বাবা আমার দিল মোহরে কাবা : ট) আড়ং ও নৌকাবাইচ

আমার বাবা আধুনিক শিক্ষিত ও প্রগাঢ় ধর্মানুরাগী। তিনি সরাসরি গ্রাম্য কোন আড়ং বা মেলার আয়োজক হোতেন না। এমনকি এইসব মেলায় তিনি কখনও অংশ গ্রহণ করেননি এবং কেনাকাটা করার জন্যও যেতেন না।তবে আমাদের গ্রামে ডাঙ্গীর ওপর ঘোড়দৌড় হতো এবং বট তলায় মেলা বসতো। মেলা বা আড়ং করার পারমিশন তিনি দিতেন। দুদুমিনা সাহেব, আজহার মাতুব্বর, ইনজাহের মাতুব্বর আড়ংয়ের ব্যাপারে খুব উত্সাহী ছিলেন। তারাই আড়ংয়ের মুল ভুমিকা পালন করতেন। আড়ংয়ের মূল আকর্ষণ ছিলো ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা। আব্বা মেলায় না গেলেও নিজ মহল্লার কাউকে দিয়ে আমাকে আড়ংয়ে পাঠিয়েছেন ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা দেখার জন্য। দুদুমিনা ও আজহার মাতুব্বরের তরতাজা, টগবগে ঘোড়া এই প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতো এবং পুরস্কার পেতো। আশপাশের গ্রামের ঘোড়াও আমাদের গ্রামের এই আনন্দময় মেলায় অংশ গ্রহণ করতো।
ঘোড়ার দৌড় শুরু হতো ডাঙ্গীর দক্ষিণ কোণে সহিদ মুছল্লীর বাড়ীর নিকট থেকে আর শেষ হতো উত্তর কোনের আজহার মাতুব্বরের বাড়ির কাছাকাছি এলাকার প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের দীর্ঘ এবং উচু সমতল ভুমিতে দৌড় প্রতিযোগিতা চলত।ঘোড়ার দোড়ো সওয়ারীর ভুমিকাই প্রধান, সেই ঘোড়াকে তীব্র বেগে ছুটে যেতে নির্দেশনা দিয়ে থাকে এবং ঘোড়াকে তীব্র গতিশীল হতে দক্ষ ঘোড়চালকের মতো কাজ করে। প্রত্যেক প্রতিযোগির ভালো সাপোর্টার এবং দর্শক ময়দানে উপস্থিত থাকে। কেউ কেউ রং বেরংয়ের পোশাক আশাক পরে ঢোল ঢাক পিটিয়ে ছড়াগান গাইতে থাকে। এমন একটি ছড়াগানের নমুনা :

দুলদুল ঘোড়া আমার ছুটছে উড়ে উড়ে
চোখের পলকে যাবে হাজার মাইল ফুড়ে।
সাধের টাট্টু ঘোড়া আমার সাধের টাট্টু ঘোড়া
তোর পাছায় মারবোনারে কোড়া
তুই যা রে দুলকি তালে
তুই যা রে পঙ্খীরাজ,
আজকে তোর মাথায় দেবো তাজ।
ওরে আমার দুলদুল দুলে দুলে যা
সব্বাইকে পাছে ফেলে আগে আগে যা
আরে যা যারে যা,
সোনার টোপর যে দেবেনা
তারে ধইরে খা
আরে খা খা খাখা বক্কিলারে খা।

অনেক সময় প্রতিযোগিতা নিয়ে পক্ষ বিপক্ষে দারুণ মারামারি লেগে যেতো।এই দ্বন্দ্ব কলহের জেরে দেশীয় অস্ত্র পাতি যেমন ঢাল শড়কি, রামদা,কাতরা ভেলা উড়া টেটা দিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেধে যেতো। এর ফলে মাঝে মাঝে এই ঘোড়দৌড় খেলা,আড়ং বন্ধ যেতো। আব্বা পরবর্তীতে আর ঘোড়দৌড়, আড়ংঅনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন আর আমাদের গ্রামে ঘোড়দৌড় আড়ং হয় না। আড়ংয়ে ঘোড়দৌড় শেষে কোনো কিছু কেনাকাটা না করে চলে আসতাম। কারণ আব্বা মেলা থেকে কোন নিন্মমানের জিনিস কিনতে পছন্দ করতেন না। মেলার খোলা বাজারের কোন মিষ্টান্নও আমরা কেনাকাটা করতাম না।

