বাবার বুকের রেশমি পরশ:

আমার বাবার নানা বাড়ি ফুলসূতি চৌধুরী বাড়ি। আমার দাদা বুড়ো বয়সে অর্থাৎ প্রায় ষাট বছর বয়সে চৌধুরী বাড়ির কুমারী কন্যা ওয়াকিদুন্নেছাকে বিবাহ করেন বেশ ধুমধাম করে। চৌধুরী বাড়ি বিয়ে করা সাধারণ লোকের পক্ষে তখন সহজ ছিলনা। আমার দাদা শাহ আবদুর রহিম সম্ভ্রান্ত ও উচ্চবংশীয় বলে এই চৌধুরী বাড়ির মেয়েকে বিবাহ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। চৌধুরী বাড়ির নামজাদা জমিদার ছিলেন চৌধুরীরানী করিমুন্নেছা।তিনি ফরিদ পুরের জমিদারদের মধ্যে অত্যন্ত মেধাবী ও দক্ষ ছিলেন। আমার দাদার স্ত্রী বিয়োগ হওয়ায় এবং কোন সন্তান সন্ততি না থাকায় তিনি শেষ বয়সে এই বিয়েটি করেন। তার আগের নছব ছিলো গির্দার সৈয়দ বাড়িতে। আমার আব্বাই ছিলেন দাদার একমাত্র সন্তান।আব্বার জবানিতে শুনেছি তিনি যখন শিশু বয়সের তখন তার পিতা মৃত্যু বরন করেন। তার পিতাকে, যখন শেষ যাত্রার গোছল দিচ্ছিলো তখন তিনি বাড়ির উঠোনে খেলছিলেন। আপনজন মৃত্যুর, বিশেষত বাবা হারানোর বেদনা বোধ তার তখনও জাগ্রত হয়নি। আব্বা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাবা হারানোর বেদনা বোধনের অযোগ্যতাকে কপাল লিখন বলে আফসোস
করেছেন। এরপর আব্বা পিতৃহীন জীবনের নিসঙ্গতা নিয়ে বেদনা বধিত জীবন কাটিয়েছেন। আব্বার আম্মুজান তাঁকে আঁকড়ে ধরে কোলে কাখে করে রেখেছেন। বুকের মানিক বুকে চেপেই বৈধবের নরক যন্ত্রণা ভুলেছেন। স্বামীর অবর্তমানে পুত্রই একদিন চন্দ্র জোছনার আড়ং বসাবে! কিন্তু নিয়তি কি তা হতে দেবে? জোছনার ঘরে, যে অমরাবতী কালো রাতের পর্দা ঝুলিয়ে দেবেনা তার দিব্যি কে দেবে! আব্বার মরণঘাতী কলেরা হল! দাদুজানের জান কেঁপে উঠল। হায়! এবার বুঝি সব শেষ হয়ে যাবে। স্বামী হারিয়ে গিয়েছে আধারের কালো জোছনায়! পুত্রও এখন চলে যাবে। হারিয়ে যাবে অজানা অদেখার অমূর্ত ভুবনে। বুকের ধন যে আমার প্রান ভোমরা, নাড়িছেঁড়া অমূল্য রতন তা কি আমাকে রেখে চলে যাবে অনন্তে আদিগন্তের শেষ সীমায়! এ যে কলেরা, এ যে মহামারী, এটা হলে কেউ তো বাঁচেনা। দাদুজান জায়নামাজে বসে গেলেন। আজ তিনি প্রভু, পরম স্রষ্টার কাছে কায়মনোবাক্যে মোনাজাত করবেন, পুত্রের প্রাণ ভিক্ষা চাইবেন। না মালেকুলমউতকে খালি হাতে ফেরত দেবেন না। তিনি নিজের প্রাণ বিসর্জন দেবেন। কিন্তু যে প্রাণ অদলবদলের মালিক তাঁকে তো রাজি করাতে হবে। নিজের জীবনের বিনিময়ে পুত্রের জীবন ফিরিয়ে দেয়ার আর্জি পেশ করবেন। নজরানা দেবেন নফল নামাজ। হে মালিক তুমি আর কত ক্ষতি দিয়ে আমাকে পরীক্ষা করবে? ভার বহন করার অতিরিক্ত বোঝা আমাকে দিও না।