বাবা আমার দিল মোহরে কাবা : জ) দেন, দরবার ও বিচার শালিসি

আমার বাবা চল্লিশ দশকের উপান্তে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার জজকোর্টের জুরি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। তখন কার দিনে এলিট৷ শ্রেণির মধ্যে যারা বিচার কার্য ভালো বোঝে,বড়ো বড়ো পাবলিক ফাংশনে বিচার শালিসি কাজে দক্ষতা দেখান তাদেরকে জুরি বোর্ডের সদস্য করার রেওয়াজ ছিলো। তিনি আমাদের গ্রামের ও পার্শ্ববর্তী চল্লিশ গ্রামের শালিসি কাজের সভাপতি বা প্রধান বিচারকের ভুমিকা পালন করেছেন।

এইসব দরবার মিটিং সিটিং এ আব্বার বেশ কিছু নিজস্ব বুদ্ধিমান এবং সাহসী প্রকৃতির লোক ছিলেন। এদের মধ্যে মহল্লার ছয় আনি খারদিয়া অংশের নজিম চৌধুরী, দুদুমিনা, আবদুস সাত্তার মিয়া, রত্তন মিয়া, আমজেদ মোল্লা, সহিদ মুসল্লী, গফুর মোল্লা, জলিল মাস্টার, আজাহার মাতুব্বর, ননী বিশ্বাস, নজিম মুনশি, শুকুর মোল্লা, গোপাল মোল্লা, মোছলেম মুনশি, মোছলেম খাঁ, রইসুল মুনশি, মোজাম ফকির, নবেদ সেখ, রশিদ সেখ, ছাদেক মোল্লা, লাল মিয়া, মোবারক সরদার, হাসেম সেখ প্রমুখ প্রধান। পরবর্তী প্রজন্মের যারা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগন্য হলেন বাকা চৌধুরী, আমজেদ মিনা, মোখলেস ওরফে মকো, সামাদ ফকির, সূর্য খা, নান্নু মোল্লা, সিদ্দিক সেখ, বকুল মাতুব্বর, মজিবর, ফায়েকসহ আরও অনেকে। দশ আনি খারদিয়া অংশের আয়নাল মিয়া, জয়নাল মিয়া, চান কাজী, পাচুমোল্লা, রহম মোল্লা, সামছুল হক খান, হাবন মীর, দলিল উদ্দিন মুনশি প্রমুখ গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ আব্বার সাথে ভিন গ্রামের বিচার শালিসির সহযোগী হতেন।

এসব মিটিং এ ওপাড়ের সেখপুরার আবদুল মোল্লা, রাঙ্গারদিয়ার লাল মিয়া, রওশন মুনশি ও চাকলাদার আব্বার সহযোগী হতেন। অধিকাংশ বিচার শালিসি ও দেন দরবারের বিষয় বস্তু ছিলো জমি দখলের হাঙ্গামা, থানা পুলিশের কেস কাচারি, চুরি ডাকাতির শাস্তির বিধান, কাইজা-ফাসাদ, খুন-খারাবি, মিথ্যা মামলা, জোর-জবরদস্তির ফসল কাটা, অন্যের পাওনা টাকা আদায়, জমির অংশীদারদের ভাগ বিলি বন্টন প্রভৃতি। কোর্টে ফৌজদারি কেসের মিমাংসা এ সব মিটিংই আব্বা সুন্দর ভাবে সমাধান করে দিতেন। মিটিং এ যা হুকুম দিতেন তাই সকলে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিতেন।

আমি যখন ফরিদ পুর শহরে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে পড়াশোনা করতাম, তখন মাঝে মধ্যে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে আব্বা আমাকেও ওই সব দরবারে বিচার শালিসি কাজে নিয়ে যেতেন। আমি বেশ আগ্রহ ভরেই তাতে অংশ নিতাম। নিজ মহল্লার ছোট খাটো মিটিং এ আব্বা নিজে না গিয়ে আমাকে পাঠাতেন মোজাম ফকির কখনও বা মোছলেম খার সাথে। আমি প্রাথমিক ভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম কিন্তু রায় পরবর্তী কোন মিটিং এ আব্বাই দিতেন।

