আমাদের পুকুর, নদী : মাছে ভাতে বাঙালি

আমার বাল্য ও কৈশোরে আমাদের বাড়িতে দুটি, পুরান বাড়িতে একটি ও বিলে তিনটি পুকুর ছিল। আর বাড়ির সাথেই ছিল খরস্রোতা কুমার নদী। এই পুকুর নদীতে প্রচুর তাজা মাছ পাওয়া যেত। বিলের পুকুরে মাছের চাষ হতো। বাড়ির পুকুরে কখনও কখনও মাছের চাষ করা হতো। আমরা প্রায় বছর জুড়ে এসব জলাশয়ের তাজা মাছ ভাজা ও ঝোলে রান্না করে খেতাম। এখন বাড়িতে একটি, পুরান বাড়িতে একটি ও বিলে একটি পুকুর জীবিত আছে। কুমার নদীও ক্ষীণতোয়া। আমার ছোটবেলার মাছের সাথে অনেক মধুময় স্মৃতি এখনও আমাকে তাড়িত করে।

মাছে ভাতে বাঙালি বলে একটি বিখ্যাত উক্তি যা আমার রক্তের ভেতর শোল গজারপোনামাছের ঝাকের মতো শ্লোগান দিয়ে ওঠে। আমি ছোট বেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলাম এর কারণও মাছ- কারণ বাড়ির পুকুরে কিম্বা কুমার নদীর বুকে বড়শি ফেলে মাছ ধরার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, ছিপ ফেলে কাঙ্খিত মাছের জন্য ছিপ ফেলে অপেক্ষা করা আমাকে ধৈর্যশীল ও অধ্যাবসায়ী করেছে- লেখা পড়ার ভালো রেজাল্টের জন্যও পরিশ্রমী করেছে।

বাড়ির পুকুরে ও নদীতে আমার বড়শী ফেলে মাছ ধরা আব্বার চোখ ফাঁকি দিয়েই করতে হতো। আমি বড়শিতে বেশ মাছ ধরতে পারতাম। পাড়ার ছেলেদের সাথে আমি কখনও বিলে মাছ ধরতে যাইনি।তবে বর্ষা কালে বাইনা পেতে, ওচা দিয়ে, খেবলা জাল দিয়ে যারা মাছ ধরতে যেতো, তাদের সাথে কখনও কখনও যেতাম, তা উপভোগ করার জন্য। কোচ, ফুলকুচি, টেটা দিয়ে যারা মাছ ধরতে যেতো তাও দেখতে যেতাম কখনও কখনও।

বর্ষা কালে এবং ভাদ্র, আশ্বিন মাসে আমাদের কুমার নদীতে বড়শি ফেলে, ওচা, জাল দিয়ে মাছ ধরা হতো। এই মত্স্য শিকারে কেবল মহল্লার ছেলে বুড়োরই নয় বরং পেশাদার জেলেরাও ভেষাল ফেলে ও কাঠাফেলে জাল ঘেরাও দিয়ে প্রচুর মাছ ধরতো। আমাদেরকে জেলেরা প্রতি দিন সকালে অথবা বিকেলে বড়ো আইড়, বোয়াল, শোল-গজার, রুই, কাতল, মৃগেল, চিতল প্রভৃতি মাছ বাড়িতে এসে দিয়ে যেতো। কখনও কখনও স্বরপুটি, পুটি, টংরাসহ পাঁচ মিশালি মাছও দিয়ে যেতো।

আমাদের মহল্লার গফুর সেখ, মদন মোল্লা, কালু মোল্লা, হাসেম মোল্লা কুমার নদীর মাছ ধরতে বেশ দক্ষতা দেখাতো। তারা অন্যদের চেয়ে প্রচুর মাছ ধরতে পারতো। আমাদের দোয়ালের পুকুরে এবং কাইলার দোপের পুকুরে প্রচুর মাছ চাষ করা হতো। এসব পুকুরে রুই, কাতল, আইড়, বোয়াল মাছের সাথে প্রচুর জিয়ল মাছ অর্থাৎ কৈ, শিং, শোল, গজার পাওয়া যেত। পুকুর থেকে ধরা এই সব জিয়ল মাছ অর্থাৎ শিং, মাগুর মাছ বাড়িতে আলাদা জলাধারে বড়ো তাগারি ও মাটির কুয়ায় জিইয়ে রাখা হতো এবং শোল,গজার মাছও আলাদা ভাবে ওই প্রকৃয়ায় জিইয়ে রাখা হতো এবং প্রায় ছয় মাস ব্যাপি খাওয়া হতো।

আমি বাড়ির পুকুরে বড়শি ফেলে মাছ ধরতে বেশ আনন্দ পেতাম। বাড়িতে প্রচুর মাছ থাকা সত্বেও আমি ছোট সময়ে প্রায়ই পুকুরে বড়শি ফেলতাম আর দীর্ঘ অপেক্ষা করতাম কোন পুটি, বোয়াল বা শোল, গজারের জন্য না কোন রজকিনী ছিল না আমার, ছিল না বিপরীত ঘাটে অপেক্ষমাণ কোন মানবীর স্বর্ণকেশীর উদাস উন্মনন।
আমি এখনও বড়শি ফেলে অপেক্ষা করি সোনালি
মতস্যকন্যার,
অপেক্ষার পিলসুজে জ্বলে নক্ষত্রের বাতি,
কখন সকাল হবে
কখন রান্নার ঘ্রাণে আমোদিত হবে হেঁশেল, আঙিনা, ঘর বাড়ি, দেশ, মহাদেশ
মহাপৃথিবীর টাট্টু ঘোড়া আমার বক্ষে জ্বালায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ
কোথায় সোনালি মাছ?
মাছ কি কদর রাতের তপস্বী, কোন দরবেশ
মাহীসওয়ার
ঘুলঘুলি অন্ধকারে ঢেকে গেছে আমাদের জলাশয়, আমাদের ঘরবাড়ি বেওয়ারিশ লাশের মতন
মুখ গুজে পড়ে আছে,
কোথায় রাজ কুমার শাহরিয়ার, শাহজাদা, শাহ আবদুল্লাহ খান মজলিশ!
তোমার উত্তর পুরুষের রক্তে জ্বেলে দাও ফসফরাস
ভিসুভিয়াসের অগ্নি চক্ষু স্হাপন কর চোখ হীন অন্ধের
অক্ষিগোলকে,
মাত্স্যন্যায়ের মত্স্য শিকারে আমি বড়শি ফেলে বসে আছি সহস্র বছর!