দাদূর মোনাজাতে জায়নামাজ ভিজে যায়। আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢ়েকে যায়। পৃথিবীও কান্নার জলে ভিজে যায়। আল্লাহ কবুল করছেন তার প্রার্থনা। আমার দাদীজান মুহূর্তে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হীম শীতল পরশে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েন। আব্বা ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পান। আব্বা পিতৃ-মাতৃহীন এতিম বালকে পরিনত হন। আমার আব্বা প্রায় সময়ে এ কথা আমাদের শুনিয়ে মাতৃহারা হৃদয়ে কোকিয়ে কোকিয়ে কেদেছেন। আমরা নিরবে নিঃশব্দে বুক চাপড়িয়ে কেদেছি। প্রভু হে আমার আব্বা পিতা মাতা হারানোর শোক যন্ত্রণায় কেঁদে কেঁদে বুক ভিজিয়েছে। আমরা দাদা দাদীর সোহাগের রেশমি চাদর থেকে বঞ্চিত হয়েছি।আমাদের বুকেও জমে আছে বেদনার পাথর খন্ড।

আমার আব্বার জন্ম সাল ইংরেজি ১৯০৩। তবে কত তারিখ কোন মাস কি বার তা এ মুহূর্তে মনে নেই। তবে তিনি কবি জসিমউদদীন এর বয়ঃকনিষ্ঠ। পল্লী কবির জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯০৩। কবি সুফি মোতাহার হোসেন এর জম্ম তারিখ ২০ আগস্ট ১৯০৭। কবি হুমায়ুন কবির এর জন্ম তারিখ ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯০৬। হুমায়ুন কবির ও নুরুল হক খোন্দকার নুরু মিয়া সাহেব আব্বার সহপাঠী। আব্বা তাঁর বাবা মা কে শিশু কালে হারিয়ে ছিলেন। ফলে তার লেখা পড়ার কাল শিশু কালেই বিলম্বিত হয়েছিল। একটু বেশি বয়সে তিনি লেখা পড়ার পাঠ শুরু করেছিলেন। এ জন্য জসিম উদ্দিন এর জন্ম সালে তার জন্ম হলেও তিন বছরের কনিষ্ঠ হুমায়ুন কবিরদের সতীর্থ হয়েছিলেন। কবি হুমায়ুন কবিরের বাবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর কবির উদ্দিন আহমদ। তিনি বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। এর জন্য হুমায়ূন কবিরকে পিতার সাথে বিভিন্ন জেলায় থাকতে হয়েছে। তাই হয়ত তিনি নওগাঁ কে.ডি.স্কুল থেকে প্রবেশিকা বা এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং ইংরেজিতে লেটার সহ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। আব্বা কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র হয়েও শেষ পর্যন্ত ঢাকা কলেজে অধ্যায়ন করেছেন। কলেজ জীবনের এই স্বর্ণময় সময়ের হাতছানি ঠেলে দিয়ে পৈতৃক সম্পত্তি দেখভাল করার জোর তাগিদ দিলেন তাঁর পিতৃতুল্য খালেক ভাই। গ্রামের অনেক প্রজাবৃন্দ ঠিক মত খাজনা দেয়না বাবার এই ভাইকে, বাবাকেও। তাই তিনি পৈত্রিক ঐতিহ্য ধরে রাখার দৃপ্ত প্রত্যয় নিলেন। গ্রামের পূর্ব কোনে এক নতুন শাসকের আবির্ভাব ঘটেছে। তিনি অন্য গ্রাম থেকে খার দিয়ায় স্হায়ী বসবাস শুরু করলেন বেশ আড়ম্ববরের সাথে। তিনি পুরোনো ক্ষমতাবানদের তেমন একটা মর্যাদা দিতে চাননা। বাবার এবং চাচার লোকদের তিনি বিভিন্ন কৌশলে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করতেন। বিষয়টি খালেক চাচা এবং বাবার তেমন শোভন মনে হয়নি।তাই আমার মেধাবী বাবা লেখা পড়ার ভার কমিয়ে গ্রাম্য রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলেন। ফরিদ পুর শহরের বড়ো এলিটদের সাথে আব্বার বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। এদের মধ্যে বিষুমিয়া যিনি বোয়ালমারী মধুখালি উপজেলার এম.