতো আর খাবে তুমি, তুমি তো দেশীয় মশা, তোমরা পাক হানাদার নও, পাকিদের এ বাঙ্গালের রক্ত খেতে দেবো। রক্ত খাইলে বাঙ্গালের রক্ত বাঙ্গালে খাউক, মনের হাউস পুরন করুক। লালু সমাদ্দর এখন কবর দেশে। লালু তুমি সেদিন পাক-হানাদারদের রক্ত খেতে দাওনি, কিন্তু যে মশারা তোমার রক্ত খেয়েছিল, যাদের তুমি মারনি তারা এখনও রক্ত খাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘর বাড়িতে লোকজন কম সময়ের জন্য অবস্থান করতো। আমাদের ঘর বাড়িতে কোন পক্ষ থেকেই আক্রান্ত হওয়ার জোর আশংকা ছিলো না তদুপরি রাতে কিছু সাহসী যুবকদের সাথে আমিও গ্রমের বাড়ি রাত্রে পাহারা দিতাম। আমার সহযোগী ছিলো সাত্তার, আমাদেরই গৃহকর্মী। সে ছিলো অকুতোভয় ও অপরিনামদর্শী। সে এ কাজে দারুণ উত্সাহী ছিলো। আমাকে জানিয়েই আমাদের ক্ষোপের মুরগী, খছরু ভাইজানদের ক্ষোপের মুরগী চুরি করে জবাই করে রান্না বাড়া শুরু করে দিতো। আরও সহযোগীদের নিয়ে আরাম করে খেতো। এটাকে ঠিক চুরি বলা যাবেনা কারণ বাড়ির প্রভাবশালী সদস্য এই বালক আমির সায় ছিলো তাতে।

মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে অনেক খেয়েছেন, তাদেরকে আব্বা অনেক যত্ন করে খাইয়েছেন। আমার মা তাদের খাবারের আঞ্জাম দিয়েছেন। ছোটো ভাই আসাদ,ও হাবিব তাদের আপ্যায়ন প্রকৃয়ায় জড়িত ছিলো। মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমাদের নিকটবর্তী ময়েনদিয়া বাজারে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা শাহ জাফরকে সম্বর্ধনা প্রদানের আয়োজন করা হয়। এ সময়ে দেখেছি জাফর ভাইকে দেবতার মতো তার পদদেশে ফুল দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের পূজো করতে। ডাঃ মুকুন্দ লাল সাহা মামা জাফর ভাইয়ের পায়ে ফুল দিয়ে অধবদনে শেবা বা প্রনাম করলেন। আমি একটু অবাক ও আনন্দিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে মুকুন্দ মামা খুব প্রভাবশালী হিন্দু এলিট যিনি একমাত্র আমার বাবাকেই নমস্কার করতেন আর কোন হিন্দু মুসলিমকে তিনি তোয়াক্কা করতেন না, যাকে আমরা, অর্থাৎ আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন, সেই তিনি বেঁচে আছেন বলেই আজকে একজন মুসলিম মুক্তিযোদ্ধাও তার প্রনাম পাচ্ছেন, পূজা পাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধাদের দেবতার কাতারে সামিল হচ্ছেন।