একবার আমাদের গ্রামের হাটখোলায় চল্লিশ গ্রামের এক শালিসি মিটিং আমি অংশ গ্রহণ করেছিলাম। এটি মূলত গ্রামের দশআনি ও ছয়আনির প্রভাব প্রতিপত্তি বিষয়ক বিবাদ বিসম্বাদের ফয়সালা কেন্দ্রিক ছিলো। আব্বা তার জীবনের পরবর্তী তিরিশ বছর এসব বিচার আচার, দেন দরবার থেকে গুটিয়ে নেন এবং দেন দরবারের ভার গ্রামের মাতুব্বর শ্রেণির হাতে ছেড়ে দেন। আব্বার অবর্তমানে আমার ছোট ভাই শাহ হাবিবুল্লাহ এসব সামলে নিচ্ছে। কিন্তু গ্রামের রাজনীতি এখন খুব খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। দূর্নীতি ও অবৈধ টাকা কড়ির লেনদেন বেড়ে গেছে। মিথ্যা ও ভুয়া ঘটনা সাজিয়ে সত ও সম্মানিত লোকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কোনঠাসা করার জঘন্য তৎপরতা চলছে। ভুমি দখল ও ফসলাদী না দেওয়ার অপতৎপরতা চলছে।

গ্রাম্য টাউটশ্রেনীর লোকদের হাতে ভদ্রও নিরীহ লোকেরা জিম্মি হয়ে পড়ছে। নিত্যনৈমিত্তিক কাইজাডাঙ্গায় সাধারণ মানুষ ও ভদ্রলোকেরা ক্ষতি গ্রস্ত হচ্ছে। এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা ভেঙে গিয়ে ত্রাসের রাজত্ব চলছে। বছরের পর বছর এইসব দাঙ্গা হাঙ্গামা সংঘটিত হচ্ছে। স্হানীয় প্রশাসন এদের বাগে আনতে হিমসিম খাচ্ছে। আব্বার কবর, মসজিদ আর আমাদের নিঃসঙ্গ পিত্রালয়, জমা জমিন নৈশব্দিক চিত্কারে অন্তঃসলিলা শোনিত প্রবাহে নিস্পিষ্ট হচ্ছে।

আমার নৈশব্দিক উচ্চারণ

একাত্তর থেকে দুহাজার একুশ
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর চলে এল
আমরা কতটা স্বাধীন, কতটা জমিন দখলে আমাদের
আছে কতটুকু ভিটেমাটি,
কতটুকু ফসলের ঘ্রাণ আমরা শুকতে পারি?
পুকুরের মাছ, বাগানের ফলমূল, জমির ফসল
কতটুকু আমাদের গোলায় বিশ্রাম পায়?

সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথামনে পড়ে
আমি তখন বালক বয়সী মেধাবী ছাত্র
লেখা পড়া ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারিনি।
সহপাঠী নিমে দত্তের বাড়ির সবকিছু লুঠ করে নিল
মোনাফেক মুসলিম নামধারী মানুষেরা,
আমি তাদের ঠেকাতে পারিনি, পারার কথাও নয়।
আমার পিতা অনেক হিন্দু ভাইদের আশ্রয় দিয়েছে
কিন্তু এখন ওইসব মোনাফেকবৃন্দ হস্তি শূঁড় উচু করেআসে,
আমাদের ঘরদোর পড়ে আছে ইয়াতিম বালকের মত
মাত্র ক,বছর হল ইদুরের উৎপাত বেড়ে গেছে।

আমরাতো আশ্রয় দিয়েছি অসহায় লোকদের
আমরা কিছুতে ছাড় দেবনা ঘাতক দূর্বৃত্তদের
আমরা স্বাধীন, স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে জানি
প্রতি ইঞ্চি জমিনের পাহারাদার আমরা
পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের
মুক্তিযোদ্ধা আমরা, এই আঠারো কোটি জনতা।