এন.এ ছিলেন যা এখন এম.পি.মর্যাদার সমান। তাঁকে আমরা খালু বলে সম্বোধন করতাম। তিনি আমাদের আত্মীয় ছিলেন। ইউসুফ আলী চৌধুরী ওরফে মোহন মিয়া, নওশা মিয়া, সৈয়দ আবুল হোসেন ওরফে কোটন ভাই তিনি গেরদার বিখ্যাত সৈয়দ বংশের উত্তর পুরুষ। তিনি আব্বার বোনের ছেলে। নুরুল হক খোন্দকার যিনি আব্বার ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। আব্বা এক সময় জজকোর্টের জুরি বোর্ডের সদস্য হলেন। বিচারকরা বিচারের ফয়সালার জন্য অনেক সময় এই জুরি বোর্ডের সদস্যদের পরামর্শ নিতেন। জাতীয় রাজনীতিতে আব্বা কখনো সরাসরি সম্পৃক্ত হননি, তবে অনেক সাংসদ মন্ত্রীমহোদয়দের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেবের ঋন সালিসি বোর্ডের ফরিদ পুর জেলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন আমার বাবা। পাকিস্তানের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান প্রায় দশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি মৌলিক গনতন্ত্র নামে রাজনীতিতে এক নতুন বিষয় চালু করলেন। এ সময়ে ইউনিয়নে মেম্বার নির্বাচন হত। মেম্বারদের ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হত। এ সব চেয়ারম্যানদের ইপি প্রেসিডেন্ট বলা হত। আমার পিতা যদুনন্দী ইউপির প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এরপর তিনি আর গ্রাম্য নির্বাচন করেন নি তবে কিং মেকার হিসাবে এলাকার রওশন মুনশি, বর্তমান চেয়ারম্যান খায়ের মুনশির বাবাকে তিন বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার ভুমিকা পালন করেছেন। এলাকার জয়নাল আবেদীন সাহেব বেশ কবার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। তাকেও একবার সহায়তা করেছিলেন। আব্বা আইয়ুব খানের রাজনীতির প্রতি বীত শ্রদ্ধ হয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসেন। পাকিস্তানে একবার ফাতেমা জিন্নাহ ও আইয়ুব খানের সাথে সরাসরি ভোট যুদ্ধ হয়।এ সময়ে আাব্বকে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে জোর তৎপরতা চালাতে দেখেছি। জাতীয় সংসদের বিভিন্ন নির্বাচন কালে আমাদের গ্রামের বাড়িতে জন সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন গুনি ব্যক্তিত্ব আব্বার সাথে ঘনিষ্ট ভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়া, কে.এম.ওবায়দুর রহমান, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, অধ্যাপক সাইয়েদ মোহাম্মদ আলী, বিষু মিয়া প্রমুখ। আমার ছোটবেলায় এদের সবাইকে আমাদের বাড়িতে অনেক বার বেড়াতে দেখেছি। সত্তুরের নির্বাচন কালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। আমাদের কাচারি ঘরের ভেতরে আব্বার সাথে এ সব নামি দামি লোকদের মিটিং হলেও কেন যেন আমার প্রবেশাধিকার হত। আমি নিবিড় ভাবে তাদের কথা শুনতাম, বিশেষত তাদের আপ্যায়নের কালে বাড়ির খাদ্য পরিবেশনাকারীদের সাথে আমার সহজ অনুপ্রবেশ ঘটে যেত।

আব্বা তাঁর বাবা মা হারিয়ে যখন নিরেট এতিম হয়ে গেলেন তখন একান্ত কাছে থেকে তাকে দেখা শোনা করেছেন খালেক চাচা। আবদুল খালেক আব্বার আপন চাচাতো ভাই ছিলেন। তিনি বয়সে আব্বার অনেক বড়ো। তিনি বিবাহ করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী আব্বাকে পুত্রের মত আদর যত্ন করতেন। তিনি ছিলেন নিসন্তান। তদুপরি আব্বাকে ছোট ভাইয়ের স্নেহে লালন পালন করতেন দীঘি মহল্লার এক মমতাময়ী বিদুষী নারী। তিনি প্রখ্যাত আলেম মৌলানা শামসুল হক সাহেবের মাতা। আব্বার ভাবীসাহেবা দয়ালু হলেও দাপটে ও দারুণ রাগি মহিলা ছিলেন। তিনি ছিলেন দুধে-আলতা রঙের দীর্ঘাঙ্গি সুন্দরী নারী। তাঁর ডাক নাম ছিল বোঁচা। আামাদের এক চাচি তাঁকে বোচা বুজি বলতেন। আমি ভাবতাম এত সুন্দরী টিকালো নাকের মহিলা যদি বোচা হয় তবে সত্যিকারের নাক বোচা মেয়েরা কোথায় লুকাবে? পাড়া পড়শী নারীরা অবশ্য তাঁকে দোতালার দাদীজান বলে সম্বোধন করত। কারণ আমার চাচার দোতলা বড়ো ঘর ছিলো বলেই হয়ত এমন নামবিশেষণ হয়েছিল তার। আমার আব্বা একটু বড়ো হলে নগরকান্দা স্কুলে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ফরিদ পুর জেলা স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। একমাত্র মেধাবী ছাত্ররা এই স্কুলে পড়ালেখার সুযোগ পেত তখন। আমার বাবা স্কুলের হোস্টেলে থাকতেন। শহরের উপকন্ঠে আত্মীয় স্বজনদের বাসায় থেকে লেখা পড়া করতে পছন্দ করতেন না। লেখা পড়ার ব্যায় ভার জমির ফসলের মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকা পয়সা এবং মহল্লার প্রজাদের প্রদেয় খাজনার টাকায় মিটে যেত। আব্বার খালেক ভাই গ্রামের বাড়িতে থেকে এসবের ব্যাবস্হা করতেন। ছাত্র জীবনে হোস্টেলে থেকেই তিনি দামি পোশাক আশাক পরতেন। আব্বার সহপাঠীরা তার দামি পোশাক আশাক ও রাজকীয় চালচলনে বিস্ময় প্রকাশ করত। অনেকে আব্বাকে বন্ধু হিসেবে পেতে আগ্রহী হতেন। ফরিদপুর শহরের এলিট শ্রেণীর ছেলে পেলেরা সহজেই আব্বার ঘনিষ্ট হয়ে যেত। আব্বার সহপাঠীদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য ছিলেন হুমায়ুন কবির ও নুরুমিয়া খোন্দকার। কবি জসিম উদ্দিন আব্বার বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। হুমায়ুন কবির ১৯০৩ সালের কাছাকাছি সময়ে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অর্থাৎ আজকের দিনের এস.এস.সি’তে বোর্ডে প্রথম স্হান অধিকার করেছিলেন। আব্বা প্রথম শ্রেণিতে ডিস্টিংশন মার্ক নিয়ে বোর্ড থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। হুমায়ুন কবির বিখ্যাত কবি ছিলেন। তিনি পরবর্তী কালে কলকাতার মেয়র হয়েছিলেন নুরুল হক খোন্দকার বা নুরু মিয়া চাচা দীর্ঘকাল ফরিদপুরের উপকন্ঠে কৈজুরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। ফরিদপুর জেলাশহরের প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি আব্বার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি সনামধন্য মন্ত্রী ইনজিনিয়ার খোন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাবা। খোন্দকার মোশাররফ হোসেন সাহেবের ছোট ভাই বাবর সাহেব আহসান উল্লাহ ওরফে হালিম ভাইয়ের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। হালিম ভাই এখন আমেরিকা প্রবাসী। তিনি সেখানে প্রায় তিরিশ বছর স্হায়ী ভাবে বসবাস করছেন। আব্বা মাঝে মাঝে নানাবাড়ি ফুলসূতি চৌধুরী বাড়ি যেতেন। ফাজেল চৌধুরী আব্বার নানা। আবদুল আলেম চৌধুরী আব্বার আপন মামাতো ভাই। আমার চাচার ছয় ছেলে ও চার মেয়ে। সাহেব চৌধুরী, হানু চৌধুরী, ইউসুফ আলী চৌধুরী, পিরু চৌধুরী, জুয়েল চৌধুরী ওরফে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, আলীমুজ্জামান চৌধুরী ওরফে জনু চৌধুরী। এর মধ্যে ইউসুফ আলী চৌধুরীর সাথে আমার পিঠের ছোট বোন হামিদাকে বিয়ে দিয়ে আমার বাবার মাতৃকুলের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রয়াস চালানো হয়। সাইফুজ্জামান ওরফে জুয়েল চৌধুরী আমার চাচাতো ভাই থেকে আরও নিকটে ভয়রা ভাই হয়ে যায়। আমার শ্যালিকা রোমাকে সে আগেই বিয়ে করে। রীতা অর্থাৎ আমার শ্যালিকা রুমার বড়ো বোন ঘটনা চক্রে আমার স্ত্রী হয়ে যায়। এ জন্য অবশ্য রানি ভাবী বা হানু ভাইয়ের স্ত্রী অর্থাৎ আমার বোন হামিদার জা এর ভূমিকা প্রবল ছিল। আমি কবি মানুষ প্রেম সুদূরের বুয়ঝলেও বিবাহকে দারুণ ভয় পেতাম। যা হোক ভাগ্যের লিখন আর কে খন্ডায়! আলেম চাচাকে যাতে না ভুলে যাই, যেন আব্বার মায়ের বাবা বাড়ি কে যাতে আমরা বিস্মৃত না হই, যে দাদুবুজি আমার বাবার জন্য নিজের জান কোরবানি করেছেন তাদেরকে পরম মমতায় তিন তরফের আত্মীয় বন্ধনে সুদৃঢ় করেছি। আমার চাচাতো ভাই জুয়েল শুধু ভাইই নয় বরং বিয়াই উপরন্তু ভায়রা ভাই। সে খুব যোগ্য, করিত্কর্মা এবং আমাদের এলাকার এক্স সাংসদ। আওয়ামী লীগের একজন ভালো নেতা। আলেম চৌধুরী চাচার আপন ভাই কালা চৌধুরী। তার এক পুত্র রবু চৌধুরী। আমার এই চাচার স্ত্রী অর্থাৎ রবুর আম্মা আব্বার সম্পর্কে ভাগনি হতেন। এই চাচীর মাতৃকুল আমার আব্বার আত্মীয়। রবুর আম্মা আমার চাচিআম্মা আমার বাবার চাচাতো বনের মেয়ে। আমার এই চাচিআম্মা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আব্বা হয়তো তার মামাতো ভাইদের পরামর্শে কলকাতা চলে যান উচ্চশিক্ষার জন্য। কলকাতা শহরে আব্বার আরেক ধনাঢ্য মামাতো ভাই ছিলেন।তিনি ফুলসুতি থেকে সেখানে গিয়েছিলেন। আব্বার এই মামাতো ভাইয়ের সাতটি সুরম্য দালান বাড়ি ছিল কলকাতা শহরে। আমাদের এই চাচা কলকাতার সাতটি নৌবন্দরের ঠিকাদারি ব্যাবসা করতেন। আব্বা প্রথমে তার এই ভাইয়ের বাড়িতে থেকে ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। আব্বা ছিলেন স্বাধীনচেতা উন্নত মেজাজের মানুষ। আস্তে আস্তে আব্বা তার মামাতো ভাইবোনের হাল্কা আচরণ বুঝতে পারেন তাই কলকাতা ছেড়ে ঢাকা চলে আসেন। এরপর তিনি ঐতিহ্যবাহি ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।