ধুলাময়লা যুক্ত খাবার খেলে অসুখ হবে বিধায় আব্বার এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিলো। আমি আমার আব্বার আদেশ নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করতাম। আমাদের বাড়ির পশ্চিমে বাহির বাড়ির কাচারি ও মসজিদ সংলগ্ন কুমার নদী আমার জীবনে অনেক আনন্দময় জল জোছনার রেশমী জোয়ার সৃষ্টি করেছে। এই নদীতে আমি গোছল করেছি, নদীর এ পাড় ও পাড় করে সাঁতার কেটেছি। সমবয়সী ও প্রায় সমবয়সী হালিম ভাই, সেলিম ভাই, মাজেদ,আজিজ, সাত্তার প্রমুখের সাথে পানি ডুবি বা ওইল ডুগ খেলেছি। ওইল ডুগ আমাদের এলাকার পানিতে ডুবে ডুবে অনেকটা ছিবুড়ি বা ছি কুতকুত খেলার মতো মতো প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে একডুবে পানির তল দিয়ে ছুয়ে দেওয়া। বর্ষাকালে, অথবা চৈত্র মাসের নদীতে ঝাঁপাঝাপি করে এই খেলায় প্রায় ঘন্টাধিক কাল অতিবাহিত করা ছিলো আমাদের নৈত্যনিমিত্তিক কাজ।
এই আনন্দ গোছল ও পানিডুবি খেলা অবশ্যই আব্বার চোখ ফাঁকিদিয়ে খেল্লেও মায়ের কাছে ধরা পড়তাম অতিরিক্ত পানি ডুবে খেলায় চোখ লাল করার কারণে। আমার লালচোখ দেখে মা আর চোখ লাল করতেন না আব্বার প্রকট লাল চোখের ঝড় ঝাপটার আসন্ন বিপদের আভাস অনুমান করে। বর্ষা কালে কুমার নদী পানিতে দুকুল ছাপিয়ে কোলচরীকে একাত্ম করে বিশাল আকার ধারন করত। আমারা কোলচরীর অল্প পানিতে তালের ডোঙা, কলার ভেলা, কখনও কখনও আমাদের এক মাল্লার নৌকা বেয়ে আনন্দ উত্সব করতাম। এ আনন্দ মেলায়, আমার সমবয়সী খেলার সাথীরা অংশ নিতো। আশ্বিন কার্তিক মাসের শান্ত অথচ ভরা নদীতে নৌকাবাইচ হতো।

নৌকা বাইচ আমাদের বাড়ির পশ্চিম উত্তরে নতুন গাঙের মুখ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের জোগাড় দিয়ার ঘোষের বাগান পর্যন্ত দীর্ঘ নদীপথে অনুষ্ঠিত হতো। নৌকা বাইচের সব নৌকাই আমাদের নদীর ঘাট পেরিয়ে যেতো ফলে আমরা নৌকা বাইচের লড়াই দারুণ ভাবে উপভোগ করতাম। তাছাড়া কখনও কখনও আমাদের এক মাল্লার নৌকায় চড়ে নৌকা বাইচের পানির ঢেউ ও দুলুনি খেতে প্রায় কাছাকাছি অবস্থান করতাম। কালু মোল্লা আমাদের নৌকার মাঝি হতো। এটা অবশ্য আব্বার অনুমতিতেই হতো। আমি কখনও কখনও নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার শেষ প্রান্তে ঘোষের বাগানের আম গাছ পরিবেশ্টিত শ্যামল সবুজ ময়দানে নদীর পাড়ে অবস্থান করতাম। সেখানে শতশত লোকের ভিড়ে নৌকা বাইচ কেন্দ্র করে গ্রামীণ আনন্দ মেলা জমে উঠতো।

নৌকা বাইচে আমাদের গ্রামের কয়েকটি নাও অংশ গ্রহণ করতো। এর মধ্যে আমাদের মহল্লার মোচন মোল্লার জল কাইচে নাও,কারিকর পাড়ার আজহার মাতুব্বরের জল কাইচে ময়ুর পঙ্খী নাও উল্লেখ যোগ্য। তবে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশটি নৌকা এই নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতো। এক একটি নৌকায় প্রায় ষাট সত্তুর জন বৈঠাধারী মাল্লা থাকতো। এরা নৌকার প্রতি বাঠামের গোড়ায় গোড়ায় বসে বৈঠা বেয়ে তীব্র বেগে নৌকাকে সামনে নিয়ে যেতো। প্রতি যোগি নৌকা রংতুলি দিয়ে বিভিন্ন শৈল্পিক অংকনে, বাহারি সাজে সজ্জিত করা হত। বিশেষ করে নৌকার গলুই ময়ুর পঙ্খী রুপ নিতো। গলুই এর দুপাশে দৃষ্টি নন্দন হরিণ চক্ষু অংকন করা হতো নৌকার মাঝে কয়েক জন সরদার বাহারি পোশাক আশাকে সজ্জিত হয়ে রাম দা হাতে বিভিন্ন অংগভঙ্গি করতো,ছড়া কাটতো আর তাদের সাথে ঢোল ঢাক, কাশা বাজিয়ে এক আনন্দ ময় অনির্বচনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতো। বাইচের নৌকায় লাফিয়ে লাফিয়ে বিভিন্ন অংগভংগি করে তারা বিভিন্ন ছড়াগান পরিবেশন করতো। যেমন:

হিয়াব্বোল বাইছের নাও
ইয়াব্বোল বাইছের নাও।
জল কাইচে নাওরে আমার
ময়ুর পঙ্খী নাও
জল কাইটা পানি কাইটা
উইড়া উইড়া যাও।
হিয়াব্বোল বাইছের নাও
ইয়াব্বোল বাইচের নাও।

উড়াল্যা কুড়াল্যা বাও
দক্ষিণ দিকে যাও,
ময়ুর পঙ্খী নাওরে আমার
ফুড়ুৎ কইরা ন্যাও।
হিয়াব্বোল বাইছের নাও
ইয়াব্বোল বাইচের নাও।

বৈঠা মারো জোরে শোরে
আরে সোনার চান
সামনে উজাল সুখের দিন
গোলায় সোনার ধান।
উইড়া উইড়া ঘুইরা ঘুইরা
দক্ষিণ দিকে ধাও
জল কাইচে নাওরে আমার
সবার আগে যাও।
হিয়াব্বোল বাইছের নাও
ইয়াব্বোল বাইচের নাও।

নৌকা বাইচের এই ছড়া গানটি আমার রক্তের ভেতর কবিতার বীজ বুনে দিয়েছে। আমাকে এখনও সবার আগে যাবার ঝড় বইয়ে দিচ্